বছর ষাটের প্রৌঢ়া। টিকালো নাক,গায়ের রঙ ধবধবে ফর্সা। কিন্তু ইতিমধ্যেই অধিকাংশ দাঁত হারিয়ে গাল চুপসেছে। ফলে, শরীরে পড়ন্ত প্রৌড়ত্বের সঙ্গে আসু বার্ধক্যের টানাপোড়েন বেশ লক্ষ্যনীয়। দুপুরে আউটডোর শেষে যখন ছেলের হাতধরে আমাদের এমারজেন্সি তে এলেন, তখনও আমাদের খাওয়া হয়নি। একজন সিস্টার ম্যাডাম, খেতে শুরু করেও কি মনে করে খাওয়া ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে প্রৌড়ার সমুখপানে বসলেন। সাথে আসা ছেলেটি কিছু বলবার আগেই ফোকলা মুখে প্রৌঢ়া বলতে শুরু করলেন, “ শুধুই পোকা, সারা গায়ে শুধু পোকা চরে বেড়াচ্ছে বাবু ”।
আমি অবাক হয়ে কিছু বলবার আগেই সাথে আসা ভদ্রলোক বললেন, মায়ের এ সমস্যা দীর্ঘদিনের। গত তিন বছরে অনেক হাসপাতালে দেখিয়েছি। এই দেখুন স্যার। বলেই ঢাউস একখানা সিটি স্ক্যানের প্লাস্টিকের ভেতর থেকে দিস্তা দুয়েক কাগজ বের করলেন। মূলতঃ পাশের রাজ্যেই বেশি যাতায়াত হয়েছে। অন্তত খান ছয়েক হাসপাতালে দেখিয়েছেন। কেউ করেছেন, ছত্রাক ঘটিত ত্বকের ইনফেকশনের চিকিৎসা। কেউ বা খোস, অথবা অ্যালার্জিক রিয়্যাকসনের জন্য চিকিৎসা। সরকারি নামী হাসপাতালে ডায়াগনোসিস হয়েছে সূর্যের আলো গায়ে লেগে প্লিওমরফিক লাইট ইরাপসন।আবার কেউ বলেছেন সোলার আরটিকারিয়া। অ্যান্টিহিস্টামিন, বিভিন্ন ক্রিম, পেটে খাওয়া ক্রিমির ওষুধ সবই একপ্রকার দেওয়া হয়েছে।সব হাসপাতালেই একবার করে গেছেন। কমেনি দেখেই অন্য হাসপাতালে পাড়ি দিয়েছেন। রিপোর্টও হয়েছে বিস্তর। কিন্তু কিছুতেই কিছু ধরা পড়েনি। মুস্কিলে পড়ে অবশেষে এ রাজ্যে ফিরে এসেছেন। কলকাতার সর্ববৃহৎ সরকারি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে গেছেন। সেখানে ত্বক বিভাগের কোনো এক জুনিয়র চিকিৎসক দেখে বলে কিনা “মানসিক বিভাগে দেখান”। এ শুনে যাইপরনাই ক্ষেপেছেন সবাই। আর যাই বলুক না কেন, আমার মা কি পাগল নাকি? তাই বাড়ি ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সমস্ত “প্যাথি” পর্যুদস্ত হয়েছে এ রোগের কাছে।গ্রামের ভেতর ফেরি করা “সর্বরোগের অব্যর্থ ওষুধ” হিসেবে লাইসেন্স ছাড়া, প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি হওয়া আদপে অবৈধ “স্টেরয়েড”ও খেয়েছেন কয়েক হপ্তা। কিন্তু অবস্থা তথৈবচ। গায়ের পোকা এখনও চরে বেড়াচ্ছে সারা গা জুড়ে।
সব শুনে ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, পোকা গুলো দেখতে কেমন? মানে, সাদা, কালো না বাদামী? ভদ্রমহিলা অসহিষ্ণু গলায় চোখ পাকিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আমার নির্বুদ্ধিতার দিকে তর্জনী তুলে বললেন, দেখতে পাচ্ছেন না? এই তো সাদা সাদা পোকা গুলো সারা গায়ে চরে বেড়াচ্ছে। বলেই উকুন বাছার মতো করে বাম হাতের বাহুতে চিমটি কেটে ডান হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর চিমটিতে একটা কিছু ধরে রেখে বললেন, হাত পাতুন। আপনার হাতে দিয়ে দিচ্ছি। অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাত পাতলাম। আমার চোখে কিছুই পড়লো না। আতসকাঁচের তলায়ও না। আমার অবিশ্বাসের ভ্রুকুঞ্চনে ভ্রুক্ষেপহীন প্রৌঢ়া তখন সারা গায়ে হাত দিয়ে একের পর এক “পোকা” বাছছেন আর উকুন মারার মত করে দুই বুড়ো আঙুলের নখের মাঝে চাপ দিয়ে “উঁহু,উঁহু” করে পরম প্রশান্তিতে ‘পোকা’ মেরে চলেছেন। আমার সন্দিহান চোখ দেখে মাঝপথে মুখ তুলে তাকিয়ে বললেন, একটা দেশলাই বক্সের মধ্যে অনেক গুলো পোকা মেরে জমা করে রেখেছি। চাইলে এক্ষুনি এনে দেখাতে পারি। আমার সিসটার ম্যাডাম হাঁ করে তাকিয়ে উনার কীর্তি কলাপ দেখে চলেছেন।
ততক্ষণে আমি কিছুটা হলেও ঠাহর করতে পেরেছি, কি হতে পারে। “ডিলিউসনাল প্যারাসাইটোসিস”। ডিলিউসন মানে, অবাস্তব ধারণা। প্যারাসাইট মানে পরজীবি। সহজ ভাষায়- সারা গায়ে পোকা চরে বেড়াচ্ছে,এরকম এক অবাস্তব ধারণা। মূলতঃ ব্রেনের স্ট্রায়েটামের মধ্যে ডোপামিনের ট্রান্সপোর্টার সিস্টেমের গন্ডগোলে এ রোগ হয়ে থাকে। সহজবোধ্য ভাবে অবশ্যই মানসিক রোগের একধরনের প্রকারভেদ। কিন্তু ‘মানসিক রোগ’ বললেই বেঁকে বসবেন উনি। আমি কি পাগল নাকি? বলে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতে পারেন। তাই ঠান্ডা মাথায় বললাম, অব্যর্থ এক মলম আছে চাচি। তিন সপ্তাহেই সেরে যাবেন। সাথে একটি মাত্র মুখে খাওয়ার ওষুধ না খেলেই নয়। সেটা মাস কয়েক খেতে হবে। আমার কথা শুনে তিন বছর ধরে ভুগে চলা ভদ্রমহিলার চোখে অবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু অন্য কোনো গতি নেই। এত্ত ওষুধ খাওয়ার চেয়ে একখান ওষুধ আর মলমে যদি সেরে যায়, শেষ চেষ্টা একবার করেই দেখা যাক না।
প্রেসক্রিপশনে অ্যান্টিসাইকোটিক একখান ওষুধ আর মন ভোলাতে শীতে মাখার এক স্বল্প পরিচিত ক্রীম প্লাসেবো এফেক্টের জন্য প্রেসক্রিপশনে লিখে দিলাম। সেদিনকার মত চাচি মা কে বিদায় দিয়ে দুপুরের খাবারে মন দিলাম।
চাচি ফিরে এলেন মাস দেড়েক পর। বললেন – ওই ক্রীম টা দারুন কাজ করেছিলো ডাক্তারবাবু। বছর পাঁচেকের রোগ একদম সেরে গেছিলো। ওটা শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন আবার একই ক্রীম কিনেছি। কিন্তু এবারে আর কমছে না।
জিজ্ঞেস করলাম, মুখে খাওয়ার ওষুধটা খাচ্ছেন না?
চাচি বললেন – ওষুধ দোকানদার বললেন, ওটা ঘুমের ওষুধ। খাওয়া যাবে না। তাই তিন হপ্তা খাওয়ার পরই বন্ধ করে দিয়েছি।
চমকে উঠলাম আমি। আমার জয়েন্ট এন্টান্সের রাত জাগা, পাঁচ বছরের সুদীর্ঘ এম.বি.বি.এস পাঠ্যক্রমের পথচলা, এম.ডি ডিগ্রির কষ্টার্জিত গৌরব মুহুর্তে ম্লান হয়ে গেলো ওষুধ দোকানে কাজ করা তথাকথিত স্বল্পশিক্ষিত এক কর্মীর কাছে।
হাতজড়ো করে আবারও প্রেসক্রিপশনে একই ওষুধ লিখে দিয়ে বললাম, এর পর বন্ধ করার আগে একবার অন্তত সত্যিকারের চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন। মলম টার আর প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র ওই ওষুধ টি রাত্রে একটা করে খেলেই হবে। আর হ্যাঁ, রাতে খাওয়ার ওষুধ মানেই ক্ষতিকারক ঘুমের ওষুধ নয় কিন্তু।











