তখন আমরা বেশ ছোট। বোধ হয় সেভেন-এইটে পড়ি। বাড়ির সামনে হরি সাহার মুদিখানার দোকান ছিল। সেখানে কিছু একটা কিনতে গিয়েছি। মনে আছে, কারও সঙ্গে আমার কথা কাটাকাটি হচ্ছিল। হরি সাহা তখন সেই ছেলেটিকে বলেছিল—“ওদের সঙ্গে ঝামেলা করিস না। ওরা নকশাল।” অর্থাৎ, মেরে-টেরে দিতে পারে। নকশালদের নিয়ে এই ভয়টা কিন্তু আজও অনেকটাই বিদ্যমান।
সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী সিপিআই (মাওবাদী) থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-নকশালবাড়ি আন্দোলন আজ বিভিন্ন ধারায় বিকশিত। তবুও নকশালবাড়ি আন্দোলনের সঙ্গে যে হিংসার একটি সম্পর্ক আছে—এই ধারণাটি আজও বেশ প্রচলিত। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে কর্পোরেট ক্ষেত্র, লেখক, সমাজকর্মী, রাজনৈতিক কর্মী, এমনকি রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছেও ‘নকশাল’ শব্দটি বহু সময়ে হিংসা বা সশস্ত্র সংগ্রামের সমার্থক। কিন্তু এই ধারণাটি কেন তৈরি হল? ধারণাটি কতটা সত্য? নকশাল আন্দোলন আর ‘হিংসা’র মধ্যে কি সম্পর্ক? এই পরিপেস্খিতে অবশ্যই আমার প্রাথমিক প্রশ্ন ‘হিংসা’ বলতে আমরা ঠিক কী বুঝি?
তার আগে নকশালবাড়ি আন্দোলনের শুরুর দিকে একটু ফিরে তাকানো দরকার।
১৯৬৭ সালের নকশালবাড়ি আন্দোলনের পটভূমিতে ছিল জমি, বর্গাদারি অধিকার এবং জোতদারদের আধিপত্যকে কেন্দ্র করে উত্তরবঙ্গের তরাই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কৃষক অসন্তোষ। ভূমি-সম্পর্কের এই বৈষম্য এবং বর্গাচাষিদের অনিশ্চিত অবস্থান বিশেষত আদিবাসী ও দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছিল।
এই বিস্ফোরণের একটি তাৎক্ষণিক সূত্রপাত ঘটে আদিবাসী বর্গাচাষি বিগুল কিষান এবং জোতদারের মধ্যে জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে। আদালতের আদেশে নিজের দাবি করা জমিতে চাষ করতে গেলে তিনি জমির মালিকপক্ষের লোকজনের হাতে আক্রান্ত হন। ঘটনাটি দ্রুত কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে দেয়। তাঁরা জমি দখল করে চাষ করা এবং নিজেদের কৃষক কমিটি গড়ে তোলার পথে এগিয়ে যেতে থাকেন।
পরিস্থিতি দ্রুত সংঘাতের দিকে এগোয়। ২৪ মে ১৯৬৭ পুলিশ কৃষক আন্দোলনের কর্মীদের গ্রেফতার করতে গেলে সংঘর্ষ বাধে এবং পুলিশ কর্মকর্তা সোনাম ওয়াংদি নিহত হন। পরদিন, ২৫ মে, পুলিশ বাহিনী নকশালবাড়ির প্রসাদজোত এলাকায় ফিরে এসে কৃষকদের একটি জমায়েতের ওপর গুলি চালায়। সেই গুলিতে ১১ জন মানুষ নিহত হন—যাঁদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিলেন।
এই হত্যাকাণ্ড নকশালবাড়ির কৃষক বিদ্রোহকে এক নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য দেয়। জমির অধিকার ও বর্গাচাষির ন্যায্য দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া স্থানীয় কৃষক সংঘর্ষ ক্রমশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পের প্রতীকে পরিণত হয়।
কিন্তু এখানেই আমার কিছু প্রশ্ন আছে।
প্রথম প্রশ্ন—‘হিংসা’ বলতে ঠিক কী বোঝায়?
হিংসার সংজ্ঞা কী?
শুধু শারীরিক আঘাত বা প্রাণহানিই কি হিংসা? ক্ষুধার্ত মানুষকে দিনের পর দিন অনাহারে রাখা কি হিংসা নয়? একজন মানুষকে এমন মজুরি দেওয়া, যাতে সারাদিন শ্রম দিয়েও তার পরিবারের দু’বেলা খাবার জোটে না—সেটা কি হিংসা নয়? একজন কৃষকের জমি কেড়ে নেওয়া, একজন শ্রমিককে অধিকারহীন করে রাখা, একজন নারীকে ধর্ষণ করা, রাষ্ট্রের হাতে নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা—এসব কি হিংসার বাইরে?
অর্থাৎ, আমরা যখন ‘হিংসা’ বলি, তখন কি শুধু নিপীড়িত মানুষের প্রতিরোধের দৃশ্যটিই দেখি? নাকি তার আগে ঘটে যাওয়া দীর্ঘস্থায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক, এবং কাঠামোগত হিংসাকেও দেখতে চাই?
‘হিংসা’ শব্দটি অনেক সময় এমনভাবে ব্যবহৃত হয়, যেন বন্দুকের গুলি, বোমা, ছুরি কিংবা শারীরিক আক্রমণই তার একমাত্র রূপ। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় হিংসার ধারণা আরও বিস্তৃত। এমন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যা মানুষের সম্ভাবনাকে পদ্ধতিগতভাবে সীমাবদ্ধ করে, তাকে কাঠামোগত হিংসার আলোচনার মধ্যে আনা হয়।
অতএব, একজন মানুষকে হত্যা করা যেমন হিংসা, তেমনই এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে একজন মানুষ সারাজীবন শ্রম দিয়েও ক্ষুধা থেকে মুক্ত হতে পারে না—সেটিকেও হিংসার বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে বিচার করা যায়।
এখানে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। কাঠামোগত হিংসাকে স্বীকার করা মানে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক হিংসাকে ন্যায্য বলে ঘোষণা করা নয়। বরং প্রশ্নটি হল—একটি হিংসাত্মক ঘটনাকে তার জন্মদাতা সামাজিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা কতটা ন্যায়সঙ্গত?
দ্বিতীয় প্রশ্ন—গীতা কি ‘হিংসা’ প্রচারের গ্রন্থ?
গীতার কেন্দ্রে তো এক যুদ্ধক্ষেত্র। অর্জুন যুদ্ধ করতে অস্বীকার করছেন, আর কৃষ্ণ তাঁকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করছেন। সেখানে ধর্ম, কর্তব্য, ন্যায় এবং যুদ্ধ—সবকটি প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
তাহলে গীতাকে আমরা কীভাবে পড়ব? কেবল যুদ্ধের উপস্থিতির কারণে কি তাকে ‘হিংসার গ্রন্থ’ বলে বাতিল করব? নাকি বুঝব, ভারতীয় নৈতিক ও দার্শনিক ঐতিহ্যের মধ্যেই অন্যায়, কর্তব্য, ন্যায়, এবং প্রতিরোধের প্রশ্ন বহু প্রাচীন?
তৃতীয় প্রশ্ন—আমাদের দেব-দেবীর হাতে এত অস্ত্র কেন?
দুর্গার হাতে ত্রিশূল, চক্র, খড়্গ; বিষ্ণুর হাতে সুদর্শন চক্র; শিবের হাতে ত্রিশূল; কার্তিকের হাতে তীর-ধনুক ।এগুলি কি নিছক অলংকার?
অবশ্যই নয়। এগুলির মধ্যে অশুভের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, অন্যায়ের বিনাশ এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতীকী অর্থ রয়েছে। অর্থাৎ, আমাদের সাংস্কৃতিক কল্পনায় অস্ত্র সবসময় কেবল ধ্বংসের প্রতীক নয়; কখনও তা প্রতিরোধেরও প্রতীক।
চতুর্থ প্রশ্ন—মহিষাসুরমর্দিনী কিসের আলেখ্য?
দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করছেন। আমরা প্রতি বছর সেই দৃশ্যকে উৎসবের সঙ্গে স্মরণ করি। সেখানে কি কেবল হত্যার উদ্যাপন আছে? নাকি অন্যায় ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি সাংস্কৃতিক প্রতীকও রয়েছে?
পঞ্চম প্রশ্ন—আমাদের দুই মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত আসলে কীসের কাব্য?
দুই মহাকাব্যেই যুদ্ধ আছে, মৃত্যু আছে, রক্তপাত আছে। কিন্তু আমরা সেগুলিকে কেবল ‘হিংসার কাব্য’ বলি না। কারণ আমরা জানি, যুদ্ধের বাইরেও সেখানে রয়েছে ন্যায়-অন্যায়, ক্ষমতা, কর্তব্য, অধিকার, বিশ্বাসঘাতকতা, শোষণ, এবং প্রতিরোধের জটিল প্রশ্ন।
তাহলে নকশাল আন্দোলনের প্রসঙ্গে ‘হিংসা’ শব্দটি উচ্চারণ করলেই কি আলোচনাটি শেষ হয়ে যায়? না।
আমি নকশাল আন্দোলনের সমস্ত রাজনৈতিক কৌশলকে সমর্থন করছি না। নকশাল আন্দোলনের ইতিহাসে যে হিংসা ঘটেছে, তার নৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন অবশ্যই হওয়া উচিত। নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ কিংবা হত্যাকে কোনও বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের নামে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যায্য বলে দেওয়া যায় না।
কিন্তু একই নৈতিক প্রশ্ন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত। প্রযোজ্য হওয়া উচিত জমিদার বা জোতদারশক্তির ক্ষেত্রেও, সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রেও, এবং যে কোনও সংগঠিত ক্ষমতাশালী শক্তির ক্ষেত্রেও।
কারণ ইতিহাসে শুধু ‘হাতিয়ারি’ বিপ্লবীরাই মানুষ হত্যা করেনি। রাষ্ট্রও করেছে। সামন্তশক্তিও করেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার রক্ষাকর্তারাও করেছে। শ্রেণিগত ও সামাজিক আধিপত্যও মানুষের জীবনকে ধ্বংস করেছে। কখনও তা প্রকাশ্য বন্দুকের গুলিতে, কখনও অনাহারে, কখনও উচ্ছেদে, কখনও ধর্ষণে, কখনও সামাজিক বঞ্চনায়।
হিংসার বিচার কেন একই মাপকাঠিতে হবে না?
আর এখানেই আমার শেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
হাজার হাজার বছর ধরে দিনের পর দিন, সারা দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেও যদি আপনার খাবার না জোটে, মাথার উপর ছাদ না জোটে, লজ্জা নিবারণের বস্ত্র না জোটে—যদি আপনার পরিবারের মেয়েদের ধর্ষিত হতে হয়, যদি আপনার পরিবারের সদস্যদের বিনা বিচারে রাষ্ট্রীয় এবং রাষ্ট্র বহির্ভূত সশস্ত্র বাহিনীর হাতে খুন হতে হয়—তাহলে আপনি কী করতেন?
তখনও কি আপনি শান্তভাবে বসে থাকতেন? আপনি কি তখনও বলতেন—“আমি হিংসা অবলম্বন করতে পারব না”? নাকি একদিন আপনার ভিতরেও প্রতিরোধের আগুন জ্বলে উঠত?
এই প্রশ্নটির সহজ উত্তর নেই।
কারণ মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কীভাবে প্রতিরোধ করবে—তা শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়; এটি ইতিহাস, শ্রেণি, ক্ষমতা, রাষ্ট্র, এবং সামাজিক অবস্থানের প্রশ্নও।
৯ আগস্টের রাতের কথা মনে করুন। কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়—একজন সাধারণ মানুষের অবস্থান থেকে প্রশ্নটি করুন। যখন অন্যায় আপনার নিজের দরজায় এসে দাঁড়ায়, যখন আপনার প্রিয়জনের নিরাপত্তা বিপন্ন হয়, যখন রাষ্ট্র বা ক্ষমতাশালী মানুষ আপনাকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করে, তখন আপনার প্রতিক্রিয়া কী হবে?
আপনি কি তখনও যাদবপুর ৮বি বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে প্রতিবাদ করবেন? হয়তো করবেন। এবং সেটাই সভ্যতার সৌন্দর্য—মানুষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হিংসার পরিবর্তে অহিংস প্রতিবাদের পথ বেছে নিতে চায়।
কিন্তু যদি সেই মানুষটির মনে হয় যে তার সামনে আর কোনও পথ খোলা নেই?
এই পরিপেস্খিতেই নকশালবাড়ি আন্দোলনকে বুঝতে হবে।
হিংসাকে সমর্থন করা আর হিংসার জন্মের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণকে বোঝা—এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
নকশাল আন্দোলন নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হোক। তার রাজনৈতিক কৌশলের সমালোচনা হোক। তার সশস্ত্র রাজনীতির নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠুক। তার হাতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডেরও বিচার হোক।
কিন্তু তার আগে সেই সমাজটিরও বিচার হোক, যে সমাজে লক্ষ লক্ষ মানুষ শোষণ, দারিদ্র্য, বঞ্চনা, এবং অপমানের মধ্যে বেঁচে থাকতে বাধ্য হয়েছিল।
কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটি সম্ভবত এই—
শুধু প্রতিরোধের হিংসাকে দেখলে ইতিহাসের অর্ধেক দেখা হয়। প্রতিরোধের আগে যে হিংসা মানুষকে সেখানে ঠেলে দিয়েছিল, সেটিকে না দেখলে ইতিহাস পাঠ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
তাই প্রশ্নটি “কে হিংসা করল?” – এর মধ্যে সীমাবধ্য থাকা উচিত নয়। প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত হওয়া উচিত—“কার বিরুদ্ধে, কোন পরিস্থিতিতে, কোন ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে, এবং কী ধরনের হিংসা সংঘটিত হল?”
পুনশ্চঃ এ লেখা যখন লিখছি, তখন আরএসএস এবং বিজেপি-র গুণ্ডারা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অরবিন্দ হোস্টেল আক্রমণ করেছে এবং তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। হোস্টেলের কোলাপসেবল গেটের মধ্যে তখন বন্দী ছাত্ররা। ঘটনাস্থলে কোনো পুলিশ দেখছি না। এই গৈরিক সন্ত্রাস থেকে ছাত্রদের বাঁচাতে রাষ্ট্র যদি আগ্রহী না হয়, তাহলে ‘হিংসা’ বা লাল সন্ত্রাসই কাম্য।











মননশীল বিশ্লেষণ