নিচের লেখাটা গল্প – আবার গল্প নয়ও। আজ আমার এক খ্যাতনামা সাহিত্যিক দিদির কাছে জানতে পারলাম, জীবনদায়ী রক্তেরও ধর্মীয় বিশুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে কোনও কোনও দেশপ্রেমী মহলে।
আমার প্রশ্ন, সত্যি সত্যিই কোনও দুরারোগ্য ব্যাধির আক্রমণ বা মর্মান্তিক দুর্ঘটনার মুখোমুখি হলে মানুষ কী রক্তের জাত বা লিঙ্গ বিচারের অবস্থায় থাকে?
উচিত-অনুচিতের সীমারেখা বহুদিনই গুলিয়ে গিয়েছে আমার — বেশির ভাগ সময়েই নীরব থাকি তাই।
মানুষের শুভবুদ্ধির ঊর্ধ্বে কিছু নেই, কেউ নেই — এই আজন্মলালিত বিশ্বাসও যেন ক্ষয়ে যাচ্ছে আজকাল।
তবু, আমার তুচ্ছ মাটির প্রদীপের শিখা যতখানি আঁধার দূর করার ক্ষমতা রাখে, সেই চেষ্টাটুকু রেখে গেলাম এখানে।
******
বছর দশেক আগের কথা। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি অনামা অখ্যাত সংগঠনের ডাকে রক্তদান শিবির পরিচালনা করতে মেডিক্যাল কলেজের ব্লাডব্যাঙ্ক থেকে অকুস্থলে চলেছি সদলবলে।
গ্রামগঞ্জের শিবির থেকে রক্ত সংগ্রহ করা আমাদের নতুন নয়, কারণ শহরের মধ্যস্থিত হাসপাতাল হওয়া সত্বেও আমাদের ব্লাডব্যাঙ্কের কপালে শহুরে ক্লাব বা সংস্থার আয়োজিত ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প বিশেষ জোটে না। নাগরিক মানুষ সম্ভবত ঝাঁ চকচকে কর্পোরেট ব্লাডব্যাঙ্কের ব্যবস্থাপনায় শিবির করতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। তাই নিজেদের রক্তাল্প ভাণ্ডার ভরাতে আমাদের বলভরসা গাঁয়ের বা মফস্বলের মানুষজনই।
বজবজ পেরিয়ে যাওয়ার পর, রাজপথ ছেড়ে সরু পিচ উঠে যাওয়া এবড়োখেবড়ো একটি পথে নামল আমাদের গাড়ি। সময়টা ঘোর গ্রীষ্ম, সকাল সাড়ে দশটা হলেও দু’পাশের আগাছা ভরা মাঠঘাট জ্বলে যাচ্ছে জৈষ্ঠের রোদে। জনবিরল রাস্তায় ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েকটা ক্ষীণতনু নেড়ি আর ততোধিক অপুষ্ট, রোগাভোগা মানবশিশু। কোনও অজানা বাঁকে দহনক্লিষ্ট পথকে দুদণ্ড ছায়া দিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঝাঁকড়া বট কিংবা অশ্বত্থ — আর সেই ছায়ায় ভাগ বসিয়েছে এক চিলতে হাটুরে চায়ের দোকান। দোকানের গোড়ায় ধূলিপথেই চট বিছিয়ে বিক্রি হচ্ছে মরকুটে আনাজপাতি — দু’দশ আঁটি শুকিয়ে যাওয়া শাক, শিরা ওঠা বৃদ্ধ ঝিঙে, ন্যাতানো হলদেটে কুমড়োর ফালি আর রুগ্ন, বিবর্ণ ক’টি বেগুন। পসরা ঘিরে দাঁড়িয়ে গুটিকয় শীর্ণ চেহারা — যেমন আনাজ, তেমনই তার ক্রেতা। খোয়া ওঠা রাস্তায় মন্থরগতি গাড়ির জানলা দিয়ে মিহি ধুলোর ঘূর্ণির সঙ্গে ক্বচিৎ ঢুকে পড়ছে মিহি সুরেলা গলার সম্মিলিত আওয়াজ — পাশে তাকালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নীল সাদা পাঁচিলের অংশ চোখে পড়ে।
চলেছি তো চলেইছি। এর পরেও যে একটা বসতি থাকতে পারে, আর সেখানে নিঃস্বার্থ পরহিতৈষার বশবর্তী হয়ে থাকতে পারেন কিছু স্বেচ্ছা রক্তদাতা — সর্বাঙ্গে নিবিড় দারিদ্র্য আর অপ্রাপ্তির মোহর লাগানো অঞ্চলটি দেখতে দেখতে যেন বিশ্বাস হতে চায় না।
তবু সকল যাত্রারই শেষ থাকে। এই দীর্ঘ, ক্লান্তিকর যাত্রাও সমাপ্ত হলো এক সময়। গাড়ি থেকে নেমে লক্ষ্য করলাম, গ্রামটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত। মহিলারা এই প্রবল গরমে মুখ মাথা ঢেকে চলাফেরা করছেন — কেউ পাশের পুকুরে কাপড়চোপড় কাচছেন তো কেউ মুদির দোকানে হিসেব করে জিনিস কিনতে ব্যস্ত।
একজন মোড়ল গোছের বৃদ্ধ এগিয়ে এলেন আমাদের দিকে। আমাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে টেকনিশিয়ান গৌতমের সঙ্গে কথা শুরু করলেন ভদ্রলোক। “বোঝলেন সার, এইটা আমাদের পোথম বছর। তা-ও নয় নয় করি ষাট সত্তুরজন রক্ত দিবে” —
গৌতম ইশারায় আমাকে দেখিয়ে দিয়ে বলল — “ম্যাডামকে বলুন, আমাদের টিমের ডাক্তারদিদি উনি”।
ভদ্রলোক আমাকে অপাঙ্গে দেখে, নিতান্ত তাচ্ছিল্য সহকারে ক্যাম্পের প্যান্ডেলের ভিতরে নিয়ে গেলেন। ভিতরে ঢুকে আমার তো চক্ষুস্থির!
একটা অপ্রশস্ত আলোহীন জায়গায় দুটো খাট ঘেঁষাঘেঁষি করে রাখা। তারপর একটা মোটা কাপড়ের আড়াল। সেটা সরিয়ে ওপাশে গিয়ে দেখলাম সেখানেও অনুরূপ দুটো খাট কাছাকাছি পাতা রয়েছে। খাট দু’টির মাথার দিকে একটা জানলা থাকায় এই অংশে আলো অপেক্ষাকৃত বেশি।
আমি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাতে বয়স্ক ভদ্রলোক বলে উঠলেন — “মহিলা আর পুরুষ ডোনারের আলাইদা বেবস্তা। তা আপনাদের সাথে কোনো পুরুষ ডাক্তার আসে নাই? পুরুষ ডোনারদের চেক আপ কেডা করবে?”
আমি হাঁ করে গৌতম আর শুক্লাদির দিকে তাকালাম। শুক্লাদি আমাদের ব্লাডব্যাঙ্কের সিনিয়র টেকনিশিয়ান। রক্তদান আন্দোলনের একাল সেকাল দুই-ই দেখেছেন – প্রাজ্ঞ মানুষ। তিনি এগিয়ে এসে আমার কানে কানে বললেন — “মুসলমানপ্রধান গ্রামগুলোয় এমন হয় গো দিদি।”
আমি কঠিন হলাম এবার –.”এভাবে রক্তদান হবে না। আড়াল সরিয়ে দিতে বলুন।”
মোড়ল ভদ্রলোকটি ক্ষেপে উঠলেন — “হবে না মানে? আমাদের ইখানে রক্তদান শিবির করতি গেলে এই রকম করেই রক্ত নিতি হবে –”
এবার আরো কঠিন গলায় বললাম — “তা হলে এখানে রক্ত নিতে পারব না। ফিরে যাচ্ছি। মেয়ে পুরুষ আলাদা ডাক্তার, আলাদা রক্ত নেবার জায়গা — এ সমস্ত হয় না।”
বয়স্ক লোকটির সমর্থনে আরো কয়েকজন পুরুষমানুষকে এগিয়ে আসতে দেখে প্রমাদ গণলাম। পরিস্থিতি ঘোরালো। রক্তদান মাথায় থাক, এই অমিত্রসুলভ পরিবেশ থেকে বেরোতে পারলে বাঁচি।
হঠাৎই খনখনে চিৎকার। দেখলাম ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসছেন এক গ্রাম্য মধ্যবয়সিনী। সঙ্গে আরো ক’জন বউ ঝি। মধ্যবয়সিনীর মাথায় কাপড়, কিন্তু পরনে বোরখা নেই। তিনি আমাদের মধ্যে এসে দাঁড়ালেন — তারপর মোড়লকে উদ্দেশ করে চাঁচাছোলা গলায় বলে উঠলেন,.”বলি, কেন গোল করতেছ হাসানের বাপ? দিদিমুনি তো ঠিকই বলতেছে — রক্তের আবার ব্যাটাছেলে মেয়েছেলে কি? যদি গেরামের কোনো পুরুষের রক্ত লাগে, হাসপাতালে গিয়া কি ব্যাটাছেলের রক্ত দিন, ব্যাটাছেলের রক্ত চাই বলে চিল্লাবে? রক্তের পেকেটের গায়ে কি মেয়েছেলে ব্যাটাছেলে বলে লিখা থাকে?”
হাসানের বাপের চোখের উপরের মধ্যযুগীয় পর্দা অত সহজে ওঠানো গেল না। তিনি গলা তুলে বললেন — “শুনো জোবু বিবি, তুমি অত মুখফোঁড় বলেই আখতারভাই তোমারে তালাক দিসে! কিন্তু এখানে মোটে ক্যাচাল পাড়তে এসোনি — আমাদের গেরামে রক্তদান শিবির হলে এ’রম ভাবেই হবে।”
তথাপি দেখা গেল, জোবু বিবি নাম্নী মহিলাটি নাছোড়। “তালাকের সঙ্গে রক্ত দ্যাওয়ার কি সম্মন্ধ শুনি? দিদিমুনি য্যামন বলছে, ত্যামনই রক্তদান হবে।
হাটাও পর্দা হাটাও! সব খাটগুলা একঠেনে করো দিকি!”
এবার আরও দু’চারজন পুরুষ এগিয়ে আসে জোবু বিবিকে নিরস্ত করতে। আর ক্রুদ্ধ হাসানের বাপ চেঁচাতে থাকেন – “কোথায় গেল আসগর? কতবার মানা করসিলাম — বলসিলাম, কলকেতার হাসপাতালের সঙ্গে সাঁট করে এইসব রক্তফক্ত দ্যাওয়ার হ্যাপা না পোয়াতে। এর চাইতে উরসের সময় কম্বল আর ফল বিলানোর বেবস্তা করলি কত ভাল হতো! এইসব ফাকুয়া ঝামেলি সইতে হতো না!”
গৌতম আমার কানের কাছে ফিসফিস করে, “দিদি, আসগর নামের ছেলেটাই এখানকার লোকাল ক্লাবের সেক্রেটারি। আঞ্জুমান দরগার ইমামের সই করা অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে ও-ই আমাদের ব্লাডব্যাঙ্কে এসে ক্যাম্পটা বুক করে গেছে।”
বুঝলাম গণ্ডগোল পেকেছে দেখে আসগর ঘটনাস্থল থেকে নির্বিবাদে অদৃশ্য হয়েছে।
রণে ভঙ্গ দিয়ে আমরাও অকুস্থল পরিত্যাগ করব কিনা ভাবছি, এমন সময় কানে এলো আর একটি মহিলাকণ্ঠ। এ গলা জোবু বিবির চেয়েও ধারালো। “হাসানের বাপ, তোমার ছোট মাইয়াটা ভরা পোয়াতি না? শুনসিলাম স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে নাকি কইয়া দিসে ওর রক্ত সহজে মিলবা না, এমন আনকা রক্ত নাকি তুমার বিটির?”
সবিস্ময়ে মুখ ফিরিয়ে দেখলাম, গাঢ় খয়েরি বোরখায় ঢাকা এক মহিলা — হাসানের বাপের নাকের ডগায় হাত নেড়ে কথাগুলি উগরে দিচ্ছেন। হাতের সবুজ, মেরুন কাচের চুড়িগুলি তাঁর তেজের সঙ্গে সঙ্গত করে ঝনঝন করে বাজছে।
হাসানের বাপ একটু মিইয়ে গিয়ে বললেন — “হ্যাঁ, তাই তো বলসে ডাক্তার। নিগেটিব না কি য্যান রক্ত ওর — তাতে কি হলো?”
বেলোয়ারি চুড়ি ফের ঝনঝন করে উঠল — “তা, বিটির ঝদি রক্ত লাগে, আর হাসপাতালে গিয়া ঝদি দ্যাখো যে ঐ নিগেটি রক্ত আছে, কিন্তু পুরুষের শরীলের – তখন কি করবা? পরপুরুষের রক্তে মাইয়ার ইজ্জত যাবে ভেবে সে রক্ত নিবা না, নাকি?”
বক্তব্যে জোর পেয়ে জোবু বিবিও এবার দ্বিগুণ উৎসাহে আরম্ভ করেন — “এখন ইখানে রক্ত দিতে গিয়া কোনো পুরুষছেলের শরীল খারাপ হলে ব্যাটাছেলে ডাক্তার আসেনি বলে কি ঘরে গিয়া দোর দিবা? দিদিমুনিরে দ্যাখাবা না? তোমাদের ওষুদ নিয়া কথা, সে ব্যাটাছেলে ডাক্তারের হাত দিল, না মেয়েছেলের হাত, তাতে কি আসে যায় শুনি?”
এর পরে আমরা, কলকাতা নামক আলোকপ্রাপ্ত শহরের নামকরা হাসপাতাল থেকে আসা জনাছয়েক চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখলাম, উপস্থিত মেয়েদের হাতে হাতে সরিয়ে ফেলা হলো পর্দার ঘেরাটোপ, সাজিয়ে ফেলা হলো আমার চেক আপের চেয়ার টেবিল, আমাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে আনা হলো ডোনার বেড — যথাযথ পরিসর রেখে পরপর পেতে ফেলা হলো সেগুলো। কয়েক মিনিটের মধ্যে আরম্ভ হয়ে গেল প্রত্যন্ত সংখ্যালঘু গ্রামের প্রথম রক্তদান শিবির — যেখানে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সাতান্নজন দান করলেন তাঁদের অমূল্য জীবনধন — রক্ত।
শিবিরের শেষে আয়োজকদের ক্লাবঘরটিতে ডালভাত আর ডিমের ঝোল দিয়ে দুপুরের খাওয়া সেরে গাড়িতে উঠবার সময় আমার চোখ খুঁজে ফিরছিল সেই অনাম্নী প্রতিবাদিনীকে। কিন্তু তখন আর দেখতে পাইনি তাঁকে।
খোয়া ওঠা চেনা রাস্তা দিয়ে ফিরবার সময় খানাখন্দের কারণে গাড়ি শ্লথ হলো একখানে — গাড়ির জানলা দিয়ে চোখে পড়ল পাশেই একটি কলাবাগান, বাঁশ দিয়ে ঘেরা একফালি সবজিক্ষেত, গ্রীষ্মের তলানি জল বুকে নিয়ে এককুচি পানাপুকুর — আর তার পাড় ঘেঁষে একটি টালির চালের জীর্ণ পাকা বাড়ি। সেই বাড়ির দাওয়ার বাঁশের খুঁটি ধরে রাস্তার দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে খয়েরি রঙের বোরখা পরা অবয়ব। মুখের নজরজালির ফাঁক দিয়ে এতদূর থেকে তার সঙ্গে দৃষ্টিবিনিময় তো সম্ভব নয়, আমি দুটো হাত উঁচু করে তাকে নমস্কার জানালাম। প্রত্যুত্তরে আদাবের ভঙ্গিতে তার ডান হাতটি সামান্য উঠল — পশ্চিমের বেলাশেষের রোদ্দুরে ঝিকিয়ে উঠল সবুজ মেরুন চুড়ি।
তারপর ধূলিপথ ধরে শহরের দিকে এগিয়ে চলল আমাদের গাড়ি — পিছনে পড়ে রইল বাঁশবাগান, রোদজ্বলা আনাজের ক্ষেত, আঞ্জুমান দরগা, হাসানের বাপ আর জোবু বিবির ভুলে যাওয়া গ্রামখানি, যেখানে আর কখনও ফিরে যাওয়া হয়নি আমার।
(#কিশোর_বিজ্ঞান_ও_কুসংস্কার নামক মাসিক পত্রিকার এপ্রিল ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত)।











