একটা ভোটে জিতে সরকার গড়ার পর হাতির পাখনা মেলার মতো অবস্থা হয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর দল ও সরকারের। যেমন রাজ্যের শাসক দল, তেমন রাজ্যের সরকার। দুটোরই বাহানার শেষ নেই । শেষ নেই মানুষের সঙ্গে প্রতারণার। প্রতিদিন সকালে উঠে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের রকমারি কৌশল। আর সন্ধ্যায় হুমকি, কখনও জাতি, কখনও ধর্ম কখনও বাঙালির আচার বিচার রুচি সংস্কৃতি নিয়ে। ভাবখানা এরকম এরা ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসে নি, এরা বাঙালির সত্ব আর সত্তা দুটোই যেন কিনে ফেলেছে। তাই ওদের নিয়মে বাঙালিকে উঠতে হবে, বসতে হবে। ভুল হলে কান ধরে ওঠবস করে রাজ্যের দুই প্রধানকে সন্তুষ্ট করতে হবে। একেবারে জমিদারি শুরু হয়েছে। বিজেপি ভেবে ফেলেছে যেন তারা বাংলার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পেয়ে গেছে! এরপর শুধু একটাই কাজ বাঙালিকে চমকানো আর চাবকানো, যাতে হিন্দি বলয়ের মানুষদের প্রভুত্ব মেনে উঠতে বসতে হুকুমের চাকর বনে যায়।
গলায় গেরুয়া গামছা ঝুলিয়ে বেকার বাঙালি বাহিনী এখন রাতারাতি জয় শ্রীরাম ধ্বনি তুলে দৈনিক রোজের ভিত্তিতে সেটাই করে দেখাচ্ছে।বাংলা গৈরিক ভূমি করে তোলাই একমাত্র লক্ষ্য। শিল্পায়নের যে আশায় বাঙালি এদের হাত ধরেছিল, তাতে এখন জমি জট, আর কেবলই মৌখিক ঘোষণা আর শিলান্যাস। বাঙালি যুবকের চাকরি কবে মিলবে?
উত্তর চাইতে গিয়ে বেধড়ক মার খাচ্ছে অঙ্গনওয়ারি কর্মী থেকে হবু শিক্ষক ও রাজ্য সরকারের অস্থায়ী কর্মীরা, তারা কেউ প্রতিশ্রুতি মাফিক বেতন কিংবা চাকরিতে স্থায়ীকরণ বা পরীক্ষার ফল প্রকাশের দাবিতে পথে নেমে জেল হাজতে পৌঁছে গেছে। এই হল এখন বাংলার গণতন্ত্র!
গোটা রাজ্যকে নিজের খাস তালুক ভাবছে বিজেপি।
ভোটে যত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার একটাও রাখে নি। লক্ষী ভান্ডারের সকলেই অন্নপূর্ণা ভান্ডার পাবে, ক্ষমতায় আসার ৪৫ দিনের মধ্যে প্রত্যেক ঘরে ঘরে দিল্লির রেটে সাড়ে চারশ টাকায় গ্যাস দেওয়া হবে, ২০০ ইউনিট করে বিদ্যুৎ ফ্রি, বেকার ভাতা ৩ হাজার, বৃদ্ধ ভাতার ২ হাজার, ঘরে ঘরে নতুন চাকরির স্বপ্ন। মিথ্যে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়িয়ে, বাঙালিকে বোকা বানিয়ে, নিজেদের মধ্যে ধর্মের নামে গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে, হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে ঘৃণা ছড়িয়ে, কতগুলো পুলিশ আর আমলার দাসানুবৃত্তি সম্বল করে রাজ্যটাকে বিরোধী দমনের হাতিয়ার বানিয়ে নিজেকে একচ্ছত্র অধিপতি বলে মনে করছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তাই নিজের অধিকার বোধ হারিয়েছেন। ওরা ভোট দেয় নি, ওদের ভোট চাই না, এ কথা বলে মুসলমানদের সরকারি পরিষেবা দেবো না বলে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে হুংকার জানাচ্ছেন। এটা কি ধর্ম নিরপেক্ষ সংবিধানে শপথ নেওয়া মুখ্যমন্ত্রীর আইন সম্মত আচরণ?
বিরোধী দমনের জন্য এত মামলা করছে বিরোধী নেতার বিরুদ্ধে যে ৮ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণে বলেছে আর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে মামলা নেব না। কারণ সবকটিই অর্থহীন, প্রকৃত অর্থে কোনো অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের নথি নেই। আইনত পারবে না জেনে গুন্ডা দিয়ে তার অফিস ভাঙচুর করেছে। তার অফিস লুট করেছে, সমস্ত ভিডিও থাকা সত্ত্বেও পুলিশ নির্বিকার। তৃণমূলের সমস্ত নেতা মন্ত্রী ও যারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আস্থা রেখেছেন তাদের প্রত্যেকের বাড়িতে এবং স্থানীয় গুন্ডা দিয়ে হামলা করানো হয়েছে। একের পর এক নেতা-মন্ত্রীকে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ডিম ছুঁড়ে এক নয়া রাজনৈতিক অসভ্যতার জন্ম দিয়েছে এই বাংলার বুকে। দুর্নীতির মিথ্যে অভিযোগে মানসিকভাবে বিপন্ন হয়ে কৃষ্ণনগরের বর্ষীয়ান বিধায়ক আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। দুর্নীতি উন্মোচনের নামে একের পর এক বিরোধী তৃণমূল নেতা-মন্ত্রী বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে বারবার। ভয় পেয়ে যারা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে তাদেরকে বলা হয়েছে ভালো তৃণমূল সংসদে বিল পাস করানোর জন্য কুড়ি জন সাংসদকে তুলে নিয়ে এনসিপিআই নামে এক পেটোয়া উপদলে ঢুকিয়ে সাংসদ লুট করেছে বিজেপি। সবটাই সংবিধানের ফাঁক দিয়ে আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে। সুপ্রিম কোর্ট এখন কেবলই অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের ভূমিকা থাকবে কিনা সেটাই দেখার।
অসভ্যতার চূড়ান্ত নিদর্শন করেছে লেনিনের মূর্তি ভেঙে। বাম দলগুলির পতাকা পা দিয়ে মাড়িয়ে আগুন ধরিয়ে। সরাসরি হুমকি বাম দলের কর্মীদের প্রতি, ছাত্রদের প্রতি এবং বাঙালির মুক্তচিন্তার পীঠস্থান যাদবপুরের প্রতি। দেশের সবথেকে এগিয়ে থাকা রাষ্ট্রীয় বিদ্যালয়টিতে জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা বন্ধ করে হোম যজ্ঞের অনুষ্ঠান করতে চাইছে।
বাঙালি কিভাবে দুর্গার পুজো করবে, তার পুজোর থিম কি হবে, পুজো প্যান্ডেলের পাশে কে থাকবে, নবমীতে কি খাবে, সেটা নিয়ে ভাষণ ও শাসন শুরু করেছে বিজেপি দল, সরকার এবং তাদের প্রশ্রয়ে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ থেকে শুরু করে বজরং দল এবং বহিরাগত বিভিন্ন ধর্মগুরু।
বাংলাকে এভাবেই এরা হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত করতে চাইছে। কিন্তু এরা কারা? কোন হিন্দু ধর্মের অধিকার এদের আছে? আদৌ কি এরা হিন্দু? ঋকবেদের যে চর্চা থেকে হিন্দু ধর্ম তত্ত্বের শুরু, তার সম্পূর্ণ বিরোধী এদের কথাবার্তা ও আচরণ। প্রকৃতপক্ষে হিন্দুত্বের নামে এরা করছে হিন্দু ধর্মের ব্যভিচার। হিন্দু ধর্ম সকল ধর্মকে নিয়ে সম্প্রীতির বাতাবরণে সহমর্মিতার মধ্যে দিয়ে সমাজ গঠনের কথা বলে। আস্তিক নাস্তিক উভয়ের অধিকার সেখানে সমান। বাঙালি মুক্তচিন্তার এই হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী। সেই হিন্দু ধর্মের অংশ আদিবাসীরাও। সমস্ত শূদ্র চন্ডাল আদিবাসী স্বামীজী যাদেরকে বলেছিলেন “আমার ভাই” দাঁড়াও হিন্দু ধর্মের অংশ. আর বাঙালি মানেই শুধু হিন্দু বাঙালি সেটাও নয়। মা সারদা বলেছিলেন শরৎ ও আমার সন্তান আমজাদও আমার সন্তান। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন যত মত তত পথ। শুভেন্দু অধিকারী এই রামকৃষ্ণ সারদা বিবেকানন্দের প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠ মিশনকেও তার হিন্দুত্বের প্রচারে কাজে লাগাতে চাইছে বাঙালিকে বিভ্রান্ত করতে। বাঙালিকে আমিষ মুক্ত করে নিরামিষ খাওয়াতে ইসকনকে এগিয়ে নিয়ে এসেছে, কিন্তু ইসকনের যে আরাধ্য কৃষ্ণ তিনি জাতপাতহীন সরবকিছুর উর্ধ্বে। মানব প্রেমের জীবন্ত প্রতীক যে চৈতন্য তাঁকে সনাতনী জাগরণের আদর্শ কেন মানা হচ্ছে না? বাংলাকে হিন্দু ধর্ম শেখাতে এসেছে যারা তাদের জানা উচিত রামমোহন হিন্দু ছিলেন না রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না বিদ্যাসাগর হিন্দু ছিলেন না এমনকি রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ সর্ব ধর্মে বিশ্বাসী হিন্দু ছিলেন, এরা সকলেই মুসলমানের হাতে জল খেতেন। শুভেন্দু অধিকারীর বোঝা উচিত, শমীক ভট্টাচার্যের বোঝা উচিত, এটা বাংলার মাটি। এখানে ধর্মশিক্ষা নিয়ে ধর্মের কথা বলতে হয়।
এখানে মানুষকে ভগবান বলে পুজো করে দেশ শাসন করতে হয়।নইলে ভুগতে হয়।
সামনে উপনির্বাচন এবং নির্বাচন আসন্ন।











