আমরা, যারা গত শতকের সাতের দশকে জন্মেছি, তাদের সিনেমা দেখার গল্পটা একটু অদ্ভুত। আমরা বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর আগেই উত্তমকুমার প্রয়াত – তারুণ্যে পৌছাতে পৌঁছাতে দেখছি উত্তমোত্তর বাণিজ্যিক বাংলা ছবির বাতি জ্বালিয়ে রাখছিলেন যে অঞ্জন চৌধুরী ও রঞ্জিত মল্লিক (হ্যাঁ, স্বনামধন্য সমাজসেবী তথা রাজনীতিক কোয়েল মল্লিকের পিতৃদেব), তাঁরাও হাল ছেড়ে দিয়েছেন – ভিক্টর ব্যানার্জি টুকটাক হিট দিচ্ছেন – তাপস পাল ও চিরঞ্জিৎ তো বলাই বাহুল্য, যদিও সেসময় তাঁরা অস্তাচলের পথে – হিট ছবির কথা বলতে গেলে প্রসেনজিৎ অতি অবশ্যই – হতাশ সৌমিত্র এমনকি মোটা দাগের ভিলেনের রোলও করছেন – নায়িকাদের মধ্যে বলার মতো এক ও একমাত্র ঋতুপর্ণা, আর হ্যাঁ, কিছুটা দেবশ্রী ও শতাব্দী – মোদ্দা কথা, টিকিট কেটে সিনেমা দেখার বয়সে পৌঁছে দেখলাম, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত আর বাংলা ছবি দেখতে হল-এ যায় না।
হিন্দি সিনেমার হালও খুব একটা বলার মতো নয়। টপ ফর্মের অমিতাভ অনেক আগেই অস্তমিত – স্কুলজীবনে হল-এ গিয়ে বলিউডি ছবি না দেখলেও মাইকে-বাজা গানের সুবাদে জানতাম, মিঠুন আর জিতেন্দ্ররই বাজার – অবশ্য সেসব ছবি হিট হওয়ার পেছনে নায়কের ভূমিকা কতখানি আর কতখানি বাপ্পি লাহিড়ীর, তা হলফ করে বলা মুশকিল। গল্প বলতে সবই বেশ প্রেডিক্টেবল – টিকিট বিক্রি হয় নাচ-গান-ফাইটিং-এর সুবাদে। মিঠুনের বয়স হয়ে যাবার পর খানিকটা বন্ধ্যা সময় – অনিল কাপুর অবশ্য ছিলেন (ইনি ঠিক কবে থেকে হিরো হলেন, মনে পড়ে না – ইংরেজ আমল থেকে বোধহয়) – আর মাধুরী তো একাই একশ।
তো এর মধ্যেই আচমকা দুখানা ছবি এসে হিসেব বদলে দিল। ‘কয়ামত সে কয়ামত তক’ আর ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ – তারপর আবার একই, অর্থাৎ ওই দুই ছবির মডেলে একের পর এক ছবি।
মোটের উপর, ভালোয়-মন্দয় মিলিয়ে-মিশিয়ে সবই বেশ প্রেডিক্টেবল ছিল – কিন্তু, বলিউডি ছবিতে, সাতের দশকের সেলিম-জাভেদ-অমিতাভ ট্রায়োর মতোই, বড়সড় একটা ঝাঁকুনি এলো আমাদের ওই এগারো-বারো ক্লাস পার হওয়ার মুখেই। শাহরুখ খান। এবং নানা পাটেকর।
এবং “রাজু বন গ্যয়া জেন্টলম্যান” – এই দুই ডিসরাপ্টারের যুগলবন্দী!
নানা পাটেকর অবশ্য তার ঢের আগে থেকেই বিখ্যাত। ‘অঙ্কুশ’ বা ‘অন্ধ-যুধ্’ তো বটেই, ‘প্রহার’-এরও গুণমুগ্ধ দর্শক ছিল – আর, অবিস্মরণীয় ‘পরিন্দা’!! ‘থোড়া সা রুমানি হো যায়ে’ দেখলে তো নানা-কে না ভালোবেসে পারা যায় না, সত্যিই। তো niche fanbase বলতে যা বোঝায়, তা নানা-র ছিল আগে থেকেই – কিন্তু ‘রাজু বন গ্যয়া জেন্টলম্যান’-এর জয় চরিত্রটিই নানা-কে এক্কেবারে জনগণের সুপারস্টার বানিয়ে দিল। হিরো নন, কিন্তু যাঁকে দেখতে লোকে হল-এ যায়।
আমাদের উঠতি তারুণ্যের বয়সে এমন ছেলেপিলে খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল, যে নানা পাটেকরের ফ্যান নয়, যে নানা-র ছবি দেখতে যায় না।
মুশকিল হলো, ওই একটি ‘জয়’ চরিত্রেই তিনি আটকে গেলেন। তাড়াতাড়ি ও অনর্গল কথা বলা, এবং অদ্ভুত কিছু ম্যানারিজম। তবে ফ্যান যেহেতু, সেহেতু ব্যাপারটা সেসময় খারাপ লাগত না। নানা-র সিনেমা রিলিজ করলেই দেখে ফেলতাম। গিয়ে হতাশ হইনি বিশেষ। দুই অননুকরণীয় ডায়লগবাজ – রাজ কুমার ও নানা পাটেকর – তাঁদের যুগলবন্দী ‘তিরঙ্গা’ (ফার্স্ট হাফ, বিশেষত) তো দুর্ধর্ষ লেগেছিল – কিন্তু, তারপর যা হয়, পুনরাবৃত্তি এবং পুনঃ-পুনঃ-পুনরাবৃত্তি আমার মতো ডাইহার্ড নানা-ফ্যানকেও ক্লান্ত করে ফেলল।
তারই মধ্যে কিছু ছবির নানা পাটেকর মনে দাগ রেখে যেত। তত হিট নয়, এরকম কিছু ছবি – যেমন ‘গুলাম-এ-মুস্তাফা’। অথবা ‘অগ্নিসাক্ষী’।
পরের দিকের ছবিতে নানা নিজেকে অনেকখানিই পাল্টে নিয়েছিলেন। ‘ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১’’, ‘অপহরণ’’, ‘আব তক ছাপ্পান্’। ভালো লাগত – আবার সেই পুরনো নানা-কে খুঁজে না পেয়ে একধরনের নস্ট্যালজিক মনখারাপ হতো।
কিন্তু চমৎকৃত হয়ে গেছিলাম ‘ওয়েলকাম’ দেখে। কন্ট্রোল… কন্ট্রোওল… আহা, কী অসামান্য অভিনয় – কী আশ্চর্য কমিক টাইমিং! এ ছবি এতবার দেখেছি, প্রতিবারই নানা-কে দেখে নতুন করে মুগ্ধ হই – বারবার ভাবি, এমন অভিনেতাকে কেন আরও বেশী করে এমন রোল দেওয়া হয়নি – একসময় নানা পাটেকর একই ধরনের রোলে অজস্রবার অভিনয় করে দর্শককে ক্লান্ত করে দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটা যদি ‘ওয়েলকাম’-এর রোলটা হতো?
নানা পাটেকর চলে গেলেন। আজ।
এক মচ্ছর, এক মচ্ছর সালা আদমি কো হিজরা বানা দেতা হ্যায়
এক খটমল পুরি রাত কো অপাহিজ কর দেতা হ্যায়…
‘যশবন্ত’-এ নানা-র মুখে এই ডায়লগ ক্যাসেটবন্দী হয়ে মাইকেও বাজত।
কিন্তু… এক নয়, অনেক – অনেক অনেএএক ককরোচ একজোট হলে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ঠিক কী করতে পারে, তা পুরোপুরি দেখতে পাবার আগেই নানা পাটেকর চলে গেলেন।












