গঙ্গা নদীর শুকিয়ে যাওয়া নিয়ে একটা লেখা লিখতে গিয়ে নজরে এলো গুজরাটের ভাদোদরার বিশ্বামিত্রি নদীর কথা। গতবছর ভাদোদরা বন্যার কবলে পড়েছিল ওই বিশ্বামিত্রি নদীর সৌজন্যে। খুব যে কেউকেটা নদী তা হয়তো নয়। তবে বর্ষার জল নদীদের কাছে মৃতসঞ্জিবনীসুধার মতো কাজ করে।ঢাল বরাবর গড়িয়ে চলা জল নদীখাত ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ে অববাহিকার বিস্তির্ণ এলাকায়। বন্যার ফলে মানুষের বিপন্নতা এবং বিষণ্ণতা দুইই বেড়ে যায়। নদীর জল আগলে বেঁচে থাকা প্রাণিদের অসহায়তার শিকার হতে হয়।
গুজরাটের পঞ্চ্ মহল জেলার পভাগড় পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে ভাদোদরা শহরের পশ্চিম সীমানা বরাবর বয়ে গিয়ে এই নদীটি খাম্বাত উপসাগরে গিয়ে মিশেছে। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার কথা মাথায় রেখে এই নদীটির হারিয়ে যাওয়া নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য স্থানীয় পুর প্রশাসন ড্রেজিংয়ের পরিকল্পনা করে। আপাত দৃষ্টিতে সহজ বলে মনে হলেও সমস্যা দেখা দেয় নদী তীরবর্তী এলাকার জীববৈচিত্রের সম্ভারকে সংরক্ষিত রাখার। কীভাবে এই কাজ সম্পন্ন হয়েছে তা নিয়েই এই নিবন্ধ।
নদীর ছড়া
ভুঁইয়ের ওপর পড়লো জল
গড়ায় সে জল খলখল,
জলের তোড়ে ক্ষইলো ভুঁই,
জম্ম নিল সে এক সই।
তাঁরে ঘিরেই মোদের বাস,
তাঁরে নিয়েই মোদের আশ।
তাঁর জলেতে ভাসাই নাও,
নামটি যে তাঁর হিজলছাঁও।
তাঁর একান্ত পরিচিত হিজলছাঁও নদীর কথা শুনিয়েছেন নাম না জানা কোন্ এক ছড়াকার। আসলে নদীর সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে কতশত জীবন, জীবনের লড়াই, বেঁচে থাকা আর বেড়ে ওঠার প্রাণস্পর্শী কাহিনি। মানুষের সভ্যতার বিকাশের পেছনে যেমন রয়েছে নদীর বিপুল ভূমিকা, ঠিক তেমনই তিলতিল করে গড়া মানুষের নানান কীর্তি ভাসিয়ে নিয়ে সেই নদীই যে আবার হয়ে ওঠে কীর্তিনাশা। নদী খাতের জল ধরে রাখার ক্ষমতাকে ছাপিয়ে যাওয়া জল উপচে পড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সব কিছু , সৃষ্টি হয় কুলপ্লাবি বন্যার।
এদেশের মানুষের কাছে বন্যা কোনো নতুন ঘটনা নয় – নদীর মতো বন্যাও আমাদের নিত্য সঙ্গী। স্মৃতির পাতা হাতড়ে দেখা গেল ২০০৫ সালে এমনটাই পরিণতি হয়েছিল ভাদোদরার। সেবারের রেকর্ড ভেঙে গত বছরের বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমান অনেক বেশি। সাধারণ বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে জল বয়ে গিয়ে ভাসিয়ে দিয়ে যায় বিস্তির্ণ এলাকা। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে তোলা হয় নানান প্রশ্ন। এদেশে যে এমনটাই দস্তুর – সমস্যাকে খতিয়ে না দেখে, খালি চোখা চোখা প্রশ্ন তোলো। ভাদোদরাকে ভবিষ্যতে বন্যার হাত থেকে বাঁচাতে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন হলো।




নদীখাতে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ আবর্জনা পরিষ্কার করে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার কাজটা সত্যিই কঠিন ছিল বাস্তুকারদের কাছে। নদী খাত এভাবে ভরাট হয়ে যাওয়ায় জন্য নদীর নাব্যতা যেমন কমেছিল তেমনই বেড়েছিল বন্যার সম্ভাবনা। তবে কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে নদী তীরবর্তী এলাকার বাস্তুতন্ত্রের সংরক্ষণের কাজটা ছিল আরও অনেক অনেক কঠিন। ডিমগুলোকে উদ্ধার করে তাদের ফোটানো এবং নতুন প্রজন্মের অতিথিদের তাদের পূর্বজদের বাসভূমে পুনঃস্থাপন করার কাজটি ছিল সন্দেহাতীতভাবে কঠিন। এই কাজটি অত্যন্ত সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সম্পন্ন করার জন্য কোনো প্রশংসাই হয়তো যথেষ্ট নয় অধ্যাপক ডঃ দেভকারের নেতৃত্বাধীন সেচ্ছাসেবক দলের। আসলে সদিচ্ছা থাকলেই উপায় হয়। ভাদোদরার পুর কর্তৃপক্ষ সেকথাই যেন নতুন করে প্রমাণ করলেন। তাঁদের এই সমবেত প্রয়াসকে কুর্ণিশ জানাই।
তথ্যসূত্র :– বিভিন্ন সর্বভারতীয় ইংরেজি সংবাদপত্র। ডাউন টু আর্থ পত্রিকা। বেটার ইন্ডিয়া।
ছবি নানান সূত্র থেকে সংগৃহীত। সকলের কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি।
অক্টোবর ১০. ২০২৫.












