দিল্লি বিধানসভার ইতিবৃত্ত: ১৯৫২ থেকে ১৯৫৬ অবধি দিল্লি বিধানসভায় ক্ষমতাসীন ছিল জাতীয় কংগ্রেস এবং দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ব্রহ্মপ্রকাশ ও গুরমুখ নিহাল সিংহ। তারপর দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ১৯৯৩ থেকে দিল্লির বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৩ তে বিজেপি জয়লাভ করে। প্রাপ্ত ভোট ছিল ৪২%, কংগ্রেসের ৩৪.৫%। তিনবার মুখ্যমন্ত্রী পরিবর্তন করতে হয়। মদনলাল খুরানা, সাহেব সিং ভার্মা এবং সুষমা স্বরাজ।
১৯৯৮, ২০০৩ ও ২০০৮ পরর্বতী তিনটি নির্বাচনে কংগ্রেসের জয়জয়কার (৪৭.৮%, ৪৮.১% ও ৪০.৩% ভোট)। বিজেপির ভোট ৩৪%, ৩৫% ও ৩৬%। টানা তিনবার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন কংগ্রেসের বরিষ্ঠ নেত্রী শীলা দীক্ষিত। ২০১১ নাগাদ দিল্লির বুকে প্রবীণ সমাজকর্মী আন্না হাজারের নেতৃত্বে দুর্নীতির বিরূদ্ধে ও লোকপাল বিলের দাবিতে জোরালো আন্দোলন শুরু হয় এবং তাতে সামিল হন সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ। আন্না হাজারের একজন প্রধান সহযোগী হরিয়ানাজাত খড়গপুর আইআইটির মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার ও রেভিনিউ সার্ভিসের প্রাক্তন আমলা অরবিন্দ কেজরিওয়াল তাঁর সহযোগীদের নিয়ে এরপর শুরু করলেন India Against Corruption জোরদার আন্দোলন। ২০১২ তে তৈরি করলেন আম আদমি পার্টি (AAP)। ২০১৩ এর দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে তাঁদের ঝাড়ু প্রতীকে লড়াই চালিয়ে সবাইকে চমকে দিয়ে ২৮ টি আসন (২৯.৪৯% ভোট) জিতে নিলেন। বিজেপি পেল ৩১ টি আসন (৩৩% ভোট) ও কংগ্রেস আটটি আসন (২৪% ভোট)।কংগ্রেস বিরোধিতা করে আপের উত্থান হলেও কংগ্রেসের সমর্থনে কেজরিওয়াল দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হলেন। জন লোকপাল বিল পাশ করতে না পারায় ৪৯ দিনের মাথায় সরকারের পতন হল। কেজরিওয়াল তাঁর আন্দোলন চালিয়ে গেলেন। মাঝে লেফটেনেন্ট গভর্নরের শাসনের পর ২০১৫ তে দিল্লিতে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। ইতিমধ্যে কেন্দ্রে সনিয়া গান্ধী – মনমোহন সিংহের কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএ কে পরাজিত করে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় এসে গেছে।
২০১৫ এর বিধানসভা নির্বাচনে আপের আসন বেড়ে হল ৬৭ (৫৪.৩% ভোট)। বিজেপি ও কংগ্রেস নেমে গেল যথাক্রমে তিন (৩২.৩%) ও শূন্য আসনে (৯.৭%)। কেজরিওয়াল মুখ্যমন্ত্রী এবং আপের চেয়ারপার্সন। ২০২০ এর নির্বাচনেও আপের জয়জয়কার। ৬২ আসন (৫৩.৬% ভোট)। বিজেপি আটটি আসন (৩৮.৫১%) এবং কংগ্রেস আবার শূন্য আসন (৪.৩%)। এই সময়টি আপের সুসময় এবং বৃদ্ধি ও বিস্তারের পর্ব।
পরে কেন্দ্র সরকার ও দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নরের সঙ্গে নানা দ্বন্দ্ব বিবাদের মধ্যে আবগারি দুর্নীতিতে উপ মুখ্যমন্ত্রী মনীশ শিশোদিয়া, প্রবীণ নেতা সত্যেন্দ্র জৈন, শেষমেশ কেজরিওয়ালের জড়িয়ে পড়া, গ্রেফতার ও জেল দিল্লি সরকার ও আপ দলে গভীর সংকট সৃষ্টি করল। জনভিত্তি মার খেল। শেষ দিকটা আপ নেত্রী অতিশি মারলেনা কোনরকমে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্শি সামলালেন। এই সুযোগে বিজেপি তাঁর সমস্ত শক্তি নিয়ে নেমে আপকে ঘিরে ফেলল। সেই আবহে ২০২৫ এর নির্বাচন। এরই মধ্যে কেজরিওয়াল ‘ ইণ্ডিয়া ‘ জোট সঙ্গী কংগ্রেস ও তাঁর নেতা রাহুল গান্ধীর বিরূদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালালেন। কংগ্রেসও আপের বিরোধিতা করলো।
২০২৫ এর নির্বাচন: ভোট পড়েছে ৬০.৪৪% (২০২০ এর নির্বাচনে পড়েছিল ৬০.৫৯%)। দিল্লি বিধানসভার ৭০ টি আসনের মধ্যে ৪৫.৮৯% ভোট পেয়ে দুই তৃতীয়াংশের বেশি ৪৮ টি আসন নিয়ে বিজেপি দীর্ঘ ২৭ বছর পর আবার ক্ষমতায় ফিরে এল। আপ ৪৩.৫৭% ভোট ও ২২ টি আসন পেল। কংগ্রেসের ভোট সামান্য বেড়ে ৬.৩৪% হলেও আসন এবারও শূন্য। অন্যান্যরা ৪.২%। কেজরিওয়াল, শিশোদিয়া, সত্যেন্দ্র জৈন, সৌরভ ভরদ্বাজ বড় আপ নেতাদের পরাজয় ঘটল। অতিশী কালকাজি আসনটি রাখতে পারলেন।
তীব্র মেরুকৃত ভোটে অন্যান্যদের মধ্যে জেডি ইউ ১.০৬%, এআইএমআইএম ০.৭৭%, বিএসপি o.৫৮%, নোটা ০.৫৭%, এলজিপিআরভি o.৫৩%, এনসিপি o.০৬% ভোট পেল। বামদের অবস্থা করুণতম। সিপিআই ০.০২%, সিপিআইএম ০.০১%, সিপিআইএমএল লিবারেশন ০.০০%, এআইএফবি ০.০০% ভোট পেল। প্রথম সারির বাম নেতারা দশকের পর দশক দিল্লিতে বাস করলেও এবং মাঝেমাঝে বিভিন্ন রাজ্যে গিয়ে ফ্যাসিবাদ ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দিলেও বোঝা যাচ্ছে বেশীরভাগ রাজ্যের মত দিল্লিতেও তাঁরা গণ বিচ্ছিন্ন।
ফলাফলের পর্যালোচনায় পরে আসছি। তার আগে শীতের সকালে একটু দেশের রাজধানী দিল্লি ঘুরে আসি।
তাক লাগানো সাফল্য:
বাজেটের ১৩% ও ১১% শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ, বিদ্যুৎ বিল কমানো, পানীয় জলের ব্যবস্থা, ঝুগ্গি ঝুপ্পি গুলির উন্নতি ও পাট্টা প্রদান, দুয়ারে আট রকম সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা, অ্যাপ ক্যাবের ভাড়ার সার্জ নিয়ন্ত্রণ, মহিলাদের নিখরচায় যাতায়াত, নিয়মিত জন সংযোগ চালিয়ে যাওয়া প্রভৃতি পদক্ষেপে দিল্লির আপ সরকার ততদিনে দেশের সর্বত্র সাড়া জাগিয়ে ফেলেছে। তারসঙ্গে কেজরিওয়ালের কেন্দ্র সরকার ও দিল্লির গভর্নরের সঙ্গে ধারাবাহিক অকুতোভয় লড়াই এবং দুর্নীতি বিরোধী মনোভাব। দিল্লির অলি গলি রাজপথে দৃশ্যত চোখে পড়ে আপ এক প্রধান শক্তি। সেইসময় প্রস্তাব এল তাঁদের জনস্বাস্থ্য ব্যাবস্থার একটি পর্যালোচনার। এককথায় রাজি হলেও আতিথেয়তা প্রত্যাখ্যান করে স্বাধীনভাবে করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
২০১৮ এর দিল্লির এক শীতের সকাল। ব্লু লাইন মেট্রো উজিয়ে আমি নয়ডা থেকে রাজীব চক পেরিয়ে আর দিল্লির সমাজকর্মী শ্রী সোমেন চক্রবর্তী দ্বারকা থেকে এসে রামকৃষ্ণ আশ্রম ষ্টেশনে মিলিত হয়ে পদব্রজে দরিদ্র শ্রমিক অধ্যুষিত পাহাড়গঞ্জ এ গিয়ে প্রথমে মহল্লা ক্লিনিক, তারপর অন্যান্য সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও হাসপাতালগুলি ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকলাম। তারপর আমি সরকারি স্কুলগুলি। সেখান থেকে সদর বাজার প্রভৃতি এলাকা। পরের ও তার পরেরদিন দিল্লির অন্য এলাকাগুলি। অনেকের সঙ্গে কথা বললাম। ছাত্র, শিক্ষক, শিক্ষা কর্মী, চিকিৎসক, স্বাস্থ্য কর্মী, রোগী, স্বাস্থ্য আধিকারিক, সাধারণ মানুষ। সত্যিই বিস্মিত হয়েছিলাম আর ভাবছিলাম আমাদের ও অন্যান্য রাজ্যে কেন এরকম করা যাচ্ছে না।
দিল্লিতে আপের সাফল্য ধরে অন্যান্য রাজ্যে শাখা বিস্তার। ছাত্র (CYSS), যুব (AYW), মহিলা (AMS) ও শ্রমিক (SVS) শাখার সৃষ্টি। ২০১৪, ‘১৯ ও ‘২৪ তিন লোকসভা নির্বাচনে যথাক্রমে ৪, ১৯ ও ৩ লোকসভা আসনে জয়লাভ। এখনও তাঁদের ১০ জন রাজ্যসভা সাংসদ ও ১২১ জন বিধায়ক। গোয়াতে রাজ্য পার্টির মর্যাদা অর্জন। ২০২২ এ পাঞ্জাবের বিধানসভায় জয়লাভ করে সরকার গঠন। ভগবানত মানের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নির্বাচন। সাম্প্রতিক কাশ্মীর নির্বাচনে ডোডা বিধানসভা কেন্দ্রে জয়লাভ। পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরে গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব, ভাঙন, কেজরিওয়ালের একক কর্তৃত্ববাদ, কংগ্রেস ও বিজেপির সঙ্গে সংঘাত, তৃণমূলের সঙ্গে সখ্যতা।
এনসিআর আর এনসিটি: মাপ করবেন। এই সুযোগে এনসিআর আর এনসিটি নিয়ে সামান্য কচকচি করে নিচ্ছি। National Capital Region (NCR) হল পরিকল্পনা ও উন্নয়নের নিরিখে দিল্লি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল (Delhi Union Territory), Gaziabad, NOIDA, Greater NOIDA, Yamuna Expressway Industrial Development Authority (YEIDA City), Gurugram, Faridabad নিয়ে বিস্তৃত অঞ্চল যার অনেকটাই সংশ্লিষ্ট উত্তর প্রদেশ ও হরিয়ানায় পড়েছে। এর সম্মিলিত জনসংখ্যা > ২. ৮ কোটি।
মহাভারতে উল্লিখিত ইন্দ্রপ্রস্থ, ১২১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত সুলতানি শাসনের রাজধানী, ১৯১১ থেকে ব্রিটিশ ভারতের এবং ১৯৪৭ থেকে ভারত প্রজাতন্ত্রের রাজধানী দিল্লি বলতে আমরা যেটা বুঝি সেটা আসলে ১৯৫৬ এর ইউনিয়ন টেরিটরি ও ১৯৯১ এর ন্যাশনাল ক্যাপিটাল টেরিটরি অফ দিল্লি অ্যাক্ট অনুযায়ী National Capital Territory (NCT)। যার মধ্যে রয়েছে নয়া দিল্লি (New Delhi) সহ সমগ্র দিল্লি শহর এবং একটি ডিভিশন, ১১ টি জেলা, ৩৩ টি মহকুমা, ৫৯ টি সেন্সাস শহর এবং ৩০০ গ্রাম। এছাড়াও আছে তিনটি পুর নিগম। Municipal Corporation of Delhi, New Delhi Municipal Council ও Delhi Cantonment Board। জেলাগুলি হল – (১) সেন্ট্রাল দিল্লি (সদর – দরিয়াগঞ্জ), (২) নিউ দিল্লি (সদর – নিউ দিল্লি), (৩) নর্থ ইস্ট দিল্লি (নন্দ নগরি, এখানে এবার ভোট দেওয়ার হার সবচাইতে বেশি), (৪) শাহদারা (নন্দ নগরি), (৫) সাউথ ইষ্ট দিল্লি (ডিফেন্স কলোনি, এখানকার পাশাপাশি কয়েকটি কেন্দ্র আপ এবার ধরে রাখতে সক্ষম হয়), (৬) ইষ্ট দিল্লি (প্রীত বিহার), (৭) নর্থ দিল্লি (আলিপুর), (৮) নর্থ ওয়েস্ট দিল্লি (কানঝাওয়ালা), (৯) সাউথ দিল্লি (সাকেত), (১০) সাউথ ওয়েস্ট দিল্লি (কাপাশেরা) ও (১১) ওয়েস্ট দিল্লি (শিবাজী প্লেস)।
NCT এর আয়তন প্রায় ১,৪৮৪ বর্গ কিমি। জনসংখ্যা ২০২১ সেনসাসে ছিল ১.১ কোটি। জনঘনত্ব ১১,৩১২ প্রতি বর্গ কিলোমিটারে। ভারতের বৃহত্তম এবং টোকিওর পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৃহৎ শহর (Metropolis)। পরিচালনার ভার দিল্লি বিধানসভার অন্তর্গত দিল্লি সরকারের। সাংবিধানিক প্রধান লেফটেনেন্ট গভর্নর। কেন্দ্রের প্রতিনিধি।
এবার নির্বাচনে আপের কেন পরাজয়: বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল তাঁদের বক্তব্য রেখেছেন। সেখানে মূলতঃ যেগুলি উঠে এসেছে (১) একদা কঠোর দুর্নীতি বিরোধী আম জনতার প্রতিভূ ‘ মাফলার বয় ‘ কেজরিওয়ালের সপার্ষদ আবগারি দুর্নীতিতে যুক্ত হয়ে পড়া, গ্রেফতারি ও জেল। (২) সাধারণ জীবনযাত্রার আম আদমির কথা বলে প্রচুর অর্থ খরচ করে মুখ্যমন্ত্রীর বাসগৃহ পুনর্নির্মাণ। যেটিকে ‘ শিশমহল ‘ আখ্যা দিয়ে বিজেপির তীব্র প্রচার। (৩) সকলের জন্য দূষণমুক্ত পানীয় জল, জঞ্জাল অপসারণ, যমুনার প্রবলভাবে কলুষিত জল পরিষ্কার করা প্রভৃতি ঘোষিত প্রতিশ্রুতি না রাখতে পারা। (৪) প্রধান লক্ষ্য জন লোকপাল বিল এখন অবধি চালু করতে না পারা। (৫) দিল্লির ভয়ানক বায়ু দূষণ রোধে কোন কার্যকর ভূমিকা না রাখতে পারা। (৬) ‘ ইণ্ডিয়া জোটে ‘ থেকেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জিনজার গ্রুপে যুক্ত হওয়া এবং কংগ্রেসকে ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ করে যাওয়া। পাটিগণিতের হিসাবে দেখা যাচ্ছে মাত্র ২% এর কিছু বেশি ভোট পেয়ে বিজেপি যেখানে এতগুলি আসনে জয়ী হল, সেখানে কংগ্রেসের ভোট ৬.৩৪%। বহু আসনেই বিজয়ী বিজেপি প্রার্থী ও পরাজিত আপ প্রার্থীর ভোটের ফারাকের চাইতে কংগ্রেস প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট বেশি। সুতরাং আপ – কংগ্রেস নির্বাচনী জোট অথবা বোঝাপড়া হলে ফলাফল অন্যরকম হতে পারত। (৭) দীর্ঘদিন ধরে আইনি জটিলতা, কেন্দ্র ও লেফটেনেন্ট গভর্নর এর সঙ্গে সংঘাত এবং নেতাদের জেলযাত্রা পুর ও প্রশাসনিক কাজে সমস্যা হচ্ছিল। মহল্লা ক্লিনিক, মডেল স্কুল সহ যাবতীয় কাজকর্ম ও পরিষেবা মুখ থুবড়ে পড়েছিল। (৮) দলে যৌথ নেতৃত্ব ও শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলার বিপরীতে কেজরিওয়ালের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ। আপ গঠনের মূল হোতা সাজিয়া ইমলি, যোগেন্দ্র যাদব, প্রশান্ত ভূষণ, আনন্দ কুমার প্রমুখরা অনেকেই কেজরির সঙ্গে দ্বন্দ্বে দল থেকে বেরিয়ে যান বা বহিষ্কৃত হন। পরবর্তী পর্যায়ে কুমার বিশ্বাসের মত প্রথম সারির নেতারা। নেত্রী স্বাতী মালিওয়াল এর প্রতি অভব্য আচরণও মানুষ ভালো চোখে দেখেননি। এদের অনেকে বিজেপিতে যোগ দিয়ে আপ বিরোধিতার প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। (৯) অনেকে ‘ স্বরাজ অভিযান ‘ এর মত সংগঠন গড়ে তুলে পৃথক কার্যকলাপ শুরু করেন। (৯) দলের নীতিতে সবাইকে নিয়ে চলার কথা ঘোষণা করলেও একটি অনুগত গোষ্ঠী (Coterie) নিয়ে কেজরিওয়ালের এককভাবে চলা। (১০) জেলে গিয়েও কেজরিওয়ালের মুখ্যমন্ত্রীর পদ ও কুর্শি ধরে রাখার মরিয়া চেষ্টা এবং দলের পরিবর্তে প্রথমে স্ত্রীকে এগিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ। (১১) কিছু ক্ষেত্রে কেজরিওয়ালের খামখেয়ালি আচরণ। মাঝেমাঝেই তিনি হঠাৎ করে বেপাত্তা হয়ে যেতেন এবং পরে দেখানো হত তিনি বেঙ্গালুরুর রবিশঙ্করের আশ্রমে বিপাসনা ইত্যাদি যোগ ক্রিয়া করছেন। (১২) নরম হিন্দুত্ব। হনুমান চালিশা পাঠ সহ নিয়মিত সাড়ম্বরে সপরিবারে পূজাপাঠ, নিখরচায় বয়স্কদের তীর্থ ভ্রমণের ব্যবস্থা, সিএএ আন্দোলন ও দিল্লি দাঙ্গায় নিষ্ক্রিয়তা প্রভৃতি সত্ত্বেও যেমন হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতায় বিজেপির সঙ্গে পেরে ওঠা যায় নি, তেমনই অন্যদিকে সেক্যুলার ভাবমূর্তি মার খেয়েছে। (১৩) বিজেপি প্রধান বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও বিজেপির প্রতি নরম মনোভাব নিয়ে তীব্রভাবে কংগ্রেসকে আক্রমণ করে চলা। এরফলে বিজেপির খুবই সুবিধা হয়েছে।
অন্যদিকে (১) আরএসএস – বিজেপির সংগঠন এমনিতেই দিল্লিতে শক্তিশালী। (২) এবার তাঁরা আরও জোরদারভাবে, আরও পরিকল্পিতভাবে, অনেকদিন ধরে, দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে এগিয়েছিল। (৩) সহায় ছিল কেন্দ্র সরকার। (৪) আপের কংগ্রেস বিরোধিতা কাজে লাগিয়েছিল। (৫) প্রবলভাবে কাজে লাগিয়েছিল আপের আবগারি কেলেঙ্কারিতে জড়ানো এবং ব্যক্তি নেতাদের দুর্নীতি ও বৈভব। (৬) কেন্দ্র বাজেটে দিল্লির বিরাট সংখ্যক চাকরিজীবী ও মধ্যবিত্তদের খুশি করা হয় আয়কর ছাড়ে এবং (৭) অষ্টম বেতন কমিশন ঘোষণা করা হয়। (৮) দিল্লির বাজেট বরাদ্দ ১০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। (৯) আপ ঘোষিত মহিলাদের অনুদান ২১০০ এর থেকে বেশী ২৫০০ ঘোষণা করা হয়। (১০) বাছাই করা কর্মীদের দিয়ে বুথ স্তরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করা হয়। (১১) শিখ মহল্লায় শিখ, দলিত মহল্লায় দলিত, পাঞ্জাবি – বাঙালি পাড়ায় সেখানকার, বিহারি শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায় সেখানকার নেতা কর্মীদের পাঠানো হয়। (১২) মোদি, শাহ এর মত হেভিওয়েট রাও প্রচারে নামেন। (১৩) আর মহাকুম্ভ সহ হিন্দুত্বের প্রচার ছিল অবিরাম। ফলে আপের ভোট ব্যাংকে ফাটল ধরে এবং ভালোরকম হিন্দু, মধ্যবিত্ত ও দলিত মেরুকরণ ঘটে বিজেপির দিকে। কিছু মুসলমান ভোটও সরে যায়।
এখন প্রশ্ন: ঢিলেঢালা গান্ধীবাদী মধ্যমন্থী (Centrist) গণতান্ত্রিক, অন্যদিকে কেজরিওয়াল কেন্দ্রিক, সংগঠনের পরিবর্তে প্রশাসনধর্মী, আম আদমি পার্টি (Aaam Admi Party অথবা AAP) কি বিজেপির এই শক্তিশালী নিগড় ভেঙ্গে আর প্রত্যাবর্তন ঘটাতে পারবে? অতিশী, গোপাল রাই, সন্দীপ পাঠক, সঞ্জয় সিংহ প্রমুখ দ্বিতীয় সারির নেতারা কি সব বাধা কাটিয়ে উঠে দাঁড়াতে পারবেন? বিজেপি এবং তাঁর কেন্দ্র সরকার, এজেন্সি, প্রশাসন, প্রচার যন্ত্র, জনবাদ, হিন্দু জাতীয়তাবাদ, মজবুত সংগঠন, বিপুল অর্থ – সব কিছুর চাপ থেকে পাঞ্জাব সরকার, দিল্লির পুরসভাগুলি এবং দলকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে? দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে বিদ্ধ কেজরিওয়াল কি বিজেপির হাতের পুতুল মায়াবতী, মমতার মত আরেক কংগ্রেস বিরোধী একনিষ্ঠ প্রচারক হয়ে উঠবেন?
ভবিষ্যতই এই প্রশ্নগুলির উত্তর দেবে। তবে এই মুহূর্তে এটুকু বলা যায় যে স্বাধীনতার পরে মাঝে কিছু সময় বাদ দিয়ে প্রায় সাত দশকের বৃহৎ শিল্পপতি ও সমন্তপ্রভুদের বৃহৎ দল কংগ্রেসের (Indian National Congress অথবা INC) একচ্ছত্রতার (Hegemony) পর কতিপয় পারিবারিক বৃহৎ ফাটকা পুঁজি ও কর্পোরেটদের বৃহৎ দল বিজেপির (Bharatiya Janata Party অথবা BJP) এর একচ্ছত্রতার প্রতিস্পরধী একটি জাতীয় দলের বিকল্পের ধারণাটির ভয়ানক ক্ষতি হল।
১০.০২.২০২৫











