জানো দাদু, যশো মাসির ছাগলটা আজকাল নাকি গাঁজা খায়।
আমাদের ও পাড়ার যশো মানে যশোদার? ছাগল কোথায়? ওটা তো পাঁঠা। বয়সকালে বেশ নধর ছিল। তখন কেটে খেলে বেশ হত। এখন বুড়ো হয়ে মাংস চিমড়ে হয়ে গেছে। ওটার কথাই বলছিস কি? তাছাড়া সময় থাকতে ইয়ে কেটে নিলে খাসি হত। এখন দুর্গন্ধই সার।
হ্যাঁ গো ওটাই। পাঁঠাই ওটা। তবে কিনা যশো মাসি বলে, ওটা ঐতিহাসিক ভাবে উচ্চবংশের। আরও কী বলে জানো? উন্নত বংশের পাঁঠা বোঝাতে সংসদ ডিকশনারিতে নাকি রামপাঁঠা বলে কোনও এন্ট্রিই নেই। তো মাসি বলে আমার পাঁঠা। আমি ল্যাজে কাটি না মুড়োয় কাটি সে আমার ব্যাপার। ওকে পাঁঠা বলবিনে মোট্টে। বলবি, যশোদার রামছাগল।
আহা, সে না হয় রামছাগলই বললুম। কিন্তু গাঁজার ব্যাপারটা কী? খুলে বল দিকিনি।
শোনো, বলি তবে। মাসি কিন্তু ওরে পুষে অবধি মানুষ করতে চেয়েছিল। মাসি পঁই পঁই করে জানত মানুষ হতে হলে মাস্টারদের কথা শুনে চলতে হয়।
এমনিতে তো সেই রামছাগল ব্যাটাচ্ছেলে খাদ্য খাবার ঘাস আর পাতা, আর পাঁচটা ছাগলজনের মতই খেত। একদিন ইশকুলের পাশের ঘাসজমিতে গোবর কুড়ুতে গেছে মাসি। ভেতরে তখন বাংলা স্যার নাইন না টেনের ক্লাস নিচ্ছিল। মাসি শুনল মাস্টার বলছে, ব্যাকরণের বই গলাধঃকরণ না করতে পারলে, মানুষ হবি না, তোরা ছাগলই রয়ে যাবি।
শুনেই তো মাসি ওই যাকে বলে একেবারে মুগ্ধ। মানুষ হবার এমন টোটকা আগে শোনেইনি সে।
তক্কে তক্কে ছিল সেই থেকে। পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে বই কিনে আনল। দোকানে মেলা বইয়ের মধ্যে ছিল বামনদেব আর পিকে দে সরকারের বাংলা আর ইংরেজির ব্যাকরণ বই দুখানা। সেই দুখানই কিনেছে।
মাসির প্ররোচনায় রামছাগলটা, সেই যে বলে না, ছাগলে কী না খায়, সেই মতন দুখানা বইকেই সটান কচড়মচড় করে খেয়েছে আগাপাশতলা।
মাসি পরদিন আদর করে তার ছাগল থুড়ি পাঁঠাকে গলা জড়িয়ে বলল, বল তো সোনা, কী শিখলি? ছাত্র বিগলিত গলায় বলল, ব্যা…।
মাসি তো শুনে মুগ্ধ। এই তো! ব্যাকরণের ব্যা টুকু শিখে ফেলেছে এক দিনেই।
আহা, পাঁঠা বলে কি মানুষ নয়?
মাসি অতি আদরের চোটে খেয়াল করেনি, কুকুরের যেমন, আদরে উল্লাসে ক্রোধে বিদ্রুপে ক্ষিদেয় আর তৃপ্তিতে একটাই প্রকাশ তার গলার ঘেউ, তার এই পন্টকেরও তেমনি, ব্যা…।
পন্টক বুঝলে তো? কণ্টক থেকে কাঁটা যেমন তেমনই পন্টক থেকে পাঁটা।
এরপর যা ঘটল সেটা মাসির নিজের ইনোভেশন। পোষ্যকে নতুন কিছু শেখানোর লোভে, ইশকুলের মাঠে গোবর পড়ে থাকুক না থাকুক, মাসি গিয়ে বাংলা মাস্টারের পড়ানো শুনবার লোভে সেই জানলার ধারে আড়ি পাতে রোজ।
তদ্দিনে মাস্টার তার ক্লাসে ব্যাকরণ শেষ করে গল্প উপন্যাসের চ্যাপ্টার ধরেছে।
দুখানা ব্যাকরণ বই পড়ে পাঁঠা যখন ব্যা বলতে শিখেছে, এবার কিছু গল্প উপন্যাস পড়ে কি আর নতুন কিছু শিখতে পারবে না?
এবার আর পুরোনো বইয়ের দোকান নয়। পুরোনো কাগজ-বইখাতাওলার কাছ থেকে জোগাড় হল কিছু ছেঁড়াখোঁড়া গল্পের বই, মায় বাংলা ম্যাগাজিন উল্টোরথ, দেশ, শুকতারা, আনন্দমেলা। কাগজওলার কাছ থেকে বেশ সস্তায়ই পাওয়া গেল।
তা সেই রামছাগলের তা খেতেও আপত্তি নেই।
এত সব খাওয়াদাওয়ার পর যশোমাসি তার রামছাগলকে খোদ ওই মাস্টারের কাছে রিভিউ আর ইনটারভিউয়ের জন্য নিয়ে গেল।
মাস্টারটা আমার যশোমাসিকে দিদি বলে।
তো ইনটারভিউয়ের সময় অণু-ছোটো-বড় সব গল্পেরই বিষয়ে সেই রামছাগল এখন বলে ব্যা।
মাস্টার বুঝিয়ে দিল। অণুগল্পের সময় যে ব্যা, তা নাকি গল্পের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুক্ষ্মতম ব্যাকুলতা। ব্যাকুলতার ব্যা টুকু মাত্র বলেছে বেচারি। আহা, ছাগল ইয়ে পাঁঠা বলে কি মানুষ না।
তবে ওই ছোটোগল্প শুধোলেও যে ব্যা বলছে, মাস্টার?
আহ্হা, বুঝে নিতে হবে, ব্যা বলেনি। বলেছে ব্য। তার মানে হচ্ছে ব্যঞ্জনা। মানে হল গিয়ে মোচড়। যেমন পেট খারাপে মোচড় দেয় না, সেই রকম। সেই ব্যঞ্জনার মোচড় না মারলে ছোটোগল্প দাঁড়াবে না, সেইটেই বোঝাচ্ছে। কখনও কখনও দুবার পেটব্যথা, দুটো মোচড়। শক্ত ক্যাপসুল নাদির বদলে ছ্যাড়ছেড়িয়ে!
আর বড়োগল্পের বেলা?
মাসি পুরোটা বলার আগেই পাঁঠা গম্ভীরভাবে আবারও ঘোষণা করল ব্যা।
মাস্টার উজ্জ্বল মুখে বলল, ভারি বুদ্ধিমান রামছাগলটি, দিদি তোমার। ঠিক ধরে ফেলেছে। বড়োগল্প হল গে ছোটোগল্পের ব্যা। ছোটোগল্পকে ব্যাখ্যা করে বলা। এই ব্যা মানে ব্যাখ্যা।
তবে উপন্যাসটা কী বুঝেছ, মাস্টারকে বলো তো রামছাগলসোনা, গোপাল আমার।
মাসি গলা জড়িয়ে শুধোলো রামছাগলকে।
তার এক কথা, একই ধ্বনি। কিন্তু এত জিজ্ঞাসাবাদে সে বোধ হয় ক্ষেপে গেছে। সাড়ম্বরে চেঁচিয়ে উঠলো, ব্যা ব্যা ব্যা ব্যা ব্যা ব্যা।
মাস্টার রামছাগলের প্রতিভায় এবার প্রায় মন্ত্রমুগ্ধ। কী বুদ্ধি গো মাসি তোমার খোকার। ঠিক ধরে ফেলেছে। ব্যা মানে ব্যাপকতা। ইচ্ছে মতন চরিত্র তৈরি করে তাদের ব্যাপক লতায় পাতায় ঘোরাও। তারপর শেষ অবধি কাহিনি ব্যাপ্ত হবার জায়গায় ব্যাহত হলে, ব্যালান্স হারালে, ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত হলে ব্যাপিকাবিদায় বলে শেষ করো উপন্যাস। এই জন্যেই এতবার ব্যা বলেছে।
মাসি তবুও বেজার মুখে বসে আছে দেখে মাস্টার বলল, ও যশো দিদি, এখনও কেন গোমড়া মুখ? সবই তো শিখেছে খোকা।
নাঃ, সব আর শিখেছে কই। কবিতার বই তো খাওয়াইনি কো একটাও। জোগাড় করতে পারিনি।
মাস্টার হদিশ বাতলালো। শোনো দিদি, কবিতা শেখাতে মানে বোঝাতে চাইলে খোকনকে গাঁজা খাওয়াও। এক আধদিন খালাসিটোলায়ও নিয়ে যেতে পারো, কিম্বা কফি হাউসে।
তা এই রামছাগল তো হাত জড়ো করে ছিলিম ধরতে পারবে না, টানতেও পারবে না।
সেই মাস্টারই উপায় বাতলেছে। কাঁচা গাঁজাগাছই নয় খাইয়ে দেখ দিদি দিনকতক।
রামছাগল নাকি গাঁজাগাছ খাচ্ছে ও।
সেই থেকে যশো মাসি হন্যে হয়ে বুনো গাঁজাগাছ খুঁজছে তার সোনামাণিক রামছাগলের জন্য। মাসিকে দেখলে নাকি এদিক পানে?









