সঙ্গের ছবিটা অনির্বাণের। মরে যাবার পরে নয়, কেননা গত সপ্তাহে ছবিটা ও-ই পাঠিয়েছিল। কিন্তু অনির্বাণ যে মরে গেছে, সেটাও তো অনস্বীকার্য।
অবিশ্বাস্য ও অনস্বীকার্য, দুইই।
অনির্বাণ আমার ভাই। স্নেহ ও প্রশ্রয়ের ভাই। সৃজনশীল ভাবনা আর প্রতিভাজনিত অস্থিরতার জন্য শ্রদ্ধারও বটে। ছিল, আর নেই।
নিয়মিত যোগাযোগ থাকত কি? একেবারেই না। আচমকা হোয়াটসঅ্যাপে লাগাতার কথাবার্তা – একটানা দুই-তিন-চার-পাঁচদিন। তারপর আবার দীর্ঘ বিরতি। বিরতি মাসখানেক বা মাসদুয়েকের। অতএব, যোগাযোগটা এপিসোডিক। আর দেখাসাক্ষাৎ কালেভদ্রে।
এই যে এপিসোডিক কথাবার্তা, সেসব কথার শুরুগুলোও কোনও বিশেষ প্রসঙ্গ টেনে নয়। যেমন গতসপ্তাহেই লিখল দুই প্রজন্মের ভাবনাচিন্তা ও রুচিবোধের ফারাক নিয়ে কিছু কথা। আচমকা। আমাকে পড়তে দিল। লেখাটার শেষ অংশ এরকম –
“বর্তমানে দাঁড়িয়ে যারা ভাবছে যে তারা কালোত্তীর্ণ কিছু ছাপ রেখে যাবে, একটা নির্দিষ্ট সুখী গন্ডির ভেতরে বসে তাদের সেই ভাবনা সাময়িক আরাম দিতে পারে। এর বেশী কিছু নয়।
নিজেকে জ্বালিয়ে আগুন রেখে যাবে আগামী বহু বছরের জন্য, এত জ্বালানি আমাদের কারোরই মনে হয় নেই।
শুধু নিজেদের যেখানে ফুরিয়ে যাওয়া, সেখানে অন্যের হাতে মশালটা ধরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাটা জরুরী।”
শেষে আমার উদ্দেশে –
“আগে প্রচুর impulsive ভাবনা থেকে প্রচুর কিছু লিখতাম। আজকাল সেসব আর আসে না। এটা লিখে মনে হল ভাল খারাপ জানার জন্য আপনাকে মেসেজে পাঠাই।”
মতামত জানালাম। সেই মতামত নিয়ে এই বিশেষ ক্ষেত্রে ও সহমত হলেও অনেকসময়ই আমার কথাগুলো ওর মনঃপূত হতো না। তর্ক জুড়ত। রেগেও যেত। ক্ষেত্রবিশেষে কটু কথাও বলত। আমিও চটে যেতাম, একবার তো ব্লক-ই করে দিলাম। তাতে কিছু যেত-আসত না, কেননা অনির্বাণ তো আমার ভাই, আদরের ভাই, তার ‘পরে রাগ করে থাকা যায় কি! সেটুকু ও-ও জানত, যদিও আমাকে কখনও কখনও ও স্যার বলে ডাকত আর কখনও বা বিষাণদা। এবং সবসময়ই আপনি।
আসলে অনির্বাণ অসম্ভব খোলা স্বভাবের মানুষ। মুখ মনে ফারাক নেই। অকপট। মতপ্রকাশের ব্যাপারেও তা-ই। জীবনে চলার পথে যে হিসেবগুলো জরুরি, তার একটাও অনির্বাণ মানত না। ওর মধ্যে একটা পাগলামি ছিল। যেটা ছাড়া বোধহয় হাজার প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও ক্রিয়েটিভ থাকা যায় না। সবমিলিয়ে ওকে হয়ত অপছন্দও করত কেউ কেউ – কিন্তু ওই উজ্জ্বল চোখ আর একমুখ হাসি দেখে কেউই বেশিক্ষণ রেগে থাকতে পারত না, নিশ্চিত। তবে ক্ষমতাসীনদের ব্যাপার আলাদা। ডেঙ্গু প্রসঙ্গে সরকারি বয়ান যদি বিহার-ঝাড়খন্ডের মশা এসে ডেঙ্গুর ছড়াচ্ছে এই হয় – তখন অনির্বাণ চন্দবিন্দু-র গানের সুরে গেয়ে বসল “ও আমার ভিনদেশি মশা” – মেডিকেল কাউন্সিল নির্বাচনের সময় আমাদের প্রচার ও পাহারার সময় দিনে কিংবা রাতে গিটার হাতে গাইতে বসত – এসব অনাচার তো ক্ষমতাসীনদের পছন্দ হওয়ার কথা নয়, তাই না?
কিন্তু সেসব কথা থাক। আপাতত কপটতাহীন অনির্বাণের প্রসঙ্গে ফিরি। এটুকু বলতে পারি, অন্তত ওর কাছে নিজের মতামত প্রকাশের সময় আমি নিজেও কপট থাকিনি। ডাক্তারদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন ক্রিয়েটিভ কাজের চেষ্টা করেন ঠিকই, কিন্তু সৃজনশীল কাজের জন্য যে সময়টুকু দেওয়া জরুরি, যে নিষ্ঠা অত্যাবশ্যক – যে সময় ও নিষ্ঠা কেরিয়ার ও পেশার জন্য বরাদ্দ সময়ে টান ফেলে, টান পড়ে উপার্জনের সম্ভাবনায়ও, যা রীতিমতো বাস্তব একটি টাকার অঙ্ক – cost – সেই cost-টুকু bear করতে অনেকেই রাজি থাকেন না। ফলত, ব্যাপারটা half-hearted শৌখিনতা হয়ে দাঁড়ায়, এবং final product-টাও খুব একটা পাতে দেওয়ার মতো হয় না। অনির্বাণকে মাঝেমধ্যে এসব বলতাম – কিছু কিছু সময় মেনে নিত, কখনও কখনও মনঃক্ষুণ্ণ হতো – তবু বলতাম, বলতে ছাড়তাম না – কেননা আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, ওর যা ক্ষমতা আছে, তার প্রতি সুবিচার করতে হলে ওকে গানের পেছনেই বেশি সময় দিতে হবে, চাকরির সময়টুকু বাদে বাকি পুরো সময়টাই গানের জন্য ব্যয় করতে হবে।
তো অনির্বাণ আপাতত প্রতিভা-টতিভার উর্ধ্বে চলে গেল। কিছু গান রয়ে গেল – যেহেতু আমি গানের ব্যাপার বিশেষ বুঝি না, তাই জানি না এই গানগুলোর একটিও দশ বা কুড়ি বছর বাদে কোনও শ্রোতার মনে রয়ে যাবে কিনা। আশা করি, কিছু গান অন্তত কিছু শ্রোতার মনে থেকে যাবে।
অনির্বাণকেও কে কে মনে রাখবে জানি না। ঋজু মেরুদণ্ড, বুদ্ধিদীপ্ত একজোড়া চোখ আর ঝিলিক দেওয়া দুষ্টু হাসি, গিটার হাতে যেখানে-সেখানে গাইতে বসে যাওয়া, কেউ গান শুনতে ভালোবাসলে ক্লান্তিহীন গেয়ে চলা – আমার ভাইটাকে আমি নিজেও মিস করব কিনা জানি না, কেননা ওর দেহের সঙ্গে সঙ্গে আমার হৃদয়ের একটা অংশও তো আজ পুড়ে গেল, যে অংশে ও ছিল – বাদ পড়া পা বা হাতের অনুপস্থিত অংশেও রোগী ব্যাথা অনুভব করে, যাকে বলে phantom limb pain, অনির্বাণের জন্য কষ্টটাও আজকের পর থেকে, হয়ত, তা-ই।
গতকাল সকাল আটটায় দেখলাম অনির্বাণের মেসেজ –
“কিছু না বললেও হবে, কিন্তু একটা কথা বিশ্বাস করবেন – আমি leftist.”
তার এক মিনিটের মাথায় – আরও এটাসেটা কথার পরে –
“বামপন্থা নিয়ে আমার মনে প্রচুর কনফিউশান। কিন্তু না ভেবেও থাকতে পারি না।”
তার পরপরই –
“আমার প্রজন্মের সবার এক অবস্থা, জানেন।”
অনির্বাণের মন্তব্যের দুমদাম প্রত্যুত্তর হয় না। হাতে একটু সময় নিয়ে উত্তর দিতে হয়। ঘণ্টাদুই বাদে ভেবেচিন্তে উত্তর দিলাম। উত্তরটা পছন্দও হলো ওর – সম্মতিবাচক ‘একদম সত্যি’ এলো বারোটা আটচল্লিশে।
সময়গুলো লিখে রাখছি। কেননা সময়টা থেমে যেতে চলেছে। দুপুর বারোটা আটচল্লিশ – মানে অনির্বাণের জীবনের তখন আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। কেননা, এর চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই আমি জানতে পারব, অনির্বাণ মারা গেছে।
শু
নলাম, পাতলা পায়খানা, পরে রাতের দিকে বমি, বাড়িতেই স্যালাইন ইত্যাদি নিতে শুরু করেছিল, ভোররাতে নাকি বলেছিল, খুব গরম লাগছে, খাট থেকে নেমে মেঝেয় গিয়ে শুয়েছিল…
আমি ওকে যখন তত্ত্বকথা নিজের জীবনবোধ-সঞ্জাত ভাবনা জাতীয় গুরুগম্ভীর কথা শোনাচ্ছিলাম, তখন অনির্বাণের হাতে সময় ফুরিয়ে আসছিল।
অনির্বাণ যখন আমার কথা পড়ে সহমত হচ্ছিল, তখন ওর সময় ফুরিয়ে আসছিল খুব দ্রুত। আস্ত একটা দিনও, তখন, আর ওর হাতে নেই।
অথচ যেটা বলার ছিল – ছাড় তো, বেঁচে থাক, বেঁচে নে, বাকি সব পরের কথা – সেটুকুই বলে ওঠা হলো না।
গতকালই একটা গ্রুপে দেখলাম, একেবারে সক্কাল সক্কাল অনির্বাণ নিজের মতামত জানিয়ে লিখেছে, “আমি পুরোটা গুছিয়ে বলতে পারি না @Dr Bishan Basu কে গুরু মানি। তিনি যদি কিছু বলেন।”
কী বলব, তুইই বলে দে, অনির্বাণ। আমার শুধুই রাগ হচ্ছে। খুব খুউব অক্ষম একটা রাগ।
তোকে নিয়ে আমার… তোর কথার উত্তরে আমার… তোর মতামত নিয়ে আমার… জাস্ট কিচ্ছু লেখার নেই… কিচ্ছু বলার নেই…










