মায়া ওর মা’কে বাবার থেকে অনেক কাছের মনে করে।
মায়া’র পুরো নাম মায়া-বন-বিহারিনী .. এরপর একটা চ্যাটার্জী বা ঘোষ জাতীয় কিছু থাকাই স্বাভাবিক ছিলো,তার বদলে যেটা আছে, সেই পদবী শুনলেই আপনাদের ভুরু কুঁচকে যাবে।
মায়া-বন-বিহারিনী মুর্মু। ওর দাদুর বাড়ি সাঁওতালডি’র নাম না শোনা একটা গ্রামে। ওর ঠাকুর্দার ঘর এক পুরুলিয়ার এক আধা-মফস্বলের কোণে, দুজনেরই পড়াশোনার দৌড় অলচিকি আর বাংলা অক্ষরজ্ঞান অবধি, তাও আবার প্রাপ্তবয়েসে।
কিন্তু তার বাবা মা.. মেধা বলুন বা কোটার উপকার, দুজনেই যার যার ক্লাসে ফার্স্ট, তারপর মাধ্যমিক.. যেখানে প্রথম সাঁওতাল হিসেবে মা সুচিত্রা সোরেনের প্রথম দশে আসা। সে বছরই ওর বাবা সুবল মুর্মু উচ্চ মাধ্যমিকে নব্বই শতাংশের ওপর নম্বর পেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে, তার থেকেও আশ্চর্য নিট পরীক্ষায় চারশো বাহান্ন র্যাংক। জেনারেলেও এই র্যাংকে সে সব কলেজ পেতো, কোটাতে তো কথাই নেই। সুবল চেয়েছিলো কোটার তকমা ঝেড়ে ফেলতে, কিন্তু সেটা সম্ভব হলো না দুটো কারণে। এক,তফসিলি উপজাতির জন্য নির্দিষ্ট সুবিধাগুলো তাহলে সে আর পাবে না, যা না হলে তার পক্ষে ডাক্তারি পড়া সম্ভব নয় । দুই, সে ওই সিটটা নিলে একজন জেনারেলের সিট যেতো, যেটা হয়তো কোটা নেওয়ার থেকেও অসাম্য-বর্ধক।
তবে এসবের থেকেও আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছিলো সে বছর। পৌনে আঠারোর সুবলের সাথে প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশনে দেখা হয়েছিলো ষোলো হতে এক মাস বাকি থাকা সুচিত্রার। মধ্য এবং নিম্নমেধার মাঝে দুই অতি-মেধাবীরই মনের সমান কোনো বন্ধু ছিলো না। ক’য়েক ঘন্টার একসাথে থাকা সেটা বদলে দিলো, চিঠি আদানপ্রদান হওয়া শুরু হলো সাঁওতালডি আর পুরুলিয়ায় । অবশেষে, ঠিক দুবছর পরে, নিট র্যাংক দুশোর আলো ঝলমল মেডিকেল কলেজের ফার্স্ট ইয়ার সুচিত্রা সোরেনকে সটান প্রেমের প্রস্তাব দিলো সদ্য দুটো অনার্স পেয়ে থার্ড ইয়ারে ওঠা সুবল মুর্মু। তাতে হ্যাঁ বলতে লহমাও ভাবেনি হরিণ চোখের কালো মেয়েটি।
কোটা আর উপজাতি, দুটো তকমাই বেশ নিঃসঙ্গ করে দেয় তার অধিকারীদের, তারা নিজের মেধায় ক্লাসের প্রথমদিকে থাকলেও। অতি নিম্নবিত্ত পরিবারের দুই আদিবাসী ছেলেমেয়ের হাতে পয়সাও থাকতো না ক্লাসের বন্ধুদের সাথে কোথাও খেতে যাওয়ার, যে কটা আমন্ত্রণ আসতো, পড়ার অজুহাতে সেকটাও কাটিয়ে দিতে হতো তাই। দুজনে উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে কলেজ স্কোয়ার আর কলেজ স্ট্রিট ঘুরতো, দুটাকার সেদ্ধ ছোলা ও মুড়ি সহযোগে, সপ্তাহে এক দুটোদিন এটুকুই বিলাসিতা ছিলো ওদের। এমনই চারপেয়ে পায়চারির সময় সুবল দ্বিতীয় বার প্রেমে পড়লো। আর একই সাথে, সুচিত্রাও।
প্রেমের বস্তুটি একটি সঞ্চয়িতা, পুরনো বই বিক্রির ফুটপাতিয়া দোকানেও বাতিল বলে কোণে রাখা, মুখচেনা দোকানদার বিনিপয়সায় দিয়ে দিয়েছিলো । দুজনে সময় কাটানোর জন্য খুলেছিলো, ঘটনাচক্রে উচ্চমাধ্যমিকে দুজনেই বাংলায় জেলায় সেরা, সিলেবাস আর প্রাইজে পাওয়া বইয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে তাদের আগেও পরিচয় ঘটেছে।
কিন্তু প্রেম হলো এই কলেজে এসে, সে সময়ে যারা মেডিকেল কলেজে পড়েছে, অনেকেরই মনে আছে, একটি লম্বা কালো কোঁকড়াচুলের ছেলে আর একটা হরিণচোখের কালো মেয়ে কলেজস্কোয়ারের একটা বেঞ্চিতে বসে একটা ছেঁড়া সঞ্চয়িতা স্পষ্ট উচ্চারণে পড়ছে, বলেই চলেছে অনেক সময় বইয়ের দিকে না তাকিয়েই।
। ২।
বাবা মায়ের প্রেমের গল্পগুলো পরবর্তী সময় মায়া বড় হতে হতে তাদের বন্ধুদের মুখে শুনেছে । ডাক্তার এস মুর্মু আর ডাক্তার এস সোরেন যথাক্রমে অর্থোপেডিক আর গায়নোকলিস্ট হয়েছেন ।পুরুলিয়ার সেই আধা-মফস্বল ক্রমে ক্রমে বর্ধিষ্ণু শহর এখন, সেখানেই তাঁদের চেম্বার । দুজনের হাতযশ নিয়ে কিছু বলার নেই, বহু কিছুতে দুজনেই এ শহরের পথিকৃত, ‘কোটার ডাক্তার’ বলে আগে ব্যঙ্গ করা চ্যাটার্জী ঘোষ-দের সাথে সাথে হদ্দ গরীব চাষী মালো সাঁওতাল ওঁরাওরাও ওঁদের কাছে যায়। ঠিক অগ্নীশ্বর না হলেও , আদ্যোপান্ত সৎ ও সমাজমনস্ক দুই ডাক্তার ফেরান না কাউকেই, যারা দিতে পারেন তাদের থেকে যথোপযুক্ত ফিজ নেন, যারা পারেন না, তাদের বিনিপয়সাতেই। মাসে একবার দুজনে সুচিত্রার পৈতৃক গ্রামে ফেরেন, শেকড়ের ঋণ সুদসহ শোধ করে চলেছেন, মেধাবী ছেলে মেয়েদের জন্য একটা ট্রাস্টও আছে তাঁদের।
আর আছেন রবীন্দ্রনাথ । মায়া’র ছোট্ট থেকে দেখা বসার ঘরে কাঁচের বাক্সে রাখা একটা ছেঁড়া সঞ্চয়িতা, পাতাগুলো এতই হলুদ, পড়তে গেলে ছিঁড়ে যাবে। ঠিক তার ওপরে রবীন্দ্রনাথের একটা দাঁড়ানো ছবি,
আর পাশের বুককেসে সার দিয়ে রবীন্দ্র রচনাবলী।
বাড়ির বাকি বইদের থেকে আলাদা, চেম্বার শেষ হলে বাবা ঠিক একটা খুলে বসবে, বইয়ের পাতার ওপর হাত রেখে একটার পর একটা কবিতা বলে যারে ‘ যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে’, ‘ আমি পরানের সাথে খেলিবো আজিকে মরণ খেলা’
‘ তোমরা নিশি যাপন করো , এখনো রাত রয়েছে ভাই’ অথবা ‘কিনু গোয়ালার গলি’। সে সব বেশির ভাগই গভীর রাত্তিরে। রবিবার বা ছুটির দিন হলে, সন্ধেবেলায়মা ওকে পড়াতে পড়াতে শুনবে , আর মধ্যে মধ্যে বিড় বিড় করে অবিকল কবিতাগুলো বলবে। মা’য়ের জীবনে রবীন্দ্রনাথ পেছনের সারিতে, এক থেকে দশ করলে এগারো নম্বরে। প্রথম দশটা জুড়ে মায়া।
মায়া-বন-বিহারিনী’র স্কুল থেকে যে ডাকনাম ‘হরিণী’ হবে, তা বোধহয় ভবিতব্যই ছিলো ।এমনকি টিচাররাও তাকে মাঝে মাঝে তাই ডেকে ফেলতেন ।
মায়া স্কুলে ভর্তি হওয়া ইস্তক সুচিত্রা তাঁর চেম্বার মেয়ের রুটিন অনুযায়ী কেটেছেঁটে ফেলেছিলেন।
শহরের সবচেয়ে নামী ইংরাজি মিডিয়ামে পড়তো মায়া, সিলেবাসের বোঝা নেহাত কম নয় । প্রতি বছর দুই সেট বই কেনা হতো , একটা থাকতো সুচিত্রার গাড়িতে। রোজকার ক্লাসওয়ার্ক, হোমটাস্ক, প্রোজেক্ট,
মেয়ের চেয়ে মা’র নখদর্পণে বেশি, চেম্বার ছটায় শেষ করে সুচিত্রা বাড়ি ঢুকে যেতেন। সুবলের সেখানে আসতে আসতে রাত এগারোটা, এসে কম্প্যুটারে রোগীর নথি, পরের দিনের অপারেশনের পড়াশোনা,
তারপর.. রবীন্দ্রনাথ । শোনা যায় মেয়ে কত বড় হলো শুনে একবার সুবল দুহাত ছড়িয়ে দেখেছিলেন, কারণ তিনি তো মেয়েকে শোয়া অবস্থাতেই দেখতেন ।
। ৩।
পড়াশোনায় মায়া প্রথম সারিতে ছিলো বললে কম বলা হবে। প্রায় সবকটা বিষয়ে সে প্রথম হয়, মায়া মুর্মু নয়, ‘হরিণী নামটা ক্রমশ যেন প্রবাদে পরিনত হচ্ছিলো । প্যারেন্ট টিচার মিটিংএ সুবলকে কেউ কখনো দেখেনি, শুধু প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশনে তাকে বোকা বোকা ভাবে হাততালি দিতে দেখা যেতো। কিছুটা বাপের, কিছুটা মেয়ের অনিচ্ছেতে পড়াশোনা স্কুল আর বাকি শৈশব আর কৈশোরে মা সুচিত্রাই ছেয়ে রইলেন মায়াকে, আর সেই সঙ্গে ক্রমশ দূর হয়ে গেলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।বাংলায় তুখোড় নম্বর পাওয়া মায়া-বন-বিহারিনী সিলেবাসের রবীন্দ্র-কবিতা লিখে বাংলার মিসের বাহবা পেলেও, তার বাইরে সে রবীন্দ্রনাথ ছুঁয়েও দেখতো না। পিংক ফ্লয়েড , কোল্ড প্লে বা লিংকিং পার্ক তার কৈশোরের অবলম্বন হয়ে উঠলো। সুচিত্রা কিছুদিন রবির দিকে ফেরাবার চেষ্টা করে তারপর নিজেই সড়গড় হয়ে উঠলেন ওয়েস্টার্নে, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আবেগ ও অনুভূতির কোনো তফাত নেই বোঝার পরে সেসব গানে ডুব দিতে তাঁর কোনো অসুবিধা হয়নি ।
সুবল একগুঁয়ের মতো রবীন্দ্রনাথ থেকে একটুও সরলেন না। গান কবিতা গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ চিঠি, ক্রমে যেন তাঁর জীবন আরো রবীন্দ্রময় হয়ে উঠলো, ওই তিন সদস্যের বাসায় দুটো অদৃশ্য ভাগ হয়ে গেলো যেন, একদিকে মায়া আর সুচিত্রা, অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ আর সুবল। মায়া অবশ্য রবীন্দ্রনাথে কখনোই বিমুখ ছিলেন না, কিন্তু কিছুটা মেয়ের পাশে থাকার জন্য আর কিছুটা সুবলের একগুঁয়েমিতে বিরক্ত হয়ে তিনি অন্যদিকেই ছিলেন।
। ৪।
মায়া নিটে বসেনি । ডাক্তারি তাকে কোনোকালেই টানেনি। জে ই ই মেইন আর অ্যাডভান্সে দুর্ধর্ষ ফল করলো সে ।র্যাংক এমন এলো, যে এমনি হলে খড়গপুর আই আই টি পাবে সে, এস টি সার্টিফিকেটে বম্বে। দুটোতেই কম্প্যুটার সায়েন্স।
মায়ার স্বপ্ন বম্বে। গত চার বছর ধরে সে স্বপ্ন দেখে এসেছে সেখানে পড়ার। আজ সেটা হাতের মুঠোয়।
এখানেই বেঁকে বসলেন সুবল। তাঁর বক্তব্য, তাঁরা আর কোনোভাবেই কোটা’র সুযোগ পাওয়ার যোগ্য নন। আর্থিক ও সামাজিক অন্যায় হবে সেটা।
সুচিত্রা এতে মৃদু আপত্তি জানাতে গেছিলেন। সুবল সেই সঞ্চয়িতা দেখিয়ে তাঁকে বললেন ‘ আই আই টিতেও কোনো সুবল সুচিত্রা উঠে আসতে পারে। ওই প্রিভিলেজটা আর নিও না।’
এরপরে আর কোনো কথা চলে না। মায়া খড়গপুর আই আই টি’তেই ভর্তি হলো । যাওয়ার সময় বাবাকে বাই পর্যন্ত বলে যায়নি সে। আই আই টি’তে থাকাকালীন সুচিত্রাই এসেছেন বারবার। মেয়ের মোবাইলে সুবল মেসেজ করলে হ্যাঁ নায়েই উত্তর সেরেছে মায়া। মধ্যের বরফ সুবল বহুবার গলানোর চেষ্টা করেছে অবশ্য। কিন্তু মায়ার তরফ থেকে ঠাণ্ডা ভাবটা কাটেনি।
খড়গপুর থেকে জন হপকিন্সে এম এস এ চান্স। এদেশের হিসেবে খরচা ষাট লাখ, থাকার খরচ আলাদা। দুই ডাক্তারের রোজগারেও টাকাটা অনেক, জীবনের সঞ্চয় অনেকটাই ভাঙলেন সুবল-সুচিত্রা।
পাছে মেয়ের আঁতে ঘা লাগে, নিজের টাকাটা সুচিত্রার অ্যাকাউন্টে পাঠালেন সুবল । পঞ্চাশ পঞ্চাশের বদলে মায়া দেখলো প্রায় পুরোটাই মায়ের টাকা।
জন হপকিন্স থেকে স্বপ্নের দৌড় শুরু মায়ার। আগে শেষ করায় একটা সেমেস্টারের ফি মকুব।
একটা ভয়ংকর চালু স্টার্ট আপে মোটা ডলারের চাকরি। এবং… এইচ ওয়ান বি ভিসা। আমেরিকান ড্রিম তাকে বল্টিমোর থেকে সিয়াটল এনে ফেললো।
মায়া মুর্মু.. মেশিন লার্নিংয়ের দুনিয়ায় অল্পসময়ের মধ্যেই চেনা এক নাম।
। ৫।
সাত বছর। এর মধ্যে সুচিত্রা এসছেন সাতবার।
মায়া বাড়ি ফিরেছে দশবার। প্রত্যেকবার এয়ারপোর্টে এসছেন সুবল। তেত্রিশবার, কারণ প্রথমবার দুজনে একসাথে গেছিলেন । ভীষণ আনন্দ করে মেয়ের খবর সবাইকে দেন সুবল । বরফ অনেকটাই গলেছে,
কারণ অভিবাসী মায়া বুঝছে কীভাবে সিটিজেন আর গ্রীন কার্ড হোল্ডারদের অদৃশ্য একটা কোটা কাজ করে এখানে। যে যতই মেধাবী হোক, ভিসা হোল্ডাররা বরাবরই তিন নম্বর স্থানে।
এরই মাঝে তিনটে ঘটনা ঘটে গেলো । একটা ভারতে। একটা আমেরিকায় । একটা মায়ার মনে।
ভারতের ঘটনাটা তেমন কিছু ছিলো না এই ক’দিন আগেও। তবে ইদানিং সেটা মহার্ঘ। ডাক্তার সুবল মুর্মু আমেরিকার বি ওয়ান বি টু ভিসা পেলেন। যদিও অফিসিয়াল কারণ নর্থ আমেরিকান অ্যানুয়াল অর্থোপেডিক কন্ফারেন্সে পেপার প্রেজেন্টেশন, আসল কারণ জানেন সুচিত্রা। ছানাহীন ঘরে মেয়ের জন্য মন-কেমন । এমপ্টি নেস্টার সিনড্রোম।
আমেরিকার ঘটনাটির নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প।
‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন’ যে আদপে ‘থ্রো দা মাইগ্রান্টস আউট’ , সে ব্যাপারে ঢাক ঢাক গুড় গুড় কিছু নেই তাঁর। তিনি কাঁকড় আর চাল তফাৎ করেন না, মেধাবী আইনত ভিসা হোল্ডার আর বেআইনি অনুপ্রবেশকারী তাঁর কাছে প্রায় সমান, দ্বিতীয়টাতে ICE আর প্রথমটাতে সরকারি প্রক্রিয়ার জটিলিকরন ও বিলম্বিকরন কাজে লাগিয়ে তিনি কুড়ুলে নিজের পা মারতে ব্যস্ত। তবে সেই কুড়ুলের ধারে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হচ্ছে বহুজনের আজন্ম শ্রমে অর্জিত বৈধ স্বপ্নরা।
তিননম্বরটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মায়াকে বিষাদরোগে ধরেছে। একা একা থাকলে তার ভয় করে। সিয়াটলে প্রায় সর্বক্ষণই মেঘ, আবহাওয়ায় বিষণ্ণতা লেগে থাকে । মায়া জোরে টি ভি চালিয়ে রাখে কিন্তু ওর অ্যাপার্টমেন্টে রাত দশটা থেকে সকাল ছটা অবধি ‘কোয়ায়েট আওয়ার’ । মায়া ওর দেশি ও বিদেশী বন্ধুদের বাড়ি যায়, কিন্তু ওদেশে ‘আড্ডা দেওয়া’ ও খুব মেপে । মায়া ডেটিং সাইটে এনরোল করে, প্রথম ডেটের পরে আর এগোয় না। মায়ার মাঝে মাঝেই মরে যেতে ইচ্ছে করে ।
এ সমস্তই সুচিত্রাকে উজার করে দেয় মায়া ভিডিও কলে, প্রায় প্রতিদিন। ক্যামেরার আড়াল থেকে একজন শোনে । রবীন্দ্রনাথ বাদ দিয়ে শোনে। রবীন্দ্রনাথ আঁকড়িয়ে ভাবে।
এরই মাঝে একটা ঘটনা ঘটে যায়। এক প্রসূতির বাড়িতে গিয়ে হঠাৎ মৃত্যু হয় । পরিবার প্রভাবশালী। ক্রেতা সুরক্ষার সাথে ক্রিমিনাল কোর্টেও মামলা ওঠে। জজসাহেবা সংশ্লিষ্ট ডাক্তারদের পাসপোর্ট জমা রাখতে বলেন কাছের থানায় ।
এর কয়েকদিন পরে, ডাক্তার সুবল মুর্মু কলকাতা থেকে মুম্বাই দোহা হয়ে সিয়াটল পৌঁছান। মায়ার অ্যাপার্টমেন্টের সামনে যখন ফোন বাজালেন, সেদিন রবির দুপুর। মেয়ে অবশ্য আগের থেকেই মায়ের কাছ থেকে খবর পেয়েছিলো। নিচে গিয়ে বাপকে নিয়ে আসতে দেরি হলো না। আর.. আর প্রথমবার ঝাপসা চোখে এক প্রৌঢ় বাবা জড়িয়ে ধরে তার মেয়েকে। বরফ গলতে থাকে।
। ৬।
তোর জি পি কী বলেছে?
‘একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যেতে।’
‘গেছিস? ‘
‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে তিন মাস’
‘যাচ্ছেতাই। সাধে এ দেশটাকে অপছন্দ করি!
তুই গান শুনিস আর? ‘
‘নাহ! ওটিটি দেখি।’
‘আজ শুনবি। পিংক ফ্লয়েড। আমাকে বোঝাবি’
‘হি হি! তুমি রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কিছু শোনো?’
‘মেয়ের ভালো লাগলে শুনবো।’
‘বেশ.. চালাচ্ছি।’
সুবল শোনেন পাশ্চাত্য সঙ্গীত। মেয়ে ব্যাখ্যা করে দেয়। খারাপ লাগে না। দুজনে গান শুনতে শুনতে অনেকটা রাত হয়।
‘কাল কটায় বেরোবি?’
’আটটায়। মা থাকলে গরম ব্রেকফাস্ট পেতাম’
‘পাঁউরুটি আছে? ‘
ওই তো .. দাঁড়া তোর ফ্রিজে কী আছে দেখি।’
পরদিন সকালে মায়া উঠে দ্যাখে পাঁউরুটি টোস্ট করে মধ্যে অ্যাভাকাডো আর টার্কি ব্রেস্ট দিয়ে অপটু স্যান্ডউইচ তৈরি।
‘ মন্দ হয়নি কিন্তু বাবা। জীবনে প্রথম?’
‘দ্বিতীয়। আসার আগে তোর মা’কে খাইয়েছি, অবশ্য এসব দিয়ে না, মাঝখানে আলুসেদ্ধ গোল মরিচ নুন আর ভাজা পেঁয়াজ দিয়ে।
হাহা করে হেসে ওঠে মায়া। অনেক অনেকদিন বাদে, একটা ছায়া যেন সরে যাচ্ছে।
‘বাবা! আর একটা কথা! কমোডটার ঢাকনা তুলে রেখেছো! মা কতবার শেখালো তোমায়! মেয়েরা ওই প্লাস্টিকটার ওপরে বসে তো!’
এঃ হে! পরের বার ঠিক করে রাখবো। শোন, কখন ফিরবি?’
তিনটে নাগাদ। কেন গো?
রান্না করবো ।
রান্না! তুমি! কবে শিখলে।
তোর মা আর ইউ টিউব আছে। একটা ক্রেডিট কার্ড রেখে যা, আমারটা যদি না চলে! বাজার কত দূরে?
এখানে বাজার না গো! সব একসাথে পাওয়া যায়। হাঁটা পথে ট্রেডার্স জো’ আছে। পাইকিরি হলে কস্ট কো। রইলো কার্ড’।
সেদিন দুপুরে বেকড সামন আর মাশরুম।
রান্নায় অপটু সুবল বেশ প্রস্তুতি নিয়েছেন বোঝা যাচ্ছে।
মন্দ নয়, আর একটু নুন হবে।
হয়ে যাবে। চল রাতে খিচুড়ি করবো ।
আর শোন, আজ একটা তোর গান আমাকে বোঝাবি, আর একটা আমার গান তুই বুঝবি।
ডিল?
ডিল!
মায়া সেদিন রাতে তারই নামের গান শোনে ।
মায়াবনবিহারিনী হরিণী… কেন তারে ধরিবারে করি পণ. . অকারণ..
মায়ার মনে হয় যেন এই আমেরিকার অলীক অধরা স্বপ্নের কথা বহুযুগ আগে কেউ লিখে গেছেন।
ঘুমাতে যাওয়ার আগে আবার মায়া হুংকার ছাড়ে ‘বাবা! কমোডের ঢাকনাটা আবার তোলা!’
পাশের ঘর থেকে আওয়াজ আসে ‘ এঃ হে হে!’
পরের তিন সপ্তাহে সুবল প্রেমে পড়েন তিননম্বর বার। এবার ওয়েস্টার্ন গানের সাথে।
আর মায়া… যা ও কখনো ভাবেনি.. এক বুড়ো দাড়িওয়ালা কবিকে ভালোবাসতে শেখে।
তিনটে সপ্তাহ পর সুবলের ফেরার পালা। এর মধ্যে সাইকিয়াট্রিস্ট অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করা হয়েছে। তিন মাস নয়, আগামী সপ্তাহেই।
তবে মায়া এখন আর অতটা বিষাদের প্রকোপে নেই।
এয়ারপোর্টে বাবাকে ছাড়তে এসেছে মেয়ে। নেমে সুবল বলে দিলেন, ‘তিনদিনের মতো রান্না করে রেখে এসছি কিন্তু। না খেয়ে অফিস যাবি না’
‘ইউ হ্যাভ ইমপ্রুভড বাবা। মা উইল বি ইমপ্রেসড’
‘থাক! একটা ছেলে জোগাড় কর এখানে। নাকি মেয়ে!’ হা হা করে হেসে ওঠেন সুবল।
ধ্যাৎ! বলে হেসে ওঠে মায়াও।
বাড়ি ফেরে একরাশ মনখারাপ নিয়ে মায়া। টেবিলের ওপর রাখা একটা বই। দূর থেকে না দেখেও মায়া জানে ওটা কী। সঞ্চয়িতা।
বাথরুম যায় মায়া। কমোডের ঢাকনাটা ..তোলা।
ফিক করে হেসে ফেলে সে।
মায়া-বন-বিহারিনী মুর্মুর আর একা লাগছে না। একটুও না।









