Skip to content
Facebook Twitter Google-plus Youtube Microphone
  • Home
  • About Us
  • Contact Us
Menu
  • Home
  • About Us
  • Contact Us
Swasthyer Britte Archive
Search
Generic filters
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Menu
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Menu
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Search
Generic filters

অস্থির সময়, সংকটে মানব সমাজ, পথ কি? 

Oplus_16908288
Bappaditya Roy

Bappaditya Roy

Doctor and Essayist
My Other Posts
  • June 5, 2025
  • 6:31 am
  • No Comments

কথারম্ভঃ প্রকৃতির নিয়মে এবং বিজ্ঞানের ব্যাখ্যায় সব কিছুই পরিবর্তনশীল। জড় ও জীব জগতে সময়, পরিবেশ, পরিস্থিতি, বস্তুর গঠন ইত্যাদির কারণে আবার পরিবর্তনেও রকমফের। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এবং মানব সমাজের ক্ষেত্রেও। এবার এই পরিবর্তনগুলি কোন দেশ বা কোন অঞ্চলের কোন মানবগোষ্ঠীর কাছে বিভিন্ন স্তরের ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক কিংবা মিশ্র হতে পারে। আবার মানুষের ভূমিকা এই পরিবর্তন গুলিকে ত্বরান্বিত অথবা মন্দীভূত করতে পারে। একবিংশ শতাব্দীর এক চতুর্থাংশে পৌঁছে মানবসমাজকে এটি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু কোন একটি বস্তুকে যদি আবহমানকাল ধরে একইরকম থেকে যাবে ভেবে রাখা হয় তাহলে ধাক্কা খেতে হবে। একটি জ্বলন্ত উদাহরণ দিয়ে শুরু করি।

আমাদের রাজ্যে কথা প্রসঙ্গে খুব গুরুত্ব দিয়ে বাম ও ডান বা দক্ষিনপন্থা কথা দুটি আলোচনা হয়। ১৭৮৯ এর ফরাসি বিপ্লবের সময় ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে সাধারণতন্ত্রের সমর্থকরা কক্ষের বামদিকে এবং রাজতন্ত্রীরা ডান দিকে বসতেন সেই থেকে এর উৎপত্তি। তারপর আড়াইশো বছর ধরে এর অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। বিভিন্ন জাতি রাষ্ট্রের সংসদে বসার বিভিন্ন ব্যাবস্থা হয়েছে। রাজতন্ত্রী পরিবর্তিত পুঁজিবাদীরা তাদের এগোনর পথে এবং বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায়, বিশেষত ১৯২৯ থেকে ‘৩৯ অবধি মহামন্দায়, সাধারণতন্ত্রী পরিবর্তিত সমাজতন্ত্রীদের বহু পথ ও চিন্তা গ্রহণ করেছেন। মানব সূচকে সবচাইতে এগিয়ে থাকা উত্তর ইউরোপের নরডিক দেশগুলি, পশ্চিম ইউরোপের ধনাঢ্য দেশগুলি, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা প্রভৃতি দেশ সকলের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক অধিকার, বয়স্ক – প্রতিবন্ধী – জনজাতি – আর্থিকভাবে পশ্চাদপদদের রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রভৃতির ব্যবস্থা করেছে। সেই দেশগুলিতে লিঙ্গ বৈষম্য কমে মহিলারা সমাজ, সংগঠন এবং সরকারের শীর্ষে পৌঁছে গেছেন। আবার রাশিয়া, চিন, ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া, কিউবা প্রভৃতি সমাজতান্ত্রিক দেশে দেখা গেছে সামন্ত – রাজতন্ত্রের মত এক ব্যক্তি (স্তালিন, হো চি মিন, মাও, টিটো, হোজা, কাস্ত্রো, শি জিনপিং) বা এক পরিবারের (কিম পরিবার) অধীনে একদলীয় কমিউনিস্ট দলের কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং কমিউনিস্ট দলগুলিতে দেখা গেছে প্রভাবশালী জাতি বা জাতের প্রাধান্য (চিনে হান; ভারতে ব্রাহ্মণ ইত্যাদি) এবং নারীর অবদমন। রাশিয়া, চিন, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশে শতাধিক বছরের প্রাচীন দলে এমনকি ভারত সহ অন্যান্য দেশের দলগুলিতে কোন নারী এবং পশ্চাদপদ জাতির সাধারণ সম্পাদক দেখতে পাবেন না। পলিটব্যুরো, কেন্দ্রিয় কমিটি এবং সরকারেও তাদের সংখ্যা শূন্য অথবা নগন্য (পেরুর ‘সাইনিং পাথ’ ছাড়া)।কিন্তু এই সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির মধ্যে যারা টিকে গেছেন এবং এগিয়ে চলেছেন সেই চিন ও ভিয়েতনাম কিন্তু সামাজিক সংস্কার, অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা প্রভৃতি ক্ষেত্রে পুঁজিবাদী পথকেই আঁকড়ে ধরেছে।

সুতরাং শুধুমাত্র কোন নির্দিষ্ট খাপের কোন রাষ্ট্র ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারেনি। টিকে থাকতে তাকে পরিবেশ পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে তেমনি নিজেকেও পরিবর্তন করতে হয়েছে। অন্যদিকে অনবরত ভাঙ্গাগড়ার মধ্যে দিয়ে প্রতিনিয়ত যেমন নতুন নতুন জাতি রাষ্ট্র, ইসলামি ধর্মীয় রাষ্ট্র গড়ে উঠছে, সেরকমই উপস্থিত রাষ্ট্র ও তাদের ব্যবস্থাপনাগুলিও ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়ে চলেছে (জারের সামন্ততান্ত্রিক রাশিয়া থেকে স্তালিন – ব্রেজনেভের সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে গরবাচভের গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রইকা এবং ইয়েলতসিনের বুর্জোয়া অভ্যুত্থান ঘুরে পুতিনের পুঁজিবাদী রাশিয়া)।

কথার বিস্তারঃ  আহার, শিকার, পানীয় জল, নিরাপদ গুহা বা বাসস্থান, যৌন সঙ্গী, মূল্যবান ধাতু, উন্নত অস্ত্র, পশম বস্ত্র, নারী সম্পদ, পশু সম্পদ, কৃষি জমি ও চারণ ভূমি, খনি, ঝর্না, শ্রম দাস, গোষ্ঠী প্রভৃতির কর্তৃত্ব ইত্যাদি নিয়ে জনগোষ্ঠী এবং ব্যক্তি স্তরে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ আদিমকাল থেকে। প্রাচীন যুগে সংগঠিত রাজতন্ত্র গড়ে ওঠার পর অন্য রাজ্যের অর্থ, নারী ও দাস সম্পদ এবং ভূমি দখল নিয়ে হানাহানি ও যুদ্ধ অনবরত। যার পরিণামে নতুন নতুন রাজ্যের সৃষ্টি, ছোট ও দুর্বল রাজ্যগুলিকে বড় ও শক্তিশালী রাজ্যগুলি কর্তৃক গ্রাস। এভাবে জম্বু দ্বীপ বা ভারতভুমি, চিন, পারস্য, ব্যবিলন, মিশর, গ্রিস, রোম প্রভৃতি প্রাচীন সভ্যতার অঞ্চলগুলিতে বড় বড় শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে এবং আরও সম্পদ ও ক্ষমতার লোভে বড় বড় সামরিক আভিযান এমনকি অন্য মহাদেশেও ঘটতে থাকে। ম্যাসিডনিয়ার সম্রাট আলেকজান্ডার তার সেনাবাহিনী নিয়ে এশিয়া মাইনর, মধ্য এশিয়া, পারস্য ও সিন্ধু জয় করে পাঞ্জাব সীমান্ত অবধি পৌঁছে যান। রোমান সম্রাটরা গল ও ব্রিটানিয়া দখল করে মিশর এবং উত্তর আফ্রিকায় বড় বড় অভিযান চালান। সেই  সময় স্থল ও অশ্বারোহী বাহিনী (ভারতে ঐরাবত বাহিনী) ছাড়াও নৌবাহিনী যুক্ত হয়। এছাড়া প্রাচীনকাল থেকেই স্থল ও নৌ পথে বিভিন্ন মহাদেশের মধ্যে বাণিজ্য চলত।

এতদসত্ত্বেও পৃথিবীর বেশিরভাগ জায়গা ছিল অনাঘ্রাত। মধ্যযুগে রাজতন্ত্রের তাত্বিক – আধ্যত্মিক ভিত্তিকে পোক্ত করতে সংগঠিত ধর্মের সৃষ্টি। প্রকৃতিবাদী আজীবক, যুক্তিবাদী চার্বাক, জনপ্রিয় লোকায়ত, মানবতাবাদী জৈন, বৌদ্ধ প্রভৃতি দর্শন গুলি হটিয়ে দিয়ে ভারতভূমিতে ব্রাহ্মন্যবাদী হিন্দু ধর্ম; জুরথ্রস্ত, ইহুদি, সাবেয়ান – মেন্দিয়ান, ইয়েজেদি ধর্মকে হটিয়ে মধ্য এশিয়ায় ইসলাম এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক বহু ঈশ্বরবাদ, পাগান, হুসাইট  প্রভৃতি ধর্মকে হটিয়ে রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্ম ইউরোপে জাঁকিয়ে বসে। ভারতভুমিতে জাতিভেদ ও ব্রাহ্মণ্য পুরোহিত তন্ত্রকে নির্মূল এবং ইসলামি আগ্রাসন কে প্রতিহত করতে না পারলেও ভক্তি ও সুফি আন্দোলন পুরো উপমহাদেশ জুড়ে একটি উদারতাবাদী প্রবাহ সৃষ্টি করে। মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ায় ইসলাম যে গ্রিক জ্ঞান ভাণ্ডারের পরম্পরাকে ধরে রেখেছিল  মোঙ্গল আক্রমণ এবং বিভিন্ন মৌলবাদী ইসলামি গোষ্ঠীর ক্ষমতা দখলের পর উগ্র ধর্মান্ধতা, নৃশংস বর্বরতা, নারী ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি বিদ্বেষ এবং হিংসার ব্যাপ্তি ঘটায়। আর বহু জ্ঞানী বিজ্ঞানীর ঐকান্তিক উদ্যোগ ও আহুতির মাধ্যমে চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে রেনেসাঁর উদ্ভাসনের আগে ৯০০ বছর ভ্যাটিকানের পোপের নেতৃত্বে রোমান ক্যাথলিক চার্চ ইউরোপকে অন্ধকার আর অত্যাচারে নিমজ্জিত রেখেছিল। এর মধ্যে পবিত্র জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে খ্রিস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে আটটি ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ হয়ে গেছে, হয়ে গেছে স্পেন থেকে মুরদের বিতাড়ন রিকনকুইস্টা।

Oplus_16908288

এরপর ইউরোপের অন্বেষণ ও অগ্রগতির সূচনা। সেইসময় পর্যটক ও বণিকদের কাছ থেকে চিন, ভারত, পারস্য বিশেষ করে ভারতের অতুল ঐশ্বর্যর কথা শুনে এবং সেখানকার অতি সূক্ষ্ম বস্ত্র, স্বাদু মশলা, দামি রত্ন ইত্যাদি দেখে ইউরোপীয়রা ভারত জয়ের স্বপ্ন দেখত। ইউরোপীয় রাজতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় আরব বণিক ও দস্যুদের এড়িয়ে সমুদ্রপথে ভারত পৌঁছনর একের পর এক অভিযান শুরু হয়। যার পরিণতি ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে কলম্বাসের আমেরিকা মহাদেশে এবং ১৪৯৭ তে ভাস্ক ডা গামার ভারতের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলে পদার্পণ। এইভাবে স্প্যানিয়ারডস ও পর্তুগিজরা মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা দখল করে ওখানকার প্রাচীন মায়া, অ্যাজটেক, ইনকা প্রমুখ সভ্যতাগুলি ধ্বংস করে লুঠপাট এবং স্থানীয় জনজাতিদের অত্যাচার শুরু করে। ভারতে একে একে পৌঁছয় ওলন্দাজ, ড্যানিশ, বেলজিয়ান, ফ্রেঞ্চ ও ব্রিটিশরা। অন্যদের পরাজিত করে  বণিকের ছদ্মবেশে ক্রমে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশ দখল করে নেয়। প্রথমে জনজাতি, তারপর ওলন্দাজ ও ফ্রেঞ্চদের পরাজিত করে তারা উত্তর আমেরিকার অবারিত ভূমিও দখল করে নেয়। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা একে একে পৃথিবীর সমস্ত প্রান্তে পৌঁছে গিয়ে তাদের দখলদারি কায়েম করে এবং লুঠ, শোষণ ও পীড়ন চালাতে থাকে। প্রথমে ইংল্যান্ডে তারপর জার্মানি এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ অবধি ঘটে যাওয়া শিল্প বিপ্লবজাত আবিষ্কার ও প্রকৌশলগুলি তাদের সহায়ক হয়। অন্যদিকে তাদের দেশের শিল্পের প্রয়োজনে সস্তা কাঁচামাল সংগ্রহ, আবার শিল্পজাত উৎপাদনগুলির বিক্রির জন্য বাজারের প্রয়োজনে বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিক নিগড়কে দৃঢ় করা হয়।

সেইসময় থেকে সামরিক বলে বলীয়ান ব্রিটেন হয়ে যায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ শক্তি এবং উপনিবেশগুলিকে বিশেষ করে প্রাচ্যের অতুল ঐশ্বর্যের দেশ ভারতকে লুঠ করে তারা হয়ে ওঠে সবচাইতে ধনী দেশ। দীর্ঘ যুদ্ধের পর শ্বেতাঙ্গ শাসিত উপনিবেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৭৭৬ এ স্বাধীন হয়ে গেলেও ১৯১৪ – ‘১৮ তে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অবধি ব্রিটেনের নেতৃত্বে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা দুনিয়া জুড়ে কর্তৃত্ব করতে থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেন ও ফ্রান্স এবং ব্রিটেন সহযোগী অ্যাংলো – স্যাক্সন শাসিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে মিত্র শক্তি জার্মানি, অস্ট্র – হাঙ্গেরিয়া, অটোমান তুর্ক দের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্র শক্তিকে পরাজিত হয়। দুনিয়া জুড়ে উপনিবেশ এবং খনিজ তেল সহ সম্পদগুলি ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্র ভাগ ও দখল করে নেয়। সেই থেকে তাদের আরও রমরমা। প্রথম শিল্প বিপ্লবে শক্তি হিসাবে জলীয় ও বাষ্পীয় শক্তির উদ্ভাবন ও ব্যাবহার, ১৮৬০ – ‘৭০ এর দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যাবহার, অন্যান্য আধুনিক যন্ত্রের সঙ্গে ১৯০৩ এ বিমান আবিষ্কার, ১৯৩০ এ পারমাণবিক শক্তির আবিষ্কার – বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে উল্লম্ফন এবং সেই সঙ্গে বিশ্ব জুড়ে শিল্পের কাঁচামাল, সস্তা শ্রম ও বাজারের অধিকার এই পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিকে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বর দিক থেকে অনেক এগিয়ে নিয়ে যায়। অন্যদিকে জার্মানিতে একের পর এক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ব্যর্থ হলেও রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব সফল হয়। ইতালিতে ফ্যাসিজম এবং জার্মানিতে নাৎসিবাদের উত্থান ঘটে।

প্রবল শক্তি সঞ্চয় করা হিটলারের নাৎসি জার্মানি, ফ্যাসিস্ট ইতালি এবং সামরিক – রাজতন্ত্রী জাপানের নেতৃত্বে অক্ষ শক্তির সঙ্গে বিশ্ব দখলদারি নিয়ে ব্রিটিশ, ফরাসী ও মার্কিনের নেতৃত্বে মিত্র শক্তির সংঘাত নিয়ে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ (১৯৩৯ – ‘৪৫)। এবারও জিতে মিত্র শক্তি বিশেষত পারমানবিক শক্তিধর মার্কিন সারা পৃথিবীকে কব্জা করে ফেলে। পিছিয়ে থাকা আর্থ – সামাজিক অবস্থা নিয়েও জার্মানিকে নিজের দেশে পরাজিত করে বার্লিন অবধি তাড়া করে প্রতিস্পরধী শক্তি হিসাবে উঠে আসে স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপে দখলদারি নিয়ে তারা বিশ্বজুড়ে মার্কিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়।

কথা শেষ নয়ঃ   সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি পর্যায় অবধি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দিলেও ভঙ্গুর অর্থনীতি, শ্বাসরুদ্ধকর আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি প্রভৃতি কারণে ১৯৯১ তে ভেঙ্গে পড়ে এবং অঙ্গ রাজ্যগুলি স্বাধীন হয়ে যায়। তার পরপরই একই অবস্থা হয় বলকান সমাজতান্ত্রিক যুগোস্লভিয়ার। পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিও পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের পথে পা বাড়ায়। এক বিশ্ব ব্যাবস্থায় শিরোমণি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্ব জুড়ে তার শাসন, শোষণ, লুঠ ও খবরদারি বাড়িয়ে চলে। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা এবং এশিয়ার   দেশগুলিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত কদলী গণতন্ত্র অথবা একনায়কতন্ত্রী সামরিক স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করে। মহামন্দা থেকে ওয়াল স্ট্রিট ধ্বস তারা নিজেরা যে সংকটগুলির সম্মুখীন হয় নানাভাবে সামাল দিয়ে তার নিয়ন্ত্রিত বিশ্বায়িত নবউদার অর্থনীতি  প্রবর্তন করে। এই পর্বে  সারা বিশ্ব থেকে সেরা মস্তিষ্ক ও দক্ষ মানব সম্পদ নিয়ে এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি ঘটিয়ে মহাকাশ থেকে সমুদ্রের অতল পর্যন্ত তার দখলদারি কায়েম করে। এর সঙ্গে কম্পিউটার, ডিজিটাল, অন্তরজাল ও কৃত্রিম মেধা ব্যবস্থা প্রচলন করে সংঘটিত করে পরবর্তী শিল্প ও প্রযুক্তি বিপ্লবগুলি। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে মার্কিন তার কূটনৈতিক, গোয়েন্দা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক থাবা বিস্তার করে এবং তার স্বার্থের পরিপন্থী যে কোন সরকারকে ফেলে পদলেহী সরকার বসায়। ইরানের জনপ্রিয় প্রসিডেন্ট মোহাম্মাদ মাসাদ্দেগ, কঙ্গোর দেশনায়ক প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিক লুলুম্বা, ইন্দোনেশিয়ার প্রজাপ্রিয় প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ এবং চিলির সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট সাল্ ভাদর আলেন্দের অপসারণ কয়েকটি উদাহরণ। ইরানের বিরুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনের ইরাককে, উত্তর আফ্রিকায় গড্ডাফিকে, আফগানিস্তানে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে লাদেনকে, সিরিয়ার বিরুদ্ধে বাগদাদিকে কাজে লাগিয়ে পরে তাদের ধ্বংস ও হত্যা মার্কিনের এই ধরনের কাজের কয়েকটি নজির। সাম্প্রতিক বাংলাদেশে হাসিনা অপসারণেও তাদের ভুমিকা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দেখা গেল সারা বিশ্বের মেধা, বিত্ত আর দক্ষ মানব সম্পদের ঠিকানা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের স্বার্থে এদের সমাবেশিত করছিল। অন্যদিকে মেধাবীরা চলে যাচ্ছিলেন সেখানে উচ্চ শিক্ষা, গবেষণা, বৃত্তি ও সম্মাননার সুযোগের জন্য। বিত্তবানরা চলে যাচ্ছিলেন নিরাপত্তা, উন্নত জীবন যাত্রা, মুক্ত জীবন ও যাবতীয় বিনোদনের ব্যবস্থার কারণে। সুইজারল্যান্ড, লিচেনশটাইন, মোনাকো, সেন্ট মারিনো, প্যারিস, লন্ডন, দুবাই তাদের সাময়িক গন্তব্য হলেও মূল লক্ষ্য মার্কিন নাগরিত্ব এবং সেখানে ‘স্বর্গ সুখে’ নিশ্চিন্ত বসবাস। তৃতীয় বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষেরা সেখানে আইনি বেআইনি পথে পাড়ি জমাচ্ছিলেন প্রচুর আয় ও নিশ্চিন্তের জীবনের জন্য। পাশাপাশি তৃতীয় বিশ্বের যাবতীয় স্বৈরশাসক; দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিক আমলা ও সামরিক অফিসার; মাফিয়া অপরাধী চক্রের মাথাদের পুনর্বাসনের গন্তব্যভূমি ছিল আমেরিকা। কিন্তু কোন কিছুই একরকম বা স্থির থাকেনা। ২০২৪ এর নভেম্বরে শ্বেত জাতিবাদী, বিদেশ থেকে আগতদের থেকে আর্থ সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া সাধারণ মার্কিনী এবং জাপান, চিন, দক্ষিণ কোরিয়া প্রমুখের উত্থানে ধাক্কা খাওয়া শিল্পপতিদের প্রতিনিধি ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে গেল। এখন অভিবাসীদের বিদায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কর্মসূচি।

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, দ্য নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ইতালি প্রভৃতি দেশগুলি নিজেদের প্রয়োজনে উপনিবেশগুলি থেকে প্রচুর পরিমানে শ্রম দাসদের নিয়ে এসেছিল। কয়েক প্রজন্মে তারা বংশ বিস্তার করেন। এছাড়াও প্রাক্তন উপনিবেশ ও অন্যান্য গরীব সমস্যাসঙ্কুল দেশ এমনকি পূর্ব ইউরোপ, বলকান, গ্রিস, তুরস্ক থেকেও সমৃদ্ধ জীবনের টানে প্রচুর মানুষ এই দেশগুলিতে অভিবাসন করেন। কিন্তু পশ্চিম ইউরোপের এই উন্নত ও ধনী দেশগুলিতেও অর্থনৈতিক মন্দা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সংকট সৃষ্টি হওয়ায় সেখানকার সরকারগুলিও অভিবাসনের উপর কড়াকড়ি করেছে এবং সেই দেশগুলিতেও অভিবাসী বিরোধী আবেগ সৃষ্টি হয়েছে।

আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও ব্রিটিশ দেশ ছাড়ার আগে হিন্দু মুসলিম বিভেদ লাগিয়ে, দাঙ্গা করিয়ে এবং দেশটাকে ভাগ করে জন্মলগ্ন থেকে পঙ্গু করে দিয়েছে। অনেক রক্তগঙ্গা বয়ে যাওয়ার পর শিখ ও হিন্দু অধ্যুষিত ভারতীয় পাঞ্জাবের থেকে মুসলিম অধ্যুষিত পাক পাঞ্জাব আলাদা হলেও সীমান্তের ওপার থেকে সন্ত্রাসবাদ ও ড্রাগ রপ্তানি এবং প্রতিটি যুদ্ধে পাক আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে পাঞ্জাবকে। দাঙ্গা, যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষর মধ্যে বাংলাকেও তখন দুভাগ করে দেওয়া হয়। কিন্তু বিগত ৮০ বছর ধরে সেখানে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর ক্রমাগত নির্যাতনে কয়েক কোটি শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা, দণ্ডকারণ্য, আন্দামান প্রভৃতি রাজ্যে ও অঞ্চলে প্রাণ হাতে করে চলে আসতে বাধ্য হন। ১৯৭১ এর যুদ্ধে পাক সেনা এবং জামাত – রাজাকার – আল বদর রা ৩০ লক্ষ নাগরিককে হত্যা এবং চার লক্ষ নারীকে ধর্ষণ করে যাদের বেশিরভাগই সংখ্যালঘু হিন্দু। এছাড়াও অর্থনৈতিক কারণে পশ্চিমবঙ্গের অসাধু রাজনীতিক – পুলিশ – প্রশাসন কে হাত করে শতছিদ্র সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের এমনকি মায়ানমারের রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা প্রতিনিয়ত প্রচুর পরিমাণে প্রবেশ করেন।

২০২৪ এর তথাকথিত জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশে ভারত বিরোধী সরকার এবং বাংলাদেশ জুড়ে ইসলামি মৌলবাদী ও জেহাদিদের কার্যকলাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বাংলাদেশের মাটিতে মার্কিন, চিন, পাকিস্তান, তুরস্ক, কাতার, সৌদি আরব প্রভৃতি দেশ তৎপরতা বৃদ্ধি করায় ভারতের পূর্ব সীমান্তও অশান্ত হয়ে উঠেছে। মণিপুরে মেইতে – কুকি বিবাদ জনিত গৃহযুদ্ধের এখনও মীমাংসা হয়নি। দেশের মধ্যভাগে নিরাপত্তা বাহিনী – মাওবাদী যুদ্ধে দরিদ্র জনজাতিরা ক্ষতিগ্রস্ত ও উৎখাত হচ্ছেন। ছটা পাক – ভারত যুদ্ধ, একটি চিন – ভারত যুদ্ধ এবং অসংখ্য সীমান্ত সংঘর্ষের পরও কাশ্মীর সমস্যার আজও সমাধান হয়নি। কাশ্মীরের এক তৃতীয়াংশ পাকিস্তানের, এক পঞ্চমাংশ চিনের এবং বাকিটা ভারতের অধিকারে রয়েছে। আকসাই চিনের পর লাদাখের কিছু অংশ চিন নতুন করে অধিকার করে নিয়েছে। আর সমগ্র কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে জঙ্গি ও নিরাপত্তার দাপাদাপি। ১৪৩ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে জাতিভেদ, শিল্প কৃষি পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের সমস্যা, আর্থিক বৈষম্য, অশিক্ষা ও স্বাস্থ্যহীনতা, খনিজ তেলের অভাব বহু সমস্যার মধ্যে ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা এক প্রধান ও জ্বলন্ত সমস্যা।

ভারতীয় দর্শনের পরিণতিঃ    মহামতী আম্বেদকরের একটি বিখ্যাত উক্তি আছেঃ ” মহাত্মারা এসেছেন এবং চলে গেছেন, কিন্তু অস্পৃশ্যরা অস্পৃশ্যই থেকে গেছেন।” বিশ্ব জুড়ে বহু মতবাদ এসেছে গেছে, কিন্তু সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে চলে আসা ‘জোর যার মুলুক তার’ নীতিই থেকে গেছে। শুধু ব্যাক্তির শারীরিক জোরের জায়গায় এসেছে ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির জোর। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থের জোর।

প্রাচীন ভারতের অবৈদিক – অনৈতিকতাবাদী, নিয়তিবাদী, শাশ্বতবাদী, অজ্ঞেয়বাদী আজীবক দর্শন; বস্তুবাদী চার্বাক দর্শন; নিরীশ্বর ও বহুত্ববাদী জৈন দর্শন; অনিত্য, অনাত্মা ও অভৌতিকবাদী বৌদ্ধ দর্শন; প্রকৃতিবাদী লোকায়ত দর্শন ব্যাক্তি ও গোষ্ঠী মানুষের মন, মানসিকতা, রুচি, সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটালেও সমাজের পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। জৈনদের দিগম্বর অংশ এবং বৌদ্ধদের মহাযান মাধ্যমিক ধারা বিমূর্ততায় আবদ্ধ হয় এবং সার্বিকভাবে ব্রাহ্মন্যবাদী হিন্দু ধর্মের ভাববাদ গ্রাস করে নেয়।

প্রাচীন ভারতের আদি রিগবেদীয় সময়ের প্রকৃতিবাদ; আরুনির বিজ্ঞান চিন্তা; ন্যায় বৈশেষিক ও সাংখ্যের বস্তুবাদ; ১০৮ টি উপনিষদের মধ্যে প্রধান ১২ টি উপনিষদের আধ্যাত্মবাদ ব্যাক্তি ও গোষ্ঠী মানুষের মুক্ত চিন্তার সম্ভবনা সৃষ্টি করলেও সমাজের পরিবর্তন করতে পারেনি। বরং পরবর্তী বেদ, বেদান্ত ও ষড় দর্শনে ভাববাদী এবং বিধি – নিষেধ ও আচার – অনুষ্ঠান সর্বস্ব পরিবর্তন; যাগ্মবল্ক্য, মনু, বদ্রায়ন প্রমুখের গোঁড়ামিবাদ এবং নারী ও শূদ্র বিরোধী বিধান; ব্রহ্মসুত্র প্রমুখ পুরোহিতকেন্দ্রিক ও গীতা প্রমুখ ভাববাদী ধর্মগ্রন্থ; শঙ্করাচার্য প্রমুখের নেতৃত্বে ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনরুত্থান অমিত সম্ভবনাময় এক আকর দর্শনকে এক আচার ও বাহুল্য সর্বস্ব গোঁড়া ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ধর্মে পরিবর্তিত করে।

ইসলাম ধর্মের সারল্য, সাম্য, ভ্রাতৃবোধ এবং সকল নিপীড়িত কে আশ্রয় দান ব্যাপক মানুষকে আকৃষ্ট করলেও পরবর্তীতে আরব, তুর্কি ও মোঙ্গল সামন্ত আধিপত্যবাদ; পশ্চাদপদ কবিল ও বেদুইন সংস্কৃতি; রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল, হিংসা, হানাহানি ও যুদ্ধের সঙ্গে ধর্মের সংপৃক্ত হয়ে পড়া; মুতাজিলা, সুফি প্রমুখ উদার দার্শনিক ধারাকে দমন করে শিয়া এবং সুন্নি ধারার কট্টর ওয়াহাবি, হানাফি, সালাফি, দেওবন্দি প্রভৃতি ধারার প্রাধান্য এবং তাদের ধর্মযুদ্ধ তত্ত্ব; ক্রমশ ধনী, সামন্ত, সুলতান, ধর্মগুরু, এককথায় আসরফ শ্রেণীর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রিভুত হয়ে পড়ায় এবং পিতৃতান্ত্রিক অবস্থান নেওয়ায় এর অমিত সম্ভবনাও এক এককেন্দ্রিক সঙ্কীর্ণ ধর্মান্ধতার দিকে ধাবিত হয়। জনজীবনের আর্থ – সামাজিক পরিবর্তন অধরাই থাকে এবং শ্রমজীবী পসমন্দাদের দারিদ্র মোচন হয়না। শিখ, ইহুদী এই ধর্ম গুলি নির্দিষ্ট স্বতন্ত্র গোষ্ঠীকে সংগঠিত করে সামাজিক অবস্থান বদলাতে সাহায্য করলেও বিভিন্ন বিভাজন এবং ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতা থেকেই যায়। বৃহত্তর সমাজ পরিবর্তন কার্যকর হয়না। মধ্য যুগের জনপ্রিয় ভক্তি আন্দোলনের সঙ্গে সুফি আন্দোলন উদারতাবাদের একটি আবহ সৃষ্টি করলেও অন্তিমে হিন্দুত্বের ভাববাদ এবং ইসলামি মৌলবাদ এদের আত্মসাৎ করে। জাতিভেদ ও বৈষম্যের অবসান এবং সমাজ পরিবর্তন স্বপ্নই থেকে যায়।

দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন সমাজের অধিপতি এবং পুরোহিতদের নিযুক্ত ধর্মতাত্বিকরা তাদের সহযোগী দর্শনগুলিকে একটি সুবিধাজনক আচার বিধির শক্ত ধাচায় নিয়ে আসতে এবং সেগুলি সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে গেঁথে অন্ধবিশ্বাসে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন। অন্যদিকে ধর্ম বঞ্চিত, শোষিত, নিপীড়িত সাধারণ মানুষের ব্যথা বেদনা সঁপে দেওয়ার আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে।

আধুনিক ভারতের দর্শনগুলির সীমাবদ্ধতাঃ আধুনিক ভারতে যে দর্শন ও চিন্তাগুলি প্রভাব ফেলেছিল সেগুলি নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করি।

গান্ধীবাদ হল মহাত্মা গান্ধী প্রণীত ভারতীয় জৈন ও বৈষ্ণব সাধনা সহ কিছু পাশ্চাত্যের নীতি ও সাধারণ কেন্দ্রিক চিন্তাধারার সমাহার। অহিংসা, সত্য ভাষণ, সরবোদয় ও সত্যাগ্রহ এর প্রধান ভিত্তি। এতে গীতার ধর্মীয় ব্যাখ্যায় প্রাধান্য পায় মানুষের অন্তর, সমমূল্য ও বিবেক বুদ্ধি। স্বাধীনতার সংজ্ঞা রাজনৈতিক এবং আধ্যাত্মিক মুক্তি। সংগ্রামের পথ প্রেম, ত্যাগ এবং দুঃখ বরণ। কল্পনায় রাম রাজ্য। এই মতবাদের বৈশিষ্ট্য গ্রামকেন্দ্রিক অনাড়ম্বর আশ্রমিক জীবন, পল্লী গঠন, কুটির শিল্পের উন্নতি ইত্যাদি। গান্ধীবাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রণেতারা হলেন রাজা গোপালাচারী, বিনোবা ভাবে, কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়, গফফর খান, প্রফুল্ল সেন, বাবা আমতে, ইলা ভাট প্রমুখ। একটি পর্যায়ে গান্ধীবাদের সারল্য ও ভারতীয় পরম্পরা সাধারণ মানুষকে প্রবল আকর্ষণ করে। কিন্তু এর পশ্চাদমুখী চিন্তা, ঔপনিবেসিকতাবাদের সঙ্গে আপোষ, গান্ধী বাবার পিছনে ভিড় করা বহু শিল্পপতি ব্যাবসায়ী কালোবাজারির শোষণ ও লুঠ, গান্ধীর নিজের বিড়লার গৃহে থাকা, দুর্ভিক্ষ – দাঙ্গা – দেশভাগ কিছুই প্রতিহত করতে না পারা প্রভৃতি বিষয় এর প্রাসঙ্গিকতাকে লঘু করে দেয়।

ভারতীয় সমাজবাদ এর ক্ষেত্রে নারী – পুরুষ সমান অধিকার; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জাতিগত বৈষম্যের নিরসন; জাতিভেদ ব্যাবস্থার অবসান; পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় পুঁজির শিল্পস্থাপন; বিদেশি আধিপত্যের অবসান; ব্যাক্তিগত ও নাগরিক স্বাধীনতা; অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলন ইত্যাদি মতাদর্শ ভারতের মাটিতে বিশেষ করে হিন্দি বলয়ে দৃঢ় ভিত্তি অর্জন করেছিল। উত্তাল কৃষক, স্বাধীনতা ও শ্রমিক আন্দোলন থেকে উঠে এসেছিলেন এর নেতৃত্ব ও রুপকাররা। জয়প্রকাশ নারায়ন, নরেন্দ্র দেব, থানু পিল্লাই, রামবৃক্ষ বেনিপুরি, মিনু মাসানি, আশোক মেহতা, বাসয়ান সিনহা, অরুণা আসফ আলি, জর্জ ফারনান্ডেজ এবং অবশ্যই রাম মনোহর লোহিয়া। সতীনাথ ভাদুরি, ফণীশ্বর রেণু প্রমুখরা লিখে গেছেন এর সৃজনশীল আখ্যান। কিন্তু পরবর্তীতে উত্তরসূরিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও বিভাজন, সমাজবাদী সরকার ও নেতৃত্বের কুশাসন ও দুর্নীতি এবং সর্বোপরি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জাগরণ তাদের শিকড় আলগা করে দেয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রাশিয়ায় সফল বলশেভিক বিপ্লব এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চিনের সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ভারতীয় রাজনীতিকদের একাংশকে মার্ক্সবাদ এর প্রতি আকৃষ্ট করে যদিও প্রথম থেকেই মার্ক্সবাদীদের বিভিন্ন মত ও পথ নিয়ে মতান্তর ছিল। হেগেলের ভাববাদী দর্শন ও ফয়েরবাখের বিশুদ্ধ বস্তুবাদী দর্শন নস্যাৎ করে মার্ক্স – এঙ্গেলস এর দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দর্শন তার তিনটি অঙ্গ দ্বন্দ্বতত্ত্ব (বিপরীতের ঐক্য ও সংগ্রাম), বস্তুবাদ ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মাধ্যমে সবকিছু ব্যাখ্যার আধুনিক দৃষ্টিকোণ অর্জন করলেও বর্তমান যুগে শ্রমিক মানেই সর্বহারা শ্রেণী, তাদের অবিরত শ্রেণী সংগ্রাম এবং সাম্যবাদ প্রবর্তনের প্রচেষ্টা বাস্তব চিত্র নয়। ‘মানুষ যতটা পারবে দেবে আর যেটুকু প্রয়োজন সেটুকুই নেবে’ এই তত্ব্ব কল্পরাজ্য বা ইউটোপিয়া থেকে গেছে। বরং ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’ নীতি সর্বত্র চোখে পড়ে। মার্ক্স সাহেবের জন্মের পর ২০০ বছরের বেশি অতিক্রান্ত, পৃথিবীর কোথাও কোন সাম্যবাদী সমাজ স্থাপিত হয়নি। বিপরীতে সোভিয়েত ইউনিয়ন বা ইউএসএসআর, যুগোস্লাভিয়া, পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি সমাজতন্ত্র ত্যাগ করে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। একদলীয় শাসন কায়েম রেখে চিন ও ভিয়েতনাম পুঁজিবাদী পথে উন্নতি সাধনায় ব্যস্ত। এই বিশ্ব ব্যাবস্থায় টিকে থাকতে সসংকোচে তাদের অনুসরণ করছে কিউবা, কম্বোডিয়া, লাওস, মঙ্গোলিয়া। ভারতে বামপন্থা তার বিভিন্ন স্বরূপ নিয়ে গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক অবধি কিছুটা এগোতে পারলেও ক্রমাগত ত্রুটিপূর্ণ অনুশীলন এবং একের পর এক বিভাজনের ফলে বর্তমানে এক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

Oplus_16908288

অস্থির সময়, সংকটে মানব সমাজ কোন পথে: এই সব কিছুর মধ্য দিয়ে দেশবাসী ও রাজ্যবাসী এক সংকটজনক অবস্থার মধ্যে উপস্থিত হয়েছে। চরম – আর্থিক বৈষম্য, দারিদ্র, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, পরিবেশ দূষণ, নিরাপত্তার অভাব, শিক্ষা স্বাস্থ্য ও গণপরিবহন ব্যাবস্থা ভেঙ্গে পড়া, সংস্কৃতির অবক্ষয়, অশিক্ষিত লুম্পেন মাফিয়া শ্রেণীর ক্ষমতা দখল, ধর্মীয় বিভাজন, জাতি ও সাম্প্রদায়িক হানাহানি, গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারগুলি হারানো, সন্ত্রাসবাদ ও যুদ্ধ প্রভৃতি তাদের ভয়ঙ্করভাবে গ্রাস করেছে। অসহায় তাঁদের পথ দেখানোর কেউ নেই। তাঁদের পথ তাঁদেরই খুঁজে বের করতে হচ্ছে। সারা দুনিয়া জুড়েই। কোন নির্দিষ্ট পথ নেই। যেখানে যেরকম উপযোগী সেরকম পদক্ষেপ। কোথাও নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন, কোথাও বিশাল গণআন্দোলন গড়ে তোলা, কোথাও গণপ্রতিরোধ সৃষ্টি করা, কোথাও বিকল্প শাসন বা ব্যাবস্থা তৈরি করা, কোথাও বা স্রেফ আভিবাসন ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার কোন ক্ষেত্রে হয়ত একাধিক পথের মিশ্রণ।

৩১.০৫.২০২৫

PrevPreviousঊর্মিমুখর: সপ্তম পরিচ্ছেদ
Nextহৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ চেতনায় নজরুল: আলোচনা সভায় তমোনাশ ভট্টাচার্যNext
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

সম্পর্কিত পোস্ট

১৩ এপ্রিল ২০২৬ সুপ্রিম কোর্টের রায় প্রসঙ্গে: সংগ্রামী গণমঞ্চ

April 19, 2026 No Comments

১৩ এপ্রিল ২০২৬ ভারতের ইতিহাসে একটি কালো দিন। সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণাকারী বাবা সাহেব আম্বেদকারের জন্মদিনের আগের দিন পশ্চিমবঙ্গের এক বিরাট অংশের মানুষ চরম

স্বৈরাচারী রাজ্য সরকারের গালে সপাটে থাপ্পড়

April 19, 2026 No Comments

১৭ এপ্রিল ২০২৬ রাজ্য সরকার এবং স্বাস্থ্য দপ্তর যে স্বৈরাচারী ও প্রতিহিংসাপরায়ণ নীতি অবলম্বন করে প্রতিবাদী জুনিয়র ডাক্তারদের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছিল, আজকের হাইকোর্টের রায় তাদের

হস্তি-সাম্রাজ্য (ভবিষ্যতের গল্প)

April 19, 2026 No Comments

কালচক্র যেহেতু সতত ঘুর্ণায়মান, ভবিষ্যতকালে যা যা ঘটবে সেই সব কাহিনি সর্বকালবেত্তাদের কাছে কিছুই অজ্ঞাত নয়। আর লেখকের কলম আর পাঠক যেহেতু সর্বকালবেত্তা, তাই কালাতীত

উন্নাও মামলা ২০১৭

April 18, 2026 No Comments

।।অভয়া বা নির্ভয়া হই।।

April 18, 2026 No Comments

হয়নি বলা কেউ বোঝেনি আমার ব্যথা বলতে বাকি প্রাতিষ্ঠানিক গোপন কথা !! গ্যাঁজলা ওঠা বিকৃত মুখ ঢাকলো কারা সেমিনার রুম বন্ধ করতে ব্যাকুল যারা !!

সাম্প্রতিক পোস্ট

১৩ এপ্রিল ২০২৬ সুপ্রিম কোর্টের রায় প্রসঙ্গে: সংগ্রামী গণমঞ্চ

Sangrami Gana Mancha April 19, 2026

স্বৈরাচারী রাজ্য সরকারের গালে সপাটে থাপ্পড়

West Bengal Junior Doctors Front April 19, 2026

হস্তি-সাম্রাজ্য (ভবিষ্যতের গল্প)

Dr. Arunachal Datta Choudhury April 19, 2026

উন্নাও মামলা ২০১৭

Abhaya Mancha April 18, 2026

।।অভয়া বা নির্ভয়া হই।।

Shila Chakraborty April 18, 2026

An Initiative of Swasthyer Britto society

আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।

Contact Us

Editorial Committee:
Dr. Punyabrata Gun
Dr. Jayanta Das
Dr. Chinmay Nath
Dr. Indranil Saha
Dr. Aindril Bhowmik
Executive Editor: Piyali Dey Biswas

Address: 

Shramajibi Swasthya Udyog
HA 44, Salt Lake, Sector-3, Kolkata-700097

Leave an audio message

নীচে Justori র মাধ্যমে আমাদের সদস্য হন  – নিজে বলুন আপনার প্রশ্ন, মতামত – সরাসরি উত্তর পান ডাক্তারের কাছ থেকে

Total Visitor

618312
Share on facebook
Share on google
Share on twitter
Share on linkedin

Copyright © 2019 by Doctors’ Dialogue

wpDiscuz

আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।

[wppb-register]