স্থানীশ্বর হইতে অশ্বপৃষ্ঠে উত্তরাপথ বাহিয়া পঞ্চনদের তীরবর্তী অঞ্চলে পৌঁছাইতে পুষ্যভূতি ভ্রাতৃদ্বয়ের অনধিক এক সপ্তাহকাল লাগিল। সমতল ঊর্বর হরিৎক্ষেত্র অতিক্রম করিয়া আরও উত্তর পশ্চিম দিকে অগ্রসর হইলে পর্বতসঙ্কুল গান্ধার রাজ্যের সীমানা দৃষ্ট হয়। বর্তমান হূণ দলপতি প্রবরসেনের পিতামহ মহাবলী মিহিরকুলের শাসনকালে গান্ধার সাম্রাজ্য সিন্ধুনদের পশ্চিম তীর পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল। উচ্চাভিলাষী প্রবরসেন তাহার সাম্রাজ্যবৃদ্ধির দুরাশায় দশ সহস্র সৈন্য লইয়া সিন্ধু নদের পূর্বতটে পুষ্যভূতিরাজত্বের ভূমিসীমার অতি নিকটে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল।
পথিমধ্যে রাজ্যবর্ধন মৌখরীরাজ্য এবং কামরূপে দূত প্রেরণ করিয়াছিলেন। কামরূপরাজ ভাস্করবর্মা রাজ্যবর্ধনের আহ্বান স্বীকার করিয়া সুদূর প্রাগজ্যোতিষ হইতে বিশাল সৈন্যবাহিনী লইয়া হিমালয়ের পাদদেশ বরাবর পঞ্চনদের পথে অগ্রসর হইতেছিলেন।
হূণগণ নির্ভীক যোদ্ধা ছিল বটে, কিন্তু পঞ্চনদ সংলগ্ন স্থানীয় অধিবাসীদের সহিত তাহাদের বিশেষ সদ্ভাব জন্মে নাই। তাহারা মূলত লুণ্ঠক, তাহাদের নীতিজ্ঞান সামান্য — বিজিত ভূমিতে দীর্ঘকালের জন্য রাজত্ব স্থাপন করিতে হইলে সেই ভূমিতে বসবাসকারী মনুষ্যগুলির সহিত আত্মিক সেতু রচনা করা আবশ্যক। আতঙ্কের শাসন দিয়া রাজ্যপাট দীর্ঘমেয়াদী করা সম্ভব নহে। কিন্তু প্রবরসেনের বাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা ও নারীধর্ষণ করিয়া, অবাধে শস্যাদি ও মন্দিরস্থিত দেবদেবীর অলঙ্কার লুণ্ঠন করিয়া চতুর্দিকে এক বিভীষিকাময় নৈরাজ্যের সৃষ্টি করিয়া ফিরিতেছিল।
এমতাবস্থায় রাজ্যবর্ধনের বাহিনী সেই স্থানে পৌঁছাইলে, পল্লীবাসীগণের মনে নূতন বলের সঞ্চার হইল। পুষ্যভূতির সৈন্যবাহিনী প্রশিক্ষিত এবং কুশলী — দুর্দম, বিশৃঙ্খল হূণবাহিনীকে পর্যুদস্ত করিতে তাহাদের অধিক কালক্ষেপ করিতে হইল না।
প্রবরসেনের সৈন্যেরা তরবারি লইয়া লড়িতে জানিলেও সুকৌশলী ভণ্ডীর নেতৃত্বে রাজ্যবর্ধনের অশ্বারোহী বাহিনীর নির্ভুল শরক্ষেপণের সম্মুখে তিষ্ঠিতে পারিল না।
যুদ্ধের চতুর্থ দিনে দূতমাধ্যমে সংবাদ আসিল, কামরূপরাজ ভাস্করবর্মা কান্যকুব্জের পথে অনেকাংশে অগ্রসর হইয়াছেন। রাজ্যবর্ধন তাঁহার পুরাতন মিত্রের সহযোগিতার আশ্বাস পাইয়া দ্বিগুণ উৎসাহে হূণবাহিনীর উপর ঝাঁপাইয়া পড়িলেন।
পুষ্যভূতিরাজ যখন বিপুল বিক্রমে আগ্রাসনলোভী বিদেশী শত্রুদিগের সিংহভাগকে সিন্ধুনদপারে পাঠাইবার উদ্যোগ করিতেছেন, সেই সময়ে তাঁহার জয়স্কন্ধাবারে রাজধানী স্থানীশ্বর হইতে এক মহা দুঃসংবাদ আসিয়া উপস্থিত হইল।
প্রভাকরবর্ধন মৃত্যুশয্যায় শায়িত — তাঁহার অন্তিমকাল সমাগত, আরোগ্যলাভের সকল পথই রুদ্ধ হইয়াছে, তাঁহার অনন্তযাত্রা শুধুই সময়ের অপেক্ষা।
রাজমাতা যশোমতী পুত্রদের অস্থির হইতে বারণ করিয়াছেন। প্রেরিত লিপিতে তিনি তাহাদের প্রারব্ধ কর্ম সুচারুরূপে সম্পন্ন করিয়া স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করিবার আদেশ করিয়াছেন। ইহাতেই পুষ্যভূতিকুলতিলক প্রভাকরবর্ধনের প্রতি সমুচিত সম্মান প্রদান করা হইবে।
রাজ্যবর্ধন মাতার আদেশ শিরোধার্য করিতে পারিলেন না। তাঁহার পক্ষে রণক্ষেত্র পরিত্যাগ করিয়া যাওয়া সম্ভবপর নহে, তাই তিনি কনিষ্ঠ ভ্রাতা হর্ষবধনকে পিতার সন্নিকটে যাইবার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ করিলেন।
“হর্ষ, এমতাবস্থায় তোমার সাহচর্য মাতার একান্ত প্রয়োজন। তুমি যথাশীঘ্র সম্ভব স্থানীশ্বর অভিমুখে যাত্রারম্ভ করো — আমি দুইশত অশ্বারোহীকে তোমার সঙ্গী হইবার আদেশ করিতেছি।”
হর্ষ যুক্তকরে অবনত মস্তকে জ্যেষ্ঠভ্রাতাকে উদ্দেশ করিয়া বলিলেন —
“দ্বিশত অশ্বারোহীর প্রয়োজন নাই রাজন। আমি দণ্ডনায়ক দশরথবর্মার নেতৃত্বে সুনির্বাচিত দশজন যোদ্ধাকে সঙ্গী হিসাবে লইতে চাহি। আমাদিগের ফিরিবার পথ নিতান্ত শত্রুসঙ্কুল নহে, আমি অনায়াসেই অতিক্রম করিতে পারিব। ইহা ব্যতিরেকে, রাজধানীতেও যথেষ্ট সংখ্যক সেনানী রাজ্যরক্ষার্থে প্রস্তুত রহিয়াছে। যতক্ষণ না কামরূপরাজ যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছাইতে পারেন, ততক্ষণ সৈন্যের সংখ্যাধিক্য আপনার পক্ষে আবশ্যক, আয়ুষ্মন।”
রাজ্যবর্ধন সম্মত হইলেন।
সূর্যোদয়ের প্রতীক্ষা না করিয়াই কুমার হর্ষবর্ধন ও দণ্ডনায়ক দশরথবর্মা দশজন সুদক্ষ অশ্বারোহী সমভিব্যাহারে রাজধানী অভিমুখে নিষ্ক্রান্ত হইয়া গেলেন।
পশ্চাতে রাজা রাজ্যবর্ধন উদ্বেগাকুল সজল নয়নে ভ্রাতার যাত্রাপথের দিকে চাহিয়া রহিলেন।
হর্ষ কি স্থানীশ্বরে ফিরিয়া পিতাকে জীবিত দেখিতে পাইবে?
রাজমাতা যশোমতী রাজপ্রাসাদের ছাদের প্রাকারের পার্শ্বে দাঁড়াইয়া শূন্য দৃষ্টিতে ধূসর দিগন্তের দিকে চাহিয়া ছিলেন।
তাঁহার আয়তিসৌভাগ্য অস্তাচলে যাইতেছে, নির্নিমেষ নয়নে কোনও অদৃশ্য অনির্দেশ্য স্থানের উদ্দেশ্যে চাহিয়া বোধহয় তাহাই নিবিষ্টভাবে অবলোকন করিতেছিলেন।
প্রভাকরবর্ধনের স্বাস্থ্যের অভূতপূর্ব অবনতি এবং বৈদ্যকুলের মুখে তাঁহাদের পরাভবের সুস্পষ্ট স্বাক্ষর লক্ষ্য করিয়া যশোমতী নিশ্চিত হইয়াছিলেন, মহাকাল আপন সুসন্তানকে নিজগৃহে ফিরাইয়া লইতে আসিতেছেন — নশ্বর জগতে তাঁহার স্বামীর ক্রীড়াকালের সমাপ্তি সমাগত। এইবার তাঁহাকে চিরতরে ছাড়িয়া দিতে হইবে। ইহজন্মে আর তাঁহার সহিত যশোমতীর সাক্ষাৎ হইবে না।
স্বামী! তাঁহার প্রাণনাথ! দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনে যিনি দ্বিতীয়বার দার পরিগ্রহ করেন নাই, এমনই প্রেমময় স্বামী তাঁহার! জ্যেষ্ঠভ্রাতা শিলাদিত্যের অনুরোধে স্থানীশ্বর হইতে উজ্জয়িনী অবধি তড়িদ্বেগে ছুটিয়া আসিয়া যিনি পাষণ্ড দেবগুপ্তের নারকীয় উন্মত্ততা হইতে তাঁহাকে রক্ষা করিয়াছিলেন, সেই স্বামীর সঙ্গে তাঁহার চিরবিচ্ছেদের ক্ষণ আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে।
যাঁহার প্রতি ভালবাসা, স্নেহ, কৃতজ্ঞতা সমস্ত মিশিয়া এক অমৃত স্রোতস্বিনী তাঁহার হৃদয়ে অন্তঃসলিলা ফল্গুর ন্যায় প্রবাহিত হইতেছে, সেই স্বামীকে চিরকালের জন্য হারাইতে হইবে।
একটি সুদীর্ঘ নিশ্বাস যশোমতীর বক্ষঃস্থল চিরিয়া বাহির হইল। তাঁহার ওষ্ঠ দৃঢ়বদ্ধ, দৃষ্টি অচঞ্চল, মন স্থির হইল।
না, প্রভাকরবর্ধন প্রয়াত হইলে তিনিও বাঁচিয়া থাকিতে পারিবেন না। বিধাতাপুরুষ তাঁহার ললাটে বৈধব্যচিহ্ন অঙ্কিত করেন নাই। তিনি সতী নারী — ত্রিভুবন সাক্ষী, স্বামী ব্যতীত অন্য কোনও ব্যক্তি তাঁহার হৃদয়ে প্রণয় দূরস্থান, মোহজাল পর্যন্ত বিস্তার করিতে সক্ষম হয় নাই।
তিনি স্থিতসংকল্প হইলেন — অদ্য গোধূলিবেলায় আপনার অন্তিম মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিবেন।
তালি বাজাইয়া তিনি প্রতিহারিণীকে আহ্বান করিলেন। “যথাশীঘ্র সম্ভব মহামন্ত্রী ও রাজপুরোহিতকে সংবাদ দাও, কহিও রাজ্ঞী যশোমতী তাঁহাদিগের সাক্ষাৎপ্রার্থিনী।”
রাজ্ঞীর আহ্বানে মহামন্ত্রী ঈশানবর্ধন এবং রাজপুরোহিত শুভদেব শর্ম্মা ত্বরিতে রাজান্তঃপুরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। যথোচিত অভিবাদন এবং স্বস্তিবাচনের পরে তাঁহারা শুনিলেন যশোমতী কহিতেছেন —
“অদ্য সূর্যাস্তের পূর্বে আমি, পুষ্যভূতিকুলতিলক প্রভাকরবর্ধনের পত্নী যশোমতী, অগ্নিতে আত্মাহুতি দিব। স্থানীশ্বর মহাদেবের মন্দির সংলগ্ন সরোবরের তীরে আপনারা সমস্ত ব্যবস্থাদি সম্পন্ন করিয়া রাখিবেন।
স্মরণে রাখুন, অদ্য সূর্যাস্তের পূর্বেই — এই সিদ্ধান্তের কোনওরূপ ব্যত্যয় ঘটিবে না। রাজ্ঞী যশোমতীর অন্তিম আদেশ পালন করুন মন্ত্রীবর। প্রস্তুত হউন।”
হতবুদ্ধি ঈশানবর্ধন ইতস্তত করিয়া অস্পষ্টস্বরে কহিতে চেষ্টা করিলেন,
“কিন্তু মহারাণী, রাজা কিংবা কুমার হর্ষ, কেহই বর্তমানে স্থানীশ্বরে উপস্থিত নাই —
এক্ষণে এইরূপ সিদ্ধান্ত –”
তাহার পর কিঞ্চিৎ দৃঢ়কণ্ঠে বলিলেন — “বাচালতা ক্ষমা করিবেন মহারাণী, অদ্যাপি পূর্বতন মহারাজ প্রভাকরবর্ধন জীবিত আছেন। আপনার এই অকাল আত্মাহুতির ইচ্ছার কারণ বোধগম্য হইতেছে না দেবী”।
রাজপুরোহিত শুভদেব শর্ম্মা কিন্তু রাণী যশোমতীর এইরূপ সিদ্ধান্তে বিচলিত বোধ করিলেন না। স্নিগ্ধকণ্ঠে ব্রাহ্মণ কহিলেন –“দেবি, আপনি ধন্য! স্বামীর মৃত্যু নিশ্চিত জানিয়া যে স্ত্রী তাঁহার সঙ্গে সহমরণে যান, তিনি স্বামীকে গুরু পাপ হইতে উদ্ধার করেন; সেই সাহসিনী নারী মৃত্যুর পরে অক্ষয় স্বর্গলাভ করিয়া পূর্ণ এক মন্বন্তর স্বামীর সহিত সহবাস করিবার পুণ্যফল প্রাপ্ত হ’ন — বৃহদ্ধর্মপুরাণে এর উল্লেখ রহিয়াছে। মন্ত্রীবর, আপনি দ্বিধা করিবেন না, সমস্ত আয়োজন সময়ের মধ্যে সুসম্পন্ন করুন।
জয়, মহাসতী যশোমতীর জয়!”
ঈশানবর্ধনের হৃদয়ে উদ্বেগ, আশঙ্কা, শোক এবং নিরুপায় প্রতিবাদের ঝঞ্ঝা বহিতেছিল। তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন, সতীর জয়ধ্বনি কোনওমতেই তাঁহার কণ্ঠ হইতে নির্গত হইল না।
রাজ্ঞী শেষ প্রসাধনে বসিয়াছেন। জিতসেনা, হিমদত্তা প্রভৃতি দাসীগণ আকুল হইয়া কাঁদিতে কাঁদিতে তাঁহার ললাটে কুঙ্কুমলেপন, চরণদ্বয় অলক্তরাগে রঞ্জিত করিতেছিল। সমস্ত স্বর্ণালঙ্কার খুলিয়া পুষ্পাভরণে তাঁহাকে সজ্জিত করিতে করিতে তাহারা ভাবিতেছিল কোন পুণ্যবলে কোনও মানবী এক মানবকে এতখানি ভালবাসিবার শক্তি আপন অন্তরে ধারণ করিতে পারে!
প্রসাধন শেষে প্রভাকরবর্ধনের মহিষী শেষবারের জন্য স্বামীসন্দর্শনে চলিলেন।
স্বামীর চরণযুগলে আপন মস্তক স্থাপন করিয়া নীরব অশ্রুতে তাহা ধৌত করিয়া দিলেন। বক্ষোপরি আশ্বাসের করযুগল রাখিয়া প্রণয়ের কত অর্থহীন সম্ভাষণ করিলেন — স্বামীর রোগপাণ্ডুর কপোলে, শুষ্কশীতল ওষ্ঠে কত স্নেহচুম্বন আঁকিয়া দিলেন — হতচেতন প্রভাকরবর্ধন কিছুই জানিতে পারিলেন না।
অবশেষে দিনমণির শেষ রশ্মি যখন মহাদেব মন্দিরের সরোবরের ঘাট স্পর্শ করিল, তখন প্রজাগণের সমবেত হাহাকারধ্বনি এবং পুরোহিতের গম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণের আবহে মহাসতী যশোমতী ইষ্টকে স্মরণ করিয়া সজ্ঞানে চিতারোহণ করিলেন।
স্বেদস্নাত, শ্রান্ত হর্ষবর্ধনের ক্লান্ত অশ্ব যখন ফেনায়িত মুখে স্থানীশ্বর নগরীর সীমানায় আসিয়া পৌঁছিল, ততক্ষণে অগ্নির লেলিহান শিখা তাহার মাতার ক্ষীণতনু গ্রাস করিয়া লোল জিহ্বায় গগন স্পর্শ করিবার স্পর্ধা প্রদর্শন করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছে।
(ক্রমশ)










