ওই ঝাঁকড়া চুলের যে ছেলেটাকে দেখছেন – ওর নাম সৌম্যদীপ। ও আমার জুনিয়র। আমি গর্বিত যে ও আমার জুনিয়র।
২০১৫ সাল। আজ থেকে প্রায় ১১ বছর আগের কথা। তখনও জানতাম যে পৃথিবী সোজামাটা। বলার অধিকার বোধহয় সবার থাকে। কলেজের ভোটে দাঁড়ানোর অধিকার টা কলেজের সবার জন্যই। নিজের কথা বলব বলে, নিজেদের কথা বলব বলে এমসিডিএসএ র হয়ে ভোটে দাঁড়িয়েছিলাম।
পরেরদিন সকাল। ৯ টায় জি এলটির ক্লাস। ক্লাসে ঢোকার আগেই এক লম্বা সিনিয়রের সঙ্গে করিডোরে দেখা। “শুনলাম তুই ডি এস এর হয়ে ভোটে দাঁড়াচ্ছিস”। ওই শুরু। সারাদিন তারপর কত জায়গায় যে ‘শুভাকাঙ্খীরা’ ডেকে পাঠিয়েছিল ইয়ত্তা নেই। শেষ টা হয়েছিল শেষ লেকচার ক্লাসে। ভরা লেকচার থিয়েটার এমসিটিএমসিপির দাদা উঠে বিশ্বাসঘাতকতার তকমা দিয়ে “দেখে নেব’ তে শেষ হয়েছিল ক্লাস।
পরের এক ঘন্টা অ্যাডিমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিংয়ের সামনে বসে ডিএসএর আরেক সিনিয়রের কাছে হাপুস নয়নে কেঁদে জিগ্যেস করেছিলাম ভোটে দাঁড়াতে গেলে এত কিছু শুনতে হয় নাকি। তখনো জানতাম না পৃথিবী সাদামাটা নয়। তখনো জানতাম না থ্রেট কালচার কাকে বলে। তখনো জানতাম না, বলার অধিকার থাকে শাসকদলের একচেটিয়া সম্পত্তি।
বিকেল বেলা। ঘন্টাখানেক হা পিত্যেশ করে ঘোরার পর দুই বন্ধু মিলে কোনোভাবে বাড়ির বাসে তুলে দিয়েছিল। এই বন্ধুগুলো এখনো আছে। তারা এখনো জানে যে পরের এক সপ্তাহ আমি ভয়ে কলেজ যেতে পারিনি। সেই সিনিয়র রা এখনো জানে সেদিন দুপুরে বাবার কাছে ফোন গেছিল -” মেডিকেল কলেজ থেকে বলছি। আপনি জানেন আপনার মেয়ে ডিএসএর হয়ে ভোটে দাঁড়িয়েছে? মেয়েকে এসব করতে বারণ করুন। বিপদে পড়তে পারে”
কেন এত কিছু লিখলাম হঠাৎ? থ্রোব্যাক টু ২০২৪। এখন বুঝি থ্রেট কালচার কি। মুখ গুলো কেও চিনি। মুখোশগুলোকেও। আর এখন বুঝি এই বিষবৃক্ষর ডাল পালা সব ডিপার্টমেন্টে ছড়িয়ে। “সোজা কথায়” কাজ না হলে “ফেল করিয়ে দেব তৃণমূল না করলে”, “হোস্টেলে থাকতে দেব না” – এসব ব্রহ্মাস্ত্রও প্রয়োগ হয়। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝি সেই ট্রমার মানে কি হয়ে দাঁড়ায়। যে বিষবৃক্ষের বলি হতে হয়েছিল অভয়াকে…
এরই মাঝে মেডিকেল থেকে অনিন্দ্যর ফোন – রুমেলিকাদি একবার আসবে।
আরেকটা মেয়ে। আর ফার্মা ডিপার্টমেন্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। – “হোস্টেলে থাকিস আর তৃণমূল ছেড়ে ডি এস এ করছিস? “, “পাশ করতে পারবি তো?”, ” তোকে এই জন্য হোস্টেল দেওয়া হয়েছিল “?? । বছর বছর বাচ্ছাকাচ্ছাদের ভর্তির সময় যিনি বায়োকেমিস্ট্রির আগেও দীক্ষা দিতেন তৃণমূল কংগ্রেসের।
এই বার আর বিফলে যায়নি প্রতিবাদগুলো। হয়তো সবাই একসাথে ছিল বলেই যায়নি। হয়ত কেন তাই-ই। সেই বাচ্চার বাড়িতেও ফোন গেছিল। তার বাবার চাকরি ধরে টানাটানিও চলে বেশ কিছুদিন। অফিসিয়ালি এনকোয়ারি বসে মেডিকেল কলেজে। যাবতীয় কমিটি থেকে সাসপেন্ডেড হয় সেই প্রফেসরের নামে কলঙ্ক। তারপরেও কাউন্সেলিং য়ের সময় সাসপেন্ডেড হয়েও আবির্ভূত হন তিনি নিয়মাবলীকে কাঁচকলা দেখিয়েই। যথারীতি ছাত্রছাত্রীরা রুখে দাঁড়ায়। কর্তৃপক্ষই বার করে দেন। নাকে কাঁদুনির ভিডিও টা তোলা থাকে যদিও। আজ বহুদিন পর সেই ভিডিও টা চোখে পরল।
হঠাৎ এত কিছু বললাম কেন? কয়েকদিন ধরে ভিডিওটা দেখে খুবই নস্টালজিক হয়ে পড়েছিলাম। ততোধিক বিষম খেলাম নবনির্মিত ঐতিহাসিক ক্যাপশান গুলো দেখে। গল্পের গরু (না গোমাতা) গজনী হয়ে ভিকটিম সেজে এ তো গাছে না মগডালে উঠে বসে আছে !!
হঠাৎ করে ইতিহাস ভূগোল না জেনে হোয়্যাটসাপ গ্রুপ থেকে কপি পেস্ট মারলে আইটি সেলের খপ্পরে পরতে হয় বইকি। সত্যিই তো হাজার গন্ডা সামাজিক কাজ, ফেসবুক পোস্ট, ডাক্তারি, উন্নয়ন,পডকাস্ট- রত্নাকর থেকে বাল্মিকী সাজতে গেলে টুকিটাকি মিসটেক হয়ে যায়। আর পরে থাকল বার বার মরা মরা করতে করতে হুমকি দিতে থাকা কিছু বিলুপ্তপ্রায় কীট পতঙ্গের ইদানিং ভোল পালটে রাম রাম আওড়ে নতুন করে স্রোতে মেশার চেষ্টা। অদ্ভুত ভাবে সন্দীপ ঘোষের জামিন হওয়ার পর থেকেই এই বাঁদর নাচ বেড়ে গেছে। ওই থ্রেট কালচার, তুই তোকারি, ফোনাফুনি, হুমকির পোস্ট, দেখে নেব – সব দেখে নিয়েছি আমরা।
ওই ঝাঁকড়া চুলের যে ছেলেটাকে দেখছেন – ওর নাম সৌম্যদীপ। ও আমার জুনিয়র। আমি গর্বিত যে ও আমার জুনিয়র। ও এই হুমকি গুলো সামলে নিতে পারবে। আই টি সেল, রত্নাকর, বাল্মীকি,মরা,রাম – সব কিছু সামলে নিতে পারবে। ও পারবে। মেডিকেল পারে। এই ছেলেমেয়েগুলো পারে। এরা আছে বলেই মেডিকেল কলেজে এখনো শ্বাস নিতে পারা যায়। বলা যায়। বাইরের কোনো সভাধিপতি তেজ দেখাতে এলে আরামসে ফুৎকারে নামিয়ে দেওয়া যায়। আবার পেশেন্টদের সুবিধার জন্য করোনাকালে আন্দোলন করে সমস্ত মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা শুরু করা যায়। সমস্ত ছেলেমেয়েগুলো যেন পড়তে এসে কারোর তাঁবেদারি না করেই হোস্টেল পায় সেটাও দেখা যায়। এমার্জেন্সি পেশেন্ট এলে কাঁধের সাথে কাঁধ মিলিয়ে তাদের ম্যানেজ করা হয় আবার মেডিসিন না পাওয়া গেলে তা নিয়েও গলার আওয়াজ তোলা হয়। এটাই মেডিকেল। আমার মেডিকেল। আমাদের মেডিকেল।
মেডিকেল না শক্ত ঘাঁটি। ওত সহজ না 😊
(ছবিটা ২০১৮ র হোস্টেল আন্দোলনের। অরিজিৎ এঁকেছিল বোধহয়। বড় প্রিয় এই শ্লোগান। কোথাও যাবে না)











