অবশেষে স্বাস্থ্য অধিকর্তা সেদিন মঞ্চে উঠে বলে দিলেন, এখন ডাক্তারদের ট্রেনিং ঠিকঠাক হচ্ছে না! তাঁর বক্তব্যকে নিয়ে অনেক জলঘোলা করার চেষ্টা হলো। কিন্তু দিনের শেষে তাঁর কথার যে সারমর্ম সেটা হলো কিছু ডাক্তার তাঁর ডিগ্রির জন্য যে এক্সপার্টিস থাকা উচিত, তা সার্ভ করতে অপারগ হচ্ছেন। দুর্ভাগ্যের হলেও এখন ব্যাপারটা সত্যি!!
কিন্তু আবার দুধওয়ালা এসে বললো আপনার জলে কিন্তু দুধ মেশানো আছে!! থুড়ি দুধে জল মেশানো আছে। মাছের দোকানের লোকটা বললো, ওই মাছটা কিন্তু পচা। বিনীত গোয়েল এসে বললো কলকাতা পুলিশ দায়িত্ব নিয়ে অভয়ার খুনের প্রমাণ লোপাট করেছে!
এরকম শুনেছেন কখনো! শোনেননি, তার কারণ নিজের কাজের ব্যর্থতা কেউ ঢাক পিটিয়ে বলে না। হয় সেটা চেপে যায়, নয়তো সেটা ঠিক করার চেষ্টা করে। সেখানে এক ভদ্রলোক নিজের এবং নিজের সিস্টেমের ব্যর্থতার কথা অন ক্যামেরা বলেছেন, আসুন সেটাকে স্বাগত জানাই। যদিও সমস্যা নিরসনের পথ তিনি দেখাতে পারেননি, আর ওনার অগ্রবর্তী ও পরবর্তী ১৪জন স্বাস্থ্য অধিকর্তা মিলেও সমস্যা সমাধান করে দিলে আমি নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘চোর্কুণাল’ রেখে দেব।
আব মুদদে কি বাত করতে হ্যা…
এখানে সমস্যা হলো নতুন পাশ করা ডাক্তারেরা উপযুক্ত ট্রেনিং পাচ্ছেন না।
এখন ট্রেনিং নেবে কে!
আমি ধরেই নিলাম ডাক্তারি পড়তে যারা ঢুকেছেন, সবার কোয়ালিটি ভালো। যদিও আজ যাঁকে আমরা অযোগ্য বলে দাগিয়ে দি, সেই মেধাতালিকার ক্রমে পাঁচ বছর পর সরকারি কলেজে হেসেখেলে চান্স হয়ে যায়, এমন হারে সরকারি কলেজ বাড়ছে এখন। কারণ? কারণ সরকার বাহাদুর বুঝেছে গ্রামে ডাক্তারের বড় অভাব। তাই কলেজ বাড়ছে গুণোত্তর প্রগতিতে। সরকারি, তার চেয়েও বেশি বেসরকারি। বেসরকারি কলেজে কোটি টাকা সেলামি দিয়ে ডাক্তাররা গ্রামে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সার্ভিস দেবে, এই হচ্ছে যুক্তি!! কিন্তু সরকার আবার সরকারি চাকরি দিয়ে গ্রামে ডাক্তার পাঠাবে সেই আশায় ও জল!! পশ্চিমবঙ্গে অন্তত পাঁচ বছরের উপর রিক্রুটমেন্ট বন্ধ। কিন্তু ডাক্তারি পড়ুয়া চাই, প্রচুর। সেই ডাক্তারেরা পাশ করে কলকাতায় বসে বিভিন্ন কর্পোরেট স্বাস্থ্য দৈত্যদের অস্ত্র হবে আর কি…
যাইহোক এসব নিয়ে কথা অনেক হয়েছে আরো হবে। কিন্তু মোদ্দা কথা যত সংখ্যা বাড়ে, সেখানে ইন্ডিভিজুয়াল ট্রেনিং কম্প্রোমাইজ হতে বাধ্য। আমরা ২৫০জন মেডিক্যাল কলেজে পড়েছি। ফার্স্ট ইয়ারে খুব অসুবিধা হতো। এ ওর ঘাড়ে চেপে ডিসেকশন দেখতাম। যদিও সেকেন্ড ইয়ার থেকে যে ক’জন ক্লাসে আসতো, আর অসুবিধা হতো না।
আর ট্রেনিং দেবে কে!
কলেজ বেড়েছে গুণোত্তর প্রগতিতে, শিক্ষক কমেছে সমান্তর প্রগতিতে। একে তো সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার ও ডাক্তার-শিক্ষকের বেতনের কোনো পার্থক্য নেই। অর্থাৎ শিক্ষকতাটা ফাউ! তাও যা আছে, তাদের আমৃত্যু এক্সটেনশন দিয়ে বা যে করে হোক রেখে কাজ করানো। আমরা ভাই নতুন কাউকে নেব না! কেউ যদি অবসর নেন বা বীরগতি প্রাপ্ত হন সরকারি কলেজের বোঝা টানতে টানতে, তাহলে সেই শূণ্যস্থান ফাঁকাই থাকবে!
কলেজ বাড়ছে। ভিসিটের সময় এক কলেজের টিচার অন্য কলেজে শেয়ালের কুমিরছানা দেখানোর মতো দেখিয়ে অনুমোদন জুটিয়ে নিচ্ছে। এদিকে ডিপার্টমেন্ট চালানোর লোক নেই!
যে ক’জন পড়ে আছেন সরকারি কলেজে তাঁরা এক হাত দিয়ে কাজকর্ম করছেন, আরেক হাত দিয়ে নিজেদের পশ্চাৎদেশ বাঁচাচ্ছেন। কোন রোগীকে ভর্তি নিতে হবে, কোন ছাত্র কিছু না বললেও পাশ করিয়ে দিতে হবে, কোন ছাত্র ডিউটি না এলেও কমপ্লিশন দিতে হবে- না হলে যাও সুন্দরবনে গিয়ে বাঘের চিকিৎসা করো, পড়াতে আর হবেনা।
ক’দিন আগে একজন নেফ্রোলজিস্টকে এমন কলেজে পাঠিয়ে দেওয়া হলো, যেখানে তাঁর ডিপার্টমেন্টই নেই। তাঁর দোষ, তিনি সরকার পক্ষের বিপক্ষে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন! যেখানে মানুষ নিজের অস্তিত্বের লড়াই লড়ছেন, সেখানে পড়ানোর চিন্তা তো বিলাসিতা!
আর ট্রেনিং হবে কোন পরিস্থিতিতে!

আগে এমবিবিএস করা মানুষজন মোটামুটি সব অপারেশনের এক্সপোজার পেতেন। আমাদের সময় আমরা ক্লিনিক্যাল পোস্টিংয়ে হাতে কলমে ওটি খুব কমই পেয়েছি। ফার্স্ট ইয়ার পিজিটি আপেন্ডিক্স অপারেশন পেলে ধন্য হয়ে যাচ্ছে! ছ’জন মিলে লেবার রুম ডিউটি দিচ্ছি- হাতে গোনা ডেলিভারি পাচ্ছি হাতে! এখন পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে নিশ্চয়ই। এমবিবিএস ও টিচারদের মাঝে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের একটা স্তর এমন ভাবে ঢুকেছে, এখন এমবিবিএস করে ইন্টার্নশীপে হাতের কাজ শেখা দিনদিন মুশকিল হবে। আর সত্যি বলতে কে কত কাজ শিখলো তার তো কোনো মাপকাঠি নেই।
আর সবাই আজ জানে ‘অনলি এমবিবিএস’ সমাজে পাত্তা পাবে না। কারণ মহাজ্ঞানী পেশেন্টরা ‘সারা গা কাঁপছে’ বলে কার্ডিওলজিস্টই দেখাবে! যদি স্পেশালিটিই জীবনের উদ্দেশ্য হয়, তাহলে রাইলস টিউব পরানো শিখে কী হবে! আমাদের সময় ধারণাই ছিল ইন্টার্নশীপ শুধু কাজ শেখার জন্য, আমাদের আগে লোকে বছরের পর বছর বিভিন্ন বিষয়ে হাউসস্টাফশীপ করে কাজ শিখত। এখন শুধু এমসিকিউ! কোন জিন দিয়ে কোন রোগ হয়, কোন মহার্ঘ্য মনোক্লোনাল এন্টিবডি দিয়ে কী চিকিৎসা হয়। জীবনে কোনোদিন ব্যবহার হবেনা, তাও প্রশ্ন আসছে! এগুলোই হলো এমসিকিউএর দান!
স্পেশালিটি করতে এসেও হাতে কলমে কাজ শেখার হাজারো অন্তরায়। জাল স্যালাইনে লোক মরবে, দোষ হবে রেসিডেন্টের! অপারেশন বন্ধ। সিনিয়র ডাক্তারেরাই সব করবেন। রেসিডেন্সিতে যদি হাতেকলমে কাজে স্বাধীনতা না দেওয়া হয়, বেরিয়ে এসে সেই মানুষটা কাজে আত্মবিশ্বাস কীভাবে পাবে!
সব বাদ দিন। ডেলিভারি এসব তো অনেক ভারী কথা। সাপে কাটার চিকিৎসা গাইডলাইন ধরে সবাই বলতে পারবে তো! বড় বড় স্বাস্থ্যের কর্তারা বলতে পারবেন? আমাদের রাজ্যে তো এসব গ্রামীন রোগের চিকিৎসা বেসিক সবার জানা উচিত। অর্গানোফসফরাস পয়সনিং-র চিকিৎসা! জানে সবাই? কাজে লাগে না, এমসিকিউ -তে তিলক কাটতে কাজে লাগে না। তাই শেখারও দরকার নেই! বরং চারটে জিনের নাম পড়ি, চারটে ওষুধের নাম পড়ি যেটা আগামী দশ বছরেও ভারতবর্ষে আসবে না। কেন? নীট পিজিতে ইম্পর্টেন্ট।
প্রতিটা স্তরে সব ঘেঁটে আছে স্বপন বাবু। আপনি বলে হাততালি কুড়িয়ে বেরিয়ে যাবেন। কিন্তু আপনি কি জানেন না আপনার স্বাস্থ্য দপ্তরে ছাত্রনেতার অঙ্গুলিহেলনে শিক্ষকের বদলি হয়ে যায়! আপনি কি জানেন না অপদার্থ ছাত্রদের পাশ করানোর জন্য শিক্ষকদের চাপ দেওয়া হয়! সরকারবিরোধী রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য পড়াতে আগ্রহী শিক্ষকদেরও এমন জায়গায় বদলি করা হয় যেখানে স্টুডেন্টই নেই! ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কলেজে পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক শিক্ষিকা নেই, আজ ডাক্তারি শিক্ষা সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি অনলাইন প্লাটফর্মের অধীনে চলে গেছে! এসব কি আপনি জানেন না? যদি জেনে থাকেন, সেটা ঠিক করার জন্য আপনি কি কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন? ওহ সরি স্যার, স্টেপ নিলে এতক্ষণে আপনাকে স্টেপ ডাউন করে দেওয়া হতো… পদে আছেন যখন, নিশ্চয়ই মানিয়েই নিয়েছেন!!










