
অযোধ্যা পাহাড়ের একেবারে লাগোয়া এই গ্রামের গৃহবধূ হলেন মালতী – মালতী মুর্মু। বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়িতে এসে মেয়েরা আরও একটু উন্নত ব্যবস্থা প্রত্যাশা করে। এ বিষয়ে জিলিং সেরেন তাঁকে খানিকটা হতাশ করে।
শাল পলাশ কুসুমের ছায়ায় ঘেরা পাহাড়তলির ছোট্ট গ্রাম জিলিং সেরেন, তবে তার শরীর জুড়ে কেমন অপুষ্টির ছাপ। এককালে গ্রামের খানিক তফাতে একটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়েছিল –জেলিং সেরেন প্রাথমিক বিদ্যালয়। মালতীর গ্রামের ছেলেমেয়েরা বনের আলপথে পা চালিয়ে পৌঁছে যেত সেখানে। সকলেই তারা,একালের হিসেবে, প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া। ট্যুরিজমের দৌলতে এই অঞ্চলে শহুরে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে খানিকটা বটে, তবে তাতে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে ষোলোআনা। গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ঘিরে রাখতে একটা বাঁধন দেওয়া দরকার, না হলেই ….!
কিন্তু চাইলেই তো আর মাটি ফুঁড়ে স্কুল উঠে আসবে না! তার জন্য একটা ন্যূনতম উদ্যোগ,আয়োজন করা দরকার। হাতের সময় চলে যাচ্ছে দেখে মালতী নিজের বাড়িতেই শুরু করলেন ছোট্ট একটা স্কুল – অবৈতনিক বিদ্যালয় ।
বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত মহামারী কালের শূন্যতা পূরণ করতে সরকারের তরফ থেকে ফরমান জারি করা হয় – অনলাইনে ক্লাস করাতে হবে। এমনিতেই ক্লাস হয়না তাতে করে আবার অনলাইনে ক্লাস। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় এমন সব হতশ্রী পরিবারের প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়াদের জন্য অনলাইনে ক্লাস? এমন স্বপ্নচারী প্রশাসকরা তো আর মালতী মুর্মুর স্কুলের অস্তিত্ত্বের কথা জানেনা। তাহলে উপায়? মালতী কী করে সামলে উঠবেন এমন কঠিন পরিস্থিতিকে।
মালতী বুঝতে পারেন অসীম ধৈর্য্যে তিলতিল করে যেটুকু আলো পৌঁছে দিতে পেরেছেন ওই মৌন ম্লান মুখের মানবকদের মধ্যে ওৎ পেতে থাকা অশিক্ষার অন্ধকার যে তাকে নিমেষেই শুষে নেবে ! একটা উপায় বের করতে মরীয়া হয়ে ওঠেন মালতী। নিজে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন। ইচ্ছে ছিল আরও খানিকটা পথ পাড়ি দেবার, কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। এ জন্য মনে গভীর আক্ষেপ রয়ে গেছে মালতীর। মালতী জানে এইসব শিক্ষার্থীরা একবার স্কুলের ছায়ার বাইরে চলে গেলে তাদের ফিরিয়ে আনা এক রকম অসম্ভব। মালতী বুঝতে পারেন, সকলের মধ্যে বিশ্বাস না জাগলে তারা কখনও পঠনপাঠনের প্রতি আকৃষ্ট হবে না। তাই ভেঙে না পড়ে নতুন উদ্যমে অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাবার পথ খুঁজতে থাকেন তিনি। পরিবারের বিধি নিষেধকে পাশ কাটিয়ে এই লড়াইয়ে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ায় স্বামী বাঙ্কা মুর্মু । গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে তাঁরা রক্ষণশীল গ্রাম সমাজে শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন করতে শুরু করেন।
কথা মাথায় রেখে আস্তে আস্তে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তাদের সড়গড় করে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। শুধু বইয়ের কথাতেই আটকে থাকলে চলবে না। আদিবাসী মানুষদের মনের ভেতর জমে থাকা অবৈজ্ঞানিক বিশ্বাস আর কুসংস্কার গুলো ভেঙে নতুন বিশ্বাসের আলোয় আলোকিত করতে হবে তাঁর শিক্ষার্থীদের । তবেই সম্ভব হবে নতুন সমাজ গঠনের।
মালতী বুঝতে পারেন যে, লেগে থাকলে একদিন এরাই নতুন বিশ্বাসের জন্ম দেবে। সেই বিশ্বাসের বাতাস পালে লাগিয়ে অনেক অনেক দূরের পথ পাড়ি দেবে তাঁর ছোট্ট শিক্ষার্থীরা, তাঁদের সমাজ। এখন খালি নিমগ্ন নির্মিতির সময়।
পুনশ্চ
সংবাদপত্রের সূত্র থেকেই মালতীর কথা লেখা। আরও কিছু জানতে গিয়ে দেখি, ঐ ছোট্ট স্কুলটিকে ঘিরে সম্প্রতি কিছু বিতর্ক দানা বেঁধেছে। বিতর্কের প্রথম হেতু – স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিকে পাশ কাটিয়ে মালতীর বিদ্যালয় প্রচারের সব আলো কেড়ে নিচ্ছে। সরকারি স্কুলটিতে বর্তমানে নথিভুক্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা – ৪৩ জন। মালতীর স্কুলে –৪৫ জন। সরকারি স্কুলের কিছু স্কুলছুট্ ছাত্র এখন মালতীর স্কুলে ভর্তি হয়েছে। এই বিষয়টি সম্ভবত উষ্মার কারণ। গ্রামের অভিভাবকরা অবশ্য মালতীর বিদ্যালয়ের পঠনপাঠন ব্যবস্থায় খুশি। এই নিয়ে টানাপড়েন চলছে।
দ্বিতীয়ত – বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মালতীকে সাহায্য করেছে অর্থ ও উপকরণ দিয়ে । অথচ মালতী ও তাঁর স্বামী বাঙ্কা সেই অবদান সম্পর্কে নীরবতা পালন করছে বলে তাঁদের অভিযোগ । ফলে তাঁরাও খানিকটা অভিমান করেছে।
নিবন্ধকার এইসব বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে এক আদিবাসী মহিলার ইচ্ছে শক্তিকেই কুর্ণিশ জানাচ্ছে।
জুলাই ২১.২০২৫












চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই মালতীর আখ্যান পড়ে ফেললাম। খুবই উৎসাহব্যঞ্জক আখ্যান মালতীর। আমাদের চেনা গণ্ডির মধ্যেই এমন অচেনা মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য লেখককে অনেক ধন্যবাদ। পুনশ্চ অংশে সংযোজিত বক্তব্য কিছুটা হলেও মনকে দমিয়ে দেয়।
মালতীর মতো মানুষেরাই আমাদের অনেকের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে। লড়াইটা ওদের। ওদেরই লড়তে হবে।
জিলিং সেরিং গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য সরকারের তরফ থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে । এই প্রয়াস পুরুলিয়া জেলার এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের আদিবাসী মানুষদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে এক সদর্থক প্রয়াস বলেই মনে করছি। এই বিদ্যালয়টির পরিকাঠামোর উন্নয়ন সামগ্রিক পরিস্থিতির পক্ষে এক ইতিবাচক পদক্ষেপ। মালতীর প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক।