দুর্নীতি, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে চরম অব্যবস্থা এবং লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিন ধরে জমতে থাকা ক্ষোভ একটি ভয়াবহ ধর্ষণ ও হত্যাকে কেন্দ্র করে আসমুদ্র হিমাচল তোলপাড় করে দেয়। ২০২৪ এর অভয়া আন্দোলন স্বাধীনতা উত্তর ভারতে এক নতুন ইতিহাস রচনা করে।
সাম্প্রতিক জেন জি আন্দোলন ও সমকালীন ভারতের রাজনীতি এবং সমাজকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ ভারত জুড়ে প্রায় কুড়িটি আত্মহত্যাকে সামনে নিয়ে এসেছে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, দুর্নীতির শিকার মৃত ছাত্র ছাত্রীদের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাহার – প্রধান এই তিনটি দাবি কে মানতে বাধ্য করেছে এই তরুণ তুর্কীরা। গোদি মিডিয়া এই আন্দোলনকে দেশবিরোধী সমাজবিরোধীদের আন্দোলন হিসাবে চিহ্নিত করেছে, স্বাভাবিক ভাবেই টি আর পি কমেছে।
সমাজমাধ্যম এই আন্দোলন এবং তার সাফল্য নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। রাজনীতি নির্বিশেষে অধিকাংশ মানুষ অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন, তার প্রমাণ ভারত জুড়ে অসংখ্য মিছিল, বিক্ষোভ প্রতিবাদ। আবার কিছু কিছু ফেসবুক পোস্টে দেখলাম কেউ কেউ জেন জি আন্দোলনের ভাষা প্রকরণ নীতিবোধ ইত্যাদি নিয়ে গভীর উদ্বিগ্ন।
যাঁরা পোস্ট করেছেন তাঁদের মধ্যে অনেক পরিচিত মানুষ জন আছেন দেখলাম।
ভাষা আদি অনন্ত কাল ধরে প্রতিবাদের এক গুরুত্বপুর্ণ মাধ্যম হিসাবে পরিচিত। আন্দোলনের শক্তির প্রকাশ হয় তার শ্লোগানে। হোক কলরব আন্দোলন, এন আর সি আন্দোলন , অভয়া আন্দোলন বহু শক্তিশালী শ্লোগান ও মিমের জন্ম।দিয়েছে। জেন জি আন্দোলন তার ব্যতিক্রম নয়। সমালোচকদের ভ্রূকুঞ্চনের কারণ এই আন্দোলনের ভাষা। জেন জি দের ঔদ্ধত্যে, পোস্টার ও মিমের ভাষায় শালীনতার অভাবে গভীর দুঃখিত হয়েছেন অনেকে। অমার্জিত তরুণ তরুণীদের নবীন প্রজন্ম হিসাবে মেনে নিতে শঙ্কিত বোধ করছেন। পুলিশ আর সাংবাদিক নিগ্রহকারীদের বিরুদ্ধে সব কেস উঠে যাওয়ায় কেউ কেউ মর্মাহত। এই মর্ম বেদনা নিয়ে আমার ব্যক্তিগতভাবে খুব কিছু বলার থাকত না, যদি না এই সমালোচকদের মধ্যে প্রাক্তন ছাত্র ছাত্রী, অনুজপ্রতিম সহকর্মীদের কাউকে কাউকে দেখতে পেতাম। মূলত এঁদের জন্যেই কিছু লেখা দরকার মনে করলাম। যাঁরা অনেক জানেন, ভূয়োদর্শী ব্যক্তি, তাঁদের জ্ঞান বুদ্ধির ব্যাপ্তি এবং চিন্তার অপরিবর্তনশীলতার উপর আমার যথেষ্ট আস্থা আছে।
Mark Twain লিখেছেন “Under certain circumstances, urgent circumstances, desperate circumstances, profanity provides a relief denied even to prayer.”
প্রতিষ্ঠিত ভাষার জন্ম সমাজের ক্ষমতার অলিন্দে। তাই সব ভাষার প্রচলিত অশ্লীল এবং অশালীন শব্দগুলি সচরাচর সেই ক্ষমতা কাঠামোর প্রকাশ ঘটায়। নারীর যৌনতার উপর আধিপত্যকামী পুরুষতন্ত্র তাই
পরিবারের বৈধ কাঠামোর বাইরে যৌন সংসর্গজাত সন্তানকে বেজন্মা তকমা দেয়, গালাগালির উদ্দিষ্ট ব্যক্তির মা এবং বোনের ধর্ষণ হুমকিকে কেন্দ্র করে সব ভাষায় তৈরি হয় অসংখ্য শব্দবন্ধ।
যখন কোন সমাজ পরিবর্তনের হাওয়ায় আন্দোলিত হয়, তখন ভাষা আবার প্রতিবাদের আঁতুড়ঘর হয়ে ওঠে। প্রতিবাদের মূল ধারার পাশাপাশি সমাজের আনাচে কানাচে তৈরি হয় বিরুদ্ধতার ভাষা, যা ক্ষমতার কাঠামোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। নিম্নবর্গের মানুষের হাতে অস্ত্র হয়ে ওঠে সেই ভাষা, যার পরিশীলিত হয়ে ওঠার কোন দায় নেই। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিদের নিমেষে নামিয়ে আনা হয় অভ্রভেদী সিংহাসন থেকে, অশ্লীলতা আর অশালীনতার চাবুকে নগ্ন, ক্ষতবিক্ষত করা হয়। পৃথিবীর সব দেশের ইতিহাসেই তাই বটতলার সাহিত্য রচিত হয়।
উনিশ শতকের বাংলায় বটতলা প্রকাশনা ও তার সাহিত্য ছিল ঔপনিবেশিক ভদ্রসমাজ ও কুলীন সংস্কৃতির আধিপত্যের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এক নীরব প্রতিবাদ। এটি মূলত নিম্নবর্গীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতি, যা অভিজাত শ্রেণীর রুচি ও নৈতিকতার শাসনকে ভেঙে দিয়েছিল। বটতলা সাহিত্য নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে, বটতলা সাহিত্য নিয়ে ঐতিহাসিক গৌতম ভদ্রর পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষণা ‘ন্যাড়া বেলতলায় ক’বার যায় ‘। বটতলার অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ। রাজা উজিরকে অনায়াসে সাধারণের স্তরে নামিয়ে এনে কেচ্ছা করা যায়। ক্রোধ প্রকাশের অধিকার সমাজ দেয়নি, তাই ঘৃণা আর ক্রোধ নিজের রাস্তা খুঁজে নিয়েছে অশ্লীল খেউড়ের মাধ্যমে। প্রশ্নাতীত ক্ষমতার প্রতিমূর্তি শাসককে উলঙ্গ করে দেয় এই সর্বগ্রাসী ক্রোধ, সব অন্যায় আর বঞ্চনার প্রতিশোধ নেয় অশ্লীল আক্রমণ। ফরাসি বিপ্লবের আগেও এই ভিন্ন ধারার নিষিদ্ধ সাহিত্য ফরাসি রাজতন্ত্রের ঐশ্বরিক পবিত্রতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল। রবার্ট ডার্নটন তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন ফরাসি বিপ্লবের আগে ষোড়শ লুই, মারি আঁতোয়ানেৎ, রাজ পরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং অভিজাতদের অশ্লীল ভাষায় আক্রমণ করে, তাদের বিলাস ব্যাভিচার কে ব্যঙ্গের কষাঘাতে বিদ্ধ করে লেখা হত অজস্র প্যামফ্লেট যা ইতিহাসে revolutionary libells নামে পরিচিত। এই ধারার সাহিত্য বাংলার বটতলার মত Grub street নামে চিহ্নিত। অষ্টাদশ শতকের ইংল্যান্ডেও এই ধারার লেখার সন্ধান পাওয়া যায়। এই লেখাগুলির মূল সুর প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা আর আধিপত্যের বিরোধিতা। ক্ষমতার আশ্রয়ে তৈরি হওয়া পরিশীলিত ভাষা ও সাহিত্যকে প্রত্যাখ্যান করে ক্ষমতাশালী চরিত্রদের তুচ্ছাতিতুচ্ছ, হাস্যকর, করুণার পাত্র করে তোলা এই ধারার সাহিত্যের লক্ষ্য। ক্ষমতা যে বৈধতার গণ্ডি কেটে অবৈধ আর অশ্লীলকে ঘৃণা করতে শিখিয়েছে, শাসকের বিরুদ্ধে সেই ঘৃণাকে উজাড় করে দেওয়াই এই নিষিদ্ধ সাহিত্য, পামফ্লেট, পোস্টারের উদ্দেশ্য। এই ভাবেই উল্টে যায় ক্ষমতার চেনা ছক, ভেঙ্গে যায় ভাষার প্রচলিত পবিত্রতা।
নিষিদ্ধতার এই শক্তিই জলকামানের সামনে ব্রেক ডান্স করতে সাহস জোগায়। বোরখায় ঢাকা মেয়ে লিকেজ প্রুফ স্যানিটারি ন্যাপকিনের পোস্টার তুলে ধরে ধারাবাহিক প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদ করে। রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদতে ঘটা অন্যায়কে যখন ঢক্কানিনাদে ন্যায় বলে প্রতিষ্ঠা করা হয় তখন এই তীব্র অশালীনতাই সজোরে অন্যায়কে আঘাত করতে পারে।
ভারতে পাঁচশো বছরের ঐতিহাসিক সৌধ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের বিশ্বাসের নিয়মে, ইলেকশন কমিশন আর সুপ্রিম কোর্টের ন্যায়নিষ্ঠতায় SIR চক্রে ভারতবর্ষের লক্ষ লক্ষ নাগরিক নিজ বাসভূমে পরবাসী হয়ে যাবার পথে, গত ১৫ বছরে ১৫২ টি প্রশ্ন ফাঁসের জেরে লক্ষ ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎনিয়ে ছিনিমিনি, অসংখ্য ছেলেমেয়ের প্রাণের বিনিময়ে সরকারি মদতে টাকা লুটছে শিক্ষা ব্যবসায়ীরা – এই গুলো সব বৈধ এবং আইনসম্মত। তাই এগুলোকে ভাঙ্গতে ভাষাকেও বৈধতার বেড়া টপকাতে হয়েছে। যাঁরা ভাষার অপব্যবহারে শিউরে উঠছেন তাঁরা কোথায় ছিলেন যখন দিল্লির পুলিশ শান্তিপূর্ণ মিছিলে লাঠি টিয়ার গ্যাস আর পেলেট গান চালালো ? যখন ঈদের আগে কুরবানি নিষিদ্ধ হয়ে যায় আর রেড রোডে নামাজ বন্ধ করে যোগ দিবস পালন হয় তখন এই নির্লজ্জতাকে অশালীন মনে হয়নি ? যারা জনগণমন গানের তালে নাচ করেছিল তারা আইনক্সের বিলাসবহুল প্রেক্ষাগৃহে বাধ্যতামূলক জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর প্রহসন চালু করেছে যারা, তাদের চেয়ে অনেক বেশি সভ্য। কখনো মেঘমন্দ্র স্বরের জাদুতে, কখনো নির্লজ্জ চিৎকারে যারা সরকারি পদে থেকে ঘুসপেটিয়া বলে, আজাদির শ্লোগান দিলে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হাসপতালে পাঠানোর নিদান দেয়, শুক্রবারী বলে, সমাজ বিরোধী বলে দাগিয়ে দিয়ে ভারতীয় জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বহুত্বকে লোপাট করতে চায়, জাতীয়তাবাদের নামে এক ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনকে চাপিয়ে দিতে চায়, তাদের চেয়ে ঢের বেশি
দেশকে ভালোবাসে এই অশালীন উদ্ধত ছেলেমেয়েরা। যে সব অভিভাবকেরা এই সব অশ্লীল প্রতিবাদ থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিতে যেতে চান তাঁদের ছেলে মেয়েদের, সেই সব ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যত সুরক্ষিত রাখতেই দেশ বিদেশ থেকে হাজার হাজার ছেলে মেয়ে হাজির হয়ে যন্তর মন্তরে দিনের পর দিন অনশন করল, পুলিশের অত্যাচার সহ্য করল। নৃশংস ঘাতকদের গদিছাড়া করে শিক্ষা স্বাস্থ্য রাজনৈতিক পরিবেশকে বাঁচানোর জন্য দেশ জুড়ে যে মিছিল আর প্রতিবাদ চলছে তার ভাষাকে অশালীনই হতে হবে। নবারুণ ভট্টাচার্যের লেখায় প্রান্তবাসী ফ্যাতাড়ুরাই ক্ষমতাধরদের অশ্লীল আক্রমণের স্পর্ধা রাখে। ক্ষমতার নির্লজ্জতাকে প্রশ্ন করতে পারে যে কাউন্টার কালচার, সেই সাংস্কৃতিক বিরুদ্ধতার অপরিহার্য অংশ এই অশালীন স্পর্ধা যা নিষেধের লক্ষণরেখা অতিক্রম করে প্রশ্ন করতে শেখায়। এই সাহসী প্রজন্ম আমাদের শিক্ষক, পথ প্রদর্শক। এই সাহস আর স্পর্ধাই দিনবদলের দিশা দেখায়।
অশালীনতার আলোচনা শুরু করেছিলাম মার্ক টোয়েন কে দিয়ে। শেষ করব ‘The necessity of political vulgarity’ প্রবন্ধে Amber A’Lee Frost এর অসামান্য একটি কথা দিয়ে-
“To deny the importance of vulgarity is to deny the revolutionary tradition”.










