আর জি কর হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকের নির্মম হত্যাকাণ্ড ও পাশবিক ধর্ষণের প্রতিক্রিয়ায় সূচনা হওয়া অভয়া আন্দোলন এযাবৎকালে বৃহত্তম গণ অভ্যুত্থান যেখানে কোন ঘোষিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়াই দ্রোহের অগ্ন্যুৎপাত ঘটায়। ঘুম ভাঙ্গার গান নিমেষে বিদ্যুৎপ্রবাহ তৈরি করে শীত ঘুমে শুয়ে থাকা শিরদাঁড়ায়, ঋজু মেরুদণ্ড নিয়ে পালাবদলের স্বপ্নে সামিল হয় বাংলার মানুষ, গ্রাম শহর মাঠ পাথার বন্দরে ডাক ওঠে –‘জোট বাঁধো তৈরি হও ।‘ প্রথমে একজোট হন মেডিক্যাল কলেজগুলির প্রতিবাদী ছাত্র চিকিৎসকেরা। অচিরেই সাধারন মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ গণ আন্দোলনের জন্ম দেয়। মানুষ পথে নামেন, ন্যায় বিচারের দাবিতে। আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া বা ইংল্যান্ডের লিডসের আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় বাংলায় বহমান আন্দোলনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে ‘Reclaim the Night, Reclaim the Right’। সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে মহানগরের গন্ডি ছাড়িয়ে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে, অন্যান্য রাজ্যে, এমন কি দেশের সীমানা ছড়িয়ে প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে।
রাজনৈতিক পরিসরের বিস্তৃতির সঙ্গে সাংস্কৃতিক নতুন রূপরেখা নির্মাণের কাজ শুরু হয় । ২ ফেব্রুয়ারি আনন্দবাজার রবিবাসরীয়তে ‘কলকাতার আকাশে এক আগুনপাখি’ নিবন্ধে অধ্যাপক অশোককুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন- “প্রতিবাদের এত বৈচিত্র্য, এত বিভিন্ন প্রকরণ গত পঞ্চাশ বছরে চোখে পড়েনি।”
নতুন গান, নতুন শ্লোগান জন্ম নিচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। প্রতিদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে দ্রোহসাহিত্যের তালিকা। এক দ্রোহের অভিঘাতে জেগে উঠছে বিগত দ্রোহের চর্চা । রাজনৈতিক আর সামাজিক দ্রোহ থেকে জন্ম নিচ্ছে নতুন ইতিহাস আর সাহিত্য।
২০২৪ এর ডিসেম্বরে ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরাম (WBDF) এর সম্পাদনায় ধর্মতলার অবস্থান মঞ্চে প্রকাশিত হয়েছে প্রবন্ধ ও কবিতা সঙ্কলন ‘দ্রোহকাল ২০২৪’। ঐতিহাসিক ভাবে এই সঙ্কলনের গুরুত্ব অপরিসীম। ‘দ্রোহকাল ২০২৪’ অভয়া আন্দোলন সম্পর্কে প্রথম প্রকাশিত সঙ্কলন গ্রন্থ।
মুখবন্ধে সম্পাদকদ্বয়- জয়ন্ত দাস এবং সৌরভ তালুকদার লিখেছেন “দেশ জুড়ে অভয়া -তিলোত্তমা এক প্রতীক হয়ে দাঁড়াল। আন্দোলনের প্রথম সারিতে এসে দাঁড়ালেন তরুণ চিকিৎসকেরা, নারী ও তৃতীয় লিঙ্গ অধিকার কর্মী রা এবং অবশ্যই বর্ষীয়ান চিকিৎসকেরা। পাশে রইলেন নাগরিক দের সমস্ত অংশ , এবং পতাকা নিয়ে বা না নিয়ে পশ্চিমবাংলার শাসক বিরোধী রাজনৈতিক দল গুলো। … ডব্লিউবিডিএফ চায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই মহান আন্দোলনের প্রথম ১০০ দিনের ইতিহাস এখানে লিপিবদ্ধ থাকুক”| ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার প্রয়াসে রচিত এই সংকলনে ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল হিসাবে আছে জয়েন্ট প্লাটফর্ম অফ ডক্টরস-এ র তরফে ১৫ অগাস্ট থেকে ১৬ অক্টোবর ২০২৪ এর মধ্যে প্রচারিত ১৩ টি অমূল্য প্রেস বিজ্ঞপ্তি।
লেখকের তালিকায় আছেন ২৩ জন।
বিষাণ বসু ‘অতিক্রান্ত দশ হপ্তা-দাবির দশ দফা’ লেখায় জুনিয়র ডাক্তার দের দশ দফা দাবি নিয়ে আলোচনা করেছেন। শুভাংশু পাল ‘প্রাতিষ্ঠানিক খুন’ প্রবন্ধে গণ জাগরণের ব্যাপ্তি ই এই আন্দোলনের সব চেয়ে বড় প্রাপ্তি।
কৌশিক লাহিড়ীর দু’টি লেখা আছে এই সংকলনে। ‘দ্রোহপক্ষের দুর্গা’ য় আর জি করে শিল্পী অসিত সাইঁ এর তৈরি করা সম্পর্কে অভয়ার আবক্ষ মূর্তি সম্পর্কে লিখেছেন ” এর আসল স্রষ্টা।… হত্যাকারী সমাজ।..এ মুখ আমাদের নিশ্চিন্ত নিরাপদ নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটানো দুঃস্বপ্ন হয়ে জেগে থাকবে “।’মহামায়া’ রচনায় অভয়াকে দধীচির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। স্বতঃস্ফূর্ত গণ জাগরণে বজ্র হয়ে ফিরে এসেছে অভয়া, শাসকের বিনাশের জন্য- ” অনেকে বলছেন মেয়েটি যেন দধীচির হাড়। আত্মাহুতি দিয়ে বজ্র দিয়ে গেল সমাজের হাতে ”
কৌশিক দত্ত- ‘অভয়া ও লিঙ্গ রাজনৈতিক আন্দোলন’ লেখায় অভয়া আন্দোলনের সূচনা, ১৪ অগাস্ট রাত দখলের ইতিহাস এবং পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। অরুণাচল দত্ত চৌধুরী ‘আমরা যারা অরুণাচল’ প্রবন্ধে ২০১৭ তে ডেঙ্গি প্রতিরোধে সরকারের ব্যর্থতা কে তুলে ধরার অপরাধে তাঁর সাসপেন্ড হওয়া এবং তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করেছেন যে আন্দোলনের স্লোগান ছিল “আমরা সবাই অরুণাচল”|
সদ্য প্রয়াত চিকিৎসক প্রলয় বসুর দু’টি লেখা আছে এই সঙ্কলনে – ‘আন্দোলন আর খাপছাড়া লেখা’, আর ‘যাঁরা আন্দোলনে ছিলেন-নায়কদের গল্প’। দু’টি লেখাতেই এই আন্দোলনে সাধারণ নাগরিক দের অভূতপূর্ব অংশ গ্রহণ নিয়ে আলোচনা আছে. . আন্দোলনকারী জুনিয়র চিকিৎসক রুমেলিকা কুমার –’আন্দোলনের হৃদস্পন্দন বুকে নিয়ে’ সূচনা থেকে অনশন মঞ্চ পর্যন্ত আন্দোলনের একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা তুলে ধরেছেন।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলি হল অর্জুন দাশগুপ্তর ‘অভয়া-তিলোত্তমা ও রাজনীতি-অরাজনীতি’, শর্মিষ্ঠা দাসের ‘তিলোত্তমা – নারীবাদী আন্দোলনে এক নতুন ঢেউ’, অরুণিমা ঘোষের ‘শারদীয়া উৎশব’, বিদ্যুৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শিক্ষা – আরোগ্য নিকেতন থেকে মৃত্যু শিবিরে অভিযাত্রা’ সৌরভ তালুকদারের ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরাম-একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয়’ , চিন্ময় নাথের ‘রাস্তায়’, কাঞ্চন মুখার্জির ‘নয়া ইতিহাস’, চন্দ্রমৌলি ঝার ‘হুমকি রাজের তিন বছর: আর জি কর’, জয়ন্ত ভট্টাচার্যের ‘অভয়াকে ঘিরে জুনিয়র ডাক্তার আন্দোলন’, নাগরিক সমাজ এবং Angana Bhttacharyya র ‘And still we rise’
দীপঙ্কর ঘোষ এর লেখা একাঙ্ক নাটক অনন্তিকা এবং তীর্থঙ্কর ভট্টাচার্য, পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরুণাচল দত্তচৌধুরীর কবিতা এই সঙ্কলনকে ঋদ্ধ করেছে। অসাধারণ কিছু আলোকচিত্র এই বই-এর অন্যতম সম্পদ।









