প্রতি রাতেই ফোনটা আসত। কিন্তু সেদিন রাতে কোনও ফোন আসেনি। সেদিন মানে ২০০৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। সন্দেহ দানা বাঁধে বিদিশা সেনের মনে। তাঁর বৃদ্ধা মা আর দশ ছরের ছেলেকে নিয়ে বাগুইআটিতে থাকতেন তিনি। স্বামী ছিলেন রানাঘাট মহকুমা হাসপাতালের নামকরা শল্য চিকিৎসক। নাম ডক্টর চন্দন সেন। বিদিশা দেবী রানাঘাটে আসতেন মাঝে-সাঝে। চন্দনবাবুও সপ্তাহান্তে কলকাতায় আসা-যাওয়া করতেন। কিন্তু রোজকার যোগাযোগের মাধ্যম ছিল ফোন। রোজ রাতেই বিদিশা দেবীর কাছে আসত চন্দনবাবুর ফোন | ব্যতিক্রম ছিল সেদিন | বিদিশা দেবী ফোন করেন ডক্টর সেন কে | ফোন রিং হয়ে যায় | কেউ ফোন ধরে না | এরপর তিনি ফোন করেন রানাঘাটে ডক্টর সেনের পরিচিতদের | না কেউ কোনও খবর দিতে পারেনি | ততক্ষণে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ডক্টর সেন-কে | বিদিশা দেবী পরদিন নিয়ে যাওয়া হয় ব্যারাকপুরে বাপের বাড়িতে | সেখানে তিনি জানতে পারেন তার স্বামী ডক্টর সেন আর নেই | তারপর প্রায় ২০ বছর কেটে গিয়েছে | না এই ঘটনায় যুক্ত কেউই কোনও শাস্তি পায়নি | আদালতের রায়ে দোষীরা সকলেই বেকসুর খালাস |
গরীবের ভগবান ছিলেন ডক্টর চন্দন সেন | রানাঘাটের সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া | অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি কোনওদিন | আর সেই কারণেই রানাঘাট মহকুমা হাসপাতালের বিভিন্ন অনৈতিক কাজ নজরে পড়ে যাচ্ছিল ডক্টর সেনের | একটা কায়েমি চক্রের মুনাফার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন ডক্টর সেন | ডক্টর সেন দেখেছিলেন হাসপাতালে রোগীদের জন্যে যা ওষুধ আসত তার প্রায় বেশীরভাগটাই “ব্যাকডোর” দিয়ে বিক্রি করে দিতেন হাসপাতালের কিছু ডাক্তার এবং হাসপাতাল পরিচালন সমিতির বেশ কিছু লোকজন | তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন ডক্টর সেন | নির্দেশ দিয়েছিলেন স্পষ্ট – তার কোনও রোগীর যেন ওষুধের অসুবিধা না হয় | ডক্টর সেন লক্ষ্য করেছিলেন গরীব রোগীদেরও ইচ্ছাকৃতভাবে হেনস্থা করছিলেন বেশ কিছু ডাক্তার | সাধারণ রোগকেও খুব জটিল করে দেখাতেন সেইসব ডাক্তাররা | যেখানে রোগ নির্ণয়ের জন্যে একটি প্যাথলজিক্যাল টেস্ট দরকার, সেখানে রোগীদের দিয়ে করানো হত বিভিন্ন রকমের টেস্ট , এমন টেস্ট যা রানাঘাট হাসপাতালে করা সম্ভব না | রোগীদের নির্দেশ দেওয়া হত বাইরের বেশ কিছু প্যাথলজিক্যাল ল্যাব থেকে টেস্টগুলি করবার | আর ল্যাবের কমিশন খেতেন সেইসব ডাক্তাররা | যে হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা হওয়ার কথা সেখানে চিকিৎসা করাতে এসে সর্বস্বান্ত হয়ে যেতেন গরীব রোগীরা | ডক্টর সেন বেশ কিছু ডাক্তারদের এই নোংরা কার্যকলাপ মেনে নিতে পারেননি | প্রতিবাদ করতে থাকেন বিভিন্ন সময়ে | দুর্নীতি মুক্ত করতে চেয়েছিলেন রানাঘাট সদর হাসপাতালকে | হাসপাতালের বেশ কিছু ডাক্তার ও পরিচালন সমিতির সদস্যদের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন ডক্টর সেন | তারাই পরিকল্পনা করেন ডক্টর সেনকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার | ডাক্তারের সাদা এপ্রনের আড়ালে রয়েছে একদল মানুষ, যারা আদতে কসাই ।
কে হয়েছিল সেদিন?
রানাঘাটের নোকারি এলাকায় হাসপাতালের অবসরপ্রাপ্ত কর্মীর বাড়িতে খানাপিনার নিমন্ত্রণ ছিল ডক্টর চন্দন সেনের | রানাঘাট হাসপাতালের তিন চিকিৎসক, রানাঘাট হাসপাতালের সমাজকল্যাণ আধিকারিকও উপস্থিত ছিলেন সেদিন | পার্টিতে প্রথমে চলে খাওয়া দাওয়া | রাত দশটার সময় গান গাইতে শুরু করেন এক ডাক্তার | কেউ একজন নির্দেশ দেয় বাড়ির দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিতে | এই বলে সেই অবসরপ্রাপ্ত কর্মী এবং উপস্থিত এক ডাক্তার ডক্টর সেনকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যান | মিনিট কুড়ি পড়ে তারা ফিরে এসে বলেন ডক্টর সেনকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না | ২০০৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি অনেক রাতে পুকুরে ভাসতে দেখা যায় রানাঘাট মহকুমা হাসপাতালের শল্য চিকিৎসক চন্দন সেনের নিথর দেহ। খবর দেওয়া হয় পুলিশে | তড়িঘড়ি চন্দনের দেহের ময়নাতদন্ত সেরে ফেলারও চেষ্টা হয় | দেহ নিয়ে আসা হয় রানাঘাট সদর হাসপাতালে | সেদিন রানাঘাটের হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেছিল হাসপাতালে | ভিড়ের মধ্যে থেকে বারবার ভেসে আসছিল একটাই কথা – “ওকে ওরা সরিয়েই দিল” |
শেষমেশ চন্দনের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চাপে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে দেহ নিয়ে গিয়ে ময়নাতদন্ত করানো হয়। তখনই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ডক্টর সেনের মুখ প্লাস্টিক বা ওই জাতীয় কিছু জিনিস দিয়ে বেঁধে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয় | দেহে প্রায় পনেরোটি আঘাতের চিহ্ন ছিল ডক্টর সেনের | হত্যার পর দেহ পুকুরে ফেলে দেওয়া হয় |
রানাঘাট পুলিশ প্রাথমিকভাবে তদন্তে নামে | এরপর দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডিকে | এই খুনে জড়িত সন্দেহে রানাঘাট হাসপাতালের তিন চিকিৎসককে গ্রেফতার করা হয়। এ ছাড়া এক ডাক্তারের গাড়িচালক , রানাঘাট হাসপাতালের সমাজকল্যাণ আধিকারিক গ্রেফতার হন এবং যাঁর বাড়িতে ভোজসভা বসেছিল, সেই অবসরপ্রাপ্ত কর্মী এবং তাঁর ছেলেকেও পাকড়াও করে পুলিশ।
কৃষ্ণনগর আদালতে মামলা শুরু হয়। বিদিশার তত দিনে আরও একটা লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছে। সেটা হল, বৃদ্ধা শাশুড়ি আর নাবালক ছেলেকে সামলে বেঁচে থাকার লড়াই। চন্দনের মৃত্যুর মাত্র চার মাস আগে ক্যানসারে মারা গিয়েছেন তাঁর ভাই। বৃদ্ধা মা পুরোপুরি বিপর্যস্ত।
২০০৪ সালে স্বাস্থ্য দফতরে চাকরি পান বিদিশা। নতুন কর্মক্ষেত্র, কাজ শেখা। তারই মধ্যে সুবিচারের আশায় ছোটাছুটি। সিআইডি তদন্ত চেয়ে রাইটার্সে দৌড়াদৌড়ি। ভয়ে হোক বা লোভে, একের পর এক সাক্ষী যখন আদালতে গিয়ে ‘বিরূপ’ হয়ে যাচ্ছে, তখনও খুঁটি আগলে মামলা চালিয়ে যাওয়ার লড়াই।
শেষ পর্যন্ত সেই দিনটা আসে। ২০০৫ সালের ৫ জুলাই কৃষ্ণনগর আদালত দোষীদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। আদালত প্রমাণ লোপাটের দায়ে রানাঘাট হাসপাতালের সমাজকল্যাণ আধিকারিকের পাঁচ বছর কারাদন্ড ঘোষণা করে।
বাগুইআটির বাড়িতে বসে সেই রায় শুনে বিদিশা বলেছিলেন, লড়াই শেষ নয়, বরং শুরু। বলেছিলেন, ‘‘এর পরে হাইকোর্ট আছে। ওরা যাতে সেখানে গেলেও রেহাই না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।’’ সেই লড়াইটা কিন্তু তিনি হেরে গিয়েছেন। ২০১০ সালে কলকাতা হাইকোর্ট সকলকেই বেকসুর খালাস করে দেয়।
বিদিশা সে দিন আদালতে যাননি। অফিসে বসেই আইনজীবীর ফোনে খবর পান। এবং কয়েক মুহূর্তের জন্য মাথার ভিতরটা ফাঁকা হয়ে যায় তাঁর। ‘‘খবরটা পেয়ে নিজেকে কেন জানি না ভীষণ নিঃসঙ্গ মনে হয়েছিল। এত দিন শুনে এসেছিলাম, ওদের হাত অনেক লম্বা। সে দিন সেটা উপলব্ধি করলাম। সে এক অসম লড়াই।’’— রাজারহাটে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে বসে বলেন বিদিশা।
তত দিনে সংবাদমাধ্যমের নজর সরে গিয়েছে। ‘বন্ধু’রা বেশির ভাগই সরে গিয়েছেন পাশ থেকে। রাজ্য সরকার হাইকোর্টের রায় চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে গেল। ‘‘কিন্তু আমি আর পারলাম না। দিল্লিতে গিয়ে আইনি লড়াই করার সামর্থ্য আমার ছিল না। থাকা-খাওয়ার জায়গা নেই। যাতায়াতের টাকা নেই। তার পর আর সরকার থেকে আমায় কিছু জানায়নি। তবে এক পরিচিত আইনজীবীর মাধ্যমে জেনেছি, মামলাটা ‘ডিসমিস’ হয়ে গিয়েছে।’’ তার পরেই তাঁর প্রশ্ন, ‘‘ওরা যদি খুন না করে থাকে তাহলে কে খুন করল?’’ জবাব দেবার জন্য আজ আর কেউ নেই !
আজকাল চিকিৎসক ও রোগীদের মধ্যে সম্পর্ক তলানিতে | সুচিকিৎসা পেতে আজও বহু কাঠখড় পোড়াতে হয় রোগীদের | অনেক চিকিৎসক ওষুধের কোম্পানি থেকে কমিশন, প্যাথলজি ল্যাব থেকে কমিশন, নার্সিং হোম থেকে কমিশন খেয়ে ভুলে গেছেন আদর্শের কথা | মৃত্যুর পরেও আইসিইউতে রোগীকে রেখে নিজেদের ইনকাম বাড়িয়ে নেন অনেক ডাক্তারবাবু | ডাক্তার চন্দন সেন ছিলেন এক ব্যতিক্রম | আমাদের মত পোড়া দেশে ডাক্তার সেনের মূল্যায়ন হয়ত কখনই সম্ভব না |
ডাক্তার চন্দন সেন | শ্রদ্ধা ও প্রণাম |
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ অহর্নিশ – Ahornish
তথ্য : আনন্দবাজার পত্রিকা, টেলিগ্রাফ, টাইমস অফ ইন্ডিয়া
{পোস্টটিতে কারা এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত তাদের নাম ইচ্ছাকৃতভাবেই দেওয়া হয়নি | বিষয়টি স্পর্শকাতর এবং এই মামলাটির বেশ কিছু অংশ এখনও বিচারাধীন | আনন্দবাজার পত্রিকা, টেলিগ্রাফ, টাইমস অফ ইন্ডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই এই পোস্টটি লেখা হয়েছে | }









