অভয়ার ন্যায়বিচারের দাবিতে চলমান অভূতপূর্ব নাগরিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আমরা দেখেছি কীভাবে এই আন্দোলনের ভাষা হয়ে উঠেছে মানুষের প্রতিরোধের ভাষা, সাহসের ভাষা। ছোঁয়াচে সাহস ছড়িয়ে পড়েছে অনেক দূরে, পাখির মুখে মুখে গানের সুরে। স্ফুলিঙ্গ হয়ে ছড়িয়ে পড়া সেই প্রতিরোধের ভাষ্য কখনো প্রতিভাত হয় কোনো জেদি স্কুলছাত্রীর প্রথম মিছিলের কান্নাভেজা স্লোগানে, কখনো কোনো শান্ত, মার্জিত কিন্তু অনমনীয় উপাচার্যের কলমে, কখনও বা ন্যায়বিচার চেয়ে সাইকেল মিছিলে কলকাতা চলে আসা কোনো গ্রাম্য কিশোরের সাইকেলের প্যাডেলে। সেই সাহসের ভাষা ছাপ ফেলে যায় সমসাময়িক লেখা – আঁকা – সাহিত্যে – গানে।
যেমন ধরা যাক, শিল্পী উদয় দেবের আঁকা এই স্কেচ। (ছবি ১)
লাগাতার পাহাড় প্রমাণ রাজনৈতিক – প্রশাসনিক চাপের মুখেও পক্ষপাতহীন, যুক্তিনিষ্ঠ এবং আপসহীন অবস্থানে অবিচল প্রফেসর ডঃ শান্তা দত্ত দে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য, যিনি অযৌক্তিক কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষার দিন পরিবর্তন করেন নি, স্বাভাবিক ভাবেই শাসক দলের চরম বিরাগভাজন হয়েছেন। এমনকি শাসক দলের কুচোনেতারা তাঁকে ‘রাক্ষসী’ অভিধায় ভূষিত করে দেখে নেওয়ার হুমকি অবধি দিয়েছে।
অবশ্য এই সংস্কৃতি ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ শাসকের পরিচিত সংস্কৃতি। এর জোরেই শাসক দলের মুখপাত্র কখনো প্রকাশ্যে মহিলা সাংবাদিককে বিকৃত উচ্চারণে বিদ্রুপ করেন, আবার কখনো খুন – ধর্ষিতা হওয়া তরুণী ডাক্তারের বাবা কে ‘মানহানি’ – র আইনি নোটিশ পাঠিয়ে মুখ বন্ধ করতে চান। কখনো দুর্নীতিপরায়ণ স্বাস্থ্যমন্ত্রক প্রতিবাদী চিকিৎসকদের বেআইনি ভাবে পোস্টিং পরিবর্তন করে দেয়, আবার কখনো দলদাস পুলিশ প্রশাসন মিথ্যে মামলা দিয়ে হেনস্থা করে প্রতিবাদীদের। এই সংস্কৃতির বিপ্রতীপে সাহসী, শক্তিশালী ও ধারাবাহিক নাগরিক আন্দোলন আজ সময়ের দাবি।
ইতিমধ্যে আবার খবরে প্রকাশ, আর জি কর দুর্নীতি মামলায় তদন্তের জন্যে শাসক দলের বিধায়ক – চিকিৎসক সুদীপ্ত রায় ( ছাপ্পা ভোটে জিতে আসা ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিকেল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও কুখ্যাত উত্তরবঙ্গ লবির কিংপিন) এবং বিধায়ক অতীন ঘোষের বাড়িতে হানা দিয়েছে সিবিআই (ছবি ৩,৪)। প্রসঙ্গত, আজও আর জি কর – শ্যামবাজার – বেলগাছিয়া বস্তির আনাচে কানাচে কান পাতলে গত বছর ১৪ই আগষ্ট রাত দখলের মধ্যরাতে আর জি কর হাসপাতালের পরিকল্পিত সন্ত্রাস ও ভাঙচুরের ঘটনার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে অতীন ঘোষ ও তার পেটোয়া বাহিনীর নাম ভেসে আসে।


কিন্তু যে সিবিআই এক বছর ধরে খুন ধর্ষণের তথ্য প্রমাণ লোপাটের তদন্ত শেষ করে উঠতে পারল না, যাদের অপদার্থতায় হয়তো কয়েকদিন পর সন্দীপ ঘোষ দুর্নীতি মামলায়ও জামিন পেয়ে যাবে, তাদের এতদিন পরে মাঝে মাঝে এই শাসক দলের নেতাদের বাড়িতে ‘হানা দেওয়া’ গুলোকে হাইকোর্টের বিচারপতির কথা ধার করে ‘গ্যালারি শো’ ছাড়া কিছুই বলা যাচ্ছে না।
আবার বিচারব্যবস্থার প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা জানিয়েও আমরা বলতে বাধ্য হচ্ছি, যেভাবে সবকিছু চলছে তাতে সাধারণ মানুষ যাতে বিচারব্যবস্থা কেও ‘গ্যালারি শো’ ভাবতে বাধ্য না হন। একথা বলার কারণ হচ্ছে, এতগুলো শুনানি পেরিয়ে এসে গত ২৭শে আগষ্ট ও ২৮শে আগষ্ট অভয়ার খুন ধর্ষণ মামলার শুনানি কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চ থেকে ডিভিশন বেঞ্চে স্থানান্তরিত হল। যদি, স্থানান্তরই ভবিতব্য ছিল তাহলে মাঝের এতগুলো শুনানি সিঙ্গল বেঞ্চে হওয়ার প্রয়োজনীয়তাটা কী ছিল? এই অযাচিত অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রিতা কিন্তু ন্যায়বিচারের অন্তরায় বলেই আমরা মনে করি।
ঠিক একই জিনিস আমরা দেখেছি তিন জুনিয়র ডাক্তারের বেআইনি পোস্টিং সংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রে। সাত / আট দিন ধরে ঘণ্টার পর ঘন্টা শুনানি শুধুমাত্র লেগে গেল এটুকু সিদ্ধান্তে আসতে যে এটি হাইকোর্টের এক্তিয়ারে পড়ে, তারপর আবার মূল বিষয়ের শুনানি, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে রাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট অবধি যাওয়ার সম্ভাব্য পরিকল্পনা এসবই এখনও বাকি। আসলে সরকার নিজেও জানে যে এই মামলায় তারা হারবে, কিন্তু এই যে তারিখের পর তারিখ কোর্টে ছুটে সওয়ালের নামে শাসক দলের বিধায়ক আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর নাটুকেপনা দেখতে বাধ্য হওয়ার যে হয়রানি – এটাই চায় সরকার। এই হেনস্থাটুকু করার জন্যই এত আয়োজন, মানুষের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে এত আইনজীবী পোষা।
অন্যদিকে গত এক মাসে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ৮ জন জুনিয়র/ সিনিয়র ডাক্তার, মেডিকেল পড়ুয়া কে এক বছর Vlog মিছিল, অনশন, অবস্থান (পুলিশের হিসেবে এসব বেআইনি কাজ) এর ‘ সাক্ষী হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ ‘ এর জন্য বৌবাজার ও হেয়ার স্ট্রিট থানায় ডেকে পাঠানো হচ্ছে ভয় দেখানো ও হেনস্থার উদ্দেশ্যে। সেই তালিকায় নতুন করে আরও দুই সিনিয়র চিকিৎসক এবং দুই জুনিয়র ডাক্তার দেবাশিস হালদার ও পরিচয় পান্ডাকে ডেকে পাঠানো হয়েছে আগামী ৩ তারিখ, বুধবার। এ প্রসঙ্গে আমাদের সম্মিলিত ধারণা এই যে, আমরা যাতে আমাদের পরিকল্পনা মতো বিভিন্ন কাজ/ কর্মসূচি না বাস্তবায়িত করতে পারি তাই আমাদের ব্যতিব্যস্ত রাখার একটা মাধ্যম হিসেবে পুলিশি হয়রানিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই জায়গা থেকেই আমাদের সিদ্ধান্ত এই যে – আইনি পরামর্শ নিয়ে সমস্ত ‘তদন্তে’ (!) সহযোগিতা করা এবং এই পুলিশি হয়রানির বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে সংগঠিতভাবে সোচ্চার হওয়ার আবেদন আমরা করব কিন্তু ভয় দেখিয়ে, মামলা করে প্রতিবাদের কন্ঠরোধ ও সাংগঠনিক বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কর্মসূচিকে ব্যর্থ করার যে পরিকল্পনা শাসক পক্ষ করছেন – সেটাকে ব্যর্থ করাই আমাদের আগামীর মূল লক্ষ্য থাকবে।
হেনস্থার প্রসঙ্গে, আরও একটি তুচ্ছ কিন্তু হাস্যকর খবর জানিয়ে রাখা প্রয়োজন। আপনাদের নিশ্চয়ই শাসক দলের ভাড়াটে চিটিংবাজ রাজু ঘোষ কে মনে থেকে থাকবে, যিনি ক্রাউড ফান্ডিং নিয়ে জুনিয়র ডাক্তারদের বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ করে মামলা করতে গিয়ে বিধাননগর কোর্টের থাপ্পড় খেয়েছিলেন।
তো তিনি আবার নতুন করে হঠাৎ বোধ হয় পেমেন্ট পেয়েছেন, তাতে এবার ভোল পাল্টে ‘বিশিষ্ট’ মানবাধিকার কর্মী সেজে আবার একটা নতুন সংগঠন খুলে অত্যুৎসাহী হয়ে জুনিয়র ডাক্তারদের ‘ক্লাউড’ ফান্ডিং নিয়ে মিথ্যাচার করতে নেমেছেন ‘ক্রাই অফ দ্য আওয়ার’ মূর্তি সংক্রান্ত খরচ এর বিষয়টিকে সামনে রেখে, শিল্পীর নিজস্ব বক্তব্য ও ব্যাখ্যা সামনে রাখার পরও (ছবি ৫) । আশা করি আবারও কোনো ‘গণতান্ত্রিক থাপ্পড়’ ই একে ক্ষমতার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা ক্লাউড নাইন থেকে বাস্তবের মাটিতে আছড়ে ফেলবে।
এই কথাগুলো একসাথে বলার একটাই উদ্দেশ্য। আসলে সব কটা পরিকল্পনা এক সুতোয় গাঁথা। দলদাস পুলিশ প্রশাসন, হলুদ সাংবাদিক, ভাড়াটে মামলাকারী, শাসক দলের কুচো গুণ্ডা থেকে ক্রিমিনাল মুখপাত্র সকলে মিলে প্রতিবাদীদের মুখ বন্ধ করার জন্য, আন্দোলনকে স্তব্ধ করার জন্যে নখ দাঁত নিয়ে নেমে পড়েছে।
যুদ্ধ অসম, কিন্তু প্রবল ক্ষমতাবান অথচ অমেরুদন্ডী ক্লীবদের বিরুদ্ধে অনমনীয়, হার না মানা মেরুদণ্ডের সাহস দাঁড়িয়ে থাকছে অবিচল। ছড়িয়ে পড়া সাহসের স্ফুলিঙ্গরা জোট বাঁধছে, দাবানলের অপেক্ষায়।
West Bengal Junior Doctors Front













