‘বিচার চায় আর জি কর’ – এক বছর আগের এই আহ্বান আজও বাংলার রাজনীতি ও সমাজে দগদগে ছাপ ফেলে রেখে গেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে সংঘটিত নারকীয় ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড কেবল পুলিশ-প্রশাসনের ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি সমাজে প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এবং ‘রেপ কালচার’ এর স্থায়ীত্বকে নগ্নভাবে বহন করে নিয়ে চলেছে। এক বছর পর ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয় এই আন্দোলন ছিল কেবল বিচারের জন্য নয়, বরং তা একটি বৃহত্তর সমাজ সংস্কারের অঙ্গীকার। ‘ওয়াশ ইওর মাইন্ড’ দেয়াললিখন এখনও শহরের প্রাচীরে ও মনের অলিন্দে জীবন্ত হয়ে আছে। এটি যেন এক ক্ষয়িষ্ণু সমাজের মানবিক বিপ্লবের দিশা। যৌন হিংসার বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ কেবল আইনি শাস্তির দাবি নয়, বরং পিতৃতন্ত্রনির্ভর সমাজ কাঠামোর মৌলিক প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে আসে।
রেপ কালচার: একটি সামাজিক ব্যাধি
‘রেপ কালচার’, এটি কেবল অপরাধ নয়, বরং এমন এক সাংস্কৃতিক বাস্তবতা, যা নারীকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে তোলে এবং যৌন আগ্রাসনের প্রতি নীরব প্রশ্রয় দেয়। গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুসারে, ভারতের অবস্থান গত দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি ঘটেছে। ২০১৫ সালে ১৪৫টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ছিল ১০৮তম, যা ২০২৫ সালে ১৪৬টি দেশের মধ্যে নেমে এসেছে ১৩১তম স্থানে। লিঙ্গ সমতা স্কোর ২০১৫ সালে ৬৬.২% (০.৬৬২) থেকে ২০২৫ সালে সামান্য কমে দাঁড়িয়েছে ৬৪.৪% (০.৬৪৪), যা লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাসে ধীর ও অসম প্রগতির ইঙ্গিত দেয়। এই ‘নীরবতার সংস্কৃতি’ ধর্ষণকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টিকিয়ে রাখা ব্যাধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই প্রেক্ষিতে ধর্ষণকে সামাজিক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করে, কেবল শাস্তিনির্ভর প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকা আদতে একটি দ্বিধান্বিত ও হটকারি জননীতি হয়ে দাঁড়ায়। রোগ যদি সমাজে উৎপন্ন হয়, তাহলে তার নিরাময় কি শুধুই ব্যক্তি পর্যায়ে সম্ভব?
রেপ কালচার এমন এক সমাজগত অস্থিরতা, যা দৈনন্দিন জীবনে যৌন বিদ্বেষমূলক ব্যবহার, মনস্তাত্ত্বিক আগ্রাসন ও হিংসার বৈধতা তৈরি করে। শুধু ভারতে নয়, গোটা বিশ্বেই এই অপসংস্কৃতির প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ন্যূনতম অথচ এর সামাজিক মদত সর্বব্যাপী। জাতিসংঘের লিঙ্গ সমতা সংক্রান্ত তথ্য অনুসারে, বিশ্বজুড়ে প্রতি তিন জন নারীর মধ্যে একজন যৌন হিংসার শিকার হন, তাদের মধ্যে মাত্র ৪০ শতাংশ সাহায্য চান, এবং তাদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশই পুলিশের কাছে পৌঁছাতে পারেন। ধনী বা দরিদ্র সব সমাজেই এই চিত্রে খুব একটা পার্থক্য নেই।
গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টের তথ্য আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতের লিঙ্গ বৈষম্যের চিত্র বহুমাত্রিক। অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগের ক্ষেত্রে ভারতের স্কোর ২০১৫ সালে ৪২.৯% থেকে ২০২৫ সালে হ্রাস পেয়ে হয়েছে ৪০.৭%, বর্তমানে ভারতের স্থান ১৪৪ যা নিচের দিক থেকে দ্বিতীয়। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ভারতের পারফরম্যান্স উদ্বেগজনকভাবে পিছিয়ে গেছে, স্কোর ২০১৫ সালে ২৭.১% থেকে হ্রাস পেয়ে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ২০.৫%। মন্ত্রী পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ ২০১৫-এর ৯.৫% থেকে কমে ২০২৫-এ হয়েছে ৫.৬%, এবং সংসদে নারীদের উপস্থিতি বর্তমানে মাত্র ১৩.৮%, যা ২০১৫ সালের মতোই অপর্যাপ্ত। এই পরিসংখ্যানগুলো দেখায়, যৌন হিংসার প্রসঙ্গে শুধুমাত্র দুর্নীতি বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক স্ববিরোধিতা এবং সামাজিক স্বার্থরক্ষাকারী নিশ্চুপতা কাজ করে।
একটি নেতৃত্ববিহীন জন-আন্দোলন
আর জি কর আন্দোলনের অনন্যতা ছিল এর নেতৃত্ববিহীনতা, যার ফলে তা দখলদারিত্ব ও দলীয় সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত থাকতে পেরেছে। রাজনৈতিক পরিসরে এই ঘটনাকে প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে চিত্রিত করা হলেও, নাগরিক সমাজে আন্দোলনটি গড়ে ওঠে কাঠামোগত প্রশ্নকে কেন্দ্র করে নারীর দিন ও রাতের দখল ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ঘিরে। রাজনৈতিক দলগুলো ধর্ষণের নিন্দা করলেও, তারা নারীর স্বাধীনতার প্রশ্নে আজও শঙ্কিত। ফাঁসির আইন নিয়ে দলমত নির্বিশেষে ঐকমত্য থাকলেও, সামাজিক কাঠামো বদলের প্রশ্নে সব দলই নীরব। বরং আন্দোলনের প্রেক্ষিতে প্রশাসন নারী আচরণ নিয়ে এক আদর্শিক আচরণবিধির কল্পচিত্র আঁকে যা আসলে নারীকে সামাজিক পরিসরে নিয়ন্ত্রণের নতুন ভাষ্য। এইখানেই সামাজিক আন্দোলনের আলাদা অবস্থান, অপরাধের শাস্তির দাবি সত্ত্বেও এখানে নারী স্বাধীনতার অপূর্ণ স্বপ্ন কেন্দ্রে আসে। এই স্বপ্নে রাজনৈতিক দলগুলো শরিক নয় বলেই তারা জনমানুষের আন্দোলনে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। আর সেই ফাঁকেই উঠে আসে জুনিয়র ডাক্তারদের অবস্থান বিক্ষোভ ও সাধারণ মানুষের পূর্ণ সমর্থনে গড়ে ওঠা এক নৈতিক জোট, যা ক্ষমতার সমান্তরালে এক নৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
জন স্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে লিঙ্গ-সমতার সংগ্রাম
বিশ্বজুড়ে রেপ কালচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কেবল আইনি নয়, বরং তা সামাজিক ন্যায়, লিঙ্গ সমতা এবং সম নাগরিকত্বের দাবি নিয়ে গড়ে ওঠে, যা সামাজিক স্বাস্থ্যের শিকড়ের প্রশ্ন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই অপসংস্কৃতির অবসানে আমাদের প্রয়োজন সামাজিক প্রতিষেধক, যা রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রয়াসে নির্মিত হতে পারে। নারীর স্বাস্থ্যকে শুধুই জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে সীমিত না রেখে, যৌন বিদ্বেষমূলক আচরণের সামাজিক উৎপত্তিস্থল চিহ্নিত করা এবং সেগুলির প্রতিরোধে কার্যকর নীতি তৈরি করাই জরুরি। এটি কেবল স্বাস্থ্য নীতি নয়, এটি জন নীতির সম্প্রসারিত রূপ।
কিন্তু সামাজিক রোগের চিকিৎসা শুধু স্বাস্থ্যনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে আইন, অর্থনীতি এবং পারিবারিক কাঠামোর প্রশ্নও সমানভাবে জড়িত। নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যে নীতি-প্রস্তাব রয়েছে, তা আমাদের আন্দোলনের দাবি ও বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে মিলে যায়।
লিঙ্গ-সমতার প্রশ্নে লড়াই কেবল আইন প্রণয়ন নয়, এটি মূলত সামাজিক ক্ষমতার কাঠামো ভাঙার সংগ্রাম। আর জি কর আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিচার চাইলে কেবল অপরাধীর ফাঁসি নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়িত্বের পুনর্নির্মাণ। বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত কাঠামো অনুযায়ী নারীর অধিকার রক্ষার জন্য বৈষম্যবিরোধী আইন, সংসদ ও নির্বাচিত সংস্থায় সংরক্ষণ, সমান নাগরিকত্বের অধিকার এবং আইনি সহায়তার ব্যবস্থা অপরিহার্য। একইভাবে, গার্হস্থ্য হিংসা, যৌন হয়রানি বা বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং তার প্রতিরোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি না হলে ‘রেপ কালচার’-এর সামাজিক শিকড় অক্ষত থেকে যায়। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সমান মজুরি, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি, শিশুসেবার সামাজিক ব্যবস্থা, এসব নীতি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কার্যকর হয় না। পরিবার ও ব্যক্তিজীবনে নারীর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে ন্যূনতম বিয়ের বয়স কঠোরভাবে রক্ষা করা, পেশা নির্বাচনের স্বাধীনতা এবং বিবাহবিচ্ছেদের পর সম্পত্তিতে সমান অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। এগুলো নিছক সংস্কারমূলক প্রস্তাব নয়, বরং পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। তাই আন্দোলনের প্রশ্ন একটাই, আমরা কি বিচারকে কেবল শাস্তির সীমায় আটকে রাখব, নাকি লিঙ্গ সমতার কাঠামো নির্মাণে সমাজ ও রাজনীতিকে বাধ্য করব?
অতএব, আইন ও নীতির প্রশ্নগুলোকে জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক ন্যায়ের বৃহত্তর লড়াইয়ের সঙ্গে একসূত্রে গাঁথাই আর জি কর আন্দোলনের মূল শিক্ষা। এখানেই আন্দোলন কেবল বিচারের দাবি নয়, বরং একটি নতুন সমাজ চর্চার আহ্বান।এই লক্ষ্যপূরণে তিনটি পদক্ষেপ অপরিহার্য। প্রথমত, নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে হিংসার ধরন ও মাত্রা বোঝার জন্য নির্ভরযোগ্য সূচক নির্ধারণ এবং তার ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ জরুরি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সূচকগুলিকে ভারতীয় বাস্তবতায় উপযোগী করে তুলে এনে ধারাবাহিক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরিস্থিতির গভীরতা ও প্রবণতা অনুধাবন করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, যৌন বিদ্বেষমূলক আচরণের যে সামাজিক উৎস ও পুনরুৎপাদনের প্রক্রিয়া রয়েছে, তা চিহ্নিত করা জরুরি। এর মধ্যে পরিবার কাঠামো, ধর্মীয় অনুশাসন, ভাষা ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির উপস্থাপনা, এইসব উপাদান কীভাবে পিতৃতন্ত্রকে সামাজিকভাবে স্থায়িত্ব দেয়, তা বিশ্লেষণ করে প্রতিরোধমূলক কৌশল তৈরি করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দেহগত অধিকারকে সম্মান জানিয়ে একটি সমন্বিত সামাজিক ও জন স্বাস্থ্য নীতি বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে উঠেছে। রাজ্য ও জাতীয় পর্যায়ে আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়ে এমন নীতি প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে, যেখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
আর জি কর আন্দোলনের এক বছরপূর্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয় এটি একটি ঘটনাবিশেষের প্রতিক্রিয়া নয়, বরং তা এক গহীন সমাজ-স্বাস্থ্যের প্রশ্ন। এই আন্দোলন লিঙ্গ সমতা, মানব মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়ের দাবিকে কেন্দ্র করে বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন সমাজ-সংস্কার পর্বের সূচনা করেছে। রাজনৈতিক দলগুলো যখন প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা শাস্তিমূলক আইনের আশ্বাস দিয়ে নিজেদের দায়মুক্ত করতে চায়, তখন এই আন্দোলন সমাজের গভীরতর অসুখগুলিকে সামনে আনে।
আজ প্রশ্ন একটাই, আমাদের রাজনীতি কি সমাজ সংস্কারের পথে এগোব, না কি আইন ও শাস্তির আড়ালে বাস্তবকে ঢেকে রাখব? আইনি বিচার যখন বিলম্বিত, আর জি কর আন্দোলন দেখায় ন্যায়ের পথে একটি মানবিক সমাজ গঠনের আহ্বান।
লেখক দি জেনিভা গ্রাজ্যুয়েট ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যুক্ত
(এই লেখাটি এই সময় প্রত্রিকায় ‘ব্যাক্তির শাস্তিতে কী হবে, যদি সমাজ না পাল্টায়’ শিরোনামে ২৮ আগস্ট ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত হয়েছে: https://eisamay.com/editorial/read-the-special-editorial-article-about-physical-assault-in-eisamay/200409521.cms












মননঋদ্ধ লেখা। বিচারের চেয়ে বদলের প্রয়োজন বেশি – এই সত্য টা বারংবার সামনে আনার প্রয়োজন। তবে তার সঙ্গে এটাও ঠিক যে নেতৃত্ব হীন আন্দোলন এগোতে পারবে না। রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে অদলীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ই আন্দোলনের দিশা দেখাবে।