৯/৬/২০২৬
আমরা সবাই জানি অভয়ার খুন-ধর্ষনের মামলায় নতুন SIT গঠনের নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাই কোর্ট। অভয়া মামলা আবার এসেছে সংবাদ পত্রের হেডলাইনে, ন্যায়বিচারের আশা আবার একটু জোরালো হয়েছে মানুষের মনে। আমরাও আশাবাদী। কিন্তু বিগত দিনে তদন্তের গতি প্রকৃতি দেখে, তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে প্রথমে কলকাতা পুলিশ, তারপর সিবিআই এর কাজকর্ম দেখে সংশয় ও জাগে মনে। বিগত প্রায় দুই বছরের তদন্ত ও আইনি লড়াই এর দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখব দেশের সর্বোচ্চ তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই তদন্ত করার পরেও কীভাবে বহু অস্বচ্ছতার মধ্যে দীর্ঘসূত্রী হয়েছে এই প্রক্রিয়া, কীভাবে বহু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি আজও, কীভাবে বারবার আশা জাগিয়েও শেষমেশ নিরাশ হতে হয়েছে আমাদের, বিচার রয়ে গেছে অধরা। অভয়ার বাবা সম্প্রতি প্রকাশ্যে সিবিআই এর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করলেন তার পর সিবিআই এর প্রতি আস্থা আরও একটু ধাক্কা খেল। তবুও, আমরা আশাবাদী, প্রচারের ঢক্কানিনাদের পর কাজের কাজ দেখার জন্য, ন্যায় বিচার পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে আছি আমরা।
এই পরিস্থিতিতে একবার সংক্ষেপে ফিরে দেখি অভয়ার হত্যা মামলার আইনি গতি প্রকৃতি।
২০২৪ সালের ৯ আগষ্ট নিজের কর্মক্ষেত্রে নৃশংস ভাবে খুন হলেন আমাদের সহকর্মী অভয়া। এর পর একদিকে যেমন আমরা পথের লড়াই তে থেকেছি, তেমনই অন্যদিকে লড়াই করেছি আদালত কক্ষের ভেতরে। ১৩ আগষ্ট অভয়ার বাবা-মায়ের করা কেসের ভিত্তিতে তদন্তভার সিবিআই এর হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দেয় কলকাতা হাই কোর্ট। ১৮ আগষ্ট সুপ্রিম কোর্ট স্বত:প্রণোদিত মামলা দায়ের করে যার প্রথম শুনানি হয় ২০ আগষ্ট। সেই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে সিবিআই তদন্তের কথা বলা হয়, সিবিআই তদন্তের স্ট্যাটাস রিপোর্ট মুখবন্ধ খামে জমা দিতে থাকে শুনানির সময়। একইসাথে সুপ্রিম কোর্ট হাসপাতাল গুলোতে নিরাপত্তার জন্য, স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর ঘটে চলা আক্রমণের প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তৈরি করে ন্যাশনাল টাস্ক ফোর্স। অভয়ার ধর্ষণ-খুন সংক্রান্ত ফৌজদারি অংশ এবং হাসপাতালে নিরাপত্তা সংক্রান্ত টাস্ক ফোর্সের দেওয়ানি অংশ – দুটো নিয়েই মামলা চলতে থাকে সুপ্রিম কোর্টে।
ইতিমধ্যে সিবিআই প্রাথমিক চার্জশিট পেশ করে, এবং সঞ্জয় রাই এর বিরুদ্ধে মামলা শুরু হয় শিয়ালদহ ফৌজদারি আদালতে। প্রাথমিক চার্জশিটে সিবিআই তথ্যপ্রমাণ লোপাটের কথা বলে এবং পরবর্তীতে সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিটে দেওয়ার কথাও বলে। তথ্যপ্রমাণ লোপাটের কাজে যুক্ত থাকার অভিযোগে টালা থানার তৎকালীন ওসি অভিজিৎ মন্ডল এবং আর জি করের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ কে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে সিবিআই আর সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট পেশ করেনি। জামিন পান অভিজিৎ মন্ডল আর সন্দীপ ঘোষ, যদিও আর্থিক দূর্নীতির মামলায় সন্দীপ ঘোষ এখনও জেলে (এই আর্থিক দূর্নীতির মামলায় গ্রেফতার হয় থ্রেট কালচারের অন্যতম মাথা, আর জি করের তৃনমূল ছাত্র পরিষদের নেতা আশিষ পান্ডে)। শিয়ালদহ আদালতে শুনানির শেষে কেবলমাত্র সঞ্জয় রাইকেই দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সঞ্জয় রাই একাই এই সব কিছু ঘটিয়েছে এবং তার মত এক সিভিক ভলান্টিয়ারকে বাঁচাতে এত তথ্য প্রমাণ লোপাট করা হয়েছে – এটা আমরা মেনে নিতে পারিনি, মেনে নিতে পারেন নি অভয়ার বাবা-মা। তাঁরা সিবিআই তদন্তের বিভিন্ন অসঙ্গতি, বিভিন্ন ফাঁকফোকর নিয়ে প্রশ্ন করে আরও তদন্ত করার জন্য আবেদন করেন কলকাতা হাই কোর্টে। সাথে সিবিআই সঞ্জয়ের ফাঁসির দাবি জানিয়ে, আর উল্টোদিকে সঞ্জয় রাই নিজের শাস্তির বিরোধিতা করে যায় হাইকোর্টে।
অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট নিজের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে করা মামলার শুনানি করতে থাকে অতি মন্থর গতিতে। রাজপথে আন্দোলনের ঝাঁজ যখন তীব্র ছিল তখন দ্রুত শুনানি হচ্ছিল। কোর্টের দিকে তাকিয়ে যখন পথের আন্দোলন স্তিমিত হল, সুপ্রিম কোর্টের শুনানির তারিখের ব্যবধান তত দীর্ঘ হতে থাকল। সুপ্রিম কোর্ট নিজে যে টাস্ক ফোর্স গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল, সেই টাস্ক ফোর্সের সুপারিশ নিয়ে বা তার প্রয়োগ নিয়ে কোন স্পষ্ট নির্দেশ কোর্ট দিল না। বরং ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের শুনানিতে সমস্ত মামলা পাঠিয়ে দিল কলকাতা হাই কোর্টে। সুপ্রিম কোর্ট ঠিক কী কারণে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করেছিল, কেনই বা বিষয়গুলোর স্পষ্ট সমাধান না করে আবার হাই কোর্টে তা ফেরত পাঠিয়ে দিল – স্পষ্ট হল না কিছুই।
এর মধ্যে সিবিআই তদন্তের অসঙ্গতি দেখিয়ে অভয়ার মা-বাবা যে মামলা করেছিলেন কলকাতা হাই কোর্টে, তার শুনানি ছাড়াই তারিখ পিছতে লাগল বারবার। সাথে পাল্লা দিয়ে চলল বিচারপতি পরিবর্তন – শুনানি ছাড়াই বারবার এক বিচারপতি থেকে অন্য বিচারপতি, এক বেঞ্চ থেকে অন্য বেঞ্চে যেতে থাকল মামলা। এই পরিস্থিতিতে আদালতের দীর্ঘসূত্রিতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করার দাবি জানিয়ে হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি কে চিঠি লিখলেন মহিলা জুনিয়র ডাক্তাররা। এরপর বহুদিন পর শুনানি হল এই মামলার। কিন্তু আবার আদালতের বেঞ্চ বদল হল।
আদালতে ‘তারিখ পে তারিখ’ চলতে চলতে চলে এল রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন। দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করার পর অভয়ার বাবা-মায়ের মনে হল ক্ষমতা দখল না করলে বিচার পাওয়া যাবে না। বিধানসভা নির্বাচনে দাঁড়ালেন অভয়ার মা, এবং জিতলেন। এই জয়ের পর আবার খানিক নড়াচড়া দেখা গেল আদালতের অন্দরে, কলকাতা হাইকোর্টে নতুন বেঞ্চ গঠিত হয়ে মামলার শুনানি শুরু হল। হাইকোর্টের নির্দেশে নতুন সিট গঠিত হল তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সাসপেন্ড হলেন তদন্তের সাথে জড়িত কলকাতা পুলিশের তিন আই পি এস অফিসার ।
কিন্তু এই পুরো ঘটনাবলী দেখলে বারবার প্রশ্ন জাগে এই তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে, প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড়ায় সিবিআই এর বিশ্বাসযোগ্যতা। কেন তদন্ত প্রক্রিয়া এত দীর্ঘসূত্রী হচ্ছে, তদন্তে এত সময় লাগছে? কেন সিবিআই সাপ্লিমেন্টারি চার্জশীট দিল না? কেন তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার পরেও সন্দীপ ঘোষ, অভিজিৎ মন্ডল জামিন পেয়ে গেল? কেন সিবিআই বারবার সঞ্জয় রাইকে একমাত্র দোষী বলে দেখতে চাইছে? তথ্য প্রমাণ লোপাটের সাথে কারা জড়িত, তা নিয়ে কতদূর তদন্ত হল, আদৌ কি তা নিয়ে তদন্ত চলছে? তদন্ত প্রক্রিয়ার বিভিন্ন অসংগতি নিয়ে, বিভিন্ন প্রশ্ন করে হাই কোর্টে মামলা করেছেন অভয়ার মা-বাবা, সেই প্রশ্ন গুলোর উত্তর কোথায়? ঠিক কী কারণে আদালত কক্ষে অভয়ার বাবাকে দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু কথা বলানো হয়েছিল, ‘শেখানো তোতাপাখি’ করে রাখা হয়েছিল?
এই তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে এরকম অজস্র প্রশ্ন আছে। তার পরেও আমরা আশা রাখি নতুন SIT স্বচ্ছ ভাবে তদন্ত করবে, এই ঘটনার সাথে জড়িত সমস্ত দোষীরা শাস্তি পাবে। অভয়া বিচার পাবে, আমরা বিচার পাব। বারবার নিরাশ হওয়ার পরেও আশা নিয়েই এই তদন্ত আর বিচার প্রক্রিয়ার ওপর নজর রাখছি আমরা।
We demand justice. We deserve justice.









