ফের এ বছরেও চিকিৎসাবিদ্যায় ভর্তির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট ইউজি-র প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটল। এই বছরে নিয়ে গত পাঁচ বছরে চতুর্থবার। এর জন্য প্রশ্ন তৈরি করে যে সরকারি সংস্থা সেই এনটিএ সুপ্রিম কোর্টের কাছে ভর্ৎসনা শুনেছে। তাতে কী? প্রতিবার প্রশ্ন ফাঁসের পর সিবিআই তদন্ত করে। নিচু স্তরে দুচারজন ধরা পড়ে। তারপর ধামা চাপা পড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত অন্তরালে থাকা আসল চক্র চলতেই থাকে। আর বছর বছর রাত জেগে দিনের আঠেরো ঘণ্টা পড়াশুনো করে যে ২০-২২ লাখ ছাত্রছাত্রী বাবা মায়ের সঞ্চিত ধনে ডাক্তারির স্বপ্ন দেখে, তাদের পরীক্ষা বাতিল হয়ে যায়। তাহলে লাভ কার? লাভ কুড়ায় শুধুমাত্র কোচিং ইনস্টিটিউটিগুলো যারা সর্বভারতীয় ডাক্তারি পড়ার কোচিং দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা ফি নেয়। ছাত্রদের ভবিষ্যতের বিনিময়ে সাধারণ মধ্যবিত্তের অর্থ আত্মসাতের এর থেকে ভালো ব্যবস্থা আর কী হতে পারে?
এটা শুধু ডাক্তারি পরীক্ষা নিয়ে নয়। সরকারের ৮৯ টি পরীক্ষা এভাবেই প্রশ্ন ফাঁসের জন্য স্থগিত করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করার চক্র চলছে যাতে কোচিং ইনস্টিটিউট থেকে প্রশ্ন ফাঁসের দালাল সহ সরকারের শিক্ষা বিভাগ , সি বি এস সি, বিভিন্ন রাজ্যের বোর্ড, এন আই টি র মতো প্রবেশিকা ও সরকারি চাকরি পরীক্ষার প্রশ্নকর্তা সংস্থার শীর্ষ স্তর পর্যন্ত যুক্ত।
নইলে বারবার পরীক্ষার্থী বাছাই করে, তার প্রশ্নপত্র কী ভাবে বার বার বেরিয়ে আসে? কীভাবে বেহাত হয়? এসব প্রশ্ন তুলেছে শীর্ষ আদালত। সপ্তাহ খানেক আগেই সুপ্রিম কোর্টের কাছে তিরস্কৃত হয়েছে নিট-এর আয়োজক সংস্থা। কয়েক দিন পরেই নিট-এর পুনঃপরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসেরও অভিযোগ উঠল। এতেই প্রমাণিত যে প্রশ্ন ফাঁসের চক্র অনেক গভীরে। দু চার জন প্রশ্নকর্তা শিক্ষক শিক্ষিকা বা সংশ্লিষ্ট কর্মীর কাজ এটা নয়। প্রতিবারই সিবিআই কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কয়েকজনকে ধরে আনার পর সেই তদন্ত শেষ হয় নি। চার্জশিট হয় নি।
এর পরও আর সন্দেহ থাকে না যে নিট-এর অসাধু চক্র এখনও সক্রিয়। সরকার যে পুনঃপরীক্ষা (যাকে রি-নিট বলছেন পরীক্ষার্থীরা) হওয়ার ২১ জুন কথা, তারও প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জানা গেল, সেই প্রশ্ন টেলিগ্রাম সমাজমাধ্যমে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে। সেই সমাজমাধ্যমের ছবি, লিংক একাধিক চ্যানেলের লিঙ্ক এবং প্রশ্নপত্র বিক্রির প্রামাণ্য ছবি-সহ এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে পোস্ট করেছিলেন এক নেটাগরিক। নিট ইউজি-র সি সংস্থা এনটিএ সেই পোস্ট দেখে দ্রুত পদক্ষেপ করার কথাও জানিয়েছে।
এক্স হ্যান্ডলে ওই প্রশ্নপত্র বিক্রির যে সব ছবি প্রকাশ্যে এসেছে, তার মধ্যে একটিতে দেখা যাচ্ছে প্রিন্টার থেকে পাতার পর পাতা প্রশ্নপত্র প্রিন্ট হয়ে বেরিয়ে আসছে। অন্য একটি ছবি টেলিগ্রাম চ্যাটবক্স-এর স্ক্রিনশট। ‘প্রাইভেট মাফিয়া’ নামের একটি গ্রুপে প্রশ্নপত্রের কিছু ছবি দিয়ে লেখা হয়েছে ‘‘৫০০ সদস্য যোগদান করলেই গ্রহণ করা হবে।’’ কী গ্রহণ করা হবে তা স্পষ্ট না বললেও বোঝা যায়— প্রশ্নপত্রের বিনিময় মূল্য বা আগাম মূ্ল্য নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কারণ তার পরের চ্যাটেই লেখা হয়েছে, ‘‘কাল থেকে আগাম হিসাবে ৩৫ হাজার টাকা করে নেওয়া হবে।’’ আরও একটি স্ক্রিনশট ‘প্রুফ’ নামে একটি টেলিগ্রাম চ্যানেলের। যা ৩ জুন তৈরি হয়েছে। সেখানে প্রশ্নপত্র হাতে তুলে প্রমাণ হিসাবে দেওয়া হয়েছে । কিছু প্রশ্নপত্র প্রিন্ট করার জন্য। নীচে লেখা, ‘‘উপরের ছবিতে ৫০০টি লাইক পড়লে ১০টি প্রশ্নের উত্তর গ্রুপেই দিয়ে দেওয়া হবে।’’ এদিকে ‘প্রিন্স শ্রীবাস্তব’ নামের এক্স হ্যান্ডেল থেকে ওই সমস্ত ছবি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, ‘‘তিনটি টেলিগ্রাম চ্যানেল থেকে একজন ব্যক্তিই রি-নিট ২০২৬-এর প্রশ্নপত্র বিক্রির দাবি করছে। এখানে ওই তিন টেলিগ্রাম চ্যানেলের লিঙ্ক দিলাম, এনটিএ এবং ভারতীয় সাইবার ক্রাইম বিভাগ ব্যবস্থা নিক।’’
শুধু কি নিট??
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ১৫টি রাজ্য জুড়ে নিয়োগ পরীক্ষায় তদন্ত করে জানিয়েছে,গত পাঁচ বছরে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে ৪১টি পরীক্ষায়। প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রায় ১.৪ কোটি চাকরিপ্রার্থীর জীবনকে আঁধারে ঠেলেছে। যাঁরা ১.০৪ লক্ষেরও বেশি পদের জন্য আবেদন করেছিলেন।
তাহলে দরকার কি সরকারকে? লোকসভায় প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রতিরোধের জন্য মোদি সরকার একটি বিল আনে। তারা বলেন যে ওই বিল আইন হলে এটি “রাজ্যদের বিবেচনার ভিত্তিতে গ্রহণ করার জন্য একটি মডেল খসড়া” হিসাবে কাজ করবে। এটি আরও সময়োপযোগী হতে পারে না। কারণ, এটা রাজ্যে যে পরীক্ষা ফাঁসের সমস্যা সবচেয়ে তীব্র – এবং ব্যাপক।
বলা হচ্ছে, এরপর প্রশ্নপত্র সেট করার সময় আর পরীক্ষার নাম উল্লেখ থাকবে না। ফলে প্রশ্ন ফাঁস হবে না।
কিন্তু জেন জি দেখিয়ে দিল সর্বশেষ CBSE পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও কিভাবে সর্ষের মধ্যে ভূত লুকিয়ে। তাই এটাই চলছে।
আসলে ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যত ও অভিভাবকদের স্বপ্নকে পণ্য করে গোটা ছাত্র সমাজকেই একটা বাজার হিসেবে তৈরি করা হয়েছে বিজেপি সরকারের শিক্ষা নীতিতে। কিন্তু কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই কেন্দ্র ও বিজেপি রাজ্য সরকারের পরিচালিত সমস্ত পরীক্ষা প্রশ্নপত্র এবং মূল্যায়নের প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে বাজারি দুর্নীতি। এদেশের পুঁজি ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে রাজনৈতিক বাটোয়ারা করে দুর্নীতির মধ্যে থেকে বিকশিত হওয়ার চেষ্টা করে। নিট ও সর্বভারতীয় বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বারবার ফাঁস হওয়া সেটাই প্রমাণ করে।
লক্ষ লক্ষ ছাত্র যুব এটা বুঝে গেছে। আজ তাই তারা রাস্তায়। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত তাই বলেই ফেললেন, এরা সিস্টেমটাকে আঘাত করছে। এরা সব ‘ককরোচ'( আরশোলা)!! কীসের সিস্টেম? সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়া নাকি পরীক্ষার নেওয়ার নামের প্রশ্নপত্র ফাঁসের সিস্টেম?
ঘরে যখন নোংরা জমে, তখনই তো বেরিয়ে আসে আরশোলা!!
এখন এদেশে আরশোলারাই ভরসা।
পুনশ্চ:
উপর্যুপরি উদ্ঘাটিত তিন-তিনটি কেলেঙ্কারি নিট ইউজি ২০২৪ ও ২৬ ডাক্তারি প্রবেশিকা (২২-২৪ লাখ প্রত্যাশী), ইউজিসি নেট ২৪ জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর (৭- ১১ লাখ) এবং সিবিএসই পরীক্ষার অপটিক্যাল মার্ক রেজিস্ট্রেশন (ওএমআর) ব্যবস্থা যাতে ভুক্তভোগির সংখ্যা নাই নাই করে ১ কোটি ৭০ থেকে ৮০ লক্ষ। সব মিলে একটি মাত্র কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রকের কেবল তিনটি প্রবেশিকা পরীক্ষায় ভুক্তভোগির সংখ্যা যে ২ কোটিও ছাড়িয়ে।
২০২৪-এর প্রশ্ন ফাঁসের পর গঠিত রাধাকৃষ্ণন কমিটির শতাধিক সুপারিশ কার্যকর হয় নি। বলা হয়েছিল, অনলাইন কম্পিউটার-নির্ভর পরীক্ষার আয়োজন করতে জয়েন্ট এন্ট্রান্স এঞ্জিনিয়ারিং (মেন) পরীক্ষার মতো। সেটাও হয় নি। আসলে মোদি সরকারের অদক্ষতা ও দুর্নীতির বলি ছাত্রসমাজ। নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কেলেঙ্কারি ও পরীক্ষা বাতিল হওয়া থেকে শুরু করে; ‘সিবিএসই’ পরীক্ষা এবং বর্তমানে ‘সিইউইটি’ পরীক্ষাকে ঘিরে বারবার দেখা দেওয়া ব্যর্থতা পর্য কোনো বড় পরীক্ষাই এখন আর সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছেন। সরকারের অদক্ষতা ও অবহেলার কারণে এক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী এবং তাদের পরিবার এখন অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ ও চরম মানসিক চাপের শিকার।
প্রশ্নপত্র ফাঁস, সার্ভার বিকল হওয়া, পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়া, অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনা; এসবই এখন যেন এক ‘নতু স্বাভাবিক’ (নিউ নরমাল) ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, বরং এটি একটি সমগ্র প্রজন্মের সাথে করা চরম বিশ্বাসঘাতকতা। এনটিএ -কে অবিলম্বে বিলুপ্ত করা উচিত এবং এর পরিবর্তে একটি বিকেন্দ্রীভূত, সুদৃঢ় ও স্বচ্ছ পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।









