রাত্রিবেলা সুইচ দিতে ভুলে গেছিলাম। সকালবেলা উঠে কেলেঙ্কারি কাণ্ড।
এমনিতেই দেরিতে উঠেছি। ভেবেছিলাম জামা প্যান্ট পরবো, আর বেরিয়ে যাব। দাঁত টাত ভোরের চেম্বার করে এসে মাজব।
ছটা থেকে চেম্বার। ঠিক ছ’টাতেই উঠেছি। উঠে দেখি সুইচ দিতেই ভুলে গেছি।
আমার ইলেকট্রিক স্কুটার। গতকাল চার্জ প্রায় শেষ হওয়ার পর রাত্রে চার্জে বসিয়েছি। ভেবেছিলাম শোয়ার আগে নেমে সুইচ অন করে দিয়ে যাব। সেটা ভুলে গেছি।
গৌরের চেম্বারে যাওয়ার কথা। গৌরকেই ফোন করলাম। ফোন পরিষেবা সীমার বাইরে। ওর ফোন এক অজানা কারণে বেশিরভাগ সময় পরিষেবা সীমার বাইরেই থাকে।
তখন বিপদের মধুসূদন প্রদীপকে ফোন করলাম। প্রদীপ পাশের পাড়ায় থাকে। একটা লড়ঝড়ে বাইক আছে। দয়া করে যদি পৌঁছে দেয়।
তিনবার ফোন করার পর ফোন ধরল। ঘুম জড়ানো স্বরে বলল, কী হলো দাদা?
পরিস্থিতি বললাম। প্রদীপ বলল, চাপ নেই, আমি তিন মিনিটের মধ্যে আসছি। বাথরুমও করবো না। একেবারে গৌরদাদের চেম্বারে গিয়ে ওখানে কোথাও করব।
আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি তো দাঁড়িয়েই আছি। এতক্ষণে গৌরের চেম্বারে লোকজন আমার মুণ্ডুপাত করতে শুরু করেছে। ওখানে যারা দেখাতে আসেন, তাঁরা বেশিরভাগ শ্রমজীবী শ্রেণির। সকাল সকাল ডাক্তার দেখিয়ে কাজে ছোটেন।
১৫ মিনিট বাদে দেখি হাসি হাসি মুখ করে প্রদীপ আসছে। আমায় দেখে বলল, একটু দেরি হয়ে গেল। আসলে কাল রাত জেগে আর্জেন্টিনার খেলা দেখেছি তো।
মিনিট দশেকের মধ্যে গৌরের চেম্বারে হাজির হলাম। ভিড় বেশ কম। সবাই রাত জেগে খেলা দেখছে কিনা কে জানে?
চটপট রোগী দেখে ফেরার পথ ধরলাম। তখনো মধ্যমগ্রামের অনেক লোক ঘুম থেকে ওঠেনি।
প্রদীপ বাইক চালাতে চালাতে বলল, খবর শুনেছেন?
কী খবর?
সব দোকানে নোটিশ দিয়ে দিয়েছে। ৭ই জুলাইয়ের মধ্যে দোকানের সব সরিয়ে নিতে হবে।
বললাম, তোমার বাবার তো হকার্স মার্কেটে চায়ের দোকান। স্টেশনের উপরে তো না?
প্রদীপ বলল, তাতে কী হয়েছে? ওটাও তো রেলের জমি। বাবা ত্রিশ বছর ধরে দোকান করছে। কী যে হবে কে জানে?
বললাম, তুমি তো এম আর এর চাকরিতে ঢুকেছো।
প্রদীপ হেসে বলল, হ্যাঁ, এখন থেকে ওটাই পরিবারের একমাত্র আয়। কিন্তু মুশকিল হলো ওই টাকায় পাঁচজনের সংসার চলবে না।
আমি বললাম, বুঝলুম। কিন্তু তুমি আস্তে বাইক চালাও। নিজের ফ্রাস্টেশন বাইকের উপর ঝেড়ো না।
প্রদীপ হাসলো। বলল, আপনি চাপ নিয়েন না। বাইক চালাতে চালাতে এমন অবস্থা হয়েছে, আমি এখন চোখ বন্ধ করেও বাইক চালাতে পারি।
তারপর বলল, চলেন, আমাদের দোকানে শেষ চা খেয়ে নেন। আর তো চা খাওয়াতে পারব না।
বললাম, সবে সাড়ে আটটা বাজে। এরমধ্যে দাদুর হাজমোলা দেওয়া গ্লাস ভর্তি দুধ চা দুবার খেয়েছি। আর চা খাইও না।
প্রদীপ বলল, এটা আপনি চা খাবেন না, ত্রিশ বছরের ইতিহাস খাবেন- যদিও ইতিহাস আমাদের মতো সামান্য মানুষের জন্য নয়।
বললাম, চলো তাহলে।
প্রদীপের বাবা অমায়িক ভদ্রলোক। দোকান আর কদিন বাদেই বুলডোজার গুড়িয়ে দেবে। তাই নিয়ে বিশেষ চিন্তা নেই। প্রদীপকে দেখেই বললেন, বুঝলি, ওভেনটা আজ দুজন মিলে পরিষ্কার করব। কেটলির তলায় কালি পড়ছে।
প্রদীপ বলল আর পরিষ্কার করে কী হবে? আর কটা দিন তো বাকি।
প্রদীপের বাবা বললেন, এটাও ঠিক কথা।
প্রদীপ বলল, জানেন দাদা, সবে নিজেদের বাড়ি তৈরি শুরু করেছিলাম। সব ঘেঁটে গেল। দিদির বিয়ের জন্য সম্বন্ধ দেখা হচ্ছিল। আমার তেরো হাজার টাকা আয়ে কোন দিক সামলাবো।
এবার বাস্তবিক দুঃখবোধ করলাম। প্রদীপ আমার থেকে প্রায় বছর বারোর ছোটো। ও যখন ইলেভেন টুয়েলভে পড়ে তখন থেকেই ওকে চিনি। ঘুরে ঘুরে নাটক করতো। থিয়েটার ছিল ধ্যান জ্ঞান। সব সময় শিকল ভাঙার গান করত। আজ ভাগ্যের পরিহাসে সে এক কর্পোরেট সংস্থার বেচু।
সকালবেলায় সবে তৃতীয়বারের জন্য চায়ে চুমুক দিয়েছি, দেখি এক অন্ধ ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলা দুজন দুজনকে সামলাতে সামলাতে টলমল করে এদিকেই আসছেন। এই চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, জয়গুরু, দুটো চা দাও তো বাপু, আর দুটো লম্বু বিস্কুট। একটু আমাদের বেঞ্চে বসায়ে দাও।
প্রদীপ দুজনকে ধরে বেঞ্চে বসালো। এই দুজনকে আমি চিনি। স্বামী স্ত্রী, ট্রেনে গান গেয়ে ভিক্ষা করেন। এখনো ভদ্রলোক গুনগুন করে গাইছেন
“কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যেরে।
লাগি সেই হৃদয়শশী
সদা প্রাণ হয় উদাসী,
পেলে মন হত খুশী,
দিবা নিশি দেখিতাম নয়ন ভরে।
আমি প্রেমানলে মরছি জ্বলে,
নিভাই কেমন করে,
মরি হায়, হায় রে-“
এই দুজনই সুগারের পেশেন্ট। দু’মাস অন্তর অন্তর দেখাতে যান। এখন দিব্যি চিনি দেওয়ার চা, আর চিনির পুর দেওয়া লম্বু খাচ্ছেন। জিজ্ঞাস করলাম, কেমন আছেন?
আরে ডাক্তার বাবু, আপনি। কী সৌভাগ্য, কী সৌভাগ্য। ওরে মালা পেন্নাম কর।
ভদ্রলোকের স্ত্রী দুহাত জড় করে প্রণাম করলেন।
প্রদীপের বাবা বললেন, তা তোমরা তো এই সময় মধ্যমগ্রামে নামার লোক নও। ডাউন বনগাঁ লোকালে বনগাঁ অব্দি ভিক্ষা করতে করতে যাও। আজ এখানে নামলে যে বড়।
অন্ধ ভদ্রলোক বললেন, কী আর কইব, নামায় দিল। গান গাইতে গাইতে আইছি, হঠাৎ মামা ধরলো। বলল, শিগগিরি দু’হাজার টাকা ফাইন বের কর। নতুন নাকি নিয়ম হইছে। টেরেনে ভিক্ষা করলে দু’হাজার টাকা ফাইন, আর হকারী করলে এক হাজার ট্যাকা।
শুনে তো আমার চক্ষু চড়ক গাছ। বলেই ফেললুম, বলেন কী? পকেটে যদি দু হাজার টাকা থাকে, সকাল সকাল ভিক্ষা করতে বেরোই?
সে বেটা তো কিছুতেই শুনবে না। গুনে দেখিয়ে দিলুম মোট ১২৮ টাকা আছে। বললাম ফাইন না দিলে কী হবে। মামা গম্ভীর স্বরে বলল, জেল হবে।
শুনেই হেসে ফেললুম। যতসব গুন্ডা মস্তান তোলাবাজ ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর ভিখারিদের জেলে পুরছে।
বললাম, জেলে বেশি মারধর করবে নাতো।
মামা বলল, মারধোর কেন করবে?
বুক ঠুকে বললুম, তাহলে নিয়ে চলুন জেলে। দুবেলা খাবার পাব। হরিনাম করব। স্বামী স্ত্রী দুজনেই জেল খেটে আসি।
নিত্যযাত্রীরা মামার উপরই ক্ষেইপা গেল। শেষে মামা মধ্যমগ্রামে নামায় দিয়ে বলল, সোজা বাড়ি চলে যাবি। টেরেনে ভিক্ষা করা নিষেধ।
প্রদীপ জিজ্ঞেস করল, তা কী করবেন এখন?
পরের টেরেনেই উঠবো। ধরলে ধরবে৷ তা বাবা, তুমি ওই গানটা গাও তো। থিয়েটারের গান।
কথা বোলো না,
কেউ শব্দ কোরো না
ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন
গোলযোগ সইতে পারেন না।
প্রদীপ গলা মেলালো। ভদ্রলোকের স্ত্রী করতাল বাজাতে আরম্ভ করলেন। আমার আর দেরি করার উপায় নাই।
রোগীরা এসে বসে থাকবে। প্রদীপকে বললাম, গান বাজনা চলুক। আমি যাই। এটুকু হেঁটেই চলে যাব। হাঁটা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।











