গত ২ বছর হেলথ সার্ভিসের সাথে যুক্ত ছিলাম, পোস্টিং ছিল শহরের এক মহকুমা হাসপাতালে। আমাদের ডাক্তারি তে পড়তে আসা অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীদের মত আমারো হেলথ সার্ভিস নিয়ে উচ্চাশা ছিল না। চাকরির করুণ অবস্থার জন্য ইন্টারভিউতে বসা এবং চাকরি পাওয়া। চাকরি পাওয়ার পর হেলথ সার্ভিস নিয়ে অনেক ধারণা পাল্টালো। যেমন আগে ভাবতাম, সেকেন্ডারি টায়ার হসপিটালগুলোতে চিকিৎসা হয় না, সবাইকে রেফার করে দেওয়া হয়, কিন্তু ওখানে গিয়ে দেখলাম, সীমিত পরিকাঠামোর মধ্যেও CPR দিয়ে রোগীকে এমারজেন্সিতে, সি সি ইউ-তে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়, রোগী বাঁচেও। সার্জারি, গাইনি, মেডিসিন সীমিত অবস্থার মধ্যেও যথাসম্ভব চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। মেডিকেল কলেজের চাকচিক্যের মধ্যে পড়াশোনা করার সুবাদে মেডিকেল অফিসারদের নিয়ে কোনো পজিটিভ চিন্তা ভাবনা আমার ছিল না, কিন্তু ওখানে গিয়ে দেখলাম রিটায়ার হবেন এমন মেডিকেল অফিসাররাও এত যত্ন নিয়ে রোগীদের দেখেন যার অভাব MES এর অনেকের মধ্যে দেখেছি। আমার অবস্থা ঢাল নেই, তরোয়াল নেই নিধিরাম সর্দারের মত, ফলত কিছু ক্ষেত্রে (বলা যায় অনেক ক্ষেত্রেই) রেফার করা ছাড়া খুব বেশি কিছু করার থাকে না। আমাদের পাঠ্য তালিকায় মেডিসিন, সার্জারি এত বড় বড় সাবজেক্ট থাকলেও আমাদের রাজ্যের বা বিদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে খুব বিশদ আলোচনা করা হয় না। বেশির ভাগ কর্পোরেট হসপিটালের ডাক্তারদের আমাদের এই হেলথ সিস্টেমের মূল পরিকাঠামো নিয়ে কোনো ধারণা নেই। ফলে স্পেশালিষ্ট মেডিকেল অফিসার যে কি পোস্ট, হেলথ সার্ভিস যে কি জিনিস-সেটা তাদের বোঝানোই মুশকিল।
MES – হেলথ সার্ভিস একে অন্যের পরিপূরক। এত অসংখ্য রোগী যদি কোনো চিকিৎসা ছাড়াই রেফার হয়ে যেত তাহলে মেডিকেল কলেজ গুলোতে কুলোতো না। এই ছোটো হসপিটালগুলোতে শুধু ডাইরিয়ার চিকিৎসা হয় এমন না, অজস্র সাপে কাটা রোগী, জ্বর, ডেলিভারি, ডেঙ্গু — এসব মানুষের রোগের একটা বড় অংশের চিকিৎসা হয়। “রেফার রোগে আক্রান্ত” এই কথা টা শুনলে বড়ই করুণা হয় সেই সব টিভি চ্যানেলগুলোর জন্য। তারা কোনো দিন কি নিজের কারোর চিকিৎসা কোনো সেকেন্ডারি টায়ার হসপিটালে করাবে! ন্যূনতম পরিকাঠামোতে চিকিৎসা করা – এটা ডাক্তার হিসেবে আমাদের কোথাও সমৃদ্ধ করে। কথায় কথায় USG, ECHO ব্যবহার করা যায় না, history, clinics, experience এর উপরে নির্ভর করতে হয়। আমি গত ১৬ বছরের মধ্যে ১২ বছর মেডিকেল কলেজে কাটালাম। এর কিছু সময় শহরের top corporate হসপিটালের CCU তেও কাজ করেছি। আমাদের পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থায় দুটো সমান্তরাল সিস্টেম চলছে, এক যেখানে সামান্য পরিকাঠামোয় মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে বেরোনো ডাক্তাররা, নার্সরা লড়ে চলেছে, এখানে কাজ করতে গিয়ে মনে হয় যাদের টাকা পয়সার সামর্থ্য নেই, তাদের জীবনের কোনো দাম নেই! অন্য দিকে বড় বড় কর্পোরেট হাসপাতালে সামান্য অসুস্থতা নিয়ে এলেও তার জন্য সব রকমের পরীক্ষা করা হয় কখনো কখনো অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষাও। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল মন্ত্র হল এখন, টাকা দাও, স্বাস্থ্য কেনো।
রোগীদের ক্ষেত্রে দেখলাম, তারা অদ্ভুত ভাবে হসপিটালগুলোকে আপন মনে করেন। সে মেডিকেল কলেজ হোক বা তাদের বাড়ির পাশের কোনো ছোটো হসপিটাল। শ্বাসকষ্টের রোগীরা বার বার একই হসপিটালে আসেন, মেডিকেল কলেজে একই জিনিস হতে দেখেছি chronic liver disease এর রোগীদের, বা chronic disease গুলোর রোগীদের ক্ষেত্রেও। আর দেখেছি আত্মীয়তা– কোথাও তথাকথিত নিম্নবিত্ত পরিবারের শাশুড়ী বৌমাকে এত যত্ন করেন যে সে বৌমা না মেয়ে সেটা বোঝা যায় না — আবার কোথাও উচ্চশিক্ষিত সন্তানেরা বাবা মা বয়স্ক হয়ে যাওয়ার জন্য বাবা – মা কে হাসপাতালে দিনের পর দিন ফেলে রেখে যায়। আবার এটাও দেখলাম, যদি সততা আর নিষ্ঠার সাথে কাজ করা যায় তাহলে রোগীদের থেকে ভালোবাসা এখনো পাওয়া যায়।
শেষে একটাই কথা, আমাদের ডাক্তারদের হাতে এখনো অনেক কিছু আছে, এই প্রফেশনকে অবক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচাতে, proper dignity নিয়ে ডাক্তারি এখনো করার সুযোগ আছে। ডাক্তারি জীবনের কিছুটা সময় কোনো প্রান্তিক হসপিটালে সব ডাক্তারেরই কাটানো উচিত, তাতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, লোকজনের স্বাস্থ্য নিয়ে ধারণা এগুলো খুব স্পষ্ট ভাবে প্রতিভাত হয়। তা পরবর্তীতে চলার পথটাকে সমৃদ্ধ করে।
পূর্ব হসপিটালের সমস্ত স্টাফ, নার্স, ডাক্তারদের কাছে যে আত্মীয়তা পেলাম তা মনে রেখে পরের যাত্রা শুরু করবো।









