ছোটবেলায় যখন শুনতাম কারও বয়স পয়ষট্টি, তখন ভাবতাম ‘কি বুড়ো” লোকটা! আজ সেই পয়ষট্টির “বুড়ো’ আরও এক কদম এগিয়ে গেল – সেই সাথে সরকার চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিল, পয়ষট্টি পেরিয়ে যাওয়ার জন্যে আর আমাকে চাকরিতে রাখা যাবে না! আজ আমার অবসর।
কিন্তু সত্য বলছি, নিজের দিকে তাকিয়ে যখন ভাবি আমি “বুড়ো” , তখন হাসি পায়। মনে হয় ধুস্, আমিতো এখনও সেই তিরিশ পেরোনো ছোকরা, যে সব কিছু দুচোখ ভরে দেখতে চায়, যে দুই পায়ে আরও অনেক অজানা পথে চলতে চায়, যে আরও অনেক ভালো বাসতে চায়, যার অনেক কিছু বলার আছে, যার অনেক কিছু করার আছে। নিজেকে আমার অন্তত এখনও বৃদ্ধ মনে হয় না।
তবুও আমার জন্মের পর থেকে পৃথিবী সূর্য্যকে অনেক বার প্রদক্ষিণ করেছে, অনেক দেশের ভৌগলিক সীমারেখা পাল্টেছে, অনেক জল বয়ে গেছে নদীতে। তেমনি আমারও জীবন সেই সাতঘাটের বদলে চৌদ্দ ঘাট ঘুরে ঘুরে ধাক্কা খেতে খেতে আজ এই ঘাটে থেমেছে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মত জীবন কখনও উঠেছে, কখনও নেমেছে- এই ওঠাপড়ার মধ্যেই ভালো-মন্দ মিশিয়ে আজকের “আমি” তৈরি হয়েছে।
৩৮ বছর আগে এক দিন আমি ছোট্ট একটি গ্রাম্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একমাত্র ডাক্তার রুপে নিধিরাম সর্দার হয়ে হুগলী জেলায় স্বাস্থ্য পরিসেবায় যুক্ত হয়েছিলাম। যেখানে গরুর গাড়িতে করেও রোগীকে নিয়ে আসা হত। তারপর একে একে বাঁকুড়া, কলকাতার বিভিন্ন হাসপাতাল, অলিপুরদুয়ার, উত্তর দিনাজপুর, মেদিনীপুর, হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগনার অনেক হাসপাতাল ঘুরে বনগাঁ থেকে অবসর। ২৫টি হাসপাতালে ঘোরা, প্রায় সমস্ত পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম্য জীবনের সাথে পরিচয় লাভ – এ আমার এক সৌভাগ্য। আর এক সৌভাগ্য, আমি যেখানেই থেকেছি, প্রায় সর্বত্রই আমি মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। এখনও ৩৮ বছর আগে্র প্রথম পোষ্টিং এর গ্রামের লোকজন আমার সাথে যোগাযোগ রাখে। আর আজ শেষদিনে আমি বনগাঁ হাসপাতালের আমার ডিপার্টমেন্টের (প্যাথলজি) সহকর্মী ও কর্মীবৃন্দের কাছ থেকে যে ভালোবাসা ও সম্মান পেলাম, তা চিরস্মরণীয় হয়ে থেকবে আমার কাছে।
চাকরি আমাকে অবসর দিলেও আমার অবসর নেই- চাইও না। জীবনের বাকি দিনগুলো কর্ম করেই যেতে চাই। আমার এতদিনকার সঞ্চিত অভিজ্ঞতা যদি মানুষের কোনও কল্যাণে লাগে, তবেই জীবন স্বার্থক হবে।









