অমায়িকতার সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতা, উত্তুঙ্গ স্পর্ধা আর বীরত্বব্যঞ্জক সংগ্রাম- ইলা মিত্র তাঁর নাম
কাজী নজরুল ইসলাম, গণেশ ঘোষ, বীণা দাস, নাগভূষণ পট্টনায়েক, ডা. পূর্ণেন্দু ঘোষ, খোকন মজুমদার, নেমু সিংহ প্রমুখ যে সকল অনন্য ব্যক্তিত্বকে কাছ থেকে দেখার ও কথা বলার সুযোগ পেয়েছি তার মধ্যে জীবন্ত কিংবদন্তি ইলা মিত্রকে (১৯২৫ – ২০০২) রাখতেই হবে।
‘ কৃষকের প্রাণ, ফুচিকের বোন ‘ , গোলাম কুদ্দুসের ‘ স্ট্যালিন নন্দিনী ‘; অশোক মিত্রের ব্যাখ্যায় জীবনানন্দের ‘ নাটোরের বনলতা সেন ‘ ; অবিভক্ত বাংলার মালদা এবং রাজশাহী জেলায় আধিয়ার ও ভাগ চাষীদের ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের (১৯৪৬ – ‘৪৮) অন্যতম সংগঠক; ১৯৫০ এ পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহীর নাচোলের সাঁওতাল ভূমিহীন কৃষি শ্রমিকদের সশস্ত্র অভ্যুত্থানের অবিসংবা নেত্রী তাঁদের পরম প্রিয় ‘ রানিমা ‘ কিংবা নবাব চাঁপাইগঞ্জের দরিদ্র মুসলমান ভাগচাষী ও কৃষি মজুরদের আপনার জন ‘ সাত আরি জিন ‘ সামলানো ইলা মিত্রের সঙ্গে প্রথমবার সাক্ষাৎ করতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখতে পেলাম আনন্দ পালিত রোড ও সি আই টি রোডের সংযোগে এক সাধারণ জীর্ণ আবাসনে বাস করা আটপৌরে পোশাকে দোহারা চেহারার দীর্ঘাঙ্গী মিতবাক মার্জিত এক সাধারণ অথচ অসাধারণ মাতৃরূপী নারীকে। ততদিনে তিনি বেথুন কলেজের অধ্যক্ষার দায়িত্ব থেকে অবসর নিয়েছেন। ১৯৬২, ‘৬৭, ‘৬৯ ও ‘৭২ চার বার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন।
ইলা সেন দের আদি বাড়ি ছিল অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলার ঝিনাইদহে। পিতা নগেন্দ্রনাথ সেন সেসময়কার অ্যাকাউটেন্ট জেনারেল। ইলা সেনের জন্ম কলকাতায়। পড়াশুনা বেথুন স্কুল ও কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৩৫ – ‘ ৩৮ রাজ্যের জুনিয়র অ্যাথলেটিক চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। এছাড়াও তিনি সাঁতার, বাস্কেটবল এবং ব্যাডমিন্টন খেলায় পারদর্শী ছিলেন। প্রথম বাঙালি নারী হিসাবে ১৯৪০ এর জাপানের টোকিও অলিম্পিকে নির্বাচিত হন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলায় অলিম্পিক বাতিল হয়ে যায়।
১৯৪২ এ আই এ এবং ১৯৪৪ এ বি এ পাশ করেন। ছাত্রী অবস্থায় প্রথমে মহিলা আন্দোলনে তারপর ১৯৪৩ এ মহিলা সমিতির মাধ্যমে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন। আত্মরক্ষী বাহিনীর স্বেচ্ছাসেবক হন। ১৯৪৫ এ কলকাতায় উচ্চ শিক্ষার জন্য আসা কমিউনিষ্ট কর্মী রমেন্দ্রনাথ মিত্রের সঙ্গে পরিণয়। পার্টির নির্দেশে রমেন্দ্রনাথ কলকাতার শ্রমিক ফ্রন্ট থেকে মালদা জেলায় কৃষক ফ্রন্টে কাজ করতে চলে যান। নববধূ ইলাও চলে যান নবাবগঞ্জে শ্বশুর বাড়িতে। রক্ষণশীল শ্বশুরবাড়ি সামলে শুরু হল মুসলমান; আদিবাসী সাঁওতাল, ওঁরাও; দলিত রাজবংশী, নমঃশূদ্র, কৈবর্ত প্রমুখ গ্রাম বাংলার শ্রমজীবী মানুষদের সঙ্গে মেলামেশা। মেয়েদের স্কুল হল, তিনি হলেন প্রধান শিক্ষিকা। ইতিমধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির কৃষক সভার নেতৃত্বে অবিভক্ত দিনাজপুরের খাঁপুড়ে যে ঐতিহাসিক তেভাগা কৃষক আন্দোলন শুরু হয়ে ঢেউ এর মত অচিরে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ। তিনি ও রমেন্দ্রনাথ সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়লেন। এরপর ব্রিটিশের সাহায্যে শ্যামা – হক সরকার পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী এবং সামরিক বাহিনী দিয়ে ব্যাপক দমন পীড়ন শুরু করল। ইলা মিত্র গ্রেফতার এড়াতে পাশ্ববর্তী রাজশাহীর নাচোল অঞ্চলে চলে এলেন। সেখানে ভাগ চাষী ও ভূমিহীন কৃষি শ্রমিক শোষিত নিপীড়িত দরিদ্র আদিবাসী দের মধ্যে শক্তিশালী সংগঠন তৈরি করলেন। মাতলা মাঝি ছিলেন তাঁর দক্ষিণ হস্ত। এছাড়াও ছিলেন হরেক মণ্ডল, ফনিভূষণ রায়, প্রমুখ দক্ষ সংগঠকরা। ইতিমধ্যে রাজ্যজুড়ে তেভাগা র আগুন নিভে গেলেও এবং যুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগে বাংলা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেও ১৯৫০ এ সংঘটিত করলেন সশস্ত্র সাঁওতাল কৃষক বিদ্রোহ। বিদ্রোহ প্রাথমিকভাবে সফল হলেও পাকিস্থান সরকার প্রচুর সশস্ত্র পুলিশ আর আনসার বাহিনী কে পাঠাল, পরে সামরিক বাহিনী পাঠাল। সঙ্গে মৌলবাদী অত্যাচারী সশস্ত্র রাজাকার দের দল। তারা ঘেরাও দমন করে জনতার উপর অত্যাচার করেও ইলা মিত্রের কোন হদিশ পেল না কারণ সাধারণ মানুষ তাঁকে এত ভালবাসত। অবশেষে তিনি যখন ধরা পড়লেন তার আগেই জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে গেছেন, তাঁকে নিয়ে মানুষের মুখে মুখে অতিকথা,ছড়া ইত্যাদি ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।
নাচোল থানায় তাঁকে চারদিন আটকে রেখে পুলিশ, আনসার বাহিনী, রাজাকার ও সামরিক বাহিনী অকথ্য অত্যাচার করল। এরপর রাজশাহী জেলে নিয়ে গিয়ে বারবার গণধর্ষণ সহ দানবীয় অত্যাচার চালানো হল। তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হল। এরমধ্যেও আইনি লড়াই চালালেন।
১৯৫৪ তে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন। প্রথমে স্বামী ও পুত্রকে নিয়ে ওঠেন বেহালার এক বস্তিতে। ১৯৫৭ সালে এম এ পাশ করেন, তারপর শিক্ষকতা ও অধ্যাপনা শুরু। পাশাপাশি সক্রিয় রাজনীতি, সামাজিক ও মহিলা অন্দোলন। ১৯৭১ এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন। বেশ কিছু বই লিখেছেন ও অনুবাদ করেছেন। যেমন, জেলখানার চিঠি, হিরোশিমার মেয়ে, লেনিনের জীবনী, রুশ গল্প ইত্যাদি। বিশিষ্ট কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন তাঁকে নিয়ে লেখেন ‘ কাঁটা তারের প্রজাপতি ‘, বাংলাদেশ সরকার তাঁকে নিয়ে তথ্য চিত্র নির্মাণ করে। ২০০২ ‘ তে একটি দুর্ঘটনায় তাঁর জীবনাবসান হয়।
বীরাঙ্গনাদের বীরত্ব কাহিনী ভরা ভারত ভূমিতে দক্ষিণ ভারতে যেমন কিত্তুর চেননাম্মা, মধ্য ভারতে যেমন লক্ষীবাই, উত্তর পূর্ব ও উত্তর পশ্চিম ভারতে রাসমণি হাজং ও দুর্গা দেবী ভোরা, পশ্চিম ভারতে গোদাবরী পারুলেকর প্রমুখ, তেমনি পূর্ব ভারতের জনসংগ্রামের মুখ হিসাবে মহিয়সী ইলা মিত্র নিজের আসন অক্ষয় রেখেছেন। তাঁর জন্মশতবর্ষে তাঁকে বিনম্র প্রণাম।
কৃতজ্ঞতা:
১) শ্রীমতী সুমনা গুপ্ত
২) ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস (২য় খণ্ড) – অরণি সেন
ছবি কৃতজ্ঞতা: পি পি বি এস










