আমার একজন সিনিয়র সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করার পরিকল্পনা করছিল, সেই নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা চলছিল। আমি সেটা নিয়ে মারাত্মক খিল্লি করছিলাম দেখে আমাদের স্যার বলেছিলেন, মমতা ব্যানার্জি কিন্তু সারা জীবন মুখ্যমন্ত্রী থাকবে না… আমি বলেছিলাম, যেই মুখ্যমন্ত্রী থাক, সিস্টেম এরকমই থাকবে। তাই আমি আর যাই করি সরকারি চাকরি করব না।
আজ মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী নেই। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা কী পরিবর্তন হয়েছে বা হতে চলেছে বলে আপনার মনে হয়? নতুন সরকার এলে কয়েকদিন দাপাদাপি, মমতাও তাই করতেন। এই হাসপাতালে যাও, একে ধমকাও, ওকে চমকাও… আমাদের সরকারে আগের মতো চলবে না। এসব বলে মিডিয়া ডেকে ঢাক পিটিয়ে কিছু বুজরুকী করা, এটুকুই… এসব হুজ্জুতি করে রোগী পরিষেবা কিছুক্ষণের জন্য ভন্ডুল করা ছাড়া এর আগেও ভালো কিছু হয়নি, এখনও হবেনা এটা আমি লিখে দিতে পারি।
প্রথম কথা, যত সরকারি হাসপাতাল আছে, সব কটা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ডবল করে দিলেও মানুষের চাহিদা পুরোপুরি মিটবে না। ডাক্তার তো ছাই নেই। সিট বাড়ছে, মেডিক্যাল কলেজ বাড়ছে – আসলে বাড়ছে মুনাফা… কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সরকারি ডাক্তার বাড়ছে কি! স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, ব্যাপক নিয়োগ হবে ১৫ জুলাইয়ের পর থেকে। আশা করি, ২০৩১এর জুলাইয়ের আগে নিয়োগ হয়ে যাবে। গ্রাউন্ড রিয়ালিটি হলো চাকরি ছেড়ে দিন, পোস্ট গ্রাজুয়েট বন্ড পোস্টিং, যেটা আসলে সুলভে ডাক্তার ভাড়া করা, সেটাও স্বাস্থ্য ভবন করে উঠতে পারেনি। স্বাস্থ্য সাথী উঠে যাবে কি যাবে না এই চক্করে সরকারি হাসপাতালেও বহু ফান্ড আসা বন্ধ। বেসরকারি হাসপাতালে বহু জায়গায় স্বাস্থ্য সাথী ভর্তি নেওয়া বন্ধ। টাকা নেই বৎস…
দ্বিতীয় কথা, সরকারের দীর্ঘকালীন ছ্যাচরামোর জন্য বহু ভালো ডাক্তার সরকারি ব্যবস্থাকে ল্যাং মেরে বেসরকারি হাসপাতালে/ বিদেশে পালিয়েছেন। ভবিষ্যতেও পালাবেন এটুকু আমার দৃঢ় বিশ্বাস। প্রাইজ পোস্টিং, নেপটিসম, দলবাজি, লবিবাজি ইত্যাদি জিনিসপত্র নিয়ে পথ চলা সবার দ্বারা সম্ভব না। বাকি যে মানুষরা এত কিছুর পরেও হাল ছেড়ে দেননি, তাঁদের ঘাড় ভেঙেই সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা চলছে, কিন্তু তাদের কাজের ঢাক পিটিয়ে খাচ্ছে চার আনার নেতাগুলো…
এখন না আছে টাকা, না আছে পলিসি, না আছে স্টাফ। সুতরাং মানুষ মরবে। এবং সেই দোষ সিস্টেম মাথা পেতে নেবে না, নিলে ভোট পাবে না। সুতরাং চাই মেসি, অর্থাৎ গোট – স্কেপগোট। এই স্কেপগোট কে হবে? ডাক্তার হবে। সে কেন ইন্টিউবেট করার রোলপ্লে করতে পারছে না; সে কেন রাতে অন কল রুমে না বিশ্রাম নিয়ে ইমার্জেন্সিতে পাগলু ডান্স নাচছে না; সে কেন রামঢ্যামনা পেশেন্ট পার্টিকে ভালো তৃণমূল বলে আদর করে বোঝাতে পারছে না ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি… সুতরাং সরকারি চিকিৎসক হয়ে বাঁচতে হলে তোমায় নন্দ ঘোষ হয়েই থাকতে হবে, আর যে কেউ যখন খুশি তোমায় ঘণ্টা ভেবে বাজিয়ে চলে যাবে।
মানুষ আগেও মরেছে, ভবিষ্যতেও মরবে, চিকিৎসা পেয়ে, না পেয়ে
বিশ্বাস করুন, নোবডি কেয়ার্স। পনের বছর ধরে দেখছি… ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ান, জিডিএ দাদাগুলো ছাড়া কারো কিচ্ছু এসে যায়না। সবাই অপটিক্স ক্রিয়েট করতে ব্যস্ত, কেউ নিজের সিনিয়রের কাছে পদোন্নতির জন্য, কেউ পাবলিকের কাছে, ভোটের জন্য। কিন্তু দিনের শেষে ভিলেন ডাক্তাররাই…
তাই সরকারি চাকরি আমি করবো নি দাদা, মাসে একশ কোটি দিলেও করবো নি…










