নীচে যে ভদ্রলোকদের স্ট্যাচুগুলো দেখছেন, তাঁরা কি বেঁচে থাকতে ভাবতে পেরেছিলেন তাঁদের নিয়ে এমন রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলবে? সম্ভবত না। কিন্তু মারা যাবার পাঁচ লক্ষ বছর পরে এঁদের নিয়ে চাপান-উতোর শুরু হয়।

.ভদ্রলোকদের যৌথনাম পিকিং ম্যান। ১৯২০-এর দশকে চীনে পিকিংয়ের কাছে সুইডিশ ও চীনা বিজ্ঞানীরা মিলে এর দেহাবশেষ বা জীবাশ্ম খুঁজে পেয়েছিলেন। চীন তখন অর্ধ-পরাধীন। তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান এসে সব ধ্বংস করে ফেলবে, এমন আতঙ্কে বা এমন অজুহাতে, পিকিং ম্যানের জীবাশ্মকে আমেরিকা-ইউরোপের বিজ্ঞানীরা জাহাজে করে আমেরিকায় পাঠান। পথে সে জাহাজ নাকি জাপানি আক্রমণে ডুবে যায়। সেই সময় চীনে কুয়োমিনতাং পার্টি এবং কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে রাজনৈতিক লড়াই চলছিল। জীবাশ্ম হারিয়ে যাওয়ার জন্য এরা একে অপরকে দায়ী করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও এদের সম্পর্কে তার আঁচ লাগে।
.
ততদিনে পিকিং ম্যান চীনের জাতীয় গর্বের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। একাডেমিক আঙিনা ছেড়ে বিতর্ক গড়িয়েছে রাজনীতিতে, রাজনৈতিক মতাদর্শে। চীনের অনেক রাজনীতিবিদ বলছেন, পিকিং ম্যান হল চীনের মানুষের আদি পূর্বসূরি, ও চীনের বর্তমান মানুষেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অন্তত পাঁচ লক্ষ বছর চীনেই আছেন। জাপানি এবং অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের পাঁচ লক্ষ বছরের “ভিটেমাটি” থেকে উচ্ছেদ করতে চাইছে। চীনের স্বাধীনতা ও কম্যুনিস্ট সরকার পত্তনের পরে এমন দাবি জোরদার হয়।
.
সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত অস্ত্র হিসেবে পিকিং ম্যানকে ব্যবহার করা হয়তো খারাপ কাজ নয়। তবে সত্যটা আদৌ এমন ছিল না। পিকিং ম্যান ছিল এশিয়ান হোমো ইরেক্টাস। আর আমাদের প্রজাতি হোমো সেপিয়েন্স উদ্ভূত হয়েছে আফ্রিকায়, “মাত্র” তিন লক্ষ বছর আগে।
.
তাহলে আসল ঘটনা কী ছিল, আর কেমন করেই বা সেটা জানা গেল? পিকিং ম্যান কি একাই রাজনীতির হাতে পড়েছিল, নাকি মানুষের উদ্ভব থেকে তার বিশ্বের কোণে কোণে ছড়িয়ে পড়ার সবটা নিয়েই এমন রাজনীতি হয়েছে? আজকের ভাষায় যা আইডেন্টিটি পলিটিক্স, তার সঙ্গে নানা দেশের নানা ধর্মের নানা জাতের মানুষের উদ্ভব জড়িয়ে আছে। আমাদের সত্যকে দেখার বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি কখনও কখনও কি তাই আবৃত হয়ে যাচ্ছে?
.
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে, এবং স্রেফ নিজেদের প্রাচীন প্রাগিতিহাস জানার কৌতূহল থেকেও বটে, মানুষের উৎস সন্ধানে যাওয়া জরুরি। বাংলা ভাষায় এই বিষয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের সব কথাগুলো ধারণ করে এমন বই ছিল না। আমার লেখা এবং আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশিত এই বইটি সে কারণেই।










