….ইক্কেবার মানাইছে না গো ! একটা জনপ্রিয়তম গানের কলি। গানখানি লেখার পর স্বয়ং গীতিকার ও গায়কের মুখেই দূর লালপাহাড়ির দেশে, রাতুল রজ বিছানো জমিনে বসে শুনেছিলাম এটি।সে ছিল জীবনের এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
যেখানে যেমন সেখানে তেমনটি না হলেই বুঝি তৈরি হয় যতোসব বিসম্বাদ, বেমানান বস্তুটিকে ঘিরে তৈরি হয় দ্বন্দ্ব আকচাআকচি। রাঙামাটির দেশের মহুল গাছকে ইস্টিশনের প্লাটফর্মের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রয়াত কবি অরুণ চক্রবর্তীরও ঠিক্ এমনটাই মনে হয়েছিল।
সমাজের বহুদিনের চেনা সংজ্ঞাটা ইদানিং একদম বদলে গেছে। এই বদলটা আমরা সবাই বুঝতে পারি। ঘরের মধ্যে ঘর তৈরির মতো, এখন আমাদের চেনা চলমান সমাজের মধ্যেই গড়ে উঠেছে বহু অণু সমাজ । আকাশছোঁয়া বাড়ির সারিতে ঘিরে থাকা সব বাহারি নামের হাউজিং সোসাইটি । চারপাশের চলতি, খানিকটা আটপৌরে সমাজ থেকে বিলকুল আলাদা এইসব মাথা তোলা হাউজিং সোসাইটির অন্দরমহল। 
সম্প্রতি প্রকাশিত টাইমস্ অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে যে ফরিদাবাদের সেক্টর ৮৬ ‘র প্রিন্সেস পার্ক হাউজিং এস্টেটের বাসিন্দা দিব্যা নায়ার । একটি অসরকারি ফার্মে কর্মরতা তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ যে, তিনি ২০২২ সাল থেকে সোসাইটির প্রাকার ঘেরা অভিজাত পরিসরের ভেতরে ভবঘুরে সারমেয়দের খাওয়াচ্ছেন, যা সোসাইটির আভিজাত্য ও মর্যাদার পরিপন্থী। সোসাইটিতে আবাসিকরা তাঁদের পোষ্যদের নিয়ে ঘুরবেন, হেঁটে চলে বেড়াবেন – তা নয়, যতোসব নেড়ি কুকুরের ভিড় আবাসিকদের শান্তিময় যাপনে বাধা তৈরি করছে! এমন অনাচার অসহনীয়।

লেখাটা এখানেই শেষ করে সম্পাদকীয় দপ্তরে পাঠিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে অপেক্ষা করছিলাম ছাপানো অক্ষরে সকালেই তাকে দেখতে পাবো বলে। কিন্তু নতুন করে কিছু কথা কানে যেতেই আবার পুনরায় মূষিক হতে হলো। ভাবছেন তো এই ভাবান্তরের হেতু কি? বলছি।
ভারতীয় সমাজ কি ক্রমশই অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে? – এমনটাই জিজ্ঞাসা সুপ্রিম কোর্টের মাননীয়া বিচারপতি জাস্টিস নাগারত্নার। চিরকালের ভারতীয় সমাজ মানুষ ও পশুর সহাবস্থানের আদর্শকে আঁকড়ে ধরেই পথ চলতে অভ্যস্ত। অথচ ইদানিংকালে আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনাসূত্রে এমন প্রশ্ন বারবার ঘুরে ফিরে সামনে আসছে – আমরা কি সহনশীলতার , সহাবস্থানের আদর্শকে বর্জন করে সংঘাতের দিকে এগিয়ে চলেছি? কেরালার রাজধানী তিরুবনন্তপুরমে মানুষ – “বন্যপ্রাণী সংঘাত ও সহাবস্থান “ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় জাস্টিস নাগারত্না এমন প্রশ্নই ছুঁড়ে দিয়েছেন অতিথি, অভ্যাগতদের উদ্দেশ্যে। অত্যন্ত সঙ্গত প্রশ্ন সন্দেহ নেই।
আমরা ক্রমশই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছি। টেকনোলজির কল্যাণে পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় আনতে গিয়ে আমরা হারিয়ে ফেলেছি আমাদের চারপাশের পরিবেশ পরিমণ্ডলের প্রাণস্পর্শী যাপনের বৈভবী অনুষঙ্গকে। আর হয়তো এই কারণেই আমাদের চারপাশে বিচরমান সারমেয় লালু, কালু, ভুতো,ভোম্বলরাও অসহনীয় হয়ে উঠেছে আমাদের কাছে। আধুনিক যাপন অনেক কিছুই কেড়ে নিয়েছে আমাদের কাছ থেকে। সেকেলে আদর্শের প্রতি আর কেইবা দায়বদ্ধতা দেখাবে? জাস্টিস নাগারত্নমকে অকুণ্ঠ ধন্যবাদ জানাই যে অন্তত তিনি আমাদের গৌরবময় পরম্পরার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বলে।
আগস্ট ৩১ ,২০২৫.











