বিলেতে সপ্তাহান্তে দুর্গাপুজোর মতো ডাক্তারদেরও ভ্যালেন্টাইনের লেখা লিখতে সপ্তাহ শেষ হয়ে যায়। চিকিৎসা ফেলে রেখে লেখালেখি তো আর করা যায় না। তাই বাসি লেখাই পড়ুন,কি আর করা যাবে!
১
হাতে চোট নিয়ে এসেছে ফুটফুটে ছোট্ট মেয়েটি। বছর ছয়েক বয়স। থেকে থেকে চিল-চিৎকার করছে। কিছুতেই চেম্বারে ঢুকবে না।
বাবা-মা জোর করে ভেতরে নিয়ে এল। মেয়েটার পরনে গোলাপী রঙের সুন্দর কারুকার্য করা একটা ফ্রক। এদিকে বাঁ কনুইটা ফুলে ঢোল। যন্ত্রণায় কাঁদছে। কাউকে হাত দিতেই দিচ্ছে না।
আমি বললাম, ‘বাহ্, তোমার জামাটা তো খুব সুন্দর! কে দিয়েছে? মা?’’না, ঠাম্মি।’
‘ঠাম্মি দিয়েছে? কবে?’
‘কালকে, ভ্যালেনটাইন ডে তে ।’
‘কি সুন্দর লাগছে তোমাকে!’
এইটুকু কমপ্লিমেন্ট দিতে দিতে তার কনুই দেখে ফেললাম। পালস, নার্ভের অবস্থা, নখের রক্তসঞ্চালন দেখা হয়ে গেল।
তারপর কিছুক্ষণ বাদে এক্সরে করিয়ে নিয়ে এল।
‘ডাক্তার আঙ্কেল, আমার কি হাত ভেঙে গেছে?’
‘এই ছোট্ট একটুখানি ভেঙেছে।’
‘আমি কি স্কুলে যেতে পারব?’
‘কেন পারবে না? কয়েকদিন পরে অবশ্যই পারবে।’
সব শেষে প্লাস্টার করিয়ে বাড়ি যাওয়ার সময় ডান হাতে টা-টা করে ফ্লাইং কিস দিয়ে গেল। ভ্যালেন্টাইন ডে !
২
ভদ্রলোকের মেদহীন পেটাই চেহারা । মাথায় খাকি রঙের ক্যাপ। টুপির ধার থেকে দেখা যাচ্ছে কয়েকটা কাঁচা পাকা চুল। দেখে মনে হয় বয়স ৫০-৫২ হবে । তবে সেটা সত্যি নয় । কারণ আমার কম্পিউটার তাঁর বয়স দেখাচ্ছে ৬৫!
‘ডাক্তারবাবু চিনতে পারছেন? সেই যে আমার বাবার অপারেশন করেছিলেন! সে অবশ্য বছর দশেক হয়ে গেল। আপনার মনে থাকার কথা না।’
‘বাবার কি অপারেশন হয়েছিল?’
‘ওই, কোমরে নার্ভের প্রবলেম হয়েছিল না? তারপর তো এত বছর ভালোই আছেন। ছেলেও তো কোভিডের সময় অনলাইনে দেখিয়েছিল আপনাকে।’
‘অনলাইনে? কোথা থেকে?’
‘ব্যাঙ্গালোর থেকে। এখন অবশ্য পুণায় শিফ্ট হয়েছে। ছেলেই বলল আপনার কাছে আসতে।’
‘ছেলে পুণে তে কি করছে?’
‘ওখানে সিমবায়োসিস ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসর। আইআইটি কানপুর থেকে পিএইচডি করল, তারপর ব্যাঙ্গালোরে পোষ্ট-ডক রিসার্চ- বায়োটেকনোলজি নিয়ে।’
‘বাঃ’
‘আমি তো কিছু করতে পারি নি। চোর-ডাকাত ধরেছি সারাজীবন। ছেলেটা অন্ততঃ মানুষ হয়েছে।’
‘আপনার হয়েছে কি?’
‘আর বলবেন না- কুড়ি কিলো চালের বস্তা টানতে গেছিলাম। বয়স যে হয়েছে, সে খেয়াল থাকে না। থানা থেকে রিটায়ার করে গেছি তাও পাঁচ বছর হল- এখনো রোজ দুঘন্টা ব্যয়াম করি। মাসল্ দেখেন মাসল্, কিরকম শক্ত!’
এই বলে হাতের গুলি ফুলিয়ে দেখালেন ভদ্রলোক। আরো দেখলাম, কোমর পুরো বেঁকে গেছে এবং শক্ত হয়ে গেছে।
‘এ তো বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন একেবারে।’
‘হ্যাঁ, আমার বৌ-ও তাই বলে আমাকে! চাকরি জীবনে কলিগরা-ও ওই এক কথাই বলত- বাড়াবাড়ি রকমের সৎ হওয়া ভালো না। বিশেষতঃ পুলিশের চাকরিতে। কিন্তু আমার বাবা বলেছিল, পুলিশের চাকরিতে যাচ্ছিস যা, কিন্তু ঘুষ খাবি না। বাবা প্রাইমারী স্কুলের মাষ্টার ছিল। দুশো ষাট টাকা মাইনের কনস্টেবল হয়ে ঢুকেছিলাম। ছোটবেলায় একটু বখে গেছিলাম তো- পড়াশুনো বেশী করিনি। কিন্তু স্যার, দুনম্বরি করিনি জীবনে। আমার বস তো আপনার বন্ধু। ভটচাজ স্যার। আমার কথা জিজ্ঞেস করে দেখবেন ওনাকে।’
‘উনি শুধু আমার বন্ধু না। আমার পেশেন্ট-ও বটে।’
‘তাই নাকি? ওনার মত মানুষ আজকাল বেশী নেই আর।’
‘হ্যাঁ, আপাদমস্তক ভদ্রলোক। কলেজে পড়ালে মানাতো ওনাকে। পুলিশের চাকরিতে একেবারে মিসফিট।’
‘কিন্তু এখানে যখন ছিল, চোর, ডাকাত, গুন্ডা-সব ঠান্ডা করে দিয়েছিল।’
‘ওইজন্যেই তো সরিয়ে দিল। যাকগে, আপনার ব্যপার বলুন।’
‘রোজ দশ কিলোমিটার সাইকেল চালাই- কমিয়ে দেব স্যার?’
‘এখন একটু কমিয়ে দিন। আর ভারী ওজন তুলবেন না। বয়স হচ্ছে।’
‘একটা এম আর আই করে নেব স্যার?’
‘নিতে পারেন।’
‘দাঁড়ান,প্রেশক্রিপশনটা দিন। ডিসকাউন্ট লিখে দিই।’
‘লিখতে হবে না স্যার। আপনার প্রেশক্রিপশন নিয়ে গেলে এমনিতেই সব জায়গায় ডিসকাউন্ট দিয়ে দেয়, আমরা জানি।’
‘তাই?’
‘হ্যাঁ, ওই যে মালদার পেশেন্ট, বাইরে বসে আছে। কোত্থেকে খবর পেয়ে এতদূরে এসেছে!’
৩
মালদার পেশেন্ট। রীতা শর্মা (নাম পরিবর্তিত)। বয়স সাতচল্লিশ। ছোটখাটো সুন্দর চেহারা। অনায়াসে ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।
‘বাতাইয়ে, তকলিফ কেয়া হ্যায়।’
ভদ্রমহিলা প্রচন্ড অবাক হয়ে বললেন, ‘আমি….আমার? ঘাড়ে, কাঁধে আর আর হাতে ব্যথা। সারাক্ষণ হাত ঝিনঝিন করে।’
পাশে বসে থাকা ভদ্রমহিলার স্বামী বললেন, ‘আসলে উনি বাঙালি। ঘোষাল। আমি ইউপি-র বামুন। শর্মা আমার পদবী।’
দুজনেই সমানভাবে ঝরঝরে বাংলা বলেন। শুধু সামান্য একটু হিন্দি-র টান আছে। সেটা দুজনের কথাতেই।
ভদ্রমহিলা অনুযোগের সুরে বললেন, ‘ওনার সাথে থেকে আমার কথায় হিন্দি টান এসে যাচ্ছে।’
ভদ্রলোক খুব রসিক। ‘হাজব্যান্ডের ভাষা না হয় একটু শিখলে!’
আমি আস্বস্ত হয়ে বললাম, ‘এইবারে বুঝলাম। কিন্তু ঘাড়ে ব্যথার জন্যে মালদা থেকে এতদূরে এলেন?’
‘ঠিক মালদাও না। মালদার কাছে সামসি নামে একটা জায়গায় আমরা থাকি।’
ভদ্রমহিলা বললেন, ‘আমার জ্যাঠতুতো দিদি কলকাতায় ডাক্তার। উনি আপনাকে চেনেন। আপনাকে দেখাতে বললেন। এক্সরে, এম আর আই – সব করিয়ে এনেছি।’
এম আর আই বলছে সারভাইক্যাল স্পাইনে স্লিপ ডিস্ক। তবে ছোট।
‘আমি কিন্তু অপারেশন করাব না।’
‘অপারেশন না লাগলে করাবেন কেন!’
উনি বেশ উদ্বিগ্ন স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার কি মনে হচ্ছে অপারেশন লাগবে?’
‘এক্ষুনি সেরকম মনে হচ্ছে না।’
‘এক্সারসাইজ করলে ঠিক হয়ে যাবে তো?’
ভদ্রলোক বললেন, ‘তুমি এক্সারসাইজ করবে? কতবার দেখিয়ে দিয়েছি- কর নি।’
‘ডাক্তারবাবু দেখিয়ে দিলে করব।’
‘দেখুন, আমাদের হিন্দিতে একটা কাহাবত আছে, ঘরকা মুরগী দাল বরাবর। সেই অবস্থা!’
‘জানি। বাংলায় বলে, গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না।’
‘আসলে উনি ক্যারাটে শেখান তো, তাই উনি ভাবেন সব এক্সারসাইজ জানেন। সেটা হয়,বলুন?’
‘আপনাকে তো দেখছি বেশ ভালোই ক্যারাটে শিখিয়ে দিয়েছে!’
‘আপনি কি করে বুঝলেন?’
‘ইনটিউশন। যাকগে, আপনি কি করেন?’
‘প্রাইমারী স্কুলে পড়াই।’
ভদ্রলোক বললেন, ‘বাচ্চাদের পড়ায় তো, তাই কিছুতেই আর বড় হল না।’
‘সে তো ভালোই।’
‘ভালো তো বটে, কিন্তু ক্যারাটেও পুরো শেখা হল না।’
‘বিয়ে হয়ে গেল?’
‘হ্যাঁ। হাইট-ও বাড়ল না। বেঁটে রয়ে গেল।’
ভদ্রমহিলা কপট রাগে স্বামীকে চিমটি কেটে বললেন, ‘কি, আমি বেঁটে?’
আমি ম্যানেজ দেওয়ার জন্য বললাম, ‘বেঁটে না, বেঁটে না – শর্টহাইট। বাঙালীরা ইউপি-র লোকেদের তূ্লনায় একটু শর্ট হাইট হয়।’
‘ইউ পি মানে একেবারে এলাহাবাদ, বুঝলেন!’
ভদ্রমহিলা বলল, ‘লাষ্ট কবে এলাহাবাদ গেছ, সে তো ভুলেই গেছ।’
যতক্ষণ প্রেসক্রিপশন টাইপ করছি, ততক্ষণ স্বামী-স্ত্রী তে এইরকম খুনসুটি চলল। তারমধ্যে মৌমিতা আর সমীরদা দু’বার বলে গেছে, বাইরে অনেক পেশেন্ট আছে।
যাওয়ার সময় ভদ্রমহিলা বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না ডাক্তারবাবু, আমরা না এরকমই।’
‘এরকম-ই থাকুন।’
৪
বছর বিয়াল্লিশের মহিলা। মানুষ যত ভদ্র ও মার্জিত হতে পারে ততটাই মার্জিত ও পরিশীলিত। আগের দিন স্বামী সঙ্গে ছিল। আজ ছেলে। ছেলেটিও খুব ‘ভালো ছেলে’ টাইপ।
‘ও ম্যাডামের পেশেন্ট। তাই আজ সঙ্গে এসেছে। ওই চেম্বার থেকে ঘুরে এল।’
‘ছোটবেলায় দেখাতো?’
‘ও তো বলেছে, এখনো ম্যাডামকে দেখাবে।’
‘মানে? ও তো এখন অ্যাডাল্ট!’
‘হ্যাঁ, কলেজে পড়ে।’
‘কোন কলেজ?’
ছেলেটি এবার মুখ ফুটে বলল, ‘যাদবপুর।’
‘কি পড়?’
‘বি টেক।’
‘কোন স্ট্রীম?’
‘ইলেকট্রিক্যাল।’
‘কোন ইয়ার?’
‘ফাইন্যাল ইয়ার।’
‘এরপর কি করার ইচ্ছে?’
মা বলল,
‘চাকরি পেয়ে গেছে। পি ডব্লিউ সি তে।’
‘বাঃ’
‘জানেন, ক’দিন বাদে চাকরিতে জয়েন করবে- ম্যাডামের কাছ থেকে হাত পেতে লজেন্স নিয়ে এল!’
শুচিশ্মিতাকে ছেলেটির কথা বলতেই ও বলল, ‘অনেক ছোট্ট বয়স থেকে আমাকে দেখায়। খুব ভালো ছেলে। আজ এসে প্রনাম করে সুখবর দিল। মাথায় হাত বুলিয়ে খুব আদর করে দিলাম ওকে। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় ওর মা-কে নাকি জিজ্ঞাসা করেছে, চেম্বারে গেলে ম্যাডাম এখন আমাকে চকলেট দেবে তো?’









