প্রতুল ওদের লোক থেকে আমাদের লোক হয়ে গিয়েছিল এটা আমাদের জয়। আর সেই জয়ের আনন্দ হর্ষ উদযাপনের জন্যই রাষ্ট্রীয় তোপধ্বনির এই বিপুল আয়োজন। প্রতুল আমাদের লোক থেকে ওদের লোক হয়ে গিয়েছিল এটা আমাদের পরাজয়। আর সেই পরাজয়ের গ্লানি হতাশা ঢেকে ফেলার জন্য ফেসবুকের দেয়ালে দেয়ালে প্রতুলের পিন্ডি চটকানোর আয়োজন।
অথচ এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। সুর, কথা গায়কীর সমন্বয়ে বাংলা গানের যে অপ্রতুল ধারাটি প্রতুল চালু করেছিলেন, জনপ্রিয় করেছিলেন সেই গীতিকার সুরকার গায়ক প্রতুল যেন এই শ্রদ্ধা অশ্রদ্ধা প্রদর্শনের বিপুল আয়োজনের মধ্যে হারিয়ে গেলেন। গমগমে ব্যারিটোন ভয়েসের মাদকতায় আচ্ছন্ন ষাট সত্তরের দশকের বাঙালি, যন্ত্রানুসঙ্গের বিপুল প্রতাপশালী আয়োজনের মাদকতায় আচ্ছন্ন আশি নব্বই দশকের বাঙালির সংগীতপ্রিয়তার যাবতীয় মিথকে চ্যালেঞ্জ করে মাঝরাতের নিস্তব্ধতাকে ছিন্ন করে একলা ক্ষীণ তনু বাঁশির মতো তাঁর সেই কণ্ঠস্বরকে তো বাঙালির একটা অংশ ভালোবেসেছিল। মাও সে তুং-এর কবিতা নিয়ে একটা লোক যদি গান বেঁধে গায় তাঁকে বামপন্থী শিল্পী আখ্যা না দিয়ে বাঙালির কোনও উপায় ছিল না। যেমন উপায় ছিল না চ্যাপলিনকে বামপন্থী আখ্যা না দিয়ে। বাঙালিকে বিপ্লবের গান শোনানোর এই হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার সেই একক সঙ্গীতের অভিঘাতে বাঙালির একটা অংশ স্তম্ভিত হয়েছিল, আকৃষ্ট হয়েছিল হয়তো ভালোবেসেও ছিল।
সেই ভালোবাসার মানুষজন ছেড়ে প্রতুল যদি শেষ বয়সে এমন শ্রোতাদের ভিড়ে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করেন যেখানে চ্যাপলিন নন, পাগলু ড্যান্স শেষ কথা বলবে সেটা প্রতুলের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। আমরা যারা প্রতুলের গানের ভক্ত ছিলাম তাদের কাছে প্রতুলের এই যাত্রাপথ ও সেই পথের শেষটা খুব একটা মানে রাখে না, আমরা মনে করি যে ইন্টারন্যাশনাল এর গানের শেষ স্তবক যখন খালি গলায় কেউ গেয়ে ওঠে, “শেষ যুদ্ধ শুরু আজ কমরেড”, মুঠি বাঁধা হাত যখন এক ঝটকায় আপনে আপ উঠে যায় ওপরের দিকে। তখন সেই গানের আওয়াজে ঢাকা পরে যেতে বাধ্য হাজার গান স্যালুটের শব্দ। শেষ বিদায় মুহূর্তে কোনটা কোন শিল্পীর কপালে জুটবে সেটা কেউ আগে থেকে বলে দিতে পারে না। প্রতুলকে মনে রাখতে চাই না। কিন্তু প্রতুলের গান গুলো মনে রয়েই গেল।
বাংলা গানের একলা পথের পথিককে শেষ বিদায়।









