“There are decades where nothing happens; and there are weeks where decades happen.”–Vladimir Ilyich Lenin
বিগত একটি বছর বাংলার সমাজ ও রাজনীতির অনেক শিকড় কে নাড়িয়ে দিয়েছে, বহু রুদ্ধদ্বারের মুখ খুলে দিয়েছে। স্থিতাবস্থার পরিবর্তন এক বছরে যেন এক শতাব্দীর সম্ভাবনা জন্ম দিয়েছে। অভূতপূর্ব জনজাগরণ বুঝিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, পুলিশ, প্রশাসন, আদালত এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির উপর বিপুল সংখ্যক মানুষের বিশ্বাস টলে গেছে। আধিপত্যের বিরুদ্ধে জমতে থাকা ক্ষোভ স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায় ছিল।
অভয়ার নারকীয় নির্যাতন ও হত্যার প্রেক্ষিতে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং বিকৃতমনস্ক অধ্যক্ষর ‘অত রাতে কী করছিল?’ মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় রিমঝিম সিংহ, শতাব্দী দাস, মহাশ্বেতা সমাজদার এবং অন্যান্যদের উদাত্ত আহবানে কলকাতা সহ পশ্চিম বাংলায় গত ১৪ অগাস্টের রাত ভারতের গণআন্দোলনের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ১৪ অগাস্ট ঐতিহাসিক রাতদখলে পথে নামে প্রায় সারা বাংলা। আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া বা ইংল্যান্ডের লিডসের আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় বাংলায় বহমান আন্দোলনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে ‘Reclaim the Night, Reclaim the Right’.
“আমরা যারা ১৯৪৭ সাল দেখিনি- স্বাধীনতার দিন দখল দেখিনি- আমরা যারা মশালের আগে রেখেছিলাম উনুন ও দেশলাইকে …তারা কেউ এই স্বাধীনতার আগের রাতে ঘরে ছিল না। কেউ চোখের জল মোছেনি – কেউ আগুন নেভায়নি – কেউ বসে থাকেনি – সবাই পা মিলিয়েছিল – সবাই সশব্দে বা নিঃশব্দে শ্লোগান দিয়েছিল – সবাই হাতে হাত রেখেছিল। … অগ্নিবিন্দুকে কী ভাবে মশাল রূপ দিয়েছিল তারা- তারা সব রাত দখল করেছিল …(অদিতি বসু রায়, ১৪ ই অগাস্ট)
নারী আন্দোলন এবং প্রান্তিক লিঙ্গযৌনতার মানুষদের আন্দোলন এক বিশেষ মাত্রা লাভ করেছে। প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার মানুষের যোগদান এই আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারণ। ২০০৭ এ রিজওয়ানুর হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় গড়ে ওঠা নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ, ২০১২ তে দিল্লিতে নির্ভয়া কাণ্ডের প্রতিবাদে আন্দোলনকে ছাপিয়ে গেছে মেয়েদের রাত দখলের কর্মসূচি এবং পরবর্তী নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ, যেখানে ধর্ষিতা ও নিহত চিকিৎসকের প্রতি সহমর্মিতার পাশাপাশি উঠেছে ন্যায়বিচারের দাবি। বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী অধ্যাপক সুজাত ভদ্র এই প্রতিবাদকে ২০০৬-৭ সালে আমেরিকার কালো নারীর অধিকারের সংগঠক Tarana Burke এর ভাষায় ‘empowerment by empathy’ বলে উল্লেখ করেছেন।
স্বাধীনতার পরের তিন দশকে পশ্চিমবঙ্গে খাদ্য আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিনি যুদ্ধনীতির প্রধান রূপকার রবার্ট ম্যাকনামারার কলকাতা আগমনকে কেন্দ্র করে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ঐতিহাসিক বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন- এই তিনটি আন্দোলনের পর ২০২৪-২৫-এর এই বৃহৎ গণ জাগরণ ক্ষমতার রাজনীতি আর শাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস দেখিয়েছে। তাই দলীয় রং না থাকলেও এই আন্দোলন অবশ্যই রাজনৈতিক।
প্রথম পর্যায়ে আন্দোলনের চালিকা শক্তি জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট। কর্মবিরতির পাশাপাশি অভয়া ক্লিনিক, লালবাজার অভিযান, স্বাস্থ্যভবনে টানা দশ দিনের অবস্থান, অবস্থান তুলে নেবার দিনেই দুর্গত এলাকায় বন্যাত্রাণ নিয়ে পৌঁছে যাওয়া, ধর্মতলায়, উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজে ১৭ দিনের অনশন এবং সরকারের সঙ্গে শিরদাঁড়া সোজা রেখে দাবির লড়াইয়ে অগণিত মানুষের সম্মান ও শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন জুনিয়র ডাক্তাররা। ক্রমশ এই আন্দোলন গণ আন্দোলনের চেহারা নেয়।
অশোককুমার মুখোপাধ্যায় মনে করেন ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরাশি বছর পরে অগাস্ট বিপ্লবের প্রতিবিম্ব ধরা পড়ে অভয়া তিলোত্তমার বিচার চাওয়া ডাক্তারদের আন্দোলনের আয়নায়, ২০২৪ এর অগাস্ট এ। এ আন্দোলনের স্বকীয়তা নতুন ভাবনায়, প্রতিবাদের বৈচিত্রে যা গত পঞ্চাশ বছরে চোখে পড়েনি ।
নতুন গান, নতুন শ্লোগান জন্ম নিচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। হোক কলরব আন্দোলনের শ্লোগান ও নতুন চেহারায় ফিরে এসেছে। রাস্তা জুড়ে গ্রাফিতি, প্রতিদিনের মিছিল, পথসভায় হারিয়ে যাওয়া গণসংগীতের সঙ্গে নতুন গান উঠে এসেছে। প্রতিদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে দ্রোহসাহিত্যের তালিকা। এক দ্রোহের অভিঘাতে জেগে উঠছে বিগত দ্রোহের চর্চা।
১৫ অক্টোবর অনশনরত জুনিয়র ডাক্তারদের অনশন মঞ্চের নাকের ডগা দিয়ে দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন কার্নিভালের ঘোষণাকে চ্যালেঞ্জ করে জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস আহবান করেন দ্রোহের কার্নিভাল। রাত দখলের অভূতপূর্ব জনজাগরণের পরবর্তী তিন মাসে কলকাতা ও জেলাগুলিতে বড় বড় মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে প্রতিবাদ কর্মসূচি চলতে থাকে যার চূড়ান্ত প্রকাশ হয় দ্রোহের কার্নিভালে। ফালাকাটা যাত্রাগাছি কুলতলি ফারাক্কা বর্ধমানের মিছিল এসে মেশে ধর্মতলায় দ্রোহের কার্নিভালে। দ্রোহের কার্নিভালকে প্রথম পর্যায়ে জোয়ারের শীর্ষ বিন্দু হিসাবে চিহ্নিত করা যায়।
জোয়ার ভাঁটার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলে যে কোন আন্দোলন। আন্দোলনে ভাঁটা অনিবার্য ছিল। জোয়ারের উত্তুঙ্গ সময় আন্দোলনকে ধরে রাখার জন্য, আসন্ন ভাঁটার সময়ে উজানের দিকে তরী বাইবার জন্য প্রয়োজন ছিল এক রাজনৈতিক কিন্তু অদলীয় সংহতি মঞ্চ। ২৮ অক্টোবর – জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস ও নাগরিক সমাজের উদ্যোগে এক ছাতার তলায় আশিটি সংগঠন একত্রিত হয়ে গড়ে তোলে অভয়া মঞ্চ যার শিকড় ছড়াতে শুরু করে শহর গ্রাম মফস্বলে। অভয়া আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবার অন্যতম কাণ্ডারি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে এই মঞ্চ।
অভয়া হত্যার বিচার হয়নি, থ্রেট কালচার খুব কমানো যায় নি, প্রতিদিন বিভিন্ন প্রান্তে নারীনির্যাতন, ধর্ষণের নতুন খবর পাওয়া যাচ্ছে,তবু মনে হয় এই গত এক বছরে এক যুগ সন্ধিক্ষণের দিশা পাওয়া গেছে, স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে সংগ্রামী ঐক্য। প্রতিবাদের হিমশৈলের দৃশ্যমান ক্ষুদ্র অংশের নিচে বিরুদ্ধতার পাহাড় কত গভীরে প্রোথিত তা হয়ত এখনই বোঝা সম্ভব নয়। হুমকি-অত্যাচার-ধর্ষণ সংস্কৃতি মূক বধির সমাজের অনিবার্য ভবিষ্যৎ হিসাবেই মেনে নেওয়ার ফলে অগাস্ট ২০২৪-এর আগে এই সংবাদগুলি আর কোন প্রতিক্রিয়া তৈরি করত না, এক ধরণের সামাজিক উদাসীনতা এবং পলায়নপরতা দাবানলের মধ্যে নিজের ঘর বাঁচানোর অসম্ভব অবাস্তব প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করত। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। নিরাপত্তা কে নিশ্চিত না করা গেলেও নিরাপত্তাহীনতার সংবাদ প্রচার প্রায় নিশ্চিত করা গেছে। নির্যাতিত ও তার পরিবারের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন যৌথ আন্দোলনের সাথীরা। নতুন দ্রোহের দিনলিপি তৈরি হয়ে চলেছে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে।
এই আন্দোলনে বিপুল সংখ্যক মেয়েদের অংশগ্রহণ নারী পুরুষের বিভাজন রেখাগুলিকেই চ্যালেঞ্জ করেছে। তাই রাতের সাথি প্রকল্প ঘোষণা করে মেয়েদের রাতে ঘরের বাইরে কাজের অধিকারকে যখন সরকার কেড়ে নিতে চায় নিরাপত্তার অজুহাতে তখন মেয়েরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। রাতদখলকারী মেয়েদের এই দুর্জয় সাহসকে বুঝতে গেলে মেয়েদের অন্য লড়াইগুলোর দিকে একটু নজর দেয়া দরকার। সরকার এবং মালিক পক্ষের বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে আশা কর্মী, মিড ডে মিল কর্মী, চা বাগানের মহিলা কর্মী এবং বিভিন্ন ছোট বড় ট্রেড ইউনিয়নে মেয়েদের বিরামহীন সংগঠিত আন্দোলন ছাড়াও বিভিন্ন গ্রাম শহরতলিতে চোলাই মদের ঠেক ভেঙ্গে দেওয়া অসংগঠিত মেয়েদের লড়াই রাত দখল আন্দোলনের রাস্তা প্রস্তুত করেছে।
আর জি কর ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজ্যসরকার তড়িঘড়ি ‘অপরাজিতা মহিলা ও শিশু বিল’ পেশ করেছে। এই বিল যৌন হিংসা প্রতিরোধ করতে চেয়েছে শাস্তির কঠোরতা বাড়িয়ে। ধর্ষণ ও হত্যার ন্যূনতম শাস্তি করা হল ফাঁসি। শাস্তি কঠোর হলেই অপরাধের হার কমে না। আসল প্রয়োজন ছিল অপরাধের প্রতিরোধ আর সহজে অভিযোগ করার ব্যবস্থা। যৌন হিংসা প্রতিরোধ এবং কর্মক্ষেত্রে আভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি সম্পর্কে এই বিল কোন মন্তব্য করেনি।
অভয়া আন্দোলন প্রথম থেকেই শুধু ধর্ষকের শাস্তির দাবিতে থেমে থাকেনি। উঠে এসেছে লিঙ্গসংবেদী বেশ কিছু দাবি- সব কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় ICC (Internal Complaint Cell), সংগঠিত ও অসংগঠিত কর্মক্ষেত্রে এবং রাস্তা ঘাটে নারী সুরক্ষার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা, victim blaming -কে আইনের আওতায় আনা, সমস্ত কর্মক্ষেত্রে এবং রাস্তা ঘাটে নারী ও প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার মানুষ দের জন্য রাত দিন ব্যবহারের শৌচালয়, কর্মরতা নারীদের জন্য কর্মস্থলের পাশে সরকারি ক্রেশ চালু করা, ইত্যাদি। এর সঙ্গে রাত দখল ও পরবর্তী কর্মসূচির মাধ্যমে ছিল রাতের সাথি প্রকল্প বিরোধী ঘোষণা – ‘সব পরিসরকে মেয়েদের পরিসর, সব সময়কে মেয়েদের সময়, সব পথকে মেয়েদের হাঁটার মত পথ’ করে তোলার দাবি।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ষণ কোন যৌন লালসার প্রকাশ নয়। ক্ষমতাতন্ত্রের আধিপত্য ও আস্ফালন এবং একই সঙ্গে সচেতন যৌন হিংসার প্রকাশ। ধর্ষণ একটি সচেতন হুমকি দেখানোর প্রক্রিয়া যার দ্বারা পুরুষ নারীর জন্য আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে। কোন সন্দেহ নেই অভয়া হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রীয় মদতে ঘটা একটি প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা কাণ্ড, যার মূলে আছে দীর্ঘ দিনের দুর্নীতি চক্র। পুরুষ চিকিৎসক হলেও তাকে খুন হতেই হত। যৌন লালসা চরিতার্থ করা এখানে মূল উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু তাও ধর্ষণ হয়েছে। এই ভাবেই অভয়া কাণ্ড মিশে যায় জয়নগর যাত্রাগাছি জয়গাঁও উন্নাও হাথরস এবং আরো অজস্র ধর্ষণ এবং হত্যার সঙ্গে। লিঙ্গ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্ষণ কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির দীর্ঘমেয়াদি ফসল, যে সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রে বিভাজনের মধ্যে দিয়ে পুরুষ এবং নারীর নির্মাণ করে- একদিকে দুর্বল অসহায় আজ্ঞাবাহী নারী যাকে শোষণ এবং ভোগ করা যায়, অন্য দিকে প্রভুত্ববাদী প্রবল পরাক্রান্ত পুরুষ যে ক্ষমতার ধ্বজা প্রতিষ্ঠা করে নারীর শরীর, মন ও শ্রমে। এই সাংস্কৃতিক নির্মাণে তাই গণ্ডী ভেঙ্গে বেরনো মেয়েরা শাসিত হয়, সে শাসন কখনো শোষণ, কখনো দমন, কখনো ধর্ষণ। অন্তর্মুখী সংবেদনশীল কোমল স্বভাবের পুরুষ ‘মেয়েলি’ বলে উপহাসের পাত্র হয়। তাই মেয়েদের শ্রমের অমর্যাদা আর যৌন হেনস্থা এক ই মুদ্রার দুইটি পিঠ- লিঙ্গ অসাম্যই এর উৎস। এই কারণেই অভয়ার জন্য লড়াইয়ে নাগরিক আন্দোলনের পাশাপাশি লিঙ্গ রাজনৈতিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া জরুরি, আমরা শুধু একজন অভয়ার জন্য লড়ছি না, ভবিষ্যতে অভয়া হবার সম্ভাবনাকে ধ্বংস করা এই আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্য। লিঙ্গ রাজনৈতিক সচেতনতার প্রসার ছাড়া শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুধু নাগরিক আন্দোলন গড়ে তুলে লাভ নেই। আবার একই সঙ্গে শুধু লিঙ্গ রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে ধর্ষণকেই একমাত্র আক্রমণের লক্ষ্য এবং আলোচ্য করে ফেলার মধ্যেও একটা রাজনীতি আছে, যে রাজনীতি এক বায়বীয় লক্ষ্যের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানায় এবং চরম দুর্নীতির উপর গড়ে ওঠা ক্ষমতাসীন শাসক দলের থ্রেট কালচার কে পল্লবিত হবার সুযোগ দেয়। লিঙ্গ রাজনৈতিক আন্দোলন আর নাগরিক আন্দোলনের ঐক্যবদ্ধ লক্ষ্য হওয়া উচিত দুর্নীতি-সন্ত্রাসতন্ত্র এবং লিঙ্গ-অসাম্য।
ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস বলেছেন পিতৃতন্ত্রের সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে ঘটে গিয়েছিল নারীর মহান ঐতিহাসিক পরাজয় (Origins of the family, private property and The State)। কেট মিলেট তাঁর ধ্রুপদী গ্রন্থ Sexual Politics এ লিখেছেন অমিত শক্তিশালী, আপাত-অমোঘ পিতৃতন্ত্রের শোষণ থেকে মুক্তি শুধু নারীরই অভীষ্ট নয়, মানবতার মুক্তির জন্যেই পিতৃতান্ত্রিক শোষণের অবসানের প্রয়োজন। আর্থ সামাজিক অবস্থান, বয়স, পোশাক, চেহারা কোন কিছুই ধর্ষণের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা দিতে পারে না। নারী দেহের উপর পুরুষের এই বলপ্রয়োগ সর্বত্র নারীর অধিকারকে বিপন্ন করে রাখে।
ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জেহাদ তাই অভয়া আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য। ২০২৪ এর ৯ ই অগাস্ট আর জি কর হাসপাতালে পাশবিক যৌন অত্যাচারের শিকার হয়ে দুর্নীতির যূপকাষ্ঠে, শহীদ তরুণী চিকিৎসকের মৃত্যুর ২ মাস ১৯ দিন পর, ২৮ শে অক্টোবর গড়ে ওঠা অভয়া মঞ্চের দশ দফা দাবীর প্রথম দাবী অভয়ার ধর্ষণ ও খুনের ন্যায় বিচার এবং দ্বিতীয় দাবীটিই হল নারী ও প্রান্তিক যৌনতার মানুষের সুরক্ষা ।
অভয়া আন্দোলনে শুরু থেকেই ধর্ষক- শাসকের সমীকরণকে চিহ্নিত করে ক্ষমতাতন্ত্রকে করা হয়েছে। ‘শাসক তোমার কিসের ভয়, ধর্ষক তোমার কে হয়’, ‘ধর্ষককে লুকায় কে, প্রশাসন/ চোদ্দ তলা আবার কে’, ‘রাষ্ট্রই ধর্ষক’- এই সব স্লোগান পোস্টার গ্রাফিতি প্রাথমিক রূপরেখা নির্মাণ করেছে এই আন্দোলনের ।
এই আন্দোলনে ধর্মীয় অনুষঙ্গের ব্যবহার নিয়ে চিন্তার প্রয়োজন। ঔপনিবেশিক বাংলায় তথা ভারতে ধর্মীয় পুনর্জাগরণবাদ চরমপন্থী রাজনীতিকে ক্রমশ গ্রাস করে ফেলে। ভাগবদ গীতা, হিন্দু দেব দেবীর মূর্তির ব্যবহার, বন্দেমাতরম, সন্ধ্যা, যুগান্তর পত্রিকার চরমপন্থী রাজনীতির সঙ্গে আক্রমণমুখী হিন্দুত্ব ও ‘শক্তি’ র উপাসনা মুসলমানদের দূরে সরিয়ে দেয়। ব্যতিক্রমী স্বরগুলি চাপা দিয়ে পুনরুত্থানবাদী হিন্দুত্বের প্রবল বন্যায় ভেসে যায় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন। ইতিহাসের এই বিশেষ অধ্যায়ের শিক্ষাকে মাথায় রেখে রাজনীতির স্বার্থে জনপ্রিয় ধর্মীয় রূপক ব্যবহার কী ভাবে করা যায় এটা নিয়ে ভাবনার প্রয়োজন আছে। দুর্গা, কালীর ছবি, শঙ্খ এবং উলুধ্বনি- এই হিন্দু প্রতীকগুলির ব্যবহার সংখ্যালঘু মানুষকে প্রতিবাদ মঞ্চে শুধু ব্রাত্য করছে তা নয়, হিন্দু আধিপত্যের সাক্ষ্য বহন করছে। হিন্দু উচ্চ বর্ণের দেব দেবীর উপাসনা শুধু মুসলিম নয়, আদিবাসী দলিত সম্প্রদায়কেও বিচ্ছিন্ন করে দেবে প্রতিবাদের পরিসর থেকে। শহুরে ভদ্র সমাজের সঙ্গে গ্রাম বাংলার দলিত আদিবাসী মুসলিম সমাজের ব্যবধান বহু গুণে বাড়িয়ে দেবে এই ধর্মীয় রূপকের ব্যবহার। বর্ধমানের ধর্ষিতা প্রিয়াঙ্কা হাঁসদা, মালদহের ধর্ষিতা আদিবাসী নাবালিকা বা উত্তরাখণ্ডের ধর্ষিতা মুসলিম নার্স – এদের কারোর কাছেই মহিষমর্দিনীর উপাসনা বা দীপাবলি কোন সদর্থক বার্তা দেয় না।
আবার এর পাশাপাশি অন্য একটা দিক নিয়ে চিন্তার অবকাশ আছে। ধর্মীয় আচার, অনুষঙ্গ গোষ্ঠী বা জাতির সামাজিক অভ্যাস, জীবনচর্চার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। কোন কোন ধর্মীয় আখ্যান, mythology অনেক সময় বিরুদ্ধতার স্বরকে সংহত করতে সাহায্য করে। তাই বিভিন্ন সংখ্যালঘু ধর্মীয় গোষ্ঠী বা আদিবাসী দলিত বা অন্যান্য প্রান্তিক জাতি গোষ্ঠীর ধর্ম ও সংস্কৃতির অনুসন্ধান প্রতিবাদী রূপকের সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করবে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর ধর্মীয় তথা সামাজিক উৎসবগুলির সঙ্গে প্রতিরোধের স্বরকে মিলিয়ে দিতে পারলে প্রতিবাদের পরিসরের অভূতপূর্ব বিস্তার হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। পারস্পরিক পরিচিতির গভীরতা সম্প্রদায়গত সম্প্রীতি বৃদ্ধি করতেও সাহায্য করবে। এর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত গবেষণা এবং দৃষ্টির প্রসারতা।
বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারণা ভেঙ্গে ফেলে নতুন নির্মাণের জন্য শিক্ষা শিবির অত্যন্ত জরুরি। ইতিমধ্যে তিনটি শিক্ষা শিবির আয়োজন করেছে অভয়া মঞ্চ। ১ ডিসেম্বর নারী ও প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের অধিকার লিঙ্গসাম্য রাজনীতি নিয়ে আয়োজিত সফল শিক্ষা শিবিরের পর ২০ ডিসেম্বর মহাবোধি সোসাইটি হলে অনুষ্ঠিত হয় স্বাস্থ্যের অধিকার নিয়ে অভয়া মঞ্চ আয়োজিত দ্বিতীয় শিক্ষা শিবির। দুটি শিক্ষা শিবিরেই শ্রমজীবী মানুষের উপস্থিতি এবং অংশ গ্রহণ চোখে পড়ার মত। ২৯শে জুন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অভয়া মঞ্চের তৃতীয় শিক্ষাশিবির অনুষ্ঠিত হয়।
১ ডিসেম্বর ভারত সভা হলে লিঙ্গসাম্য রাজনীতি নিয়ে আয়োজিত শিবিরের সম্পর্কে স্বাতী ভট্টাচার্য লিখছেন – “বহু বহু দিন পরে ফের শ্রমজীবী মানুষের অপরিমিত, নিহিত শক্তিকে জাগরিত করে তা থেকে নিজের গতিশক্তি আহরণ করতে চাইছে নাগরিক আন্দোলন … শহরের সংগঠকদের ডাকে যখন এক অঘ্রাণের বিকেলে গ্রামের মেয়েরা ভারত সভায় বলেন ‘আমরা বাড়তি পাঁচশো টাকা সরকারের কাছ থেকে ভিক্ষা চাই না, আমাদের পরিশ্রমের সম্মান চাই‘, যখন দাবি করেন ‘আমরা যেন যখন ইচ্ছা বাড়ি ঢুকতে পারি, কেউ যেন আমাদের নামে কিছু তে না পারে’, তখন পথের একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সংহতির মাধ্যমে সাম্য- এই পথ নতুন নয়, তবু প্রতি প্রজন্মকে নতুন করে সে পথ তৈরি করতে হয়।“
অভয়া মঞ্চ শুধুমাত্র একজন অভয়ার বিচারের জন্য গঠিত হয়নি, আর অভয়া না হতে দেয়াই এই মঞ্চের অন্যতম লক্ষ্য। তাই এই মঞ্চের অন্যতম প্রধান দাবী হল নারী সুরক্ষা। এই নারী সুরক্ষার প্রশ্নে অভয়া মঞ্চ অবিরাম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং যাবে। এই ভাবেই আর জি করের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে কোন্নগর, শুলুংগুড়ি এবং বাংলার প্রতি প্রান্তে। অভয়া আন্দোলন মিশে যাচ্ছে প্রত্যন্ত জেলা ও গ্রামের আন্দোলনে। এই রাজ্যে প্রতিদিন অভয়ারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। প্রতিটা সকাল শুরু হচ্ছে সংবাদপত্রে, “নিত্যনতুন” ধর্ষণের ঘটনার শিরোনামে। অভয়া মঞ্চ লড়াইয়ের রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ায়নি। সুলঙগুড়ি, কোন্নগর, ব্যারাকপুর, হরিদেবপুর, ক্যানিং, কসবা ল কলেজ, গরফা, সোনারপুর, পাঁশকুড়া, দুর্গাপুর, উলুবেড়িয়া, দত্তপুকুর, চাঁদপাড়া – যেখানেই নারী নির্যাতনের বা ধর্ষণের খবর এসেছে, অভয়া মঞ্চের প্রতিবাদী সদস্যরা ছুটে গেছেন।
রাজারহাটেরযাত্রাগাছি, গৌরাঙ্গ নগর, শুলুঙ গুড়ি, জগৎপুর এবং সংলগ্ন এলাকা জুড়ে নারী সুরক্ষা বৃদ্ধি এবং অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধের দাবিতে অভয়া মঞ্চ বৃহত্তর বিধান নগর বিগত কয়েক মাস ধরে কাজ করে আসছে। এলাকার মানুষের সঙ্গে আলাপ আলোচনা এবং প্রচারের মাধ্যমে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করছে এই মঞ্চ। একাধিক বার স্থানীয় থানা এবং বিধান নগর কমিশনারেট অভিযান করে ডেপুটেশন দিয়েছেন এই মঞ্চের সদস্যরা। কোন্নগরে প্রতিবন্ধী নাবালিকার খুনের প্রতিবাদে রাজ্য প্রতিবন্ধী সম্মিলনী ও ‘প্রচেষ্টা’নামক সংস্থার সঙ্গে যৌথ ভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি নিয়েছে অভয়া মঞ্চ। ক্যানিং এ কার্যত শাসক দলের চক্রব্যুহে ঢুকে ধর্ষিত নিহত কিশোরীর বিচারের জন্য লড়াই শুরু করেছে অভয়া মঞ্চ বৃহত্তর দক্ষিণ এবং বেহালা প্রতিবাদী মঞ্চ। জনচেতনা মঞ্চ, জনসংস্কৃতি, বিজ্ঞানমনস্ক, অভয়া মঞ্চ বৃহত্তর দক্ষিণ, বেহালা প্রতিবাদী মঞ্চ, বৃহত্তর বারাসাত অভয়া মঞ্চ, বৃহত্তর সিঙ্গুর অভয়া মঞ্চ, বৃহত্তর জলপাইগুড়ি অভয়া মঞ্চ – অভয়া মঞ্চের সহযোগী বিভিন্ন সংগঠন ও মঞ্চ গুলির সাহায্যে জেলা গুলিতে ছড়িয়ে পড়ছে অভয়া মঞ্চের প্রতিবাদ কর্মসূচি।
অভয়া মঞ্চ শুধু রাজ্যের অভ্যন্তরে নয়, সারা দেশ ব্যাপী প্রতিমুহূর্তে ঘটে চলা যৌন নির্যাতন এর বিরুদ্ধে লড়াই এইমঞ্চের।
কেরালায় মহেশতলা অঞ্চলের চারজন নারী শ্রমিকের ভয়াবহ নির্যাতনের তদন্ত করতে মহেশতলা ষোল বিঘা বস্তি বাঁচাও সংগ্রামী মণ্ডলীর সঙ্গে কেরালায় গেছে অভয়া মঞ্চের একটি প্রতিনিধি দল। আর্থিক এবং আইনী সহায়তা নিয়ে ষোল বিঘা বস্তি বাঁচাও সংগ্রামী মণ্ডলীর পাশে আছে অভয়া মঞ্চ। কর্ণাটকে শ্রীক্ষেত্র ধর্মস্থল মঞ্জুনাথ স্বামী মন্দির সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরে ঘটে চলা ভয়াবহ নারী ঘাতী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিবৃতি মারফৎ সারা দেশের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন প্রতিবাদী মানুষ এবং গণতান্ত্রিক ও মহিলা সংগঠন গুলির কাছে জনমত ও গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছে অভয়া মঞ্চ। অভয়া হত্যার ন্যায়বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা এই মঞ্চ রাজ্য এবং দেশের প্রতিটি প্রান্তে নারী সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। এই লক্ষ্যপূরণে সন্ত্রাস সংস্কৃতির অবসান আবশ্যিক শর্ত ।
গুড়গাঁও এ নিহত বাঙ্গালি তরুণী নার্স, মহারাষ্ট্রে নির্যাতিতা আত্মঘাতী চিকিৎসক- এঁদের বিচারের দাবিতে কর্মসূচি অভয়া মঞ্চের পরিকল্পনায় আছে।
শুধু সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন হলেই ধর্ষণ বা নারীনিগ্রহ বন্ধ হয়ে যাবে এমন নয়। ক্ষমতাতন্ত্রের আমূল পরিবর্তন ছাড়া নারী সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা সম্ভব নয়। যে সংস্কৃতি নারী কে ভোগ্য পণ্য ভাবতে শেখায় তার উৎপাটন ছাড়া ধর্ষণ রোধ করা সম্ভব নয়। সামাজিক দুর্নীতি আর লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সংঘর্ষের পাশাপাশি নতুন চিন্তা ও সংস্কৃতির জন্ম – এই ভাবেই নির্মাণের পথে এগিয়ে চলেছে অভয়া মঞ্চ।
অভয়া মঞ্চের উদ্যোগে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যেমন খিদিরপুর, বোলপুর, জলপাইগুড়ি, ১৬ বিঘা বস্তি, সোনারপুর প্রভৃতি জায়গায় আয়োজন করা হচ্ছে “অভয়া ক্লিনিক” নামক স্বাস্থ্য শিবিরের। কেন্দ্রীয় কর্মসূচি ছাড়া বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের অসংখ্য কর্মসূচি হয়েছে গত এক বছরে যেখানে মঞ্চের সদস্য এবং বহু সাধারণ প্রতিবাদী মানুষ অংশ নিয়েছেন।
এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন। যারা সাম্যের অধিকারে বিশ্বাস করেন, শোষণ মুক্ত সমাজ চান, যেখানে স্বাস্থ্য শিক্ষায় সবার সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বামপন্থী এবং গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিকে এক সঙ্গে লড়াই এর ময়দানে থাকতে হবে। বাম শিবির গুলির পারস্পরিক বোঝাপড়াটা উন্নত করার প্রয়োজন। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে সংসদীয় এবং অসংসদীয় বামদের। তত্ত্বের আলাপ আলোচনা বিতর্ক যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি অবিরাম তাত্ত্বিক সংগ্রাম আর গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নিয়ন্ত্রণ করে মতের ভিন্নতাকে সম্মান করা, সহিষ্ণুতা প্রদর্শন এবং সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে যৌথ লড়াইয়ের পথ খুঁজে নেওয়া। কোন ভাবেই দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থ কে প্রাধান্য না দিয়ে অদলীয় রাজনৈতিক যৌথ মঞ্চ গড়ে তোলার জন্যই সব শক্তিকে ব্যবহার করতে হবে।
অভয়ার ন্যায়বিচার, ভয়ের রাজনীতির অবসান, স্বাস্থ্যের অধিকার এবং লিঙ্গ সাম্যের দাবি – অভয়া আন্দোলনের এই মূল দাবি গুলিকে নাগরিক পরিসরে প্রসারিত ও শক্তিশালী করতে গেলে ইতিহাসের শিক্ষাকে অস্বীকার করলে চলবে না। আশির দশকের স্বাস্থ্য আন্দোলনকে ভুললে চলবে না কোন ভাবেই। স্বাস্থ্য ভিক্ষা নয় অধিকার – আশির দশকের আন্দোলনেই প্রথম ঘোষিত হয় এই দাবি। সার্বজনীন স্বাস্থ্যের দাবি এবং সংঘর্ষের পাশাপাশি নতুন চিন্তা ও পরিকাঠামোর নির্মাণ – অভয়া আন্দোলনের অগ্রগতি এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্যের আন্দোলনের সঙ্গে গভীর ভাবে সম্পর্কযুক্ত। শুধু পুলিশ বা সিসিটিভি নয়, উন্নত পরিকাঠামো এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবাই চিকিৎসক ও রোগী- উভয়ের নিরাপত্তাকে সুনিশ্চিত করতে পারে।
অভয়া হত্যা মামলার বিচার নিয়ে কেন্দ্র রাজ্য মিলে ট্র্যাপিজের খেলা চলছে। suo moto cognizance দিয়ে সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে গিয়ে জল ঢালার চেষ্টা, CBI এর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অকর্মণ্যতা, জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস আর প্রতিবাদী মানুষের লড়াই এ মামলা সুপ্রিম কোর্ট থেকে হাই কোর্টে আনা গেলেও শুনানী শেষ না করেই ডিভিশন বেঞ্চে পাঠিয়ে দেওয়া এবং আইনী ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা – সব মিলিয়ে আইনী লড়াই এ এই মুহূর্তে খুব আলো দেখা যাচ্ছে না। এই অন্ধকারকে সরাতে পারে গণ আন্দোলনের জোয়ার। কোর্টে সহজে বিচার হয়ে যাবে আর কোর্টই শেষ কথা বলে দেবে – এই বিশ্বাসে অভয়া মঞ্চ তৈরি হয়নি। ‘বাধা যত কঠিন হবে লড়াই তত তীব্র হবে’ – এই প্রত্যয় থেকেই গড়ে উঠেছে অভয়া মঞ্চ।
এই মুহূর্তে বিভিন্ন জেলা ও মফস্বল শহর গুলিতে সংগঠন গড়ে তোলা বিশেষ প্রয়োজন। বড় মেডিক্যাল কলেজে নিরাপত্তার অভাবকে সর্বত্র মেয়েদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে যুক্ত করে থ্রেট আর রেপ কালচারের অবসানের দাবিতে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে রাজপথ থেকে আলপথে। শহুরে এলিট আন্দোলনের গণ্ডী ছাড়িয়ে দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন না করলে এই আন্দোলন অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে যাত্রা করতে পারবে না। বিপুল ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ে নেমে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে এক বছর আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া এবং পথের সঙ্কল্পে অবিচল থাকা অভয়া মঞ্চের অন্যতম সাফল্য। বর্ষপূর্তিতে এই ইতিবাচকতা আমাদের উৎসাহ দিক, অনুপ্রেরণা যোগাক আরব্ধ কাজকে সম্পূর্ণ করার প্রয়াসে ভবিষ্যতে আরও কঠিন সংগ্রামে ব্রতী হতে, যে সংগ্রাম আমাদের পৌঁছে দেবে মহানগরের সীমানা ছাড়িয়ে শহরের প্রান্তে, বাংলার প্রতি গ্রামে, শ্রমিক কৃষক সাধারণ মানুষের মধ্যে।।











গণ আন্দোলনে ধর্মীয় অনুষঙ্গ ব্যবহার , সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে- এটা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই । গান্ধীর এই দিকে একটা ঝোঁক ছিল, নেহরু একেবারেই পছন্দ করতেন না । গণ আন্দোলন যখন স্বতঃস্ফুর্ত হয়, তখন এই ধর্মীয় অনুষঙ্গের ব্যবহার অনেক সময়ই স্বতঃস্ফুর্তভাবে হয়ে যায় । যেমন ধরুন, শঙ্খের ব্যবহার। শঙ্খ কখনোই কোনও একটি ধর্মের একচেটিয়া অধিকার নই । অভয়া আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে কালী বা দুর্গার ব্যবহার, যতটা ধর্মের করণে, তার চেয়েও বেশি মনে হয়, শক্তির প্রতীক হিসাবে । একই মানুষ মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে এই সমস্ত নিয়ে যাবেন বলে মনে করিনা। ধর্মীয় অনুষঙ্গ সচেতন ভাবে বাদ দিতে হবে, কিন্তু সন্ন্যাসী, কোনও মৌলবী, বা যাজক যদি ধর্মীয় পোশাকে আন্দোলনে আসেন, আমরা তখন তাদের কি বলবো? পোশাক পরিবর্তন করে আসুন।
এতো কিছু লেখার পরও বলবো, গণ আন্দোলনে এমনকি সতস্ফুর্ত গণ আন্দোলনেও সচেতন বা অসচেতনভাবে ধর্মীয় অনুসঙ্গ পরিহার করাই শ্রেয় । কিন্তু এর জন্য আন্দোলনকে পরিহার করা আরও বেশি মৌলবাদিতা ।
অত্যন্ত তথ্য সমৃদ্ধ ও যুক্তিপূর্ণ । আজ অভয়া মঞ্চের বন্ধু রা/সাথিরা যেভাবে সব যায়গায় এগিয়ে যাচ্ছে আশা রাখি ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা একটু হলেও কমতে পারে। তবে দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তি পাওয়া টা দরকার।