কোনও একটি আবাসনের বেনিয়ম নিয়ে লড়াই করার সময় আবিষ্কৃত হয়েছিল, তৎকালীন আবাসন-মন্ত্রী তথা রাজ্য আবাসন পর্ষদের চেয়ারম্যান কলকাতা পুরসভার তৎকালীন মেয়রের কাছ থেকে কিছু অনুমতি প্রার্থনা করেছেন – প্রার্থনা চটজলদি মঞ্জুরও হয়েছে – মেয়র ও আবাসন-মন্ত্রী একই ব্যক্তি। পরিবেশ-দফতরের ছাড়পত্র – সেক্ষেত্রেও, পরিবেশ-মন্ত্রীও, সেই একই ব্যক্তি। শুনেছি, এমন ঘটনা, সেই সময়, বিভিন্নক্ষেত্রে ঘটেছে।
তো সেরকমই, রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী পুলিশমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী সবই একজন। তিনি ঠিক কী হিসেবে কার বিরুদ্ধে দাবি জানাতে আগামীকাল পথে নামছেন, তা বুঝে ওঠা মুশকিল।
কেননা, আরজিকর প্রসঙ্গে যা যা কথাবার্তা ক্রমশ সামনে আসছে, তা ভয়াবহ। মানে, ‘অভয়া’-র খুন ধর্ষণ শুধু নয়, তার আগে এতদিন ধরে যা যা চলেছে, সেই সব কথাবার্তা। চূড়ান্ত দুর্নীতি ও তা ঢাকতে ভয় দেখানো ইত্যাদি প্রভৃতি – এককথায় অন্ধকারের রাজত্ব। স্বাস্থ্যমন্ত্রকের দায় নেই?
পুলিশ অপরাধ ঢাকতে যা যা করা সম্ভব, দায়িত্ব নিয়ে করেছে। খুনকে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা থেকে শুরু করে জেরা করতে দেরি করা সবই। তথ্যপ্রমাণ লোপাট করার অভিযোগ তো আছেই। পুলিশমন্ত্রকের দায় নেই?
গতকাল রাতের ঘটনায়, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আহত অফিসারকে, তিনি নির্দেশ দেন, চটজলদি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে। কেন? তাঁর আমলে তরতর করে এগিয়ে যাওয়া সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসা হতে পারত না??
তো ‘অরাজনৈতিক’’ এই পরিবেশে, স্নেহশীল দাদার মতো কুণাল ঘোষ জানাচ্ছেন – রাজ্য সরকারের প্রতি ক্ষোভ থাকলে জানান, কিন্তু বিরোধীদের ষড়যন্ত্রে পা দেবেন না।
ঠিকই। সরকারি দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ‘অরাজনৈতিক’ হওয়াই সমীচীন – আধ্যাত্মিক হলে বোধহয় আরও ভালো হয়।
নন্দীগ্রাম পর্যায়ে গুজবের বান ডাকিয়েছিলেন যাঁরা, তাঁরাও অত্যন্ত বিচলিত – কী দুর্দিন, কী অন্যায়, চারপাশে, এই ইস্যুতে, ভয়ানক গুজব ছড়ানো চলছে! গুজব ছড়ানো অনুচিত, সে নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই। কিন্তু কুণাল ঘোষের মুখে নীতিকথা যতখানি গ্রহণযোগ্য, এঁদের মুখে গুজব-বিরোধিতাও, ততখানিই। প্লাস এক্ষেত্রে, মুড়িমিছরি এক করে দেখানো, সত্যি-কে গুজব বলে চালানোর অপপ্রয়াসও লক্ষণীয়। ‘লেসার এভিল’-এর মায়া কাটিয়ে ওঠা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়।
আরজিকর-এর অধ্যক্ষ অন্য কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন (আদালত অবশ্য সে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন) – দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত এক চিকিৎসক আরজিকর-এ অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন।
সিবিআই চটজলদি তদন্ত করে, তদন্ত করে দোষীদের সাজা দেয় – সেসব এখন অতীত, এখন পাঁচতলা মল পুরোটাই ইত্যাদি প্রভৃতি, অতএব…! তদুপরি এক্ষেত্রে তো দায়িত্ব নিয়ে তথ্যপ্রমাণ হাপিশ করা হয়েছে, কাজেই…।
সেই রাত্রে – মানে, খুন ও ধর্ষণের সেই রাত্রে – ডিউটিরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কেউই প্রকাশ্যে আসেননি, কেউই মুখ খোলেননি। ওদিকে ধর্ষকের এনকাউন্টার চাওয়ার পর যুবরাজও চুপ।
এদিকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে – দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও, এমনকি বিদেশেও – মেয়েরা নিরাপত্তার অধিকার, রাতে রাস্তায় নামার অধিকার পুনরুদ্ধারে নেমেছেন। বিপুল সংখ্যক নারী। পুরুষও। সেখানেও, ছেলেরা ছিল কি ছিল না, শাঁখ বাজানো হয়েছে কি হয়নি ইত্যাদি প্রভৃতি প্রশ্নের মাধ্যমে জল ঘোলা করা চলছে।
তো এই আশ্চর্য অমৃতকালে, আমাদের দায়িত্ব – গুরুদায়িত্ব – এক্কেবারে সহজ-সরল ‘অরাজনৈতিক’ হয়ে থাকা।
সরকারি অন্যায় – সরকারি দুর্নীতি – সরকারি অনাচার – এই সবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করুন, খুবই ভালো কথা – কিন্তু করতে হলে করতে হবে, একদম অরাজনৈতিক প্রতিবাদ। নইলেই কিন্তু মুশকিল। আন্দোলনের ‘সতীত্ব’ নিয়ে টানাটানি শুরু হবে।
আর টানাটানি যাঁরা করবেন, তাঁরা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অবশ্যই – কিন্তু আমাদের মেনে নিতে হবে, তাঁদের চাহিদাটুকু নিখাদ অরাজনৈতিক!!
(এখানে বিদ্বজ্জন তথা সুশীলবাবুদের নিয়ে আর টানাটানি করছি না। এমনিতেই তাঁদের জীবনে এত্তো সমস্যা, এর মধ্যে ফালতু ইয়ে বাড়ানোর মানে হয় না।)










