হাসির গল্প লেখা, মানে যে গল্প পড়ে বিষাদে পাথর মন গলিয়ে হাসির ঝর্নাধারা নেমে আসবে মানবজমিনে, তেমন গল্প লেখা পৃথিবীর অন্যতম কঠিন কাজ।
আমি, বলতে নেই, হাস্যরস সৃষ্টি করতে আদৌ পারি না। অথচ দেখুন হাস্য রস মোটে চ্যাটচেটে অস্বস্তিকর নয় — এই মারাত্মক গরমে সারা গায়ে রসালো পান্তোয়ার নির্যাস মেখে উহ্ আহ্ ইরিব্বাবা করার মতো বেদনাদায়কও নয়, তবুও আমার কলম ধর্মঘট করে, অন্যান্য অনায়াসসৃষ্ট রসের সমান মজুরি দাবি করে বসে! বেয়াদব বেতমিজ লেখনী!
যা হোক, পোচ্চুর গৌরচন্দ্রিকার পরে একপিস সাতবাসি জিলিপিতুল্য মজার গপ্প পোস্ট করছি।
এর আদিরূপটি অনেককাল আগে একটি লিটল ম্যাগে প্রকাশিত হয়েছিল। এখন একই গপ্প কথঞ্চিৎ পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত আকারে পেশ করলাম।
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট
********************
মালবাজার টাউনকে পিছনে ফেলে যে কালো পিচঢালা রাস্তাটা ও-ই চালসার দিকে চলে গেছে, তার উত্তরদিকে দিগন্তবিস্তৃত চা বাগান; যতদূর চোখ যায়, ততদূর অবধি ছড়ানো — সেই ধোঁয়াটে নীল ভুটান পাহাড়ের গায়ে গিয়ে শেষ হয়েছে যেন। ঐ চা বাগানের একপাশে কতগুলো নিচু ছাতওলা কাঠের বাড়ি, পরপর সাজানো — ওগুলো বাবুদের কোয়ার্টার। তারই একটার প্রশস্ত চত্বরে একটা ছোট্ট প্যান্ডেল বাঁধা হয়েছে। ওটা নেপালচন্দ্রের বাড়ি।
নেপালচন্দ্রের মনে আজ ভারি ফুর্তি। আজ যে বড়দার বৌভাত!
মাইকটা অদৃশ্য। তাও বিসমিল্লার মূর্ছনা বাগানের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল বহুদূরে। নেপালচন্দ্র কাঠখোট্টা ব্যক্তি, সুরাসুরের ধার বড়ো একটা ধারে না। সে প্যান্ডেলের পিছনে, একটা বুনো কাঁটাঝোপের ধারে বসে অতীব মনোযোগ সহকারে বৌদির বাপের বাড়ির তত্ত্বের ‘চিত্রকূট’ সাঁটাচ্ছিল পরম তৃপ্তিতে। এমন সময় তার বড়পিসির ‘অমাইক’ গলা বেজে উঠল — ”ন্যাপলা! ন্যাপলা কোতায় গেলি? বারকোশ ভত্তি চিত্তকুট রেকে গেলাম ভাঁড়ারঘরে – আদ্দেক বেবাক উবে গেল ক্যামন করে শুনি? ন্যাপলাআআ-”
নেপালচন্দ্রের কপালে ভূরিভোজ বড় একটা জোটে না। উত্তরবঙ্গীয় উদরাময় তার নিত্যসঙ্গী। চা বাগানের নৃশংস ডাক্তারজেঠু ফি-মাসে মেট্রোজিলের গুলি আর কেঁচোনাশক বড়ি প্রায় ক্যাডবেরি চকোলেট খাওয়ানোর মত করে তাকে গিলিয়ে থাকেন – আর সেও সোনামুখ করে খায়। বলতে নেই, নোলাটা তার একটু বেশিই। টিফিনের সময় ইস্কুলের গেটের হজমি, আচার, ‘কারেন্ট’ থেকে শুরু করে রায়েদের জংলা বাগানের বুনোকুল, করমচা, পেয়ারা, মায় স্টেশন মার্কেটের ভেলপুরি, ফুচকা, সবই তার অত্যন্ত প্রিয়। ফলে শুধু কেঁচোর বড়ি আর মেট্রোজিলই নয়, কুখাদ্য ভক্ষণের পুরস্কার স্বরূপ মাস্টার মশাইদের চড়চাপড়, মায়ের কানমলা, বাবার ছাতাপেটা ইত্যাদি খেয়ে খেয়েও সে তার পেটটাকে জয়ঢাক করে ফেলেছে এতদিনে।
অত হাবিজাবি গেলে বলেই বোধহয় তার বুদ্ধিটাও বেশ গোলমেলে। একদিন দুপুরে মা-পিসিমারা বসে বাংলা সিনেমা দেখছিলেন টিভিতে। নেপালচন্দ্রের টেলিভিশনের মোহ নেই। কিন্তু সদ্য পৈটিক কৌশল বিঘ্নকারী রোগের হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়ায় তার ইস্কুল যাওয়া স্থগিত ছিল সেদিন। উঠোনে বসে নিবিষ্টচিত্তে তার একান্ত অনুগত নেড়ি শাঁটুলের ল্যাজে একটা খালি টিনের কৌটো বাঁধার চেষ্টা করছিল নেপাল। আর ভাবছিল ওটার মধ্যে যদি একটা ঢিল ফেলে দেওয়া যায়, মাঝারি সাইজের বেশ গোলগাল, মসৃণ একটা ঢিল, আর শাঁটলো ওটা সুদ্ধু ল্যাজটা নাড়িয়ে যদি পাড়াময় দৌড়ে বেড়ায় — তখন কি অপূর্ব শব্দতরঙ্গ ছড়িয়ে পড়বে চতুর্দিকে! ভেবে ভেবেই আনন্দে তার রোম কন্টকিত হয়ে উঠছিল। বলাই বাহুল্য শাঁটুল তখন নিদ্রাভিভূত ছিল। এমন সময় তার কানে এলো, টিভির পর্দা থেকে ভিলেনের প্রতি নায়কের হুঙ্কার –”এর ফল ভাল হবে না সর্দার! জেনে রেখো, তুমি যা করতে চলেছ, তার পরিণাম মৃত্যু!”
বাহ্! কথাটা তার ভীষণ পছন্দ হলো। মুশকিল হচ্ছে, পছন্দসই কথা পেলে তার লাগসই ব্যবহার না করা ইস্তক নেপালচন্দ্রের পাকযন্ত্র কাজই করে না। অতএব, সে কথাটাকে কাজে লাগাতে বেরিয়ে পড়ল।
ইতস্তত ঘুরতে ঘুরতে পাড়ার নতুন শনিমন্দিরটায় চোখ আটকে গেল তার। মার্বেলের মন্দির। টাউনের বুড়োদা শিলিগুড়ি থেকে টালি আনিয়ে চাতালটা বাঁধিয়ে দিয়েছে। একটা নিচু পাঁচিল দিয়ে ঘিরেও দিয়েছে মন্দিরটা। পাঁচিলের গায়ে আবার দেবদেবীদের ছবি সাঁটা টাইলস। লোকজনের ইয়ে পেলে পাঁচিলের গায়েই ভার লাঘব করার একটা চলন আছে কিনা, তাই। বুড়োদার তোলাবাজিতে নতুন স্টার্ট আপ — ঠাকুরদেবতায় ভয়ঙ্কর ভক্তি।
তা,ওই পাঁচিলের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতেই নেপালচন্দ্রের মুখে এক প্রকান্ড হাসি ফুটে উঠল।
পরদিন সকালে, প্রাতর্ভ্রমণকারী সুধীনজেঠু, দুধওলা রমেশ, কাগজওলা শ্যাম দেবশর্মা — সকলেই দেখল, বিস্ফারিত চোখেই দেখল, শনিমন্দিরের নিচু পাঁচিলের গায়ে দেবদেবীদের ছবির উপরে কাঠকয়লা দিয়ে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা রয়েছে —
”এখানে কেহ প্রস্বাব করিবেন না। করিলে পরিণামে মৃত্যু”!
সক্কলে নেপালচন্দ্রের মৌলিকতায় মুগ্ধ হলেও বাংলাস্যার রাজেনবাবু হননি। মাথায় ডাস্টারের মোলায়েম গাঁট্টা মেরে বলেছিলেন —
”ব্ল্যাকবোর্ডে পঞ্চাশবার প্রস্রাব বানান লিখে তবে তোর আজ ছুটি!”
মাঝের ঘর, যেটা নেপালচন্দ্রের মা-বাবার ঘর, সেটাতেই বড়দার ফুলশয্যার ব্যবস্থা হয়েছে। বৌভাতের খাওয়া দাওয়া মিটেছে একটু আগে। বাড়ির, পাড়ার কাকিমা, মাসিমা, দিদিরা নতুন বৌদিকে নিয়ে খুনসুটিতে ব্যস্ত। দাদা ভূপালচন্দ্রের মত নেপালেরও অসহ্য লাগছে।কতক্ষণে এদের আদিখ্যেতা শেষ হবে কে জানে। কতক্ষণে যে নতুন বউকে নিয়ে নতুন বর একটু একান্ত হবে!
অবশেষে সেই সময় এলো। ঘরের দরজা বন্ধ হলো। ফুলে ফুলে সাজানো ঠাকুদ্দার আমলের উঁচু খাট, তাতে পা ঝুলিয়ে বসল নবদম্পতি। জানলায় পর্দা টানা। ভূপাল তার বউয়ের পিঠে আলতো করে একটা হাত রাখলো। বউ একটু উসখুস করে উঠল — ”কি করছ! কেউ যদি দেখে ফেলে!”
ভূপাল মৃদু হাসলো। ”পাগলি একটা! কে আছে ঘরে,যে দেখবে? ঘরে তো শুধু তুমি আর আমি!”
ভূপাল কিন্তু নির্ভুল ছিল না।
সেই পুষ্পশোভিত সুউচ্চ পালঙ্কের নীচে, গভীর অনুসন্ধিৎসায়, কিঞ্চিৎ ব্যস্তভাবে একটি সযত্নরক্ষিত হাঁড়ির ঢাকা খুলতে প্রবৃত্ত ছিল শ্রীমান নেপালচন্দ্র। নির্ঘাৎ ওটায় সেই নতুন গুড়ের দই আছে — যেটা বৌদির বাবা স্পেশ্যাল আইসবক্সে ভরে সুদূর নবদ্বীপ থেকে আনিয়েছেন। কম পড়ে যাবে বলে পরিবেশন করা হয়নি আজ — কাল দুপুরে বাড়ির লোকেরা শুধু খাবে। কিন্তু নেপালচন্দ্রের লোলুপ রসনার কি আর অতক্ষণ তর সয়?
ওদিকে তখন দুটি ঘটনা ঘটছিল। একদিকে বড়পিসিমা বিলাপ করতে বসেছিলেন — “বলি ছোটবৌ, আমার আক্কেলটা দ্যাখ দিকি একবার — আজ শুদু জর্দা খয়ের দিয়েই পান মুকে দিতে হবে রে! চুন ফুইরেচে বলে জ্যোতিকে আনতে দিলাম — বেভুলে তোদের ঘরের খাটের নিচোয় রেকে দিয়েচি। খেয়ালই পড়ল না যে আজ ছেলের ফুলশয্যে ও’ঘরেই — এখন দোর ঠেলে চুনের খোঁজ করব? ছ্যাছ্যাছ্যাছ্যা – কত বড় লজ্জার কতা হবে বল দিকি! রাম রাম রাম রাম–”
অন্যদিকে ভূপালচন্দ্রের সঙ্গে নববধূর কথোপকথন বিপজ্জনক বিন্দুতে এসে পৌঁছেছিল।
”তোমাদের চা বাগানে বাঘ আসে?”
”আসে তো, হরদম আসে” —
”বলো কি গো? বড় বাঘ?”
”না, ঠিক বড় বাঘ নয়, চিতাবাঘ। তা দাপটে সেও বড় কম নয়! ভুটান পাহাড়ের নিচের জঙ্গল থেকে ছিটকে চলে আসে কতসময়—”
”তুমি নিজের চোখে দেখেছ?”
ভূপালের গলায় গ্রাম্ভারি ভাব ফোটে — ”কত্তবার’!”
(বাস্তবে মাত্র একবার, তার কৈশোরে একটি চিতাবাঘ কোনোভাবে চা-বাগানের কুলি লাইনে এসে পড়েছিল। নেপালচন্দ্র তখন দুধের শিশু হলে কী হবে, রেওয়াজি গলার কান্না বুথ সায়েবের বাচ্চাকেও হার মানাতো বটে। বাঘের আগমনে বাগানে হুলুস্থূল পড়ে যায় এবং কুলিবস্তির টিন ক্যানেস্তারা, লোকজনের আর্তনাদ, বড়-মেজো-সেজোবাবুদের সমবেত হম্বিতম্বিতে বিরক্ত নেপালচন্দ্র গলায় গিটকিরি খেলিয়ে প্রবল অসন্তোষ ব্যক্ত করতে আরম্ভ করে। শোনা যায়, সেই অশরীরীতুল্য চেঁচানিতে কুলিবস্তির ক্যানেস্তারা থমকে যায়, বাবুরা ব্যোমকে যান এবং বাঘবাবাজি চমকে গিয়ে মদেশিয়া কামিনদের কেটে রাখা গর্তে পড়ে তৎক্ষণাৎ অজ্ঞান হয়ে ধরা দেবার কর্তব্য সুচারুরূপে সম্পন্ন করে। কাকতালীয় কিনা সে বিষয়ে তালফল এবং দণ্ডবায়সের ইন্টারভিউ নেওয়া হয়নি ঠিকই, তবে উক্ত দুর্ঘটনার পরে কোনো আত্মভোলা ‘দেবদাস’ কিংবা পথভোলা ‘নবকুমার’ চিতাবাঘ আর ভূপালদের চা বাগানের ত্রিসীমানা মাড়ায়নি, এটা সত্যি কথা!
উপহার স্বরূপ সায়েব মালিকরা ন্যাপলাকে সোনার ঘুনসি প্রেজেন্ট করেছিলেন — পরে অবশ্য জানা যায় সেটি নিয্যস গিল্টি করা।)
নববধূ অতশত জানে না, সে বেচারি শহরের মেয়ে। কৌতূহলে ফাটো ফাটো হয়ে কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করে — ”এই বাড়িতে এসেছিল কখনো?”
বউয়ের গলার কম্পন ভূপালও টের পায় এইবার।
ঠিক সেই মুহূর্তে উল্লিখিত হাঁড়ির মধ্যে মুখটি ঢুকিয়ে অত্যুৎসাহী নেপালচন্দ্র একখাবলা দই উদরস্থ করা মনস্থ করল। মুখে দেওয়া মাত্র পৃথিবী যেন শতধা হয়ে ফেটে পড়ল নেপালচন্দ্রের চোখের সামনে।
অর্ধেক মুখ হাঁড়ির বিবরে — সেই অবস্থায়ই তার সুপ্রসিদ্ধ বৈঠকি গলা থেকে অমানুষিক আর্তনাদ বেরিয়ে এলো — ”আঁআঁআঁআঁ–”
খাটের উপরে নতুন বউ উন্মাদ আতঙ্কে ভূপালকে খামচে ধরে চিৎকার করে উঠল — ”বাঘ! বাআআঘ! আমাদের খাটের নিচেই বাঘ–”
তারপরেই ভূপালের কোলে পতন এবং মূর্ছা!
পিসিমার বিলাপ, নেপালচন্দ্রের মর্মন্তুদ সিংহনাদ, ভূপালচন্দ্রের হম্বিতম্বি, প্রতিবেশীদের দৌড়োদৌড়ি — সব মিলিয়ে তখন নরক একেবারে গুলজার।
সাতদিন পরে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেল নেপালচন্দ্র। তার কন্ঠস্বর বিজাতীয় হয়েছে, এখন শাঁটুলও তার গলা শুনে চিনতে পারে না। তবে সে অতি সুবোধ নাবালক হয়ে গিয়েছে এখন — অখাদ্য কুখাদ্যে আর রুচি নেই। কেবল ইস্কুলের ছুটির দিনের দুপুরবেলায় মাঝে মাঝে বেঁটে চা গাছের ফাঁকে শেড ট্রি-গুলোর মাথার উপর ধোঁয়ার কুন্ডলী দেখা যায়।
নিন্দুকে বলে, কেমন বিড়ি বিড়ি গন্ধ!
ছবি: আন্তর্জাল 😁









