নদীরে – , ও মোর তিস্তারে – : তিস্তাকে নিয়ে নির্মলেন্দু চৌধুরির অপূর্ব সুরেলা ভাটিয়ালি গান শুনতে শুনতে আমরা তিস্তার বিস্তীর্ণ ভাটি থেকে মায়াবী উজানের দিকে এগোই। কারণ ওখানেই রয়েছে উত্তরবঙ্গের একের পর এক ভয়াবহ মনুষ্যকৃত প্রাকৃতিক বিপর্যয় গুলির উৎস। বিশ্বের সর্বোচ্চ, ষষ্ঠ দীর্ঘতম, নবীন ও ভঙ্গিল পর্বত হিমালয় যেমন দুর্লঙ্ঘ ও অনেকটাই অজানা, তেমনই তাকে নিয়ে গবেষণা ও কাজও অসীম। শুধুমাত্র ‘হিমালয়ান জার্নাল’ ই ২০০১৮ অবধি বেরিয়েছে ৭৩ খণ্ড। আবার সমগ্র হিমালয়ের মধ্যে বর্ষণসিক্ত শ্যামল পূর্ব হিমালয় অতুলনীয় উদ্ভিদ ও প্রাণী বৈচিত্র্যে পূর্ণ এবং নিসর্গ রূপে অনন্য। তাই আবিশ্বের প্রকৃতিপ্রেমী, পর্যটক ও গবেষকদের পূর্ব হিমালয় বিশেষত দার্জিলিং পাহাড় এবং সংশ্লিষ্ট নেপাল, সিকিম ও ভুটানের প্রতি প্রবল আকর্ষণ।
এই অঞ্চলের প্রধান নদী অপরূপা তিস্তাকে ভালবেসে শমিতা ও উৎপল চৌধুরি তাঁদের ছাত্রাবস্থা, প্রেম ও দাম্পত্যের বিভিন্ন পর্বে তিস্তার উজান ধরে উৎসমুখে ৪০ বারেরও বেশি গিয়েছেন। একমাত্র কন্যা তিস্তাকেও কয়েকবার নিয়ে গেছেন নদী তিস্তার সাথে দেখা করাতে। ১১ বছর বয়সে কন্যা তিস্তা দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ১৩ বছর বয়সে চলে গেলে তাঁদের হিমালয় প্রমাণ শোক লাঘবের জন্যে আবার ফিরে গেলেন হিমালয়ের কোলে তিস্তার উৎসমুখের নিকটবর্তী তিব্বতি ভুটিয়া শরণার্থীদের নিরালা জনবসতি লাচেন ও লাচুং এ। তারপর তিস্তার প্রবাহ ধরে উত্তর সিকিমে তিস্তার সৃষ্টি থেকে বাংলাদেশের চিলামারির কাছে ফুলছড়িতে ব্রহ্মপুত্র নদের সাথে মিলিত হয়ে যমুনা নামধারণ অবধি ৪১৪ কিমি তিস্তার বর্ণময় বহতাকে ছবি ও দুই মলাটের মধ্যে আনলেন ‘ And The Teesta Flows’ (২০১৫) গ্রন্থে।
তোর যেমন থৈ থৈ বেলা – : ছোটবেলা থেকে অনেকবার উত্তরবঙ্গ ও দার্জিলিং পাহাড় যাওয়া, গল্প শোনা, ডাঃ গিরিধারী কুণ্ডুর ‘টংসা চু’ পড়া। কালিম্পঙের দিকটা বা সিকিম যাওয়ার সময় জাতীয় সড়ক ১০ ধরে স্রোতস্বিনী তিস্তার উজান পথেই এগোতে হয়েছে। আবার ডুয়ারস এবং উত্তর পুবের রাজ্যগুলিতে পৌছতে সেবকের কাছে পাহাড় থেকে সমতলের দিকে ঝাঁপ দেওয়া উচ্ছ্বল তিস্তার উপর দিয়ে করোনেশন অথবা রেল সেতু পেরোতে হয়েছে। কালিম্পঙে সুরজিত কাকুর কোয়ারটারসে থাকার সময় ঘুম থেকে উঠলেই দেখা হত তিস্তার বোন ঝকঝকে রুপোলী রেলি নদীর সাথে। বাবার সাথে প্রথম যেবার সিকিম যাই সিকিম তখন বিদেশ, রাজতন্ত্র। গ্যাংটক অবধি পুরোটা পথ তিস্তা সেবার লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে সঙ্গ দিয়েছিল।
হালে ভারত – চিন সীমান্ত সংঘর্ষের পর সীমান্ত দেখতে জুলুক হয়ে ডোকলাম, পুপুপ, জেলেপ লা, নাথু লা গেছিলাম। তিস্তা অনেকটা পথ সঙ্গ দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু জানিয়েছিল তার গভীর দুঃখের কথা। তারপর দপ্তরের কিছু কাজ উপলক্ষ্যে কালিম্পং জেলার কিছু গ্রামে গেছিলাম। রিম্বি ও কালিঝোরায় তিস্তা লো ড্যাম ‘৩’ ও ‘৪’ এ দেখলাম বীভৎস অস্ত্রপচার করে বাঁধ দিয়ে নদীকে মৃতপ্রায় করে দেওয়া হয়েছে। সিকিমে তিস্তা এবং তার উপনদীগুলির উপর ৪৭ টি জায়গায় বাঁধ, জলাধার ও জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে। এর মধ্যে নয়টির কাজ সম্পূর্ণ, ১৫ টিতে আংশিক কাজ হয়েছে। আর জলপাইগুড়ির গজলডোবায় বিশাল শুখা নদীখাতে রচিত হয়েছে তিস্তার অন্তিম শয্যা।
তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্ত: তিস্তা সবাইকে আনন্দ ও উৎসাহ এবং পাহাড়ে জল ও বিদ্যুৎ দেওয়া ছাড়াও সমতলে পড়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জলপাইগুড়ি জেলা, কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জ ও মাথাভাঙ্গা মহকুমা এবং দহগ্রামের পর বাংলাদেশের রংপুর ডিভিশনের লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারী জেলার ১২,৫৪০ বর্গ কিমি অঞ্চলে পানীয়, অন্যান্য প্রয়োজনীয় এবং কৃষির সেচের জল জোগায়। তিস্তা আবার কাঁদায়। বন্যায় উথাল পাথাল করে দেয় দুই দেশ মিলিয়ে সমগ্র উত্তরবঙ্গকে।
বন্যার হাত থেকে উদ্ধার পেতে এবং সারা বছর সেচের জল জোগাতে ৩০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৫ তে শুরু হল তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ ও ফিডার খাল খনন নিয়ে যে তিস্তা প্রকল্পের সেটি ঘোষিত ৯.২২ লক্ষ হেক্টর কৃষি জমির মধ্যে মাত্র ১.০৪ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচের জল পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। এই প্রকল্পে যে পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি হয়েছে সেটি জানা যাবে কৃতী পুলিশ অফিসার নজরুল ইসলামের জবানবন্দীতে। আর এটির ফলে এখানকার রাজবংশী ভূমিপুত্র বাঘারু বর্মণদের ভাগ্যে কি ঘটেছে জানা যাবে ১৯৯০ সালে আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট সাহিত্যিক দেবেশ রায়ের অনবদ্য আঙ্গিকে লেখা ‘তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্ত’ গ্রন্থে।
কেন তিস্তাকে নিয়ে এত কথা? : কারণ ৮ অক্টোবর ২০২৩ মধ্যরাত্রে প্রবল মেঘভাঙ্গা বৃষ্টির (Cloud Bursting Rain) পর সিকিমের উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত দক্ষিণ লোনাক হ্রদ (৫,২০০ মি) ফেটে ও উপছে পড়ে বিপুল জলরাশি তিস্তায় উপনীত হয়ে পাহাড়ে ১০ থেকে ২০ ফুট উঁচু হড়পা বান (Flash Flood), তিস্তা পাড়ে ভয়ঙ্কর ধ্বস (Massive Landslide), সমতলে বন্যা (Flood) সৃষ্টি করে ভূপ্রকৃতি এবং জনজীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে। চুংথাং এর তিস্তা ‘৩’ বাঁধ, জলাধার ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, ১১ টি সেতু, বহু ঘরবাড়ি, বিপুল সামরিক সম্পদ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এটি ছাড়াও তিস্তা ও তার উপনদীগুলি এবং সংলগ্ন পাহাড়ের উপর আশু লাভের জন্য খোদার উপর খোদকারি করায় একদিকে যেরকম অনন্তকাল থেকে চলে আসা প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে পাশাপাশি ভয়ানক সব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্ম হচ্ছে।
উত্তরবঙ্গের নদনদীর প্রকৃতি ও তাদের সমস্যাঃ উত্তরবঙ্গের প্রধান নদনদীগুলি হল – মেচি, বালাসন, মহানন্দা, তিস্তা, নেওড়া, মূর্তি, জলঢাকা, লিস, হিস, চেল, করলা, ধরলা, দুদুয়া, ডায়না, ডিমা, ডিমডিমা, মুজনাই, তোরষা, কালজানি, জয়ন্তী, রায়ডাক, গদাধর, হলং, সঙ্কশ প্রভৃতি। এগুলি মুলত হিমালয়ের বরফ গলা জলে পুষ্ট এবং বর্ষায় ভয়াল রূপ ধারণ করে। তার উপর দূষণ জনিত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘ অনাবৃষ্টির পর খুব অল্পসময়ে অতিবৃষ্টি, নদীখাত মজে যাওয়া, নিয়মিত জলপ্রবাহের অভাবে নদীর বুকে চর পড়ে যাওয়া, চাষ চা-বাগান ও বাণিজ্যিক কারণে নদীখাত দখল হয়ে যাওয়া, নদীর পাড়ভূমি থেকে ব্যাপক বৃক্ষ ছেদন, অরণ্য ধ্বংস, ভূমিক্ষয়, নদীর বুক থেকে যথেচ্ছ বালি ও পাথর উত্তোলন, বাঁধ দিয়ে নদীর প্রবাহ ঘুরিয়ে দেওয়া, নদীর তীর ঘেঁষে এমনকি নদীবক্ষে অবৈধ নির্মাণ, নদীর বুকের উপর দিয়ে একের পর এক রাস্তা ও ব্রিজ তৈরি নদীগুলিকে মৃতপ্রায় করে তুলেছে। সংলগ্ন প্রকৃতি ও প্রাণ বৈচিত্র্য (Biosphere) কে ধ্বংস করে দিয়েছে। ফলে বর্ষায় ও অতিবৃষ্টিতে জলের প্রবাহ নদীখাত থেকে ঠিকমত বয়ে যেতে না পেড়ে চারপাশে বিপর্যয় ঘটায়।
লোভী আধুনিক তথাকথিত শিক্ষিত মানুষ এগুলি ভাবেন না, বিশেষ করে অসাধু রাজনীতিক – আমলা – ঠিকাদার – ব্যাবসায়ী – মাফিয়া চক্র তাদের ব্যাক্তি মুনাফার কারণে এই অমুল্য ভূপ্রাকৃতিক সম্পদগুলিকে দ্রুত ও স্থায়ী ভাবে ধ্বংস করে দেয়। অথচ পাহাড়ের জনজাতি তিব্বতী, ভুটিয়া, লেপচা জনজাতিরা যুগযুগ ধরে পবিত্র তিস্তা মাতা এবং সংলগ্ন পাহাড় ও বনভুমিকে সংরক্ষণ করে এসেছিলেন। তিস্তার উৎসে গুরুদংমার হ্রদ তাঁদের পবিত্রতম স্থান। সেরকমই উত্তরবঙ্গের সমতলের ভূমিপুত্র রাজবংশী, মেচ, রাভাদের দ্বারা উত্তরবঙ্গের প্রাণভোমরা তাঁদের প্রিয়তম তিস্তা বুড়ি এবং তার সহোদরা ও কন্যারা ভক্তিভরে পূজিত হয়ে এসেছেন। তাদের উৎসর্গ করে মেচেনি মেলা সহ কত উৎসব, গান, পালা – পার্বণ অনুষ্ঠিত হত। এই অঞ্চলের মূল নিবাসী এই জাতি গোষ্ঠীগুলিকে আজ প্রান্তিক করে দেওয়া হয়েছে।
তিস্তা বুড়ির সংসারঃ উত্তরবঙ্গের সমস্ত নদীগুলির মধ্যে তিস্তা সবচাইতে দীর্ঘতম ও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে ৩০৫ কিমি ও বাংলাদেশে ১০৯ কিমি তার বিস্তার। তার উৎপত্তি সিকিম – নেপাল সীমান্তে অবস্থিত কাঞ্চনজঙ্ঘা শৃঙ্গের (৮৫৮৬ মি) ৭৫ কিমি উত্তর – পূবে উত্তর সিকিমের পাউনহুরি পর্বতের খাংতসে হিমবাহ (৫৪৪০ মি) থেকে। হিমবাহের গলা জল স্ফটিকের মত স্বচ্ছ অপরূপ নীল তিব্বতীদের পবিত্র গুরুদংমার হ্রদকে (৫৪৩০ মি) পুষ্ট করে একটি ধারায় নেমে সো লামো হ্রদে (৫১০০ মি) এসে পড়ে। সেখান থেকে সৃষ্ট হয়ে তিস্তা সিকিমের উত্তর সিকিম, মঙ্গন, পূর্ব সিকিম ও পাকিয়ং জেলা অতিক্রম করে পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পং জেলায় প্রবেশ করে।
দেখা গেছে কাঞ্চনজঙ্ঘার পাদদেশে অবস্থিত ২৬ কিমি দীর্ঘ জেমু হিমবাহের (৬২৮৯ মি) সাথে খাংতসে – তিস্তা হিমবাহের সংযোগ রয়েছে। উত্তর সিকিমের বিস্তৃত অঞ্চলের হিমবাহ ও বরফাবৃত শৃঙ্গগুলির গলা জল বিভিন্ন গিরিখাত (Ravines), ঘাট (Gorges), পাথরের স্তুপ (Moraines), প্রণালী (Channels) ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে একেবেকে (Meandering) তিস্তায় এসে পড়ে। পশ্চিমে তিস্তার উপনদী হল লোনাক, রঙ্গিত, কনকা, রিংগং চু, রংহম চু, গেলিখোলা, রিয়াং প্রভৃতি। পূবে তিস্তার উপনদী রংপো, লাচুং, রানিখোলা, রেলি, তালুং, দিক চু, লাংলাং চু প্রভৃতি। এগুলির আবার ছোটছোট উপনদী রয়েছে। যেমন খানি আর পালা হল রেলির উপনদী।
তিস্তাকে ঘিরে উচ্চ অববাহিকায় রয়েছে তুন্দ্রা উদ্ভিদজগৎ (Alpine Vegetation) এবং নিম্ন অববাহিকায় ক্রান্তীয় পর্ণমোচী উদ্ভিদজগৎ (Tropical Deciduous Vegetation)। দক্ষিণে পুনরভবা, আত্রাই, করতোয়া তিস্তার শাখা নদী যেগুলি যথাক্রমে পদ্মা নদীতে, রাজশাহী ডিভিশনের নাটোর পাবনা ও শাজাদপুর জেলা জোড়া বিশাল চলন বিলে এবং যমুনা নদীতে গিয়ে মিশেছে। আরও ভাটিতে লালমনিরহাটের দুয়ানি এবং নীলফামারীর ডিমলাতে বাংলাদেশ তিস্তার উপর ব্যারাজ নির্মাণ করেছে। এছাড়াও তিস্তাকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যে রয়েছে জল বিবাদ। ১৯৮৩ তে একটি অস্থায়ী বোঝাপড়া হয়েছিল ভারত ও বাংলাদেশ সেচের জন্য যথাক্রমে ৩৯% ও ৩৬% জল পাবে এবং বাকি ২৫% স্বাভাবিক গতিতে প্রবাহিত হতে দেওয়া হবে। কিন্তু তিস্তায় পর্যাপ্ত পরিমাণ জল না থাকায় পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশকে জল ছাড়তে নারাজ। তাই ভারত – বাংলাদেশ তিস্তা চুক্তি এখনও অধরা।
তিস্তার বোন তোরষাঃ তোরষা উত্তরবঙ্গের আরেকটি বড় নদী। চিন অধিকৃত তিব্বতের চুম্বি উপত্যকার হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়ে মা চু নাম নিয়ে ১১৩ কিমি প্রবাহিত হয়ে, তারপর আমু চু নাম নিয়ে ভুটানের মধ্যে দিয়ে ১৪৫ কিমি প্রবাহিত হয়ে শীল তোরষা নামে ভারতে প্রবেশ করেছে। আলিপুরদুয়ার জেলা এবং কোচবিহার জেলার সদর ও তুফানগঞ্জ মহকুমার মধ্যে দিয়ে বয়ে গিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার মধ্যে দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের সাথে মিশেছে। কালজানি, ঘরঘরিয়া, বুড়ি তোরষা প্রভৃতি তোরষার উপনদী। তোরষা ভুটানের ‘তোরষা স্ট্রিক্ট নেচার রিসার্ভ’ ও জলদাপাড়া দুটি অভয়ারণ্যর মধ্যে দিয়ে গেছে। লব রাভার সঙ্গে এক সূর্যাস্তে মালঙ্গির জঙ্গল থেকে দেখেছিলাম তোরষা পাড়ের আসাধারণ জীব বৈচিত্র্য। ভুটান তোরষার উপর আমি চু জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়েছে। তোরষাও আজ মানুষের দূষণ আর অত্যাচারের শিকার। কোচবিহার শহরের উপান্তে শীতের মরশুমে দেখে এলাম নদীর উপর বেআইনি সাঁকো নির্মাণ করে পয়সা নিয়ে বাইক, ভ্যান রিকশা, মানুষ পারাপার করা চলছে। আত্রাই এর রায়খর, তিস্তার বোরোলির মত তোরষায় এখন আর সুস্বাদু পাথরচাটা মাছ সুলভ নয়। এই তোরষা, কালজানিরাই বিভিন্ন কারণে নদীখাত মজে যাওয়ায় প্রতি বর্ষায় তাদের উপচে পড়া জলে উত্তরবঙ্গের পূর্ব অংশে বন্যার সৃষ্টি করে।
উত্তরবঙ্গের মনুষ্যকৃত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রধান কারণগুলিঃ
(১) পরিবেশ দূষণ, বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমবাহ এবং তুষার শৃঙ্গগুলির আস্বাভাবিক গলন। ইসরোর উপগ্রহ চিত্রে ধরা পরেছে জেমু, লোনাক প্রভৃতি উত্তর সিকিমের হিমবাহগুলির ব্যাপক সংকোচন।
(২) চিন ও ভারত দুই উন্নয়নশীল দেশে শিল্প, নির্মাণ, পরিবহন, প্রভৃতি কারণে জীবাশ্ম জ্বালানির (Fossil Fuel) অত্যধিক ব্যাবহার এবং তজ্জনিত দূষণ। সিকিমেও যেমন অপরিকল্পিত নগরায়ন ও দূষণ বাড়ছে সেরকম চিনের দিকেও প্রবলভাবে সড়ক, রেল, শিল্প, বাঁধ, জলাধার, বিদ্যুৎকেন্দ্র, আধুনিক গ্রাম, নগর, সামরিক ঘাঁটি, বিমানঘাঁটি, রানওয়ে ইত্যাদি নির্মাণ যজ্ঞ চলছে।
(৩) সীমান্তের দুই পাড়ে সামরিক তৎপরতা, নতুন ঘাঁটি নির্মাণ ছাড়াও ঘাঁটি বাঙ্কার ও যোগাযোগ ব্যাবস্থা কে শক্তিশালী করা, পাহাড় কেটে একের পর এক স্থায়ী নির্মাণ, ট্যাংক ও সাঁজোয়া গাড়ি চালানোর জন্যে পাহাড় ফাটিয়ে সব ঋতুর উপযোগী প্রশস্থ পথ নির্মাণ, সামরিক মহড়া প্রভৃতির ফলে প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
গলওয়ান সহ আকসাই চিন, হিমাচল, সিকিম, অরুণাচল প্রতিটি সীমান্তে চিনের সামরিক সজ্জা যেমন বেড়ে চলেছে, ভারতও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মেতে উঠেছে। পূর্ব সিকিমের পুরনো বাবা মন্দির সীমান্ত পোষ্টের কাছে দেখে এলাম বিতর্কিত ডোকলাম অঞ্চল থেকে চিনের আগ্রাসন রুখতে ভারতের দিকে ডিনামাইট ফাটিয়ে প্রশস্থ রাস্তা তৈরি হচ্ছে। নাথু লা সীমান্তের কাছে বোফরস হাউইতজার থেকে পাহাড় কাঁপিয়ে গোলা বর্ষণ অনুশীলন হচ্ছে।
(৪) অরণ্য ধ্বংস করে, পাহাড় কেটে ও ফাটিয়ে এবং পরিবেশের সমূহ ক্ষতিসাধন করে নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণ, রাস্তা চওড়া করা, টানেল নির্মাণ এবং এনজেপি – রংপো রেলপথ নির্মাণ।
(৫) তিস্তা সহ পাহাড়ি নদীগুলিকে বাঁধ দিয়ে জলাধার, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সেতু নির্মাণ।
(৬) জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ন, বেআইনি নির্মাণ, বহুতল নির্মাণ, নদী পাড় ও নদী খাত দখল করে নির্মাণ।
(৭) ধ্বস প্রবণ অঞ্চল গুলিতে পর্যন্ত নির্মাণ।
(৮) বৃক্ষহীন ন্যাড়া এলাকায় ভূতলের ভঙ্গুর মৃত্তিকার দ্রুত ক্ষয় এবং নিয়মিত কাদার ধ্বস (Mud Slide)।
(৯) নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন ও যানবাহন চলাচল এবং তার জন্য ব্যাপক দূষণ।
(১০) এমনিতেই হিমালয় ভঙ্গুর পর্বত, প্রবল ভূমিকম্পপ্রবণ (Seismically Active Zone V) ও ধ্বসপ্রবণ এলাকা এবং এখনও হিমালয়ের গঠন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি। তার উপর উপরোক্ত কর্মকাণ্ড সমগ্র হিমালয় এবং সিকিম ও দার্জিলিং পাহাড় সহ উত্তরবঙ্গকে গভীর সংকটময় (Critically vulnerable) করে তুলেছে।
প্রতিবিধান ও প্রতিকারের (Both Prevention and Mitigation) সন্ধানেঃ
(১) সামগ্রিক দূষণ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে পাহাড়, তরাই, ডুয়ারস ও সমতলের দূষণ কমিয়ে আনতে হবে। এরজন্যে ভারত সরকার, সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার, দার্জিলিং পার্বত্য পরিষদ, জেলা ও মহকুমা প্রশাসন, পৌরসভা ও ত্রিস্তর পঞ্চায়েত এবং পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ পরিষদ কে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে চিন, নেপাল ও বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সাথে আলোচনা চালাতে হবে। হিমবাহ সংলগ্ন এলাকাগুলিতে বিমান উড়ান, পর্বতারোহণ ও পর্যটনে নিষেধাজ্ঞা লাগু করতে হবে।
(২) উদ্ভিদ, গুল্ম, বৃক্ষ সহ সমগ্র বনভুমিকে রক্ষা করতে হবে। প্রতিবেশী ভুটানের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা গ্রহণ করে সর্বত্র বনভূমি ও বৃক্ষের পরিমাণ ও সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।
(৩) বড় বাঁধ ও বড় জলাধারগুলি ভেঙ্গে ফেলতে হবে। নদীকে তার খাত ধরে বইতে দিতে হবে।
(৪) ঝোরা, খোলা, প্রণালী ইত্যাদি পাহাড়ের জলের নির্গমন পথগুলিকে উন্মুক্ত রাখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। কঠোরভাবে প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যাগ ও প্যাকেটের ব্যাবহার নিষিদ্ধ করতে হবে।
(৫) চিনের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলে, সীমান্ত উত্তেজনা কমিয়ে, পাহাড়ে সামরিক নির্মাণ ও বিস্ফোরকের সংখ্যা কমিয়ে ফেলতে হবে। মনে রাখতে হবে ‘পৃথিবীর ছাদ’ বিশাল তিব্বতের মালভূমি দক্ষিণের হিমালয় ছাড়াও অনেকগুলি পর্বতের সৃষ্টি এবং উঁচুতে হলেও অনেকটা সমতল এবং নির্মাণ সহায়ক। চিনকে দেখে আমাদের ভঙ্গুর হিমালয়ে নির্মাণ প্রতিযোগিতা আত্মহননের সামিল।
(৬) স্থল ও গোলন্দাজ বাহিনীর প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা থাকবে, কিন্তু এমন কিছু করা যাবে না যাতে সিকিমের বারদং এর মত সেনা, অস্ত্রশস্ত্র ও বিস্ফোরক সমেত আস্ত সেনা শিবির ধুয়ে মুছে যায় অথবা লাদাখে টি ৭২ ট্যাঙ্ক ডুবে যাওয়ার মত ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। আমাদের বায়ু সেনা (Air Force) এবং ক্ষেপণাস্ত্রের উপর জোর দিতে হবে।
(৭) ডিনামাইট দিয়ে পাহাড় ফাটানোর পরিবর্তে প্রয়োজনীয় পাথর কাটার জন্য কম ক্ষতিকর আধুনিক প্রযুক্তি ব্যাবহার করতে হবে।
(৮) ভূমিকম্প প্রতিরোধী ও অন্যান্য নিয়ম মেনে এবং বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশবান্ধবভাবে নির্মাণ করতে হবে। পাহাড়, তরাই ও ডুয়ারস এর ক্ষেত্রে বহুতল নিষিদ্ধ করতে হবে। বহু উন্নত দেশের মত শক্ত ও পোক্ত (Seasoned) কাঠের বাড়ি এবং সংকর (Alloy) টিন বা শিটের ঢালের ছাদ বিশিষ্ট আধুনিক গৃহ নির্মাণের উপর জোর দিতে হবে।
(৯) নিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন শিল্প গড়ে তুলতে হবে।
(১০) যানবাহনের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। এক জায়গায় এক সময়ে বেশি যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেওয়া যাবেনা। প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তুলে ইলেক্ট্রিক ও ব্যাটারি গাড়ি জনপ্রিয় করতে হবে। ইলেক্ট্রিক ও ব্যাটারি চালিত গণ পরিবহন ব্যাবস্থার উপর জোর দিতে হবে।
(১১) পাহাড়ের মত তরাই ও ডুয়ারসেও অরণ্য সংরক্ষণ করতে হবে এবং চা বাগান সম্প্রসারণ, পর্যটন শিল্প ও নির্মাণের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।
(১২) সমতলে ড্রেজিং ইত্যাদির মাধ্যমে নদী ও খালগুলি সংস্কার করতে হবে। ১০০ দিনের কাজের শ্রম দিবসের সাথে এই কাজকে যুক্ত করতে হবে।
(১৩) সড়ক, সেতু ও রেলপথ নির্মাণের ক্ষেত্রে নদী প্রবাহ যাতে বাধাপ্রাপ্ত না হয়, অরণ্য ও বন্য প্রাণ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় লক্ষ্য রাখতে হবে। উত্তরবঙ্গের অরণ্যের মধ্যে দিয়ে যাওয়া দ্রুতগামী রেলপথকে উপরে মাটি, পাথর ও কংক্রিটের ঢিপির উপর তুলতে (Elevated Railway) এবং নিচে স্থানে স্থানে অরণ্যে হাতি সহ বন্যপ্রাণী চলাচলের জন্য এবং অন্যত্র মানুষ ও যানবাহন চলাচলের জন্য পথের (Corridor) ব্যাবস্থা করতে হবে।
(১৪) তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের ত্রুটিগুলি দ্রুত শুধরে নিতে হবে। এই মুহূর্তে কাজ চলা এনজেপি – রংপো রেল প্রকল্প এবং প্রস্তাবিত তিস্তাবাজার থেকে তিস্তার পশ্চিম ঢাল বরাবর সিকিম অবধি নতুন সড়কের ক্ষেত্রে পরিবেশ সুরক্ষাবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
১৬ .০৭.২০২৪











চমৎকার লেখা। যথাযোগ্য জায়গায় এ লেখাটি পৌঁছে দেওয়া দরকার। এবং প্রচার দরকার।