নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসার জন্য এবং তাকে যেন তেন প্রকারেন ধরে রাখার জন্য ভারতের রাজনৈতিক দলগুলি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ও জাত্যাভিমানী প্রচার, দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, বিরোধীদের মিথ্যা মামলায় জড়ানো ও গ্রেফতার, বিরোধীদের মিথ্যা অভিযোগে চরিত্র হনন, অন্য দলে ভাঙন ঘটানো, নির্বাচনের আগে সরকারি প্রকল্প ঘোষণা ও সরকারি কাজ শুরু, ভোটারদের মধ্যে টাকা জামাকাপড় কম্বল মদ ইত্যাদি বিতরণ, ভোটার তালিকায় কারচুপি, বিরোধীদের প্রার্থী ও এজেন্ট হতে না দেওয়া, ডামি প্রার্থী দেওয়া, বিরোধীদের ভোট দিতে না দেওয়া, বুথ দখল, ছাপ্পা ভোট, ভোট বাক্স বদল, পোস্টাল ব্যালটে কারচুপি, গণনায় কারচুপি, ফলাফলে কারচুপি, সন্ত্রাস, অত্যাচার, নারী নিগ্রহ, উচ্ছেদ, খুন, জনজীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি, নিয়ন্ত্রণে থাকা পুলিশ – প্রশাসন – নির্বাচন কমিশন – ব্যবসায়ী – মফিয়া – সমাজবিরোধী দের কাজে লাগানো ইত্যাদি অনৈতিক ও অসাংবিধানিক কাজগুলি কম বেশি করেই থাকে। এগুলি ভারতীয় গণতন্ত্র নামক প্রতিষ্ঠানে নতুন কিছু নয়। আমাদের রাজ্যের ক্ষেত্রেও আমরা শাসক দল জাতীয় কংগ্রেস, সিপিআইএম, তৃণমূল কংগ্রেস – সকলের ক্ষেত্রে গত ৭৫ বছর ধরে এগুলি দেখে এসেছি ও দেখে চলেছি।
আপনাদের অনেকের মত এগুলি অনেকবার অনেক জায়গায় দেখেছি। মুর্শিদাবাদের গ্রামে পঞ্চায়েত নির্বাচনে সারাদিন হিংসাত্মক ভোট পর্ব চলার পর হাজারো জনতার বলয়ের মধ্যে উত্তেজক ভোট গণনা এবং দুপক্ষের সমাজবিরোধীদের বোমা ও গুলি বিনিময়ের অভিজ্ঞতা অনন্য।
একসময় Manual থেকে ভোট পদ্ধতির Digital উত্তরণ ঘটেছে, কিন্তু অসাধুতার সেই ঐতিহ্য ও পরম্পরা চলছে। সালটা ১৯৯৯ হবে। চাকরিরত অবস্থায় Post Graduation করে MO Supy হিসাবে Writers’ Buildings Dispensary তে সাময়িক পোষ্টেড। এক বিকেলে, দাবাং মন্ত্রী রাম চ্যাটার্জির ভাই বলে সর্বত্র পরিচয় দেওয়া এবং ‘অজ্ঞাত’ কারণে ঐ ডিসপেনসারিতে স্থায়ী প্রাইজ পোস্টিং পাওয়া এক দাদা, ডিউটিরত অবস্থায় কোথাও খেপ মেরে এসে গরম খবর দিলেন, “বুঝলি, দেখে এলাম যে উত্তর পূর্ব কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রের বুথ গুলোতে ইভিএম এর বোতামে যাই টেপা হোক না কেন সবই অজিত পাঁজার পক্ষে যাচ্ছে। অজিত পাঁজার পাশে আলো জ্বলছে। …” ।
তবে একটু অন্য কায়দায়, নির্বাচনী হিংসা বর্জন করে এবং সাধারণভাবে কোন নির্বাচিত সরকারকে না ফেলে (ব্যতিক্রম জম্বু ও কাশ্মীর এবং মণিপুর), বর্তমানে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি দলটি নির্বাচনী ‘ দক্ষতার ‘ চূড়ান্ত সাফল্যে পৌঁছেছে। আরএসএস এবং ভারতীয় জনসংঘের জন্ম ১৯২৫ ও ১৯৫১ তে হলেও বিজেপির জন্ম কেবল ১৯৮০ তে। অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে ১৯৯৬ তে ১৩ দিনের এবং ১৯৯৮ – ‘৯৯ তে ১৩ মাসের এবং ১৯৯৯ – ২০০৪ এ পূর্ণ পাঁচ বছরের সরকার চালানোর পর নরেন্দ্র দামোদর মোদি র নেতৃত্বে ২০১৪ থেকে তিনবারের স্থায়ী সরকার। মোদির সবচাইতে বড় কৃতিত্ব জাতীয় কংগ্রেসের দুর্জয় ঘাঁটি গান্ধী – প্যাটেল – মোরারজি দের গুজরাটে কংগ্রেস কে একদম ধরাশায়ী করে দেওয়া এবং নিজে সেখানে ২০০১ – ২০১৪ অবধি দীর্ঘসময় মুখ্যমন্ত্রী থাকা। জাতীয় ক্ষেত্রেও ১৪০ বছরের প্রাচীন এবং স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় ছয় দশক ক্ষমতায় থাকা প্রধান রাজনৈতিক দল জাতীয় কংগ্রেস কে দুর্বল করে দেওয়া এবং তার অনভিজ্ঞ নেতা রাহুল গান্ধীকে নিয়ে ছেলেখেলা করা।
এছাড়াও ক্ষমতায় থাকার জন্য বিজেপি একের পর এক অন্য দলের ভাঙন ধরিয়েছে, ছোট দলগুলিকে নিজের কব্জায় নিয়ে এসেছে, অন্য দলের করিৎকর্মা নেতাদের নিজের দলে নিয়ে এসেছে, ইডি সিবিআই এনআইএ … কেন্দ্র এজেন্সি গুলি কে এবং নির্বাচন কমিশন, আদালত ও গভর্নরদের কাজে লাগিয়েছে। ইদানিং অভিযোগ – ডিজিটাল রিগিং , এনআরসি এসআইআর ইত্যাদির মাধ্যমে বিরোধী ভোটার দের ও ভোট ব্যাঙ্ক এর নাম কাটানো। টাকা ছড়ানো ইত্যাদি তো আছেই। এগুলি নিয়ে বর্তমানে বিরোধীরা সোচ্চার। রাহুল গান্ধী ‘ অ্যাটম বোম ‘, ‘ হাইড্রোজেন বোম ‘ ইত্যাদি ফাটাচ্ছেন। তাতে অবশ্য বিশেষ কাজ হচ্ছে বলে মনে হয় না।
এখানে আলোচনার মূল বিষয়বস্তু বিজেপির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দক্ষতা। তার কয়েকটি দিক :
(১) দেখা গেছে বিজেপি নিজের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব অটুট রেখে ক্রমশঃ তার নির্বাচনী জোট NDA তে আঞ্চলিক দলগুলিকে সামিল করেছে। NPP, AIDMK, DMDK, TDP, JDU, LJPRV, AJSUP, AINRC, ADS, AGP, HSPDP, IPFT, JSP, JDS, MGP, NPF, NCP, NDPP, PPA, SHS, SKM, TMP, JDP, UPPL, TMMK, BDJS, GNLF, HAM, JSS, NP, PJP,
PMK, PNK, RLD, RLM, Rashtriya Samaj Paksha (RSP), RPIA, SBSP, TMCM, RYSP, RSVA, RHJM, SGS, IMKMK, IJK ইত্যাদি দলগুলি এখন বিজেপি র ছাতার নিচে।
(২) প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনকে নিয়ে ভালোভাবে বিশ্লেষণ করে কৌশলের ঘুঁটি সাজিয়েছে। ভারতীয় আর্থ – সমাজিক ও জাত ব্যবস্থাকে ধরে Social Engineering করেছে। উদাহরণ, উত্তর প্রদেশের কুরমি ও নিষাদ দের জন্য যথাক্রমে আপনা দল ও নিষাদ পার্টি; বিহারে মুসাহার ও পাসোয়ান বা চামারদের জন্য হিন্দুস্তান আওয়ামী মোর্চা ও লোক জনশক্তি পার্টি (রাম বিলাস)। উত্তরপ্রদেশে শিয়া ও পশ্চাদপদ পসমন্দা মুসলমানদের একাংশকে ধরেছে। সারা দেশে আদিবাসী ও জনজাতিদের মধ্যে দীর্ঘ কাজের ভিত্তিতে সেখানে বিজেপি যথেষ্ট গণভিত্তি করে ফেলেছে।
(৩) বিরোধীদের ভোট কাটতে কিছু গণ ভিত্তি সম্পন্ন দলকে নির্বাচনে নামানো। উদাহরণ, মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি, আসাদউদ্দিন ওয়েশির এআইএমআইএম।
(৪) কিছু গণভিত্তি সম্পন্ন শক্তিশালী আঞ্চলিক দলের সঙ্গে গোপন বোঝাপড়া করে প্রধান প্রতিপক্ষ কংগ্রেসকে দুর্বল করে দেওয়া এবং সুযোগ পেলে এদেরও আঞ্চলিক ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নিজে সেই রাজ্যের ক্ষমতা দখল করা। উদাহরণ, অসমে ‘ অসম গণ পরিষদ ‘, মহারাষ্ট্রে ‘ শিব সেনা ‘ ও ‘ এনসিপি ‘ , দিল্লি ও পাঞ্জাবে ‘ আম আদমি পার্টি ‘, পশ্চিমবঙ্গে ‘ তৃণমুল কংগ্রেস ‘, ওড়িশায় ‘ বিজু জনতা দল ‘।
(৫) এরপরও প্রতিটি নির্বাচনে কোন বিশেষ ইস্যু তৈরি করে সেই লক্ষ্যে কোন বিশেষ দল বা আন্দোলন গড়ে তুলছে। ত্রিপুরা নির্বাচনে আমরা দেখলাম ‘ তিপ্রা মথা ‘ কে দিয়ে বাজার মাত করতে। বিহারে বিজেপি নিজে সর্ববৃহৎ দল (৮০ জন বিধায়ক) ও ক্ষমতাসীন জোটে থাকা সত্ত্বেও প্রশান্ত কিশোরের ‘ জন সুরজ পার্টি ‘ কে নামিয়ে প্রচারে ঝড় তুলেছে। যাকে সামলাতে রাহুল গান্ধী – তেজস্বী যাদব দের অধিকার যাত্রা করেও পুনরায় অধিকার যাত্রা দ্বিতীয় পর্বের কথা ভাবতে হচ্ছে।
দক্ষিণের সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য তামিলনাড়ু। এখানে ব্রাহ্মণ্যবাদ শক্তিশালী হলেও দ্রাবিড় জাত্যাভিমান আরও বেশি শক্তিশালী। বিজেপির দখলে অল্প কয়েকটি বিধানসভার আসন। তাই সে একদিকে কেন্দ্র প্রকল্প, দ্রাবিড় জাত্যাভিমানী প্রচার, অন্যদিকে অন্তত ছয়টি ভাল থেকে অল্প গণ ভিত্তি সম্পন্ন তামিল দলের সঙ্গে জোট গড়েছে। এরপরও জনপ্রিয় তামিল সিনেমার নায়ক বিজয় এর নেতৃত্বে ‘ Tamiliga Vetrri Kazhagam (TVK) ‘ গড়ে প্রচারের ঝড় তুলে ফেলেছে। TVK বিজেপি সহ উত্তর ভারতীয় দলগুলির সমালোচনা করলেও মূল এবং ঘোষিত লক্ষ্য ক্ষমতাসীন DMK কে ক্ষমতাচ্যুত করা।









