দীর্ঘদিন যে কিছু লিখি না তার প্রধান কারণ এক, সম্ভবত আর লিখতে পারি না, তাই দূরে থাকি। এবং দুই, লিখে বা বলে সাময়িক আমোদ এবং নিজের বাজারদর বাড়ানো ছাড়া যে খুব কিছু হয় না সেটা বিলকুল বুঝে গেছি; তাই সরে থাকি। দু’টোর জন্যই আমার অন্য জায়গা আছে, লেখা থেকে এই দু’টো পেতে চাইওনি কোনওদিন।
অভয়া ঘটনার এবং তার পরবর্তী আগুন- আন্দোলনের একবছর হ’ল। দীর্ঘদিন বাদে একটি আন্দোলনের সঙ্গে স্বতঃস্ফুর্ত জড়িয়ে পড়েছিলাম। তারপর তা থেকে বেরিয়েও এসেছি। আমি রাজনৈতিক মানুষ, কিন্তু রাজনীতি “করতে” পারি না- নিজের এই রিয়েলাইজেশনের প্রায় একদশক পেরিয়ে গেছে। তবু অভয়া আমাকে ফেসবুকে এবং তা পেরিয়েও রাস্তায় নামিয়ে এনেছিল, প্রবলভাবেই। কেউ বলেনি কিছুই। বড় হয়ে যাওয়ার সুবিধে হচ্ছে কেউ কিছু বলে না। সবাই ধরে নেয় বড় হলে মানুষ সবটা জানে, সামলে নিতে পারে। তারপর সরেও গেলাম। রাস্তা থেকে। কিছুটা মন থেকেও। নিজস্ব সুস্থতার জন্যই। বড় হয়ে যাওয়ার অসুবিধে হচ্ছে কেউ আমাদের মনের সুস্থতার খোঁজ নেয় না।
____________________________________________
পুণ্যদার এই খবরটা দেখেই দু’কথা বলতে এলাম।
শুধু ব্যক্তিমানুষকে নিয়ে কথা বলার অভ্যেস রাজনৈতিকভাবেই শিখি নি। কিন্তু আজ ব্যক্তিগতস্তরে হতাশা আর অপরিমেয় ক্রোধ ছাড়া তো কিছুই নেই। তাই এটুকু লিখিই।
পুণ্যদা সবার কাছে ড. পুণ্যব্রত গুণ। আমার এবং আমাদের মত অসংখ্য ছেলেপুলের কাছে শুধুই “পুণ্যদা”। আমার থেকে তিরিশ বছরের বড় হয়েও।মেডিকেল কলেজে ঢুকেই পুণ্যদাকে চেনা। ডিএসএর রিইউনিয়ন পেরিয়ে, আয়লার জন্য কলেজ স্ট্রিটে অর্থ সংগ্রহ পেরিয়ে, ২০১১ এর আন্দোলন পেরিয়ে, চেঙ্গাইলে মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্র আর সরবেড়িয়ায় পুণ্যদার পাশে থেকে ডাক্তারি শেখার দিন পেরিয়ে, ব্যক্তিগত মান- অভিমান- হাসি- ইয়ার্কি পেরিয়ে এই সেদিন অভয়া আন্দোলনেও আবার একসাথে পথ হেঁটেছিলাম ধর্মতলায়। আমি আমূল বদলে গেছি এতদিনে, ব্যর্থতার অক্ষেই। পুণ্যদার মোবাইলের কলারটিউনে রাখা “হেই সামালো ধান” এই দীর্ঘ সময়েও বদলায়নি।
আমাকে, আমার মত অসংখ্য ছেলেপুলেকে হাতে ধরে ডাক্তারি শিখিয়েছে, সহজ হয়ে মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে, সবার সঙ্গে মিশে গিয়েও নিজের চিন্তায়- চেতনায়- আদর্শে দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে শিখিয়েছে পুণ্যদা। পুণ্যদা সেই স্থির আগুন যার কাছ থেকে আমরা নিজেদের সামান্য মোমবাতিটুকু জ্বালানোর সুযোগ পেয়েছিলাম কোনও একদিন। আর তাকে আমাদের রাজ্য সরকার কেস দিয়েছে, বলেছে থানায় গিয়ে হাজিরা না দিলে জেলে ভরবে!
____________________________________________
চোখের সামনে একটা জনপদ শেষ হয়ে গেল। লুম্পেনরাজ আর ক্যাকিস্টোক্রেসির দুর্গন্ধময় জল পড়ে আছে ভেঙে যাওয়া পিচ রাস্তার খানাখন্দে। তার মধ্যে দিয়ে সামনে হেঁটে যাওয়া তো দূর, সামান্য পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে গেলেও গা ঘিনঘিন করে। অভয়াকে নিয়ে আমি- আমরা সবাই রাস্তায় নেমেছিলাম, পাগলের মত ক্রোধে। রাষ্ট্র অনেকদিন সেই ক্রোধ আর লড়াইয়ের ওপর ব্লাডার খালি করে দিয়েছে। সে বুঝিয়ে দিয়েছে এ রাজ্যে এমনিতে কিছু নেই এবং হবে না শুধু সেটাই নয়; বাঙালির রাজনীতি এবং লড়াই নিয়ে যে জাত্যাভিমান ছিল সেটাও তার ডিরেক্ট স্পনসরশিপ (কৃপা) ছাড়া হবে না।
তা নিয়ে (ব্যক্তি) আমার কিছু যায়ও আসে না। আমি দুর্দান্ত অ্যানার্কিস্ট এবং ততোধিক দুর্দান্ত স্নব। আমার যায় আসে পুণ্যদাকে নিয়ে। তার বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারের নির্লজ্জ প্রতিহিংসা নিয়ে। যাদের কোনও ধারণা নেই পুণ্যদার কাজ, আদর্শ, ইতিহাস- বর্তমান- লিগ্যাসি নিয়ে।
কারণ তৃণমূলের জমানায় মুড়ি- মিছরি- তিরামিসুর এক দর। যদি চাটতে পারো আর কোটি কোটি টাকার ভেতর গলা পর্যন্ত শুয়োরের বাচ্চার মত ডুবে থাকতে পারো তাহলেই তোমার নামে রাস্তার মোড়ে হোর্ডিং; অন্যথায় থানা হাজিরা।
এমনিতেই আমাদের ভয়ডর বরাবরই একটু কম ছিল। তার ওপর আপনাদের মুশকিল কী জানেন? আপনারা নিজেরাই আইনের শাসনকে যে জায়গায় নামিয়ে এনেছেন তাতে মাথা থেকে পা পর্যন্ত আপনাদের ক্রেডিবিলিটি জিরো। আপনাদের এই কেস দেওয়ার খেলাকে কেউ আর পাত্তা দেয় না। কেউ আর ভয় পায় না। আমাদের কথা না’হয় ছেড়েই দিন…
তবু যারা এটা করতে চাইছেন তাদের বলি, পুণ্যদার জীবন আর তার কাজের আগুনে আমি- আমরা শুধু মোমবাতি জ্বালাইনি, মশালও সাজিয়ে রাখা আছে। সে মশাল বের করা হয় না, আওয়াজ তোলা হয় না তার কারণ অন্য কিছু নয়, শুধুই ঘেন্না। এই সরকার এবং তার শাসনব্যবস্থার প্রতি। তার সীমাহীন ঔদ্ধত্য, ঔদাসীন্য আর নির্লজ্জতার প্রতি।
কিন্তু তার মানে এই নয় এখনও চুপ থাকব। আমি আগে ব্যক্তি এবং তার সঙ্গে আমার সম্পর্কের। অনেক পরে সমষ্টি এবং তার রাজনীতির। নিতান্ত দুঃস্বপ্নেও পুণ্যদাকে ছোঁয়ার ধৃষ্টতা দেখালে আমার জন্যও একটা জায়গা রাখবেন আপনাদের জেলের ভেতর। মশাল নিয়েই যাব।
অবশ্য তাতেও আপনারা যে সর্বৈব অন্ধকার তৈরি করেছেন তা সামান্যও কাটবে কিনা জানা নেই।









