রাষ্ট্র যখন অরাজক তখন বিরুদ্ধতাই নাগরিকের জীবন ধারণের একমাত্র পথ। নাগরিক সমাজের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল ১৪ ই আগস্ট শহর গ্রাম মফস্বলে। এই সময়কাল এই রাজ্যের ইতিহাসে প্রতিস্পর্ধার কাল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ২০২৫ এর জানুয়ারি মাসে মোহিত রণদীপ এবং শুভ প্রতিমের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্রোহকালের দলিল: বাধা যত প্রতিরোধ তত’। এই সংকলনে কুড়িটি প্রবন্ধ আছে এছাড়া আছে জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের সংগঠক ডঃ পুণ্যব্রত গুণের একটি মূল্যবান সাক্ষাৎকার।
শুরুতে মুখবন্ধ অংশে সম্পাদকদ্বয় তাদের দায়বদ্ধতার কথা জানিয়েছেন “দ্রোহকালের দলিল পাঠকের স্মৃতিতে দ্রোহের বহ্নি প্রজ্বলিত রাখতে যদি সামান্য ভূমিকা ও নেয় সেটুকুই আমাদের পরমপ্রাপ্তি হয়ে থাকবে।“
মোহিত রণদীপ তাঁর লেখায় সমাজমন, সামাজিক স্মৃতি এবং জনরোষ নিয়ে আলোচনা করেছেন। মনস্তত্বের বিশিষ্ট গবেষক কার্ল গুস্তাফ ইয়ং দেখিয়েছেন কালেকটিভ আনকনসাস এর ভিতরেই নিহিত রয়েছে এই বিপুল জনরোষের কারণ। অবচেতন মনে দীর্ঘ দিন ধরে জমা ক্ষোভের সঙ্গে সচেতন অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হওয়া আস্থাহীনতা, হতাশা আর ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে ১৪ ই অগাস্ট রাতে। অভয়া আন্দোলনে অবদমিত ক্ষোভের উদগীরণকেই ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে ন্যাশনাল ক্যাথারসিস বলে আখ্যায়িত করেছেন প্রধান বিচারপতি। মিলন কুন্দেরা কে অনুসরণ করে লিখেছেন মোহিত – “ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াই আদতে বিস্মরণের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে স্মৃতির লড়াই”।
শমীন্দ্র সরকার ১৪ই আগস্ট এর রাতে বিভিন্ন জায়গার ছবি সাজিয়েছেন তাঁর লেখায়। এই লেখা শেষ হয় এই ঘোষণা দিয়ে- “তাপসী মালিকের ধর্ষণ ও খুনকে পুঁজি করে যে রাজনীতির শুরু হয়েছিল আজ অভয়ার ধর্ষণ ও খুন দিয়ে তার শেষ হবার পথে”।
সুমন নাথ রাজ্যে ‘গণতান্ত্রিক পরিসরের অন্তর্জলী যাত্রা’ শীর্ষক প্রবন্ধে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক পরিসরে সংকোচন নিয়ে লিখেছেন। সৈকত চন্দ্র ‘নিরোর বেহালা বাদন কিংবা দুর্গাপুজোর কার্নিভাল হৃদয়হীন নিষ্ঠুরতার বৃত্তান্ত’ প্রবন্ধে রাজ্যের থ্রেট কালচার এবং রেপ কালচার নিয়ে লিখেছেন- “কোন স্বৈরাচারী শাসক কে ইতিহাস ক্ষমা করেনি যদিও ক্ষমতাকামী শাসক তা দেখতে পায় না বা চায়না। অন্ধ হলে প্রলয় কিন্তু থেমে থাকে না”। শুভপ্রতিমের লেখাতেও রয়েছে রাজ্যজুড়ে হুমকি সংস্কৃতির নানা নিদর্শন এবং রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদ প্রতিরোধের কিছু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত- “ মিছিলে না গেলেও বাড়ির টিভিতে দুই দিন ধরে খবর দেখছেন সীতা মাহাতো, গ্রামের নাম উকি আর নদীর নাম রুপাই… ‘আজকে আমাদের গ্রামেও মিছিল হয়েছে জানেন’? … গ্রামের শেষে ভাঙ্গা মন্দির মন্দিরের বারান্দায় বসে তিনটি বাচ্চা, সদ্য মিছিলের স্লোগান তাদের মুখে। এক বৃদ্ধা হঠাৎ বলে উঠলেন শুধু মিছিল করলে হবে নাই আমাদের কালি হতে হবে। পুলিশ বা বাবু কাউকে ছাড়া যাবেক নাই গায়ের মা বেটিদের কালি হতে হবেক”।
অমিতাভ সেনগুপ্তর ‘শাসকের রং বদল শুধু নয়, দরকার মন বদল’ লেখায় রাজ্যের দুর্নীতির সঙ্গে উল্লেখ করেছেন গোরখপুর হাসপাতালে ডঃ কাফিল খান এর অকল্পনীয় অভিজ্ঞতার কথা। জাস্টিস যে ডিলেইড হবে সেটা স্পষ্ট হচ্ছে,ডিনায়েড হবে কিনা সেটা রাষ্ট্র ঠিক করবে না আন্দোলন ঠিক করবে প্রশ্ন সেটাই। সমস্যাটা শাসকের রং বদল নিয়ে নয়, দরকার শাসকের চরিত্র বদল। বিষাণ বসু মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের দিশাহীনতাতার প্রেক্ষিতে দুর্নীতির সর্বগ্রাসী আস্ফালন এবং সবশেষে মধ্যবিত্তের শীতঘুম থেকে জেগে ওঠা বাঙালি সমাজ কে নিয়ে লিখেছেন “আমরা আশা করব এই দফায়… আমাদের মত শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বোধোদয় ঘটবে …অভয়ার মৃত্যু একটা বড় ঝাঁকুনি আশা করি তা আমাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলবে”। হুমকি তন্ত্র নিয়ে লিখেছেন রত্নাবলি রায় লিখেছেন গত কয়েক দশক ধরে আমরা উঠতে বসতে ফ্যাসিবাদের বিরোধিতার কথা বলেছি কিন্তু ফ্যাসিবাদ কিভাবে গ্রাম জনপদ পাড়া পেরিয়ে পরিবারে এসে পৌঁছেছে সেটাকে সবসময় খেয়াল করতে পারিনি। সামাজিক সামাজিক বাঁধন যতই দুর্বল হয়েছে জীবিকা নির্বাহের চাপে যতই আমরা একলা হয়েছি ততই রাষ্ট্রের উপর ভরসা করতে শুরু করেছি আর পথ তৈরি করেছি রাষ্ট্রীয় স্বৈরাচারের।
গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় লেখায় উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজে আশির দশকের স্বাস্থ্য আন্দোলনে লড়াই এর ইতিহাস। ‘অন্তহীন কঙ্কালের স্তূপ’ এবং ‘বিষবৃক্ষ’- সোমা মুখোপাধ্যায়ের দুটি লেখা তে স্বাস্থ্য দপ্তর এবং হাসপাতালের চরম দুর্নীতি প্রকাশিত হয়েছে। আর জি কর হাসপাতালের শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের পরিবেশ বহু বছর ধরে করে অন্ধকার গ্রাস করে নিয়েছিল। অভয়া হত্যাকাণ্ড এবং তার পরবর্তী জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন মহাশ্বেতা সমাজদার। অনিতা অগ্নিহোত্রী, স্বাতী ভট্টাচার্য,শতাব্দী দাস লিখেছেন অপরাজিতা বিল সম্পর্কে। এই বিল সম্পর্কে স্বাতী ভট্টাচার্য বলছেন ‘পাশের আগেই ফেল’। ভূমিকা ভট্টাচার্য রাত দখল আন্দোলনের অতীত ও বর্তমান আলোচনা করেছেন তার লেখায়। অনুরাগ মৈত্রেয়ী তাঁর লেখা ‘চাওয়া পাওয়া’ তে দেখিয়েছেন কিভাবে অভয়া আন্দোলনে প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার মানুষেরা ভাষা খুঁজে পায়। এক স্বতঃস্ফূর্ত ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের শরিক হতে পারে। অভয়াকে তিনি এক ‘হুইসল ব্লোয়ার’ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক গোষ্ঠীর মনে জমে থাকা ক্ষোভ এবং রাগ একটা বয়েলিং পয়েন্ট হয়ে বেরিয়ে এসেছে। রিজেকশন কালচার বা ক্যান্সেল কালচারের বদলে এক বৃহত্তর ঐক্যের স্বপ্ন দেখতে পেরেছে। শেফালী মৈত্র ‘বাড়ি বাড়ি ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান’ লেখায় লিঙ্গ রাজনীতি, লিঙ্গসাম্যের সংগ্রাম এবং পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর জটিল সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। অভ্র ঘোষ আধিপত্যের মোহ বনাম দ্রোহ লেখায় আরজিকর আন্দোলনকে আধিপত্যের মোহ ভাঙার কারিগর হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। ‘কলঙ্কিনী কলকাতা জাগ্রত কলকাতা’ প্রবন্ধে আশিস লাহিড়ী বলেছেন এই কলঙ্ক জনক ঘটনার বিরুদ্ধে আন্দোলনে গত কয়েক মাসে কলকাতার অন্য চেহারা দেখা যায়। এই আন্দোলনে তিনি প্রকৃত জনগণতন্ত্রের ছায়া, দেখতে পান। কলকাতা ইতিহাসে এই জাগরণ স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সাক্ষাৎকারে ডঃ পুণ্যব্রত গুণ ৮০ র দশকের আন্দোলনের সঙ্গে বর্তমান আন্দোলনএবং শাসকের তুলনামূলক মূলক আলোচনা, সার্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবা, জয়েন্ট প্লাটফর্ম অফ ডক্টরস এবং শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ এর প্রতিষ্ঠা নিয়ে তথ্যভিত্তিক এবং বিশ্লেষণী আলোচনা করেছেন।
এই বইয়ের শেষ অংশ হল একটি আর্কাইভ সেকশন যেখানে সামাজিক মাধ্যমে দ্রোহের আগুন আগুনের কিছু নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে। জুনিয়র ডাক্তারদের দশ দফা দাবি রয়েছে এই আর্কাইভে। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান আছে এই বইতে। বেশ কিছু গান রয়েছে যার কিছু এই সময় লেখা কিছু পুরনো গান এই সময় নতুন মাত্রা পেয়েছে বইয়ের শেষে বেশ কিছু গান রয়েছে যার কিছু এই সময় লেখা কিছু পুরনো গান এই সময় নতুন মাত্রা পেয়েছে। বইয়ের শেষে অপরাজিতা মহিলা ও শিশু বিল এবং এর বিরুদ্ধে নারী অধিকার কর্মীদের প্রতিবাদ পত্র সংযোজিত হয়েছে।









