আজকাল বাঙালির ওষুধ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বন্ধ করেছি। বাঙালির স্বভাব হল, ডাক্তার দেখিয়ে (বা না-দেখিয়ে) ওষুধের নাম জানতে পারলেই সেটা ‘কী কাজ করে’ সেটা জেনে ফেলার চেষ্টা করে। রিসেন্টলির কিছু আগে অবধি সে জ্ঞানলাভের পদ্ধতি ছিল এমত:
১) ডাক্তারকে আমি যে যে সমস্যার কথা বলেছি, সেগুলো শুনে ডাক্তার এই ওষুধ লিখেছে, তার মানে এটা এই সমস্যার ওষুধ — অর্থাৎ, আমি যদি বলে থাকি ঘুম হচ্ছে না, তা হলে এটা হচ্ছে ঘুমের ওষুধ। যদি বলে থাকি ‘ডিপ্রেশন’ হচ্ছে, তবে এটা অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট। আসলে ডাক্তার তাঁকে হয়তো সাইকোসিসের চিকিৎসা করছে, তাতে কিছু আসে যায় না।
২) আমার বাবা / দাদা / মেসোমশাই / জাঁইবাবু / এমনকি পাড়ার পটলাদা বলেছে এটাই এই সমস্যার ওষুধ। তাই ওটা ওই সমস্যারই ওষুধ।
৩) আমায় ডাক্তারবাবু যদি সকালে একটা, আর রাতে একটা ওষুধ খেতে দেয়, তাহলে রাতেরটাই ঘুমের ওষুধ।
রিসেন্টলি (আজকাল) আর একটা নতুন পদ্ধতি হয়েছে — নেটে দেখা। আর নেটেরও বলিহারি, ওয়ান এমজি থেকে আরম্ভ করে মেয়ো ক্লিনিক, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক সবাই — ইহা ঘুমের ঔষধ, উহা পাকস্থলীস্থ অ্যাসিড কমাইবার কার্যে ব্যবহৃত হয়, তাহা হেপ্যাটিক এনসেফ্যালোপ্যাথির চিকিৎসায় কাজে লাগে — এ হেন ইনফরমেশনাধিক্যে আন্তর্জাল ভরিয়ে ফেলেছে।
এ পর্যন্ত তবু ঠিক আছে। নলেজ ইজ পাওয়ার। রোগীকে আমিই বলি — নেট দেখে ওষুধটা সম্বন্ধে পড়ে নেবেন। কোথাও কোনও খটকা লাগলে জিজ্ঞেস করবেন। সমস্যা হল, বাঙালি পুরোটা পড়েন না। যেখানে লেখা আছে — ‘ডাক্তারি মতামত-বিনা ব্যবহার করবেন না’, ততদূর যানই না, আর গেলেও — ‘আরে ওরা কী জানে? যারা ওয়েবসাইট লেখে, তারা কি ডাক্তার? আমার পিসতুতো দাদা বিন্টিদা পিজির হেনতেন ডিপার্টমেন্টে আছে (আছে, কিন্তু কী করে বলেন না, হয়ত আউটডোরে খাতায় নাম লেখে), সে বলেছে…” বলে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে আরম্ভ করেন, তখন হয় সোনায় সোহাগা। সেই ‘বন্ধু’ যিনি ফোন করে বলেছিলেন, “শোনো, ‘এক্স’ ওষুধটা তোমাদের ডিপার্টমেন্টের তো? আমি তোমার চেম্বারে যাব, আমাকে একটা প্রেসক্রিপশন করে দিও তো!” তিনি কোনও কারণে তাঁর ডাক্তারকে বলেছিলেন, ঘুম হচ্ছে না। ডাক্তারবাবু দয়াপরবশ হয়ে ‘এক্স’ ওষুধ রাতে একটা করে খাবেন-এর পরে, স্পষ্ট লিখে দিয়েছিলেন, ‘দু-সপ্তাহের জন্য’। প্রেসক্রিপশন-প্রাপক আনন্দে সে ওষুধ তিন মাস ধরে খেয়ে ফিরে গিয়ে ডাক্তারবাবুকে বলেছিলেন, “এবারে ওটা আর লিখলেন না?”
ডাক্তারবাবু যখন জানতে চেয়েছিলেন, “ওটা তো দু-সপ্তাহ লেখা ছিল, আপনি কি খেয়েই চলেছেন নাকি?” তখন সত্যি কথা বলেননি, বলেছিলেন, “কই না তো!”
ব্যাস, ডাক্তারবাবুও আর লেখেননি, উনিও দোকান থেকে কিনে কিনে খেয়ে চলেছিলেন। ক্রমে একটায় হয় না, দুটো, তারপর দুটোর জায়গায় তিনটে হল। তখনও হুঁশ হল না। শেষে যখন দিনে চারটে, মাসে একশো-বিশ অর্থাৎ বারো পাতা ওষুধ কেনার ‘প্রয়োজন’ হল, তখন টনক নড়ল (এতদিন প্রেসক্রিপশন ছাড়া যিনি সাপ্লাই দিচ্ছিলেন, সেই) ওষুধের দোকানদারের। তখনই মনে পড়ল আরে অনিরুদ্ধ তো সাইকিয়াট্রিস্ট, এবং ফোন হল, ‘ওষুধটা তোমাদের ডিপার্টমেন্টের তো?’
আমার ডাক্তার বন্ধুদের অনেকে বলবে, “ওষুধের দোকানদারের দোষ। এতদিন বিনা প্রেসক্রিপশনে দিচ্ছিল কেন?” নিঃসন্দেহে কথাটা ঠিক, কিন্তু দোকানদার তো ক্রেতার বাড়ি গিয়ে তার পকেটে ওষুধ জোর করে গুঁজে দিয়ে আসেনি?
দোকানদারদের কয়েকটা ব্যাঁকা লজিক আছে, সেটা এখানে আলোচ্য নয়। কিন্তু দোকানদার কি কেবল গরিব, অশিক্ষিত লোকের ওপর ডাক্তারি করে? পিএইডি-ধারকরা (সে যে বিষয়েই হোক) দোকানে গিয়ে ‘পেট খারাপের’ বা ‘সর্দি-জ্বরের’ ওষুধ চায় কেন? আমার সেই উচ্চশিক্ষিত বন্ধুও তেমনই দোকানে গিয়ে চেয়েছিল বলেই দিয়েছিল। একই সঙ্গে বলি, হার্টের রোগীকে ‘এটা খান, খেয়ে যান, স্ট্রেস আর টেনশনটা কম থাকবে,’ বলে এক্স ওষুধ লিখে দেওয়ার ডাক্তার আজও কম নেই। তাঁরাই আবার কয়েক বছর বাদে সেই রোগীকেই, ‘ওরেব্বাবা, এতগুলো খাচ্ছেন! না, না; খুব খারাপ। বন্ধ করুন। পারছেন না? সাইকিয়াট্রিস্ট দেখান,’ বলে ঘাড় থেকে নামিয়ে দেন।
যে ওষুধে নেশা হয়, সে ওষুধ তো বোঝা গেল। যাতে নেশা হয় না, তার অপব্যবহার করতেও বাঙালির জুড়ি নেই। সকালে ‘কনস্টিপেশন’ বলে তিন-চামচ করে জোলাপ সকাল আটটায়, দুপুর বারোটায়, বিকেল চারটের সময় খেয়ে, রাত আটটায় ‘পেট খারাপ হয়ে গেছে’ বলে হেপ্যাটিক একসেফ্যালোপ্যাথিতে ব্যবহার্য অ্যান্টিবায়োটিক ‘দুটো খেয়ে নিয়েছি’ কারণ ‘নামটা পড়েই বোঝা যায় ওটা পেটের রোগের ওষুধ’, এমন বাঙালিকে খুব ভালো করে চিনি। তারপরে পরদিন দুপুরে ‘অ্যান্টিবায়োটিকের জন্য ভীষণ কনস্টিপেশন’ বলে আবার জোলাপ… আবার পরদিন সকালে কাজে বেরোনোর আগে অ্যান্টিবায়োটিক…
এ-হেন বাঙালি যদি জিজ্ঞেস করেন, “‘ওয়াই’ ওষুধটা কিসের গো? অ্যান্ট্যাসিড?” তখন আমার পাজঞ্জুরিতে তিড়িতঙ্ক লাগে। এর উত্তর ‘না’ বললে বলতে হবে কিসের ওষুধ, তখন, অথবা ‘হ্যাঁ’ বললেই, শুরু হবে হুড়মুড় করে কথায় কথায় ওষুধ গলাধঃকরণ। সে পাড়ার পটলদার মেয়ের বিয়েতে সাতটা ফিশ ফ্রাই, বারো পিস মাছ, হাফ-বালতি মাংস খেয়ে ‘ওরে বাবা হাঁসফাঁস অবস্থা, গলা-বুক জ্বলে গেল’ দিয়ে আরম্ভ হলেও, তৎপরবর্তীকালে — ‘আজ পটলদার ছেলের বৌভাতে খাবার জন্য বেরোবার আগে একটা খেয়েই নিই,’ এবং ‘ফিরেও একটা খেয়ে নিই’ হয়ে আরও পরে কোনও এক দিন, পটলদার নাতির মুখেভাতে ‘সকালে একটা, দুপুরে একটা, বিকেলে একটা’তেও থামে না। বাড়তেই থাকে। আবার আরও ওস্তাদি আছে। ‘অ্যান্ট্যাসিড’ বলে যে ওষুধের তালিকা ডাক্তারি বইয়ে থাকে, সে সব গোলাপি বা হলদে ট্যাবলেটে, বা জেল-জাতীয় ঘন তরলে তাঁদের মন ভরে না। তাই তাঁরা অন্যান্য যতরকম পেপটিক আলসার, বা সমতুল্য কঠিন অসুখের ওষুধ আছে, সবাইকে প্রাণের আনন্দে ‘অ্যান্ট্যাসিডের রঙে রঙ মেলাতে হবে’ বলে মুড়ি-মিছরি এক করে দিয়েছেন। এ সবে নিশ্চয়ই ডাক্তারদের কোনও হাত ছিল না (তাঁরা হাঁ-হাঁ করে ওঠার আগেই বলে দিলাম)। এখন সে সব হিস্টামিন-2 রিসেপ্টর ব্লকার, প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর ইত্যাকার ওষুধ বাঙালি প্রাণের খুশিতে সকাল-দুপুর-বিকেল-রাত এগ রোল, ফিশ-ফ্রাই, চিকেন-কাটলেট, কবিরাজি, মুর্গ-মুসল্লম, দো-পেঁয়াজা, বিরিয়ানির সঙ্গে সমানতালে প্যাঁদাচ্ছেন, আর সেই সঙ্গে পেট ছাড়লেই দু-তিন রকম অ্যান্টিবায়োটিকসের ককটেল… একেবারে মুঠো-মুঠো।
মুঠোর হিসেবে অবাক লাগছে? হিস্টামিন 2 রিসেপ্টর ব্লকার ট্যাবলেট, দিনে যেটা বড়োজোর দুটো খেতে হয়, সেরকম ট্যাবলেট, একাধিক রকম, দিনে আড়াইশো-তিনশোটা (লিখতে ভুল হয়নি কনফার্ম করতে সংখ্যাতেও লিখছি ২৫০–৩০০) খায় এমন একাধিক মানুষ আমি স্বচক্ষে দেখেছি। আমার পিডিয়াট্রিশিয়ান বন্ধু বলেছিল, “এর স্টম্যাক অ্যাসিড আর কোনও দিন তৈরি হবে?”
অবশ্যই এটা পড়ে অনেক বাঙালিই মনে করবেন, “ও, আমি তো মাত্র আটটা / বারোটা / বিশটা / পঞ্চাশটা খাই, আমি সেফ…” সে যে যা মনে করেন করুন, পরে ডিমেনশিয়া হলে আমাকে দেখাতে আসবেন। কিন্তু আমাকে জিজ্ঞেস করলে এই ধরনের উত্তরই পাওয়া যাবে — ‘এটা হেপাটিক এনসেফ্যালোপ্যাথিতে দেয়,’ বা, ‘এটা 1 Esophagitis, 2 Non-erosive reflux disease, 3 Peptic ulcer disease, 4 Prevention of nonsteroidal, anti-inflammatory drug-induced ulcers, 5 Zollinger-Ellison Syndrome, 6 Helicobacter pylori infections-এর ওষুধ’। এর বাইরে কিছু জানতে পারবেন না।
‘তাহলে আমার ডাক্তার এই ওষুধ দিল কেন?’র উত্তর — জানি না।









