দু’হাজার চব্বিশের আগস্ট মাসের নয় তারিখ। অনভিপ্রেত একটি দুর্ঘটনা ঘটে যায় রাজ্যের একটি হাসপাতালে। একটি মেডিকেল কলেজে। খবরটা সবাই জানেন, পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন।
দুর্ঘটনা হলেও ব্যাপারটা নজিরবিহীন। কেননা আত্মহত্যা ইত্যাদি অহরহ ঘটতে থাকলেও – সংশ্লিষ্ট কলেজটি কোনও এক অজ্ঞাত কারণে ইদানীং দুর্ঘটনা/আত্মহত্যা-প্রবণ – তবু একটি মেয়ে নিজেই নিজেকে ধর্ষণ করে খুন করেছে, এমন বড় একটা দেখা যায় না।
কলকাতা পুলিশ চটজলদি তদন্তে নামে এবং সম্ভবত এমন নজিরবিহীন ‘দুর্ঘটনা’-র পর মেয়েটিকে লোকলজ্জার হাত থেকে বাঁচাতে একজন পুরুষকে ঘটনার দায় গ্রহণে রাজি করে, থুড়ি চিহ্নিত করে।
সংশ্লিষ্ট পুরুষটিও – সঞ্জয়বাবু – মানুষ হিসেবে মহৎ। খুন আঘাত ধর্ষণ থেকে বাদবাকি যা যা সম্ভব, যাবতীয় সবকিছুর দায়ভার তিনি একাই গ্রহণ করেন। শোনা যায়, দায়গ্রহণের আগে তিনি আলিপুরে ফোন করে জিজ্ঞেস করেন, যে, ওইদিন এদিকে কোনও ভূমিকম্প বা ওর’ম কিছু ঘটেছিল কিনা, ঘটে থাকলে তিনি তার দায় গ্রহণেও প্রস্তুত।
ওদিকে পুলিশের ‘তদন্ত’ চলাকালীন মাননীয় অধ্যক্ষ বৈঠকে বসেন। কেউ কেউ বলেন, বৈঠক বসে ঘটনাস্থলেই, লাশের পাশে। কেউ বলেন, বৈঠক হয় অধ্যক্ষের খাস চেম্বারে। নিশ্চিত জানা যায় না। তবে মেডিকেল কাউন্সিলের বড়কর্তা থেকে শুরু করে কর্তার ঘনিষ্ঠ ও ক্ষমতাশালী চামচা, তাঁরা যে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এটুকু নিশ্চিত। ফোনের ওপাশে কর্তাদেরও কর্তারা – বাপেরও বাপ থাকে, থাকাটাই দস্তুর – তাঁরা ছিলেন। তবে আলোচ্য বিষয়সূচীতে যে প্যারিসে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক গেমস ও রাজ্যের স্বাস্থ্যশিক্ষার উন্নয়নচিন্তা ব্যতীত ভিন্ন কিছু ছিল না, এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
এমন ঘটনা ঘটিয়ে বসলেও, স্বভাবের দিক থেকে মেয়েটি ছিল নিতান্ত লাজুক প্রকৃতির। আত্মহত্যা করবে – এবং তা-ও এমন অদ্ভুত উপায়ে – সে বিষয়ে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব কেউই কিচ্ছুটি জানতে পারেনি। অবশ্য সঞ্জয়বাবু দায় স্বীকারের পর থেকে এটি দুর্ঘটনা হিসেবেই উল্লেখিত হওয়া ভালো। তো মেয়েটি এতই অন্তর্মুখী ও সিক্রেটিভ টাইপের, যে, দুর্ঘটনা ঘটে যাবার আগে তো দূর, দুর্ঘটনার পরেও তার সঙ্গীসাথী বন্ধুবান্ধবদের কেউই কিচ্ছু জানতে পারেনি। এখনও কেউ কিচ্ছুটি জানতে পারেনি। সংশ্লিষ্ট কলেজের অনেক ছাত্রছাত্রী তো আজ পর্যন্ত জানে-ই না, যে, তাদের কলেজে কিছু একটা ঘটনা ঘটেছে।
একইভাবে, সংশ্লিষ্ট কলেজের অধ্যাপকরাও কিচ্ছু জানেন না। বক্ষরোগ বিভাগের কেউ কেউ টিভি দেখে খবরটা জেনেছিলেন বটে – তাঁদের থেকে হয়ত আরও কেউ কেউ – কিন্তু পুলিশ সদর্থক পথে তদন্ত করছে জানার পর সকলেই আশ্বস্ত হন ও এসব নিয়ে আলোচনা বাড়ান না। তাছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসক-অধ্যাপকরা যান রোগীর চিকিৎসা করতে এবং ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা করাতে – আর পাঁচটা অবান্তর বিষয়ে মাথা ঘামানো তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। ব্যক্তিগতভাবে জেনেছি, সংশ্লিষ্ট কলেজের ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার দেখভাল করার দায় যাঁদের ‘পরে ন্যস্ত, তেমন একজন অধ্যাপক, এবিষয়ে প্রশ্ন করলে, বলেন – এই মুহূর্তে ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়াটাই তাঁর কাছে প্রায়োরিটি, অন্য বিষয়ে মন দেওয়ার অবকাশ তাঁর নেই। স্বাভাবিক। শাস্ত্রে বলেছে – ছাত্রাণাং অধ্যয়নং তপঃ! অধ্যাপকদের তো আরও বেশি।
তো পরিস্থিতি মোটের উপর স্বাভাবিক।
স্বাস্থ্য-দফতরের বড়কর্তারা – এবং চেয়ারে বসা ভাবলেশহীন সেই রোবটসমূহের চালকরা – একটা অনভিপ্রেত দুর্ঘটনা খুবই এফিশিয়েন্টলি সামলে দেওয়া গেছে দেখে অনেকটাই আশ্বস্ত।
একটু অন্যরকমের একটি দুর্ঘটনা – অপরাধ নয় কোনও ভাবেই – এত দ্রুততার সঙ্গে তার সুরাহা করে ফেলার পর কলকাতা পুলিশও গর্বিত। কলকাতা পুলিশের আন্তর্জাতিক পুরষ্কার প্রাপ্তি স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।
কিন্তু এ রাজ্যে ভালো-কে ভালো বলার লোক আজকাল কমে আসছে।
যেমন ধরুন, পুলিশ-প্রধান বিনীত গোয়েল রাজ্যের যাবতীয় নরনারীর চোখে – বিশেষত নারীদের চোখে – নায়কের আসনে বসার কথা, কিন্তু তেমনটা এখনও হলো না। বিনীত গোয়েল আইপিএস মানুষ – ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে উচ্চারণ করেছেন, ‘কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন’ – এবং কর্মযজ্ঞে পুনরায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, কিন্তু সবাই তো আর এমন স্থিতপ্রজ্ঞ কর্মযোগী হতে পারেন না। তাই কেউ কেউ বিষণ্ণ।
যেমন, আমাদের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী।
মানুষ হিসেবে তিনি কোমলপ্রাণ। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেও তা-ই। জনকল্যাণে, বিশেষত নারীকল্যাণে, ব্রতী। তাঁর রাজত্বের এক প্রজা-নারী কেন এমন কাজ করে বসল, তা ভেবে তিনি গভীরভাবে বিষণ্ণ।
তাঁর পুলিশ, এত করেও, মানুষের মন পাচ্ছে না কেন, এই ভেবে পুলিশমন্ত্রী হিসেবে তিনি বিষণ্ণ।
আর এত কাজ করার পরও, দিনে ছাব্বিশ ঘণ্টা পরিশ্রম করার পরও একেবারে একটা নন-ইস্যু-কে ইস্যু করে যেভাবে তাঁর একান্ত স্নেহভাজন সন্দীপ (ও সম্প্রদায়) ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তা দেখে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবেও বিষণ্ণ।
এই বয়সে বিষণ্ণতা ভালো ব্যাপার নয়। বিষণ্ণতা কাটানোর জন্য যে যেটুকু পারে চেষ্টা করছে। সুরসিক কপিল সিব্বাল অব্দি মোবাইলে জোকস পাঠিয়ে মাননীয়ার মন ভালো করার চেষ্টা করছেন। নিজের পাঠানো সেই জোকস পড়ে কপিলবাবু নিজেই হেসে ফেলে আদালতের বকুনি – আদালত হয়ত পরিস্থিতির ‘গ্র্যাভিটি’ জানতেন না – তো কপিলবাবু বকুনি খেলেও মাননীয়া এখনও হাসেননি।
প্রিয় পাঠিকা, আপনি এগিয়ে আসুন। মাননীয়ার বিষণ্ণতা কাটানোর চেষ্টা করুন।
পুনঃ – হ্যাপি বার্থডে, রাধাগোবিন্দবাবু। আপনার নামাঙ্কিত মেডিকেল কলেজটি, আজ, আক্ষরিক অর্থেই, বাকিদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। ছাত্রছাত্রী ফ্যাকাল্টি, পরিবেশ – সবই, এককথায়, প্রতিযোগিতার উর্ধ্বে। কংগ্র্যাচুলেশনস, স্যার।










