‘সৃষ্টিবিধাতার
নিয়েছ কর্মের ভার
তুমি নারী
তাঁহারি আপন সহকারী’
এই ক’দিন তেমন করে সোশ্যাল মিডিয়া, টিভি বা খবরের কাগজে উঁকি মারিনি। কিন্তু অন্ধ হলে তো প্রলয় বন্ধ থাকে না।
তাই বালিতে মুখ গোঁজা উটপাখির ‘বর্ষার ছুটি’র পরিসমাপ্তি ঘটালাম।
ঘটনাপ্রবাহ গড়াতে গড়াতে সুপ্রিম কোর্ট অবধি পৌঁছেছে।
সেখানে আর জি কর হাসপাতালের সাম্প্রতিক নারকীয় হত্যা এবং তার অনুষঙ্গে উঠে আসা নারীসুরক্ষা বিষয়ক কিছু বৃহত্তর সমস্যার সমাধানের দিশা দেখানো হয়েছে। সকলেই উচ্চতম ন্যায়ালয়ের প্রধান বিচারপতির আজকের বিবৃতি জানেন, বিস্তারিত বলা নিষ্প্রয়োজন।
ভারত আবেগসম্পন্ন দেশ। ঘৃণা, ভালবাসা, আনন্দ, ক্রোধ সবকিছুই বিপুল উদ্যমে প্রকাশ করে থাকে — সময়ে সময়ে নিতান্ত অধৈর্য শিশুর মতোই প্রকাশ করে থাকে। তাতে ক্ষতি নেই। বস্তুত, ঘটনা যা ঘটেছে তা এতটাই ভয়ঙ্কর এবং বিবমিষা জাগানো যে সেখানে সংযত থাকাটাই কঠিন, প্রায় অসম্ভব।
নাগরিকদের উচ্ছ্বাস নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু চিকিৎসকদের, বিশেষ করে ঐ হাসপাতালটিতে কর্মরত চিকিৎসকদের আবেগ প্রকাশের বিষয়ে কিছু বলার আছে।
খবরে প্রকাশ (হ্যাঁ — খবরেই, গুজবে নয়), উক্ত হাসপাতালটিতে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি চলছিল, যে কারণে রাজ্য সরকার বিশেষ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। কথা হচ্ছে, যাঁর নেতৃত্বে এই দুর্নীতি চলছিল বলে খবরে প্রকাশ, তিনি তো চার্লস শোভরাজ কিংবা চম্বলের মান সিং এর মতো অন্ধকার সাম্রাজ্যের একক অধীশ্বর নন, তিনি একটি হাসপাতালের শিক্ষা-প্রশাসনের সদ্যপ্রাক্তন প্রধান। তিনি একা হাতে, কাকপক্ষীকে জানতে না দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে মারাত্মক দুর্নীতিতে লিপ্ত থেকেছেন, এ কথা কাকপক্ষীও সম্ভবত বিশ্বাস করবে না।
তাহলে উক্ত হাসপাতালের অত্যাচারিত, পীড়িত, ভীত চিকিৎসককুল (মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে) এতদিন প্রতিবাদ করেননি কেন? ভয় পেয়েছিলেন। অত্যন্ত সঙ্গতভাবে ভয় পেয়েছিলেন। সেই ভয় বা আতঙ্কের ট্রমা থেকে বেরিয়ে প্রতিবাদে ঝাঁপিয়ে পড়তে তাঁদের সময় লেগেছে। খুবই স্বাভাবিক। তাঁরা হেক্টর কিংবা অ্যাকিলিস নন, সাধারণ মানুষ। নিজেরা যখন নিজেদের সেই সময়টুকু দেওয়াকে ন্যায্য ভাবছেন, তখন সুপ্রিম কোর্ট বা কেন্দ্রীয় অনুসন্ধানকারী সংস্থাকে সেই সময়টুকু দিতে ক্ষতি কী?
‘পাঁচদিন হয়ে গেল, এখনো কিছুই করতে পারল না’
‘সরাসরি মে রে দেওয়া দরকার’ জাতীয় ধর তক্তা মার পেরেক বক্তব্য সুষ্ঠু সমাধানকে ত্বরান্বিত করবে? তাই হয়?
পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট খবরের কাগজ থেকে আন্তর্জাল সর্বত্র ঘুরছে। মানবশরীরের আভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবস্থান, কোন ধরণের আঘাতে কী ধরণের প্রতিক্রিয়া হয়, কী কী চিহ্ন দেখে হ ত্যার কারণ অনুমান করা যায়, ধ র্ষ ণের পরে খু ন নাকি খু নের পরে ধ র্ষ ণ, ইত্যাদি সম্পর্কে সঙ্গতভাবেই বিশেষ ধারণা না থাকা নিতান্ত সাধারণ মানুষও তা গোগ্রাসে গিলছেন, মতামত দিচ্ছেন, পক্ষ তৈরি করছেন, ইন্ধন জোগাচ্ছে হরেক লিঙ্ক, স্টোরি আর ক্লিপ। জঘন্যতম অপরাধের বিচার চাওয়ার নামে এসব জানা খুব জরুরি? জানলে প্রতিবাদের অভিমুখ পরিবর্তিত হবে?
কোনো সভ্য দেশে, তথ্য জানার অধিকারের নামে, বিচারাধীন বিষয়ে এমন হওয়া উচিৎ?
আমরা ভেবে দেখব না, খুব পরিণত আচরণ করছি কী?
দীর্ঘসূত্রিতা কাম্য নয়। তবু আমি আশাবাদী। সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত নিরাপদতম কর্মক্ষেত্রে, অর্থাৎ হাসপাতালে, কর্মরত অবস্থায় মারাত্মক যন্ত্রণা ও অবমাননা সয়ে যে মেয়েটি না ফেরার দেশে চলে গেল, নাড়িয়ে দিয়ে গেল একটা স্থবির, অলস সমাজকে — চটজলদি সমাধানের মোহে সেই সমাজ যেন দিকভ্রষ্ট না হয়।
ন্যায়বিচার এবং নারীসুরক্ষার অধিকার, এই দু’টি বিষয়ই প্রধান বিচার্য হোক, এটাই চাই।
বিভিন্ন বাইনারি এনে আসল অ্যাজেন্ডা গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা যেন প্রতিহত করতে পারি আমরা।
দুর্গাপুজোর বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই নয় — লড়াই হোক তার নির্লজ্জ বৈভব প্রদর্শনের বিরুদ্ধে। যাঁরা পুজোর জাঁকজমক কম হলে বহু মানুষের রুজি রোজগারে টান পড়বে বলে চিন্তা করছেন, তাঁদের করজোড়ে বলি — নম্রভাবে, সুচারু সাজে, আন্তরিক উপাসনায়, অভাবী মানুষকে মাঙ্গলিক কাজকর্মে জড়িয়ে নিয়ে, আড়ম্বরের দৃষ্টিকটু প্রকাশ না করেও দৃষ্টিনন্দন শারদোৎসব করা যায় তো! মা তাতেই বেশি সন্তুষ্ট হবেন, দেখনদারি তাঁরও আর ভাল লাগে না। প্রদীপের নিচে অন্ধকার নিয়ে উৎসব উদযাপন মানায় কী? বুকে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর শোকের পাথর চেপে এক গরাস ভাতই গলা দিয়ে নামতে চায় না মানুষের, ঝকমকে জামাকাপড়, চোখ ধাঁধানো বাহারি আলো আর মণ্ডপসজ্জা ভাল লাগবে?
পরিশেষে সেই পুরোনো কথা। সুপ্রিম কোর্ট আন্দোলনরত চিকিৎসকদের কাজে ফিরতে অনুরোধ করেছেন।
আমাদের, চিকিৎসকদের লড়াই সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে তো নয়! তাঁদের জন্যও তো এই লড়াই লড়ছি আমরা, তাই না? এই লড়াইয়ে তাঁদেরও সামিল করতে হলে, অনির্দিষ্টকাল পরিষেবা বঞ্চিত করে রাখলে কিন্তু চলবে না, এই কথাটি জুনিয়র সতীর্থদের আরো একবার ভেবে দেখতে অনুরোধ জানালাম।










