আধ্যাত্মিকতা আর রিলিজিয়াসনেসের একটা প্রধান পার্থক্য এই যে রিলিজিয়নের মূল কাজ হল ধর্মীয় বিশ্বাসকে কোডিফাই করে গোষ্ঠী নির্মাণ করা। গোষ্ঠী নিজের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করার জন্য অন্য গোষ্ঠীর থেকে নিজেকে আলাদা করে রাখার চেষ্টা করে, নির্দিষ্ট কিছু স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করে এবং স্বার্থের সংঘাত হলে অন্য গোষ্ঠীর সঙ্গে কলহ বা যুদ্ধে জড়ায়। এই ব্যাপারগুলোর সঙ্গে ঈশ্বর বা আধ্যাত্মিকতার বিশেষ সম্পর্ক নেই। বস্তুত রিলিজিয়নের সঙ্গেই ঈশ্বর বা আধ্যাত্মিকতার সম্পর্ক আদৌ আছে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
গোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে গেলে কিছু কর্তব্যের তালিকা লাগে, আর লাগে কতগুলো ট্যাবু। বিধিবদ্ধ কর্তব্যগুলো তো চুপচাপ নিজের মতো করা যায়, তা সে গায়ত্রী মন্ত্র জপ করাই হোক বা নামাজ আদায়। যে কাজ নীরবে, ব্যক্তিগত পরিসরে করা হয়, তা আইডেন্টিটি নির্মাণে জরুরি হলেও ফলিত রাজনীতিতে তার গুরুত্ব অপেক্ষাকৃত কম। অপর গোষ্ঠীর সঙ্গে বিরোধ নির্মাণে, মেরুকরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ট্যাবুগুলো… যেমন গরু বা শুয়োরের মাংস। এগুলো রাজনৈতিক মাংস এবং সেই কারণেই পাঁঠা, মুর্গি বা মাছের থেকে আলাদা।
রাজনীতির কারবারিরা সাধারণত কোনো গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন, আবার সেই গোষ্ঠীর সমর্থনকে পুঁজি করেই তাঁদের আধিপত্য, ভোগবিলাস ইত্যাদি বজায় থাকে। এই আধিপত্য বহাল রাখার প্রয়োজনে তাঁরা বিভিন্ন ছুতোয় কোনো উপযুক্ত ‘অপর’ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিতে চেষ্টা করবেন, তা মোটামুটি জানা কথা। বেশিরভাগ সময় সেই লড়াই রেটরিক বা রাজনৈতিক প্যাঁচপয়জারের মধ্যে সীমিত থাকলেও ক্ষেত্রবিশেষে তা অর্থনৈতিকভাবে বা শারীরিকভাবে সহিংস হয়ে উঠতে পারে।
সর্বদাই কেন একইরকম সহিংস হয় না এইসব টানাপোড়েন? এর মূল কারণ দুটো। প্রথমত, লাগাতার ভায়োলেন্স বহু দিক থেকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ক্রমাগত মারামারি করার আর্থিক এবং শারীরিক ধকল বিপুল এবং এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠে সামগ্রিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় হতে পারে। ফলে এরকম সংঘর্ষ তোলা থাকে সময়মত ব্যবহার করার জন্য।
দ্বিতীয়ত, প্রাত্যহিক জীবনে মানুষের পরিচয় অত সরল নয় এবং মানুষে-মানুষে আদানপ্রদানও একরৈখিক নয়। ধর্ম ছাড়াও পেশা, ভাষা, ভৌগোলিক অবস্থান, জাতীয়তা বা রাষ্ট্রীয় নাগরিকত্ব ইত্যাদি অনেককিছুর ভিত্তিতে মানুষ পরিচয় এবং সামাজিক সম্পর্ক নির্মিত হয়। এগুলো বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বাফারের কাজ করে। অপরায়নের একটা অজুহাতের বিপরীতে তিনটে common বা shared feature / interest দাঁড়িয়ে থাকে। রাজনীতি ব্যবসায়ীদের কাজ হল এই তিনটেকে মুছে দিয়ে বিরোধের জায়গাটাকেই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে জাগিয়ে তোলা। এই উদ্যোগে ধর্মীয় ট্যাবুগুলো ম্যাজিকের মতো কাজ করে। সাধারণত সেই ম্যাজিকটা হল হঠাৎ উস্কানিতে মব তৈরি করা এবং ছোট বা বড় দা ঙ্গার পরিস্থিতি তৈরি করা। শুধু ভারতে নয়, বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে এই কাজ করা হয়েছে এবং হচ্ছে, বিভিন্ন রিলিজিয়ন অবলম্বী রাজনীতি ব্যবসায়ীরা করেছেন সাফল্যের সঙ্গে, করেই চলেছেন৷ মানুষের জন্য এর ফল কখনোই ভালো হয়নি। তবু রাজনেতারা এই পদ্ধতি অবলম্বন করেন, কারণ এটা তাঁদের / শাসক শ্রেণীর কাজে লাগে। সামাজিক আর রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের অন্যান্য দিকগুলোকে চাপা দেওয়া একটা প্রধান উদ্দেশ্য, কারণ অন্য কিছু দিক (যেমন অর্থনৈতিক শোষণ) সম্বন্ধে সাধারণ মানুষ সচেতন হলে এবং সেই প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হলে শাসক শ্রেণী ঘোরতর অসুবিধার মধ্যে পড়বেন৷
রাজনৈতিক নেতাদের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কিছু গণতান্ত্রিক পদ্ধতি আছে। কিন্তু গণতন্ত্র তো বাঁচে জনগণকে অবলম্বন করেই। তাই যখন কোথাও সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশের মনে অন্য সবকিছু চাপা পড়ে গিয়ে শুধুমাত্র রিলিজিয়নভিত্তিক বিদ্বেষ অতিমাত্রায় প্রকট হয়ে ওঠে, ঘৃণার চাষ এমন মাত্রায় পৌঁছায় যে ধর্মীয় অপরকে যেনতেন প্রকারে বিপদে ফেলা, শারীরিক নিগ্রহ করা, এমনকি হ/ত্যা করা ‘জলভাত’ হয়ে যায়, তখন রীতিমত চিন্তিত না হয়ে উপায় থাকে না। ২০২৪ পরবর্তী বাঙলাদেশের উদাহরণ দিচ্ছি প্রথমে, কারণ তাতে এই পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুভব করা ভারতীয় সংখ্যাগুরুর পক্ষে সহজ হবে৷ তারপর বলার থাকে এই যে ভারতের পরিস্থিতি এই মুহূর্তে বাঙলাদেশের মতো বিস্ফোরক না হলেও মানুষের মনের জমিতে সেই একই বিষফলের চাষের লক্ষণগুলো প্রকট হচ্ছে৷ বাঙলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে যদি আমরা ঘৃণা করি, তাহলে সেই একই পরিস্থিতি আমাদের দেশে আমরা চাইতে পারি না এবং একই কাজ আমরা করতে পারি না। এটুকু অন্তত বোঝা দরকার।
গত কয়েক মাসে ভারতের বিভিন্ন স্থানে ভাষা, আঞ্চলিকতা এবং ধর্মবিশ্বাসের কারণে যে হত্যাকাণ্ড গুলো ঘটেছে, তা ভয় পাওয়ানোর মতো। গতকাল কোলকাতায় যা ঘটেছে, তা সেগুলোর মতো ভায়োলেন্ট না হলেও কৌশল হিসেবে যথেষ্ট চিন্তাজনক।
অলিপাবে আমি কোনোদিন যাইনি, চোখেও দেখিনি। তার ঐতিহ্য সম্বন্ধেও ধারণা নেই। তবে শুনেছি সেটা এক পার্সি মালিকের রেস্তোরাঁ, যেখানে গরু, শুয়োর, মুর্গি, পেঙ্গুইন, জলহস্তী… সবকিছুরই মাংস বিক্রি হয় এবং মদ্যপান হয়। অর্থাৎ ইসলামে হারাম অন্তত দুটো জিনিস সেখানে বিক্রি হয়। সেখানে বামুনের জাত মারার ষড়যন্ত্র হওয়াটা খুব বিশ্বাসযোগ্য কনস্পিরেসি থিওরি নয়। সায়ক চক্রবর্তীর নামও কালকেই প্রথম শুনলাম। তিনি ফুটেজখোর না হিন্দুত্ববাদী, নাকি কোনোটাই নন, তা আমি জানি না। কিন্তু তাঁর গতকালকের কাজটি আমার ভয়ঙ্কর লেগেছে৷ ঠাণ্ডা মাথায় একজনকে ফাঁসানোর ষড়যন্ত্র হলে ভয়াবহ, আর স্রেফ ফুটেজের জন্য হলে নাগরিক হিসেবে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়। যেটাই হোক, এই প্রবণতাকে থামানো প্রয়োজন দেশের স্বার্থে।
অবশ্য আমার প্রতিক্রিয়া এবং প্রতিবাদের কারণ সম্ভবত অন্য প্রতিবাদীদের অনেকের সঙ্গে মিলছে না। সায়ককে অনেকেই গোবৎস বলে ঠাট্টা করছেন তিনি গরু খেতে আপত্তি করেছেন বলে। আমি তা করছি না, কারণ ধর্মবিশ্বাসী মুসলমান যদি শূকর ভক্ষণ করতে নারাজ হতে পারেন, বিশ্বাসী হিন্দুও গোমাংসকে বিষবৎ ভাবতেই পারেন। প্রাচীনকালে হিন্দুরা গরু খেতেন, এই যুক্তিও এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। সব ধর্মীয় বা সামাজিক অনুশাসনের ক্ষেত্রে প্রাচীন যুগে ফিরে যেতে কি আমরা রাজি হব? আফসোস করতে গিয়ে ইয়ং বেঙ্গলের বৈপ্লবিক কাজকর্মের উল্লেখ করেছেন কেউ কেউ। যে কাজটির প্রশংসা বিশেষভাবে করা হয়েছে, তার বিষয়েও আমি তেমন সপ্রশংস নই। বামুনদের গায়ে বা ঘরে গরুর হাড় ছুঁড়ে দেওয়া অনেকটা মুসলমান মানুষকে জোর করে শুয়োর খাওয়ানোর মতোই। দুটোই সাম্প্রদায়িক কাজ, এমনকি অ্যাথেইস্টরা করলেও। ইচ্ছার বিরুদ্ধে হিন্দুকে গরু খাইয়ে বা মুসলমানকে শুয়োর খাইয়ে প্রগতিশীল করার কোনো বাসনা আমার নেই। হিন্দু গরু খেতে না চাইলে এবং মুসলমান শুয়োর খেতে না চাইলে স্পষ্ট বলবেন যে তিনি কোনোমতেই ওই জিনিস খাবেন না। অন্যদের খাওয়া বা রান্না হওয়া নিয়ে আপত্তি না থাকলে অলিপাবের মতো জায়গায় যেতেই পারেন, নইলে নিজের রিলিজিয়ন অনুসারে বিশুদ্ধতাবাদী জায়গায় যাবেন। অলিপাবের খাবারের মান নিয়ে যে আলোচনাগুলো হচ্ছে, সেগুলো সম্বন্ধে কিছুই বলছি না, কারণ সেগুলো অপ্রাসঙ্গিক এবং ওই বিষয়ে আমার কোনো ধারণাও নেই।
আমি তাহলে এই ঘটনায় বিচলিত কেন? প্রতিবাদ করছি কেন? কারণ একজন ব্যক্তি বিদ্বেষের বশে একজন অপরিচিত ব্যক্তির ক্ষতি করার চেষ্টা করছেন… এটাকে ক্যান্সারের লক্ষণ হিসেবে ভাবা জরুরি, বিশেষত যেহেতু এই প্রবণতা মাত্র একজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এই ধরনের আচরণ থেকে মব লি-ঞ্চিংয়ের, এমনকি জাতিদাঙ্গার সৃষ্টি হতে পারে এবং সামগ্রিকভাবে এই প্রবণতা আমার দেশের পক্ষে, তার সামাজিক বুননের পক্ষে এবং গণতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকারক এবং দেশের উন্নতির পথে প্রতিবন্ধক, দেশকে দুর্বল করে দেবার সহায়ক। এই কারণটুকুই আমার কাছে যথেষ্ট।











