বাংলার জনতার কাছে অভয়া মঞ্চে’র খোলা চিঠি
সুধী,
২০২৪ সালের ৯আগস্ট আমাদের মেয়ে, বাংলার মেয়ে অভয়া’কে হারিয়েছি আমরা। দশ মাস অতিক্রান্ত, আজও প্রকৃত বিচার অধরা। আর জি কর হাসপাতালে ছাত্র যুবদের প্রবল বাধা সত্বেও রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নের অন্যতম হাতিয়ার পুলিশের জুলুমবাজি আর বল প্রদর্শনের কাছে পরাস্ত হয়ে শববাহী যানে করে অভয়া’র নিথরদেহ চলে গিয়েছিল শেষকৃত্যে।
“ক্ষুব্ধ যারা, লুব্ধ যারা,/ মাংসগন্ধ মুগ্ধ যারা, একান্ত আত্মার দৃষ্টিহারা/ শ্মশানের প্রান্তচর, আবর্জনা কুণ্ড তব ঘেরি/ বীভৎস্য চিৎকারে তারারাত্রি দিন করে ফেরা ফেরি/ নির্লজ্জ হিংসায় করে হানাহানি/ শুনিতাই আজি/ মানুষ-জন্তুর হুঙ্কার দিকে দিকে উঠে বাজি” –
ফ্যাসিস্তদের বিশ্বগ্রাসী বীভৎস পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ও ধিক্কার জানিয়ে লেখা কবিগুরুর এই কবিতার প্রাসঙ্গিকতা বোঝা যায়অভয়ার নৃশংস হত্যা এবং বিচারের পরিবর্তে প্রমাণ ধ্বংসেরঅপচেষ্টায়। একটি হাসপাতালের ভিতর তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যা ‘আরোগ্য নিকেতন’ বা ‘স্যাংচুয়ারি’র ধারণাকে পদদলিত করেছে। এর পেছনে জড়িয়ে আছে পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি যার জনক এবং রক্ষক এই রাজ্যের সরকার। বিশ্বাসভঙ্গের ক্রোধ আর বিষন্নতা মানুষকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। ১৪ই আগস্ট ২০২৪ এ ‘মেয়েদের রাতদখল’ ইতিহাস তৈরী করে। দেশে বিদেশে জনগর্জন, লাগাতার রাতদখল এবং রাস্তায় প্রতিবাদী জনতার প্লাবনকে ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধে রবি ঠাকুরের ‘রাখী বন্ধন’ বা ‘৪২ এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে মানুষের অংশগ্রহণের সঙ্গেই একমাত্র তুলনীয় বলে প্রবীণ মানুষজন, অনেকেই মনে করেন। জুনিয়ার চিকিৎসকদের আন্দোলন, ধর্মতলায় অনশন এই আন্দোলনে অন্য মাত্রা যোগকরে। ‘দ্রোহের কার্নিভাল’ প্রতিমা বিসর্জনের ‘কার্নিভাল’কে ম্লান করে দেয়। রাজ্য জুড়ে সংগ্রামরত চিকিৎসক, চিকিৎসক সংগঠন, সাধারণ মানুষ, শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার গণতন্ত্রপ্রিয় সংগঠনগুলোর মিলিত শক্তিতে গত ২৮অক্টোবর, ২০২৪ গঠিত হয় অভয়া মঞ্চ’।
কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় তদন্তকারী এজেন্সীর তদন্তের নামে দীর্ঘসূত্রিতা, সর্বশেষ শুধুমাত্র একজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করা প্রতিবাদী জনতাকে হতাশ করে। কিন্তু আন্দোলন থেমে যায় না । শুরুহয় আন্দোলনের নতুন এক পর্যায় যেখানে আইনের লড়াই আর পথের লড়াই পরস্পরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। মহামান্য বিচারক তাঁর রায়ে উল্লেখ করেছেন, “কলকাতা পুলিশের তদন্তকে অন্ধভাবে অনুসরণ করেছে সিবিআই।” বিচারক তাঁর রায়ের ছত্রেছত্রে সিবিআই তদন্তের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতাকে উল্লেখ করেছেন। প্রমাণ লোপাটের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া টালা থানার ওসি’র বিরুদ্ধে সিবিআই অতিরিক্ত চার্জশিট জমা না দেওয়ায় জামিন পান তৎকালীন টালা থানার ওসি অভিজিৎ মন্ডল। অভয়ার মা-বাবা’র অনমনীয় লড়াই, জুনিয়র চিকিৎসক এবং অভয়া মঞ্চে’র নিরলস আন্দোলনের ফলে কলকাতা উচ্চ আদালতে নতুন করে মামলা শুরু হয়। আবার মানুষ আশাবাদী হচ্ছেন, রাজ্য জুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে অভয়া মঞ্চ। আজও ধিকি ধিকি করে সে আগুন জ্বলছে, শাসক চাইলেও আগুন নিভতে দেয়নি এই মঞ্চ। অপরাধীদের পরিত্রাতা শাসকের বিনিদ্র রজনী দেখতে চাই আমরা। অভয়া মঞ্চ শেষ বিচার দেখেই ছাড়বে।
রাজনৈতিক কিন্তু অদলীয় অভয়া মঞ্চের রাজনীতি একটাই – এক ভয়হীন সমাজের নির্মাণ যেখানে আর কোন অভয়া হতে দেব না আমরা। নারী সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য নিয়ে যে কোন অনাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করবে অভয়া মঞ্চ। রাজ্যের বেহাল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মূলে যে ব্যবস্থা কাজ করছে তার উৎপাটনই আমাদের লক্ষ্য।
তাই প্রতিটি দিনই আমাদের অভয়াযাপন, অভয়াস্মরণ। তবু প্রতিমাসের ৯তারিখ অভয়া’কে বিশেষ ভাবে স্মরণ করি আমরা। ৯আগস্ট, ২০২৪ থেকে আজ পর্যন্ত অভয়া হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যে প্রতিষ্ঠানের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তা হচ্ছে টালা থানা। পোস্টমর্টেম এর আগে পরে, সমস্ত ক্ষেত্রেই এই থানার ভূমিকা সিবিআই তদন্তে বারবার উঠে এসেছে। তৎকালীন ওসি-র হস্তক্ষেপ এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। তাই আমাদের টালা থানা অভিযান।
আপনাদের সকলকে আহ্বান আবার জনগর্জনে ভরিয়ে তুলুন সারা বাংলাকে অভয়া’র ন্যায় বিচারের দাবিতে। কবিগুরুর ভাষায় ‘লোকভয়, রাজভয় মৃত্যুভয়’ তুচ্ছ করে আমরা যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি –
“অনন্ত আকাশে,
উদার আলোক-মাঝে, উন্মুক্ত বাতাসে।”










