সাময়িকপত্র তো সবসময়ই সমকালীন। তবে এই দ্রোহকালের সময়ে বোধহয় সেটা আরও সত্যি হয়ে উঠেছে। অভয়ার খুন এবং নির্যাতনের প্রতিবাদে যে লড়াই গত একবছর ধরে দিকে দিকে চলছে তার ছবি তুলে ধরেছে বিভিন্ন সাময়িকপত্র। আজ হাতে আসা সেরকমই এক সাময়িকপত্রের কথা সংক্ষেপে তুলে ধরব যা এই দ্রোহকালকে লিপিবদ্ধ করে রেখেছে।
সাউথ কলকাতা সোসাইটি ফর এমপাওয়ারমেন্ট অফ উইমেন-এর মুখপত্র সিউ। আর সেই পত্রিকার ১৫ নম্বর বুলেটিনের বিষয় দ্রোহকাল: রাতদখলের মেয়েরা। প্রথম লেখা বিশিষ্ট সাংবাদিক স্বাতী ভট্টাচার্যের। আন্দোলনের নির্মাণ শিরোনামে তিনি স্পষ্ট লিখেছেন, “অভয়া তথা তিলোত্তমার বিচার চেয়ে আন্দোলনের যে দিকটা সব চাইতে বেশি আলোচিত, তা হল সরকারের কর্তব্যচ্যুতি, এমনকি বিচারের রাস্তা রোধ করে দাঁড়ানোর নানা লক্ষণ। আর সেইসঙ্গে সব ধরনের কর্মক্ষেত্রে ‘থ্রেট কালচার’ তৈরি করে রাখার প্রবণতা, যা সব নারী পুরুষকে বিপদে ফেলে, তবে মেয়েদের বিশেষ করে বিপন্ন করে।” তিনি সরকারের অসংবেদনশীল আচরণকে তুলে ধরেছেন। দেখিয়েছেন, অভয়ার ন্যায়বিচারের পক্ষে না থেকে সরকার অভিযুক্তদেরই সব সময় আড়াল করতে চেয়েছে। তবে নেতিবাচকতা নয়, তিনি আন্দোলনের অপার সম্ভাবনার কথাই বলেছেন। তাঁর ভাষায়, “ ‘কিছুই হল না’ যারা বলবে, তাদের অনেকে আসলে কিছু হওয়াকে ভয় পায়। কী হচ্ছে, কেমন করে হচ্ছে, কেমন করে মেয়েতে-মেয়েতে ব্যক্তিগত পরিচয় হয়ে উঠছে নাগরিক আন্দোলন, তা পর্যবেক্ষণ করছে ইতিহাস।”
এই আন্দোলন আমাদের ইতিহাস অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত করেছে। উৎসা সারমিন রাতদখলের পাঁচদশক শিরোনামে ১৯৭৫-এ ফিলাডেলফিয়া রাত দখলের কথা বলে তারপরের পঞ্চাশ বছর ধরে বিভিন্ন রাত দখলের ইতিহাস পর্যালোচনা করেছেন।
প্রতিভা সরকার রোজকার ঘটে চলা ঘটনার প্রেক্ষিতে সমাজে নারী অবমাননার ছবি তুলে ধরেছেন। শতাব্দী দাস রাত দখলের লড়াই প্রসঙ্গে লিঙ্গ রাজনীতির কথা এনেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, নারী ও প্রান্তিক লিঙ্গযৌনতার মানুষের মর্যাদা ও সুরক্ষা নিয়ে মূলধারার আন্দোলনকারীরা কি আদৌ আগ্রহী? তাঁর মন্তব্য: “এই বিরাট কর্মকাণ্ডকে সামগ্রিকভাবে পরিচালনা করার দক্ষতা কোনও দলীয় আন্দোলনকর্মীর মধ্যেই দেখছি না। মনে করছি, এ পথ নতুন।” যাঁরা মনে করছেন এই জ্বলে ওঠা তাৎক্ষণিক তাঁদের উদ্দেশে তাঁর বক্তব্য, “জ্বলে ওঠা সাময়িকই হয় চিরকাল। কিন্তু আগুন বাঁচিয়ে রাখাই চুল্লির বেঁচে থাকার প্রমাণ।”
সেজন্যই বোধ হয় অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায় এই রাতদখলের আন্দোলনকে ‘এক দীর্ঘস্থায়ী লংমার্চ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একই কথা বলেছেন সরিতা আহমেদ; আসলে এই দ্রোহের উৎসবটি একটি লম্বা কর্মসূচি যার শুরু আছে, শেষ নেই। এই লড়াইয়ে কিভাবে সেকালের অভয়ারা সাহস দিচ্ছেন তা তুলে ধরেছেন অপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি লিখেছেন, স্লোগানে, পোস্টারে বিশেষভাবে কয়েকজনের নাম ফিরে আসছে আন্দোলনের শুরু থেকেই – কাদম্বিনী, রোকেয়া ও প্রীতিলতা। এঁদের নাম যেসব স্লোগানে উচ্চারিত হচ্ছে তার বয়ান মোটামুটি এই রকম – কাদম্বিনী/ রোকেয়া/ প্রীতিলতার এই মাটিতে/ বাংলায় ধর্ষকদের ঠাঁই নাই। বোঝাই যাচ্ছে, আন্দোলনকারী নবীন ডাক্তারবৃন্দ এবং সামগ্রিকভাবে নাগরিক সমাজ কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে বাঙালির আদর্শ বা আইকন হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে, সসম্মানে উপস্থাপিত করছে। লেখিকার উপলব্ধি, স্বাধীনতা–উত্তর বাংলায় এর আগে আর কোনও গণআন্দোলনে এঁদের নাম উচ্চারিত হয়েছে কিনা জানিনা তবে এটা অনস্বীকার্য যে বাঙালি এঁদের এতদিন ভুলে ছিল।
এই সংকলনের বৈশিষ্ট্য, সমাজের নানান পেশার, নানান অংশের মানুষের লেখা। ফলে একটা বহুমাত্রিক ভাবনার পরিচয় মেলে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ পড়তে গিয়ে। সাংবাদিক, অধ্যাপক, গবেষকদের পাশাপাশি রয়েছে চিকিৎসক আক্টিভিস্টের লেখা। রুমেলিকা চলমান চিকিৎসক আন্দোলনের পরিচিত নাম। তিনি লিখেছেন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা। শেষে মেলে এক বড় ভাবনার পরিচয়, যখন পড়ি: মহিলাদের কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা এবং সম্মানের দাবি শুধু ডাক্তারি পেশাতেই সীমাবদ্ধ নয়, প্রতিটি পেশার ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। আশা রাখব এই আন্দোলন যেন প্রতিটি মানুষের সমানাধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নকে সুরক্ষিত করতে পারে।
সেকথাই অন্য ভাষায় লিখেছেন মোনালিসা পাত্র। তাঁর মতে, আন্দোলনের পথে আলো জ্বেলেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে। কয়েকটি প্রশ্ন তুলে সেগুলোর উত্তর খুঁজতে চেয়েছেন তিনি। প্রশ্নগুলো জরুরি। এই আন্দোলন কি অরাজনৈতিক? এই লড়াই কি পুরুষের বিরুদ্ধে নারীর? তবে কি কিছুই বদলাবে না? শুরু কোথা থেকে করব? বিচার কার কাছে চাইছি? আর কী হবে এর বিচার?
রাতদখলের লড়াইয়ের প্রেক্ষিতে অন্য লড়াইয়ের বিষয়ও উঠে এসেছে পত্রিকায়। সব মিলিয়ে বলতেই হয়, সমকালীন লড়াইকে নথিবদ্ধ করেছে এই সাময়িকপত্র, যা ভাবীকালের লড়াইকে পথ দেখেবে, প্রেরণা দেবে।
সিউ পত্রিকা
দ্রোহকাল: রাতদখলের মেয়েরা
বুলেটিন ১৫, ডিসেম্বর ২০২৪।
সম্পাদক: আফরোজা খাতুন।
সাউথ কলকাতা সোসাইটি ফর এমপাওয়ারমেন্ট অফ উইমেন, কলকাতা – ৭০০০৭৫।
মূল্য: ১০০ টাকা।









