ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের বয়ান।
পোস্ট শেয়ার করার অনুরোধ আমি সাধারণত করি না, কিন্তু এক্ষেত্রে কথাগুলো যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় ততোই ভালো – তাই অনুরোধ, সম্ভব হলে শেয়ার করুন।
বয়ানটি পোস্ট হিসেবেও দেওয়া রইল। কপি-পেস্ট করেও ভাগ করে নিতে পারেন।
.
.চিকিৎসক-সংঠন হিসেবে – এবং সচেতন নাগরিকগোষ্ঠীর অন্যতম হিসেবেও – রাজ্যের বর্তমান সরকারের অনেক ক্রিয়াকলাপই আমরা পছন্দ করতে পারি না। স্বাস্থ্যই বলুন বা শিক্ষা, কিংবা নাগরিকের সুরক্ষা বা কর্মসংস্থান – সরকারের চিন্তাভাবনা থেকে কর্মপ্রণালী, সবই এককথায় চমকপ্রদ। তবু, তার মধ্যেও একটি বিভাগ যদি, সামগ্রিকভাবে, সবিশেষ নজরকাড়া পারফরম্যান্স দিয়ে থাকে, তাহলে তা হলো স্বরাষ্ট্র দফতর তথা পুলিশ (যদিও বিভিন্ন বিভাগের প্রশাসনিক কর্তা তথা উচ্চপদস্থ আমলারা তাঁদের কড়া প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলে দিতে পারেন)।
পারফরম্যান্স বলতে কী? বলা যেতে পারে, শাসকদল যে-ধরনের কাজ দেখলে খুশি হয়, সেই কাজগুলো করা।
মানে, শাসকদলের উদ্যোগে/মদতে অপরাধ সঙ্ঘটিত হলে অপরাধের তদন্ত না করা। তদন্ত হলে পাছে শাসকদল বিপাকে পড়ে, প্রমাণ লোপাট ইত্যকার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সে সম্ভাবনা শুরুতেই নির্মুল করা।
এবং পাশাপাশি, যাঁরা শাসকদলকে কোনও না কোনও ভাবে অস্বস্তিতে ফেলছেন, তাঁদের কারণে-অকারণে থানায় ডেকে পাঠানো। ক্ষেত্রবিশেষে তাঁদের মিথ্যে মামলায় জড়িয়ে দেওয়া। অনেকসময় মারধর হুমকি ইত্যাদিও। (আস্তিনে আরও কী কী তাস লুকোনো রয়েছে, তা অবশ্য এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।)
এই রাজ্যের পুলিশ হিসেবে কর্মরত যাঁরা, তাঁরা সবাই শাসকদলের তাঁবেদারি করছেন বা দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে উঠেছেন, এমন কখনোই নয়। একান্তে কথা বলতে গিয়ে অনেক পুলিশকর্মীই এবিষয়ে নিজেদের হতাশা বা বিরক্তি ব্যক্ত করেন – সম্ভবত পুলিশের মধ্যে এমন মানুষের সংখ্যাই বেশি – কিন্তু উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপে তাঁরা বিশেষ কিছু করতে পারেন না, উপরন্তু উত্তরোত্তর সামাজিক সম্মানহানির গ্লানিতে তাঁরা আরও হতাশ হয়ে পড়ছেন। পুলিশকর্মীদের বড় অংশের এই অকারণ অসম্মান, হতাশা, ও অসহায়তা অনুভব করার পরও এটুকু দৃশ্যমান, যে, বিগত বছরকয়েকে রাজ্যের পুলিশ শাসকদলের তল্পিবাহক ও যাবতীয় কুকর্মের সহযোগীতে পরিণত হয়েছে।
অভয়ার খুন-ধর্ষণ ও তৎপরবর্তী ঘটনাক্রম লক্ষ করুন। তদন্ত কী হয়েছে, কীভাবে হয়েছে – সবাই জানেন। ক্ষোভের আগুন কতখানি তীব্র ছিল, প্রতিবাদ কতখানি জোরদার ছিল – সে-ও সবাই জানেন। তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এবং আন্দোলন প্রতিহত করার ক্ষেত্রে পুলিশের অতি-সক্রিয়তার খবরও অনেকেই অল্পবিস্তর রাখেন। কাজেই কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।
কিন্তু এটুকু মনে করানো যাক, পুলিশের অতিসক্রিয়তা তথা প্রতিহিংসাপরায়ণতা এখনও স্তিমিত হয়নি। এই গত সপ্তাহেই অভয়া-আন্দোলনের দুই পরিচিত মুখ, তাঁদের ডেকে পাঠানো হয়েছিল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। ঠাকুরপুকুর থানায়। এই সপ্তাহে একইধরনের ডাক পেয়েছেন চিকিৎসক-আন্দোলন তথা অভয়া-আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় কিছু চিকিৎসক। কেউ ডাক পাচ্ছেন বউবাজার থানায়, কেউ হেয়ার স্ট্রিট থানায়, কেউ বা অন্য কোনও থানায়। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাক পড়েছে জুনিয়র ডাক্তারদের মধ্যে অতিপরিচিত কিছু মুখেরও। এমনকি এমবিবিএস পঠনরত ছাত্রদেরও থানায় ডেকে পাঠানো চলছে।
তো সন্ত্রস্ত করে রাখার এই পুলিশি রাজ নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই, বোঝানোরও নেই। সবাই এককাট্টা হয়ে রুখে না দাঁড়ালে “থ্রেট কালচার” যে ‘চলছে, চলবে’ – সরাসরি কিংবা প্রকাশ্য মুখাবয়বটুকু সামান্য বদলে, অথবা মুখোশের অন্তরালে – সেই খবরটুকুই জানালাম।
যে পুলিশ বিদেশে গবেষণারত এক কৃতী ছাত্রকে, দেশে অনুপস্থিত থাকলেও দূর থেকে মন্ত্রীমহোদয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে, দিল্লি বিমানবন্দরে গিয়ে গ্রেফতার করতে পারে – ছাত্রটিকে একেবারে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী হিসেবে দাবি করতে পারে – সেই পুলিশ যে কতখানি নির্লজ্জ মিথ্যেবাদী প্রতিহিংসাপরায়ণ ও হিংস্র হতে পারে, সে কথা, আশা করি, মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
শুধু মনে করিয়ে দিই, মুখ বুজে থাকলেই বা “সাতেপাঁচে না জড়িয়ে” থাকতে চাইলেই বেঁচে যাবেন, এমন কিন্তু নয়। উচিত-অনুচিতের বোধহীন অন্ধ হিংস্র পুলিশ গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক – সুতরাং যেকোনও শান্তিপ্রিয় সাধারণ নাগরিকের পক্ষেও বিপজ্জনক। আর পাঁচজনের কথা যদি না-ও ভাবেন, অন্তত নিজের বা নিজের সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে, নিতান্ত ব্যক্তিস্বার্থে হলেও, প্রতিবাদটা করুন। করুন এখনই। কে বলতে, এরপরের ডাক হয়ত আপনার? তখন কিন্তু সময় বা সুযোগ কোনোটাই থাকবে না।











