মরিশাস ভ্রমনের চতুর্থ দিন এক কান্ড ঘটলো। যে বাড়িতে ছিলাম, তাঁরা নিতান্তই ধর্মপ্রাণ, অতিথিবৎসল। ভারতীয় না হয়েও তাঁরা প্রবল ভাবে ভারতীয় ভাবধারার পূজারী। ফলে মনে ধরেছিলো বেশ। চতুর্থদিন যখন উনাদের বাড়ি থেকে গ্র্যান্ড বে পরিদর্শনে বেরোনোর উদ্দেশ্যে নিজেদের ভাড়া করা গাড়ি উনাদের গ্যারেজ থেকে বের করছি, বাড়ির মালকিন সীতা রামকুরুন করুণ মুখে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, আপনারা তো ডাক্তারবাবু। আমার স্বামী আজ একমাস ধরে ঘরবন্দী। পাঁজরের একটা ব্যথায় এক্কেবারে কাবু। এখানে তিনজন চিকিৎসককে দেখানো হয়েছে। যদি কিছু মনে না করেন, একটিবার দেখে দেবেন?
ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধানই ভাঙবে। চিকিৎসকস্বত্ত্বাও তাই। ফলে না বলে বেরিয়ে আসার জো নেই। সঙ্গী শাওনদাও চিকিৎসক। দুজনে মিলে গাড়ি থেকে বেরিয়ে নিচতলায় উনাদের বৈঠকখানায় গিয়ে বসলাম। ভেতর থেকে বিশালবপু পরমেশ্বরবাবু অতিকষ্টে বেরিয়ে এসে আমাদের টেবিল ঘিরে থাকা চেয়ারগুলোর একটিতে কোনোমতে বসলেন। পরিষ্কার হিন্দিতে বললেন “ডাক্তারসাব, বহত দর্দ হো রাহা হ্যায়”। হাতে থাকা প্রেসক্রিপশনগুলোতে চোখ বুলিয়ে দেখলাম ব্যাথার ওষুধ দিয়েছেন চিকিৎসক শিবনারায়ন জি। এরপর চিকিৎসক সুখসাগরজি ডিক্লোফেনাক গ্রুপের এক ইঞ্জেকশনও দিয়েছেন। আর এক চিকিৎসক হৃদযন্ত্রের গন্ডগোল ভেবে বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা করিয়েছেন বটে। কিন্তু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ‘খাড়া বড়ি থোড়’। রিপোর্ট নরমাল। ব্যথা বাগে আসেনি।
বিশালবপু পরমেশ্বরবাবুকে উনাদের বিছানায় শুইয়ে ডানদিকের পাঁজরে যে জায়গায় ব্যথা অনুভব করছেন, সেইখানে চাপ দিয়ে জোরে শ্বাস নিতে বললাম। অর্ধেক শ্বাস নেওয়ার পরেই ভদ্রলোক যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠলেন।“শ্বাস লেনে সে ভি দর্দ হো রহা হ্যায় ডাক্তারসাব”।
জিজ্ঞেস করলাম একমাস আগে যখন থেকে এই ব্যথা শুরু হয়েছিলো তার আগে কোনো ঘামঝরানো খাটাখাটনি করেছিলেন কিনা? ভদ্রলোক খানিক ভেবে বললেন, সেদিন উনাদের গাড়ির স্টেপনি চেঞ্জ করতে গিয়ে লিফটিং জ্যাক আটকে গেছিলো বলে গাড়ি ধরে বেশ কয়েকবার ঝাঁকুনি দিয়ে লিফটিং করতে হয়েছিলো। তারপর থেকেই এই ব্যথার শুরু।
পূনরায় আগের দেখা চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন ও রিপোর্টগুলোয় চোখ বোলালাম। চেস্ট এক্সরে নরমাল। কোনো পেরিকার্ডিয়াল বা প্লুরাল সমস্যা নেই। স্লিপিং রিবও নেই। ইসিজিতে কোনোরকম সমস্যাও নেই। শুধু চার ও পাঁচ নম্বর রিবের স্টারনাল জয়েন্টে ব্যথা। অর্থাৎ কিনা ককস্টোকন্ড্রাইটিস। চিকিৎসার স্বাভাবিক নিয়মেই চিকিৎসকেরা এন.এস.এ.আই.ডি গ্রুপের ব্যথার ওষুধ দিয়েছেন। কিন্তু কমেনি। ভদ্রলোক হাইপোথাইরয়েডিজমের রোগী। সাথে ভিটামিন ডি বেশ কম।
চিকিৎসা বেশ সহজ। এন.এস.এ.আই.ডি গ্রুপের ব্যথার ওষুধের সাথে একটু পেশি শিথিলকারী ওষুধ যোগ করলেই হলো। কিন্তু মুস্কিল হলো মরিশাসে পেশি শিথিলকারী ওষুধ পাওয়া যাবে কিনা কে জানে? অগত্যা নিজের ব্যাগ হাতড়াতে শুরু করলাম। ট্রাভেল ব্যাগের প্রয়োজনীয় ওষুধের খোপে পেয়েও গেলাম একটা। ভদ্রলোককে খেতে দিলাম। সাথে একটা অ্যান্টাসিড ও ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট। সঙ্গে শিখিয়ে দিলাম ব্রিদীং এক্সারসাইজের কৌশল।
এরপর ক্যাপ-মালহেরক্স চার্চের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম আমরা। ঘন্টা চারেক পরেই সীতা ম্যাডাম ফোন করলেন। বললেন একমাসের ব্যথা এই ঘন্টা চারেকের মধ্যেই উধাও। কি বলে যে ধন্যবাদ দেবেন ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। আমাদের সেদিন মন্ট চইজি-তে থাকার কথা ছিলো। কিন্তু উনি কিছুতেই আর একবার উনাদের আতিথেয়তা না গ্রহণ করে যেতে দেবেন না। অগত্যা গোধূলি বেলার মন্ট চইজি সমুদ্রতীরের সৌন্দর্য উপভোগ করে ফিরে এলাম উনাদের বাড়িতে। পরের দুদিন উনাদের বাড়িতে রাখলেন। যত্ন করে খাওয়ালেন। ভারতপ্রেমী আরও কয়েকজনকে ডেকে বলিউডের গান বাজনার আসর বসালেন। পরিশেষে দুবছর বাদে উনাদের ছেলের বিয়ের আগাম নিমন্ত্রণ জানিয়ে সজলচক্ষে বিদায় দিলেন।











