প্রতিবেদকের সামান্য কথাঃ পড়াশুনার সময় পড়াশুনা করা হল না। অনিশ্চিত জীবন ছেড়ে অনেক বিলম্বে কর্মজীবনে প্রবেশ। চাকরির সুবাদে জেলা থেকে জেলান্তর। উত্তর, দক্ষিণ ও রাঢ় বাংলা এবং জঙ্গল মহলের অনন্যসুন্দর নিসর্গ, প্রকৃতি, ঋতু, নদী – পাহাড় – জঙ্গল, গ্রামজীবন, জনসমাজ, কৃষি চক্র, লোক সংস্কৃতি এত ভাল লেগে গেল যে চাকরিতে উন্নতির কোন চেষ্টাই হলনা পাছে কোন শহুরে মরুভূমির কোন বহুতলের শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে যাওয়া হয়। তবে সব আকর্ষণ, এমনকি অপরূপ তরাই – ডুয়ারস আর পুরুলিয়া কেও ছাড়িয়ে গেল দখিনের সুন্দরবনের বাদাবন। ছোটবেলা থেকে সেখানকার নানারকম গল্প বিশেষ করে সেখানকার অদ্বিতীয় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের গল্প শুনে প্রবল কৌতূহল ছিল। পরে সেখানে বেড়াতে গিয়ে সেখানকার গা ছমছমে জঙ্গল আর বুক কাঁপানো নদীগুলো কে দেখে কৌতূহল আরও বাড়ে। কর্মসূত্রে যখন সেখানে উপস্থিত হলাম, তখন ধীরেধীরে সেখানকার কষ্টকর অথচ রোমাঞ্চকর জনজীবনে সংপৃক্ত হলাম।
সপ্তাহে তিন – চারদিন শেষ রাতে উঠে গাড়ি নিয়ে চলে যেতাম ক্যানিং, বাসন্তী ছাড়িয়ে গদখালিতে সুন্দরবনের অন্যতম মহানদী বিদ্যার ঘাটে। তারপর নদীপথ ধরে জঙ্গল অধ্যুষিত গোসাবা ব্লকের আনাচে কানাচে। কখনও বা পদ্মেরহাট, জয়নগর, জামতলা হয়ে সুন্দরবনের অপর মহানদী মাতলা তীরের কৈখালি, তারপর কুলতলি, ভুবনেশ্বরী হয়ে মহানদী ঠাকুরান নদীর পাড়ে শেষ গ্রাম কিশোরীমোহনপুরে যেখানে বাঘ বিপাকে পড়ে নারকেল গাছের মাথায় উঠেছিল এবং নদীপাড়ে আলপথে প্রাতঃভ্রমণের সময় একদিন আমাদের চমকে দিয়ে প্রায় দশ ফুটের এক হৃষ্টপুষ্ট দাঁড়াশ সাপ পায়ের সামনে দিয়ে রাস্তা পার হয়েছিল। অথবা উস্তি, নিশ্চিন্দিপুর, কাকদ্বীপ হয়ে পাথরপ্রতিমা বা নামখানা অথবা মথুরাপুর। শ্রমজীবী হাসপাতাল প্রমুখের সূত্রে আগেই যাতায়াত ছিল সন্দেশখালি, হিঙ্গলগঞ্জ। কখনও বেশি রাতে ফিরতাম, কখনও কয়েকদিন থেকে যেতাম সুন্দরবনের গ্রামে আবার কখনও লঞ্চের মধ্যে রাত্রিবাস গভীর অরণ্যে। কারণ ততদিনে বাদাবনের নেশা পেয়ে বসেছে।
মাত্র কয়েকটি টুকরো ছবিঃ দাঁড়িয়ে আছি বাসন্তীর ঝড়খালি টাইগার রেসকিউ সেন্টার এবং ঘন ম্যানগ্রোভ ভরা জলাভূমি ছাড়িয়ে রুপোলি হেড়োভাঙ্গা নদীর পাড়ে। এত রূপসী নদী জীবনে দেখিনি। পূবে বিদ্যা পশ্চিমে মাতলা দুই মহানদীকে মিলিয়েছে এই নদী। জোয়ার ভাটা সহ ভাল স্রোত খেলে এই নদীতে। নদীর ওপাড়ে হেড়োভাঙ্গার বাঘের জঙ্গল স্পষ্ট প্রতীয়মান। তেনারা প্রায়শই রাতে খাদ্যের সন্ধানে নদী সাঁতরে এপাড়ে চলে আসেন। শীতের বিকেল। অস্তগামী সূর্যের লাল আভা নদীর রুপোলি জলে মিশে বর্ণচ্ছটা সৃষ্টি করেছে। আস্তে আস্তে আলো কমে আসছে, একটু পরে ঝপ করে সন্ধ্যে নামবে। হঠাৎ নিস্তব্ধতা চিরে ওপাড়ের জঙ্গল থেকে ভেসে এল এক ভয়ঙ্কর বাঘের গর্জন। স্থানীয়দের লব্জে দখিন রায়ের হাঁকারি। যে কখনও এই বাজখাই আওয়াজ না শুনেছে সে এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারবে না। ভয়ের এক ঠাণ্ডা স্রোত মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে গেল। আমরা তাড়াতাড়ি প্রস্থান করলাম।
গোসাবার বালির দ্বীপের একটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে স্বাস্থ্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ শেষ হতে হতে দুপুর তিনটে। সামান্য টিফিন করে এবার ফিরব। প্রথমে ভ্যানো করে ইটের রাস্তা, তারপর অনেকটা হেঁটে কাদাভেঙ্গে, তারপর একটা কাঠের পাটাতন বেয়ে বিদ্যা নদীতে নোঙর করে থাকা লঞ্চে। কি একটা উপলক্ষ ছিল, তাই বিএমওএইচ সাহেব লঞ্চে করে বিদ্যা, গোমর, পীরখালি, হেড়োভাঙ্গা আর মাতলা নদীর সঙ্গম পঞ্চমুখীর কাছাকাছি বিদ্যার অপর পাড়ে সুন্দর একটা চরের কাছে নিয়ে গেলেন। সেখানে নোঙর ফেলে লঞ্চের মধ্যেই উপাদেয় ভোজনের ব্যবস্থা হল। খেতেখেতে একজন প্রৌঢ় স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী সুন্দরবনের বাঘের গল্প শুরু করলেন। তার বলার দক্ষতায় সকলে মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছিলেন। কাছেই বাঘের জঙ্গল আর লাগোয়া চর ভর্তি দেড় মানুষ সমান হোগলা, নল খাগড়া আর শনের বন। তিনি বলে চলেছেন, “বাঘ যাকে তাক করবে, তাকে ধরবেই। ওদের চোখে জাদু আছে। যার দিকে তাকাবে সে ভেবলে যাবে, নড়াচড়া করতে পারবে না। বাঘ এক লাফে তার ঘেটি ধরে তুলে নিয়ে যাবে।“ একটু থেমে, “ ধরুন সামনের এই ঘাস বনে একটা বাঘ লুকিয়ে আপনাকে নজর রাখছে – “ সবাই নড়েচড়ে বসলেন।
গোসাবা হাসপাতাল ঘাট থেকে চলেছি প্রান্তিকতম ছোট মোল্লাখালি হাসপাতালে। বিদ্যা নদীর উজান বেয়ে একেবেকে কচুখালির বাঁকগুলো পেরিয়ে। ডান তীরে ঘন জঙ্গল, সবই প্রায় একরকম দেখতে। বামদিকে মাঝেমাঝে লোকালয়। সারেঙের পাশে বসে আমিও কিছুক্ষণ লঞ্চ চালিয়েছি। বর্ষাকাল, কালো মেঘ করে ঝেঁপে বৃষ্টি নামল। দুদিকে ঝাপসা দৃশ্যমানতার মধ্যে প্রকৃতির এক অন্যরূপ। উড়ুক্কু মাছের কথা শুনেছিলাম। অবাক হয়ে দেখতে পেলাম লঞ্চের দুপাশে ট্যাংরা জাতীয় মাছ ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে। বৃষ্টির আনন্দে বোধহয় ওরা লাফিয়ে চলেছে, মনে হচ্ছে উড়ছে। কম আলোয় অভিজ্ঞ সারেংও পথ হারিয়ে ফেললেন। খাঁড়ির পর খাঁড়ি পেরিয়ে গোলকধাঁধা থেকে যত বেরোতে চান তত গভীর অরণ্যে ঢুকে পড়েন। সবাই খুব উদ্বিগ্ন। ঘেমে নেয়ে পাক্কা আড়াই ঘণ্টা বহু কসরত করার পর দূর থেকে যখন সাতজেলিয়ার ঘরবাড়ি আবছা দেখা গেল তখন সবাই হাফ ছেড়ে বাঁচলেন।
গোমর নদী পেরিয়ে সজিনা নদী ধরে দয়াপুর, হ্যামিল্টন আবাদ, সাধুপুর হয়ে লাহিড়ীপুরের একটা খালে ঢুকেছি। এটি শেষ লোকালয়, এরপর বাঘের জঙ্গল। দুপুর গড়িয়ে গেছে। একসময় খালের পাড়ে একটা ভাঙ্গাচোরা কুঁড়েতে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রর রঙচটা হোরডিং দেখে নামলাম। আমাদের আকস্মিক আগমন। আর এসব জায়গায় বাইরে থেকে কেই বা আসে? কিন্তু উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ঢুকে আশ্চর্য হলাম। বিদ্যুৎ নেই। আধো অন্ধকারে এক সুশ্রী তরুণী স্বাস্থ্য কর্মী তার নির্ধারিত পোশাক পরে নিবিষ্ট মনে গ্রামবাসীদের চিকিৎসা পরিষেবা দিচ্ছেন, শিশুদের যত্ন করে টিকা দিচ্ছেন। সেদিন সাক্ষাৎ সরস্বতী দর্শন হয়েছিল।
পাথরপ্রতিমা ব্লকের জি প্লটে সমুদ্পোকূলে অবস্থিত রাজ্যের দক্ষিণতম ইন্দ্রপুর স্বাস্থ্যকেন্দ্র দর্শনের করে নদীপথেই ফিরছি। বিএমওএইচ সাহেব সারেং কে বলে ধনচির বাঘের জঙ্গল দেখাতে নিয়ে গেলেন। বন দপ্তরকে বলে আগেই ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। অনেক কষ্ট করে লঞ্চ ঘাটে ভিড়ল। বন্দুকধারী দুই বনরক্ষী আগে পিছে থেকে জঙ্গলের মধ্যে আমাদের অনেকটা ঘোরালেন। যদিও যথেষ্ট সংশয় ছিল অকস্মাৎ বিপদ লাফ মেরে এলে এনারা গুলি চালানো তো দূরের কথা বন্দুক নামাতে পারবেন তো। যাইহোক একটা সময় তারা আমাদের জঙ্গলের মধ্যে একটা উঁচু টাওয়ারে তুললেন। সময়টা ছিল বসন্তকাল। দুদিকে যতদূর চোখ যায় গরান, গেওয়া, কেওড়া, বাইন, পশুর, হেঁতাল, সুন্দরী, ধুন্দল, গোলপাতা, প্রভৃতি বৃক্ষগুল্মের এই জঙ্গলে যেন আগুন লেগেছে। কচি সবুজ পাতার সঙ্গে হলুদ – কমলা ফুলে ভরা এই ঘন জঙ্গল।
একরাতে কাজ সেরে ফিরছি। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। নদীর মনোরম হাওয়া। লঞ্চের ডেকে বসে আছি। বললাম, “সুন্দরবনের ডাকাতদের সম্পর্কে কিছু বল।“ রঞ্ছন পাশে বসা লঞ্চের মালিক কাম পরিচালক কাদের দার কোর্টে বলটা ঠেলে দিল। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর কাদের আলি তার আত্মজীবনীর কিয়দংশ বলেছিলেন। একসময় কাদের আলি ছিলেন সুন্দরবনের দুর্ধর্ষ ডাকাত সর্দার। প্রচুর ডাকাতি করেছেন। তার দল ছিল সমগ্র অঞ্চলের ত্রাস। ডাকাতি করে সুন্দরবনের গহন অরণ্যে ঢুকে যেতেন, পুলিশ কিছু করতে পারত না। পরে ধরা পড়েন। অনেক কোর্ট কাছারি করে আট বছর জেল খেটে ফেরেন। এখন এই লঞ্চ ভাড়া দিয়ে রোজগার।
আরেকবার রামগঙ্গা ঘাট থেকে ভোরবেলায় মাতলা মোহনার বাঘের ঘাঁটি বনি ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছি। লঞ্চ প্রথমে মৃদঙ্গভাঙ্গা নদী হয়ে লোকালয় পেরিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করল। তারপর একটা বড় বাঁক নিয়ে সুন্দরবনের আরেক মহানদী সপ্তমুখী। দুপাড়ে গভীর ম্যানগ্রোভের জঙ্গল। এই স্রোতস্বিনী বড় নদী পেরিয়ে এই বাঁক – সেই বাঁক, এই চ্যানেল – সেই চ্যানেল পেরিয়ে পড়লাম আরেক মহানদী ঠাকুরান বা জামিরা তেl বিশাল বিশাল ঢেউ লঞ্চ কে দোলাচ্ছিল। আড়াআড়ি নদী পেরিয়ে ঢুকলাম চুলাকাঠির বাঘের জঙ্গলে। সপ্তমুখী, ঠাকুরান, মাতলা – বিদ্যার সাগর সঙ্গমে এই অঞ্চলে গভীর জঙ্গলে ভরা একেকটি বদ্বীপ। আমাদের লক্ষ্য ছিল সেদিনটা কলস দ্বীপ ঘুরে গাজি দ্বীপের ঘাটে রাত্রিযাপন। পথে জঙ্গলের মধ্যে ও নদীর পাড়ে চিতল হরিণ, বুনো শুয়োর, গোসাপ, বাদর, কুমির ও অজস্র পাখি দেখলাম। এক ঝাঁক গাঙচিল তো আমাদের লঞ্চের সঙ্গেই যাচ্ছিল। চুলাকাঠির জঙ্গলে আমাদের বাঘ দেখাতে গিয়ে সারেং একটা সরু খালে প্রবেশ করলেন। দুদিকে নিশ্ছিদ্র জঙ্গল এবং এতটাই কাছে যে দুদিকের হেঁতাল গাছের পাতা লঞ্চে বাড়ি খাচ্ছিল। হঠাৎ ভাটা শুরু হওয়ায় লঞ্চ আটকে গেল। বাঘ দেখতে এসে বাঘের খাদ্য হওয়ার জোগাড়। আমরা ডেক ছেড়ে লঞ্চের ভেতর আশ্রয় নিলাম। কয়েক ঘণ্টা পরে জোয়ার শুরু হতেই লগি ঠেলে সেখান থেকে কোনরকমে নিষ্ক্রমণ।
বিধবাদের গ্রামঃ প্রয়াত প্রাণী বিজ্ঞানী এবং সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ ডঃ কুমুদরঞ্জন নস্কর বড় নৌকায় দুর্গাদুয়ানি নদী দিয়ে আরামপুর, দুলকি ছাড়িয়ে আমাদের নিয়ে চলেছেন সোনাগাঁ য়। তিনি জোগাড় করেছেন প্রচুর জামাকাপড়, সাদা শাড়ি, খাতা – বই – পেন – পেন্সিল, শুকনো খাবার, কিছু সেলাই মেশিন ইত্যাদি। আমরা জোগাড় করেছি কিছু ওষুধপত্র। সোনাগাঁ আসলে বিধবাদের গ্রাম। আরও নির্দিষ্টভাবে বললে বাঘ বিধবাদের গ্রাম। বেশিরভাগ বাড়িতে শুধু মেয়েরা রয়েছেন। পরিবারগুলোর হাতে জমি যৎসামান্য। কিন্তু সেই নোনা জমিতেও কোন চাষ হয়না। বিকল্প কোন রুজি রোজগারের ব্যবস্থা নেই। নদীর অপর পাড়েই জঙ্গল। অপার দারিদ্র আর ক্ষুধার জ্বালা তাই বাধ্য করে মহাজনের কাছে ধার করে নৌকা – জাল নিয়ে বনবিবির পুজো দিয়ে জঙ্গলে ঢুকতে।
জঙ্গলের খাঁড়ি গুলো ভরা মাছ আর কাঁকড়ায়। সেগুলো ধরে আনতে পারলে মহাজনের কাছে বেচে কিছুদিন পেট চলে। কেউ বা জঙ্গলে ঢোকে কাঠ কাটতে বা মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করতে। তাদের অনেকের প্রাণ যায় বাঘের হানায়। নিজেদের ডেরায় জলকাদা মেখে পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকে বাঘ, বোঝা যায় না। জঙ্গলের মধ্যেই হোক বা খাঁড়িতে নৌকায় আচমকা শিকারের ঘাড়ের উপর লাফিয়ে পড়ে তাকে সঙ্গেসঙ্গে কব্জা করে জঙ্গলের মধ্যে নিঃশব্দে টেনে নিয়ে যায়। সুন্দরবনের মানুষও দুঃসাহসী এবং লড়াকু। তারাও হাতের লাঠিসোটা বৈঠা রাম দাঁ নিয়ে লড়ে যায় বাঘের সঙ্গে। অনেক সময়েই আক্রান্তকে উদ্ধার করে নিয়ে আসতে পারে নৌকায়। কিন্তু নদীপথে, তারপর ভ্যান রিক্সা বা গাড়িতে দূরবর্তী গোসাবা বা ক্যানিং অথবা বাঙ্গুর হাসপাতালে তাদের আনার সময় বেশিরভাগ আক্রান্ত অত্যধিক রক্তক্ষরণে মারা যান।
এম আর বাঙ্গুর হাসপাতালে বাঘের আঁচড় কামড় খাওয়া এবং পাথরপ্রতিমা হাসপাতালে নদীতে বাগদা চিংড়ির মীন ধরতে গিয়ে দুপায়ের নিচের অংশ কুমিরে খুবলে নেওয়া রোগী দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে। আর বাঙ্গুর, বারুইপুর, ক্যানিং, গোসাবা, বাসন্তী, কুলতলি, মথুরাপুর, ডায়মন্ডহারবার প্রভৃতি হাসপাতালগুলোতে কালাচ, কেউটে, চন্দ্রবোড়া প্রভৃতি বিষাক্ত সাপের কামড়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে চলা রোগীদের দেখারও দুর্ভাগ্য হয়েছে।
সুন্দরবনের মানুষঃ আমরা সকলেই জানি গঙ্গা – ব্রহ্মপুত্রর মোহনায় এই বদ্বীপ অঞ্চল তুলনায় নবীন এবং এখানেই বিশ্বের অদ্বিতীয় লবনাম্বু উদ্ভিদের গভীর ম্যানগ্রোভ অরণ্য বিদ্যমান যাতে আশ্রয় নিয়েছিল গণ্ডার, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার সহ বহু বন্যপ্রাণ। বাইরে থেকে মানুষ গিয়ে এখান থেকে দামি কাঠ, হোগলা ও গোলপাতা, বেত, উৎকৃষ্ট মধু, প্রচুর পরিমাণে সুস্বাদু মাছ, কাঁকড়া ইত্যাদি নিয়ে আসতেন। শিকারিরা হরিণ, বাঘ ইত্যাদি শিকার করতেন। মুনাফাকারী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রা দেখল বরিশাল, খুলনা, চব্বিশ পরগণার দক্ষিণে অবস্থিত বিস্তৃত সুন্দরবন অঞ্চল থেকে প্রচুর রাজস্ব আদায় করা সম্ভব। ১৭৮৩ তে যশোরের জেলাশাসক হেঙ্কেল সারভেয়ার দের দিয়ে সার্ভে করিয়ে সুন্দরবনের একেকটা অঞ্চলকে লটে বিভক্ত করে বড় জমিদারদের ইজারা দিলেন। তারা ইজারা দিলেন ছোট জমিদারদের, তারা লাটদারদের।
এইভাবে বহু মধ্যসত্বভোগী হয়ে রায়ত, বর্গাদার, ভাগচাষীদের মাথায় শোষণের পাহাড় নামল। তারা অত্যন্ত দক্ষ ও পরিশ্রমী পূর্ব বাংলার চণ্ডাল নমঃশূদ্র, পৌন্ডক্ষত্রিয় প্রমুখ; মেদিনীপুরের মাহিস্য, সদগোপ প্রমুখ এবং সাঁওতাল পরগণা ইত্যাদি অঞ্চল থেকে সাঁওতাল, মুন্ডা প্রমুখ জনজাতি কৃষকদের নিয়ে এসে বাঘ, কুমির, কামোট, বিষধর সাপ, ঝড়ঝঞ্জার মধ্যে কঠোর পরিশ্রমে অনেকটা জঙ্গল হাসিল করে চাষের জমি তৈরি করলেন। এই বঞ্চিতরাই ১৯৪৬ – ’৪৯ এ কাংশারি হালদার প্রমুখের নেতৃত্বে তেভাগা কৃষক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। এদের বংশধররাই বর্তমান সুন্দরবনের প্রধান বাসিন্দা। ড্যাম্পিয়ার আর হজ ১৮২৯ – ’৩০ এ সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে একটা কাল্পনিক লাইন টেনে উত্তরাংশ বসতি ও কৃষির জন্য এবং দক্ষিণাংশ অরণ্যের জন্য বিভাজিত করলেন। ঐ অরণ্য ১৮৭৫ সালে সংরক্ষিত বনে পর্যবসিত হল। ১৯৪৭ এ ভারত ও বাংলা ভাগ হওয়ায় সুন্দরবনের বৃহত্তর অংশ পূর্ব পাকিস্তানে এবং পরবর্তী বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হল। কিন্তু এখানকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগের কিনারা হল না।
সুন্দরবনের বাঘঃ ভারতের অন্যান্য অরণ্যের বাস্তুতন্ত্রের শীর্ষে থাকা প্রবল সাহসী, শক্তিমান, বুদ্ধিমান, ক্ষিপ্র ও সুদর্শন মাংসাশী শিকারি প্রাণী বাঘের সাধারণ চরিত্রগুলো ছাড়াও কঠোর পরিবেশে জীবনধারণের জন্য সুন্দরবনের বাঘ বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। সুন্দরবনের বাঘ অত্যন্ত ধূর্ত, কঠোর পরিশ্রমী, প্রবল শক্তিশালী ও জেদি। এদের রয়েছে প্রখর দৃষ্টি ও শ্রবণ শক্তি এবং ভাল ঘ্রাণ শক্তি। আকারে একটু খর্বকায় হলেও পুরুষ বাঘের দৈর্ঘ্য আট থেকে সাড়ে নয় ফুট, ওজন ১২০ থেকে ১৫০ কিগ্রা। কর্দমাক্ত ঘন জঙ্গলের এবং ম্যানগ্রোভের ধারালো ঠেস মূলের মধ্যে দিয়ে দ্রুত চলাফেরা করতে পারে। দ্রুত সাঁতার কেটে কুমির ও কামোট (এক ধরনের ছোট হাঙ্গর) ভরা খাঁড়ি ও ছোট নদীগুলো তো বটেই বিশাল স্রোতস্বিনী নদীগুলো নিয়মিত পারাপার করে। রায়মঙ্গল নদী পার হয়ে প্রায়শই তাদের ভারত – বাংলাদেশ করতে দেখা যায়। বাঘ দেখতে পেলেই হনুমান, শিয়াল আর কাঁকর হরিণ এবং কিছু পাখি শব্দ করে জঙ্গলের মধ্যে সবাইকে সতর্ক করে। তাই বাঘ লুকিয়ে থেকে অত্যন্ত সন্তর্পণে শিকারের কাছাকাছি পৌঁছে অতর্কিতে আক্রমণ করে শিকার ধরে।
প্রবল জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসে গাছে উঠে এবং সাইক্লোনের প্রবল ঝড়ে গাছের গুঁড়ি ধরে প্রাণ বাঁচায়। প্রতিদিন দুবার করে জোয়ার ভাটায় অভ্যস্ত। সাধারণত হরিণ ও শুয়োর তাদের খাদ্য। খাদ্যের অপ্রতুলতায় অনেকসময় নদী থেকে মাছ ও কাঁকড়া ধরে খায়। খাদ্যাভাবে বাঁদর, গোসাপ, কচ্ছপ ইত্যাদি মেরেও খায়। অনেকসময় বাধ্য হয়ে পশুদের মৃতদেহ খায়। মিষ্টি জলের অভাবে অনেকসময় নোনা জল খেয়ে জীবন ধারণ করে। খুব কষ্ট করে শিকার ও খাদ্য সংগ্রহ করতে হয় তাই তারা শারীরিকভাবে মেদহীন ও অত্যন্ত সক্ষম এবং দুঃসাহসী ও ভয়ানক হিংস্র। মিলনের সময় সংকেত পাঠাতে পাঠাতে এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপ এমনকি উত্তাল নদী পেরিয়ে বাঘিনীর কাছে পৌঁছে যায়। বাঘ – বাঘিনীর সঙ্গমকাল ৩ – ৪ দিন, একত্রবাস ৭ – ১০ দিন। তারপর যে যার এলাকায় ফিরে যায়। ১০৫ দিন গর্ভ ধারণের পর বাঘিনী ২ – ৩ টি শাবক প্রসব করে। বাঘেদের হাত থেকে সদ্যজাতকদের বাঁচাতে বাঘিনী শাবকদের নিয়ে গভীর জঙ্গলে অথবা জঙ্গলের বাইরে লোকালয়ের কাছে চলে আসে। বাঘিনীরা শাবকদের খুব যত্ন করে মানুষ করে এবং প্রশিক্ষণ দেয়। দুই থেকে চার বছরের মধ্যে শাবকেরা বড় হয়ে নিজ নিজ এলাকা গড়ে তোলে। তারা সাধারণত ১০ – ১৫ বছর বাঁচে।
বর্ষায় নদীতে সাঁতার কেটে একইরকম দেখতে দ্বীপগুলোর মধ্যে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যেতে গিয়ে কোন কোন সময় ভুল করে লোকালয়ে চলে আসে। আবার খাদ্যাভাবে কিংবা শিকারে অশক্ত হয়ে পড়লে লোকালয়ে চলে আসে। গরু, ছাগল, কুকুর মেরে খায়। কোন কোন বিশেষজ্ঞ নোনা জল গ্রহণ করার জন্য সুন্দরবনের বাঘ এত হিংস্র মনে করেন। সুন্দরবনের বাঘ সাধারণভাবে মানুষখেকো নয়। ডেরায় পৌঁছে যাওয়া মানুষ শিকার করে খেয়ে তাদের কেউ কেউ মানুষখেকো হয়ে ওঠে। কোন কোন গবেষক মনে করেন যে ১৯৭৯ তে জ্যোতি বসুর বাম সরকার দণ্ডকারণ্য থেকে এসে সুন্দরবনের মরিচঝাঁপি দ্বীপে বসতি গড়ে তোলা পূর্ববঙ্গের দলিত হিন্দু উদবাস্তুদের অমিয় সামন্তের নেতৃত্বে সশস্ত্র পুলিশ এবং গুন্ডা পাঠিয়ে গণহত্যা চালান। সেইসময় লাশগুলো ঝিলা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। সেই মৃতদেহ খেয়ে সুন্দরবনের বাঘ নরখাদক হয়ে ওঠে। ব্যাপক চোরা শিকারের ফলে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা কমে ১০০ – র কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে। লোহার ফাঁদ, আধুনিক অটোমেটিক অস্ত্র এবং মারাত্মক সব বিষ তাদের কাজ সোজা করে দিয়েছে। চোরা কারবারীরা বাঘের ছাল এবং অঙ্গ প্রত্যঙ্গ চিন, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, তাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশে বহু মূল্যে বিক্রি করে।
বাঘে–মানুষে সংঘর্ষঃ ব্যাপক পরিবেশ দূষণের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে এবং ঘনঘন সাইক্লোনের সৃষ্টি হচ্ছে। আয়লা, আম্পান প্রমুখ ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে মানুষ কর্তৃক ক্রমাগত ম্যানগ্রোভ কেটে ফেলায় এবং তার সঙ্গে জঙ্গলে খাদ্য ও মিষ্টি পানীয় জল অপ্রতুল হওয়ায় বাঘেরা অনেক বেশি সংখ্যায় লোকালয়ে চলে আসছে। ঘটছে বাঘে মানুষে সংঘর্ষ। জাল বিছিয়ে বাঘকে আটকে গণ পিটুনিতে মেরে ফেলা হচ্ছে।
আবার অন্যদিকে, নোনা জমিতে চাষ না হওয়া, নিয়মিত ঝড় ও নদী প্লাবন, বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব এবং অপার দারিদ্রের কারণে এই অঞ্চলের সক্ষম পুরুষেরা পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে ভিন রাজ্যে চলে যান। অভাবের সুযোগে নারী ও শিশু পাচার চক্র খুব সক্রিয়। যারা পড়ে থাকছেন পেটের দায়ে তাদের জঙ্গলে ঢুকতেই হয়। দূরত্ব, সময়, অর্থ ও লাল ফিতের কারণে বেশিরভাগের বৈধ পারমিট নেই। আর বৈধ পারমিট থাকলেও তার চারণভূমিতে বাঘ কাউকে রেয়াত করে না। এভাবে জঙ্গলের মধ্যে বাঘের বাসভূমিতে মানুষ বাঘের কাছাকাছি চলে যাচ্ছে। ফলে বাঘের আক্রমণে মারা যাচ্ছেন বহু কাঠুরে, মৌলে, মৎস্যজীবী, মাঝি। দশকের পর দশক এরকম হয়েই চলেছে।
এর বিহিত নিয়ে আমরা যেগুলো ভেবেছি এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে যেগুলো করা সম্ভব ও করা উচিত সেগুলো এখানে আলোচনা করলাম।
বিকল্প ভাবনাঃ
১) সরকারি – বেসরকারি উদ্যোগে স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে যেটুকু বাদাবন রয়েছে সেটুকু সংরক্ষণ এবং প্রচুর পরিমাণে ম্যানগ্রোভ লাগিয়ে অরণ্য বৃদ্ধি ও ম্যানগ্রোভের ঢাল তৈরি করতে হবে। এরসঙ্গে নদী বাঁধ গুলোও ঠিকভাবে মেরামত ও সংরক্ষণ করতে হবে। সুন্দরবনের সংরক্ষণে কেন্দ্র সরকার এবং রাষ্ট্রপুঞ্জকেও যুক্ত করে নিতে হবে।
২) জঙ্গলের মধ্যে হরিণ ও শুয়োরের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে এবং তাদের প্রজননের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়াও জঙ্গলের মধ্যে বেশি করে মিষ্টি জলের পুকুর কেটে চারদিকটা উঁচু করে জল খাওয়ার জায়গাটা মসৃণ করে দিতে হবে। এর ফলে বাঘের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে লোকালয়ে যাওয়া কমবে।
৩) বাঘের জঙ্গলের অপর পাড়ের লোকালয় গুলোতে নদী পাড় উঁচু করে তার উপর শক্ত জাল লাগিয়ে ফেলতে হবে। ঘাটগুলোতে উঁচু লোহার গেট লাগাতে হবে। যাতে গ্রামে বাঘ ঢুকতে না পারে। এর উপর সব জায়গায় বন দপ্তরকে ‘বাঘ বন্ধু’ নিয়োগ করতে হবে যাতে বাঘ – মানুষে সংঘর্ষ না হয়। এরপরও লোকালয়ে বাঘ ঢুকলে বন দপ্তরের তরফ থেকে তাদের দ্রুত ধরে, স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে গভীর জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
৪) নোনা জমিতে উপযোগী চাষ; নোনাজমিতে হয় এরকম ধান, শস্য ইত্যাদি চাষ; নোনা জমির চরিত্র বদলের কৌশল; পুকুর ও ভেড়ি গুলোতে মাছ কাঁকড়া ও চিংড়ি চাষের পদ্ধতি প্রভৃতির প্রশিক্ষণ; রাস্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্ক থেকে কম সুদে ঋণ; পঞ্চায়েত, কৃষি দপ্তর থেকে সুলভে বীজ, চারা, মীন, জৈবিক সার, জৈবিক কীটনাশক ইত্যাদি সরবরাহ করতে হবে। এছাড়াও নারকেল, খেজুর, পান, ফল, ফুল ইত্যাদি অর্থকরী ফসল চাষে উৎসাহিত করতে হবে। এছাড়াও উন্নত জাতের হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল, ভেড়া প্রভৃতির শাবক ও প্রশিক্ষণ দিয়ে পশুপালন, পোল্ট্রি, ডেয়ারি, মৌমাছি পালন প্রভৃতির মাধ্যমে বিকল্প রোজগারের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫) নদীতে কোমর বা হাঁটু ডুবিয়ে মীন ধরা বন্ধ করে গ্রামে ভেড়ি ও জলাশয় প্রস্তুত করে সমবায় করে বাগদা চিংড়ি, ভেটকি, বাসা প্রভৃতি অর্থকরী মাছ চাষে উৎসাহিত করতে হবে।
৬) নানারকম কুটির শিল্পের প্রশিক্ষণ, পুঁজি, কাঁচামাল ও বাজারের ব্যবস্থা করতে হবে।
৭) রেশন, অন্নপূর্ণা যোজনা, বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা, বেকার ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে।
৮) বর্তমান লাগামহীন, বেলেল্লা, ঝুঁকিপূর্ণ পর্যটন নয়, নির্দিষ্ট এলাকা অবধি সংগঠিত ও পরিবেশ বান্ধব পর্যটনের বিকাশ ঘটিয়ে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এইসবের মাধ্যমে স্থানীয়দের সংরক্ষিত জঙ্গলে যাওয়া প্রতিরোধ করতে হবে। এরপরেও কর্মীসংখ্যা বাড়িয়ে, আধুনিক সরঞ্জাম ও জলযানের ব্যবস্থা করে এবং পেশাদারি পরিচালনায় বনদপ্তর কে সংরক্ষিত জঙ্গলে কড়া নজরদারি রাখতে হবে।
৯) সুলভ সোলার প্যানেল (মেরামতির ব্যবস্থা সহ) বসিয়ে প্রান্তিক গ্রাম ও লোকালয় গুলোয় বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে হবে। চিকিৎসা পরিষেবা বৃদ্ধির জন্য সুলভে নৌ এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে।
১০) সুন্দরবনের পরিকাঠামো, নাগরিক পরিষেবা এবং উন্নতির জন্য পরিবেশবান্ধব লঞ্চ, বাস, টোটো সার্ভিস; ঘাট, বাজার ও রাস্তা গুলোর উন্নতি; সুলভ শৌচালয়ের ব্যবস্থা; শিয়ালদা – হাসনাবাদ, শিয়ালদা – ক্যানিং, শিয়ালদা – নামখানা শাখার ট্রেনের সংখ্যা ও যাত্রী পরিষেবা বৃদ্ধি; ক্যানিং – বাসন্তী রেল প্রকল্প দ্রুত কার্যকর করা; ক্যানিং এ মেডিকেল কলেজ স্থাপন; এছাড়াও হাসপাতাল, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, থানা, ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিস, স্কুল, কলেজ, স্টরম ও ফ্লাড সেন্টার প্রভৃতি গঠন, প্রবর্তন ও উন্নতির ব্যবস্থা করা।
১১) সুন্দরবন কে প্লাস্টিকমুক্ত অঞ্চল ঘোষণা করা। পরিবহন ও কৃষিতে কাটা তেল বন্ধ করা। ডিজেলের বদলে ব্যটারি চালিত জলযানের প্রবর্তন। হাতানিয়া – দোয়ানিয়া থেকে গোমর থেকে ঝিলা, সুন্দরবনের সর্বত্র বাংলাদেশী জাহাজ, বারজ ইত্যাদির গমনাগমন নিষিদ্ধ করা। সংরক্ষিত অরণ্যে বন দপ্তর এবং বিশেষ সরকারি কাজে ব্যবহৃত নৌযান ছাড়া সমস্ত যান চলাচল নিষিদ্ধ করা।
১২) রাজ্যের অন্যান্য সীমানার মত সুন্দরবনেও বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ অবিরত। রাজনৈতিক নেতারা এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত পুলিশ, প্রশাসন ও পঞ্চায়েত দশকের পর দশক অর্থ এবং ভোটের বিনিময়ে এই অনুপ্রবেশকে মদত দিয়ে এসেছে। এমনকি বেশ কিছু রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুও চলে এসেছেন। অনুপ্রবেশকারীরা সংরক্ষিত বন এবং ম্যানগ্রোভ কেটে বসতি নির্মাণ করে চলেছেন। বিএসএফ, কোস্ট গারড, রাজ্য পুলিশের আরও ক্যাম্প, সেন্টার, থানা ও স্টাফ বাড়িয়ে; আধুনিক দ্রুতগামী জলযান, সরঞ্জাম ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বাড়িয়ে; সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়ে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, চোরাশিকার ইত্যাদি বন্ধ করতে হবে।











