আর কোন রেড ক্যাটাগরি কারখানা নয় শ্রমনিবিড় গ্রীন ক্যাটাগরি শিল্প চাই স্পঞ্জ আয়রণ, রামিং মাস, ক্রেসার ও সিমেন্ট কারখানার ভয়াবহ দূষণ রোধ ও প্রাকৃতিক সম্পদের লুটতরাজ বন্ধের দাবিতে রঘুনাথপুর মহকুমা দূষণ বিরোধী ও প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা মঞ্চের আহ্বানে ৫ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ শনিবার দুরমুট গ্রাম সংলগ্ন মাঠে অনুষ্ঠিত হল দূষণ বিরোধী নাগরিক সভা।
বর্তমানে দূষণ নামটি শুনলেই আমাদের সকলের মনে এক অস্থিরতার চিত্র ফুটে ওঠে। বর্তমানে পুরুলিয়ায় তা আরও প্রকট রূপ ধারণ করেছে। বিশেষ করে বায়ুদূষণ পুরুলিয়া জেলার রঘুনাথপুর মহকুমায় এতটাই প্রকট হয়ে উঠেছে যে, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। দিনে দিনে তার প্রভাব মানুষের উপর মারাত্মকভাবে পড়ছে। এই দূষণের ফলে নানান রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। এমনকি হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সার পর্যন্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশী স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু এবং বৃদ্ধদের। আমাদের জেলায় এই দূষণের অন্যতম কারণ ২০০র বেশী রেড ক্যাটাগরির কারখানা। যার মধ্যে বেশিরভাগ হচ্ছে দূষণ দানব স্পঞ্জ আয়রন, রামিং মাস, সিমেন্ট ও ক্রেসার কারখানা। আবার এই কারখানার প্রয়োজনীয় সামগ্রী পরিবহনে যথাযথ নিয়ম না মানার জন্য রাস্তার দুপাশে বর্জ্য পড়ে থাকছে, তা থেকে দূষণ ছড়াচ্ছে। এমনকি তার ফলে পথদুর্ঘটনা পর্যন্ত ঘটছে। বর্তমানে রঘুনাথপুর এলাকায় বাতাসের গুণমান সূচক ২০০ (AQI) ছাড়িয়ে গেছে। সবসময় বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে কার্বন ডাই অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড। এছাড়াও অ্যালুমিনিয়াম, কার্বন, লোহা, সিলিকন, ম্যাঙ্গানিজ এবং ক্যাডমিয়াম সহ কপার, নিকেল, জিঙ্কের মত ভারী ধাতুও যা ডাস্ট হিসাবে মিশে থাকে। যা এক কথায় মারাত্মক।
এমনকি যারা এই কারখানাগুলিতে কাজ করেন তাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে থাকে না যথাযথ সুরক্ষা, তাই তারাও আক্রান্ত হয় নানান রোগে। সম্প্রতি একটি কারখানাতেই কাজ করতেন এমন ১০ জনের বেশি সিলিকোসিসের উপসর্গ নিয়ে মারা গিয়েছেন। তিলে তিলে শেষ হয়ে যাওয়া পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা কর্তৃপক্ষ একটু খোঁজ পর্যন্ত নেয়নি। কতটা অমানবিক হলে এহেন আচরণ করা যায়? বর্তমানে সরকারি হিসাবে সিলিকোসিসে আক্রান্তের সংখ্যা ১৬ জন। কিন্তু আমরা মনে করি জেলা জুড়ে এই সংখ্যাটা অনেক। যার জন্য যথাযথ বিজ্ঞানসম্মতভাবে সার্ভে হওয়া প্রয়োজন।
আবার এই ধরনের কারখানা পরিচালনার জন্য প্রচুর পরিমাণে জলের প্রয়োজন হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেই জল ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহার হয়। ফলে কারখানা সংলগ্ন এলাকার ভূগর্ভস্থ জলস্তর নিচে নেমে যায়। ফলশ্রুতিতে একদিকে যেমন পানীয় জলের সংকট দেখা দেয় অন্যদিকে ফ্লুরাইড, আয়রন ঘটিত জল দূষণ দেখা দেয়। যা আমাদের শরীরে মারাত্মক ক্ষতি করে। এমনকি ফ্লোরোসিস রোগ পর্যন্ত দেখা দিতে পারে।
এই ধরনের কারখানা স্থাপনার সময় খানিকটা দূষণ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পরে তা মারাত্মক আকার ধারণ করছে। অনেক ক্ষেত্রে মালিক সর্বোচ্চ লাভের জন্য কোনো ফিল্টার ছাড়াই দূষিত গ্যাস বাতাসে ছেড়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি একটি সিমেন্ট ও একটি স্টীল কারখানা তৈরি হয়। স্থাপনের সময় এলাকার মানুষকে জানানো হয়েছিল যে এগুলো আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে এখান থেকে দূষণ হবে না। এলাকার যুবকদের কর্মসংস্থান হবে। এই প্রতিশ্রুতি কারখানা কর্তৃপক্ষ রাখেনি। এই কয়েকবছরে এলাকার মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। এই ঘটনা প্রায় প্রতিটি কারখানার ক্ষেত্রেই। ফলে বায়ু-জল-মাটি দূষিত হচ্ছে। তার সুদূরপ্রসারী ফল ভুগতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
সম্প্রতি নতুনডি অঞ্চলের হুড়রা, ঝাড়ুখামার, দুরমুট এলাকার জল-বাতাস-জীবন কেড়ে নিতে তৎপর প্রশাসন। সম্প্রতি তড়িঘড়ি উদ্বোধন হয়েছে একটি স্পঞ্জ আয়রন কারখানার। উদ্বোধনের পূর্বে পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য শুনানি (পাবলিশ হিয়ারিং) করতে হয়। কিন্তু আমরা কী দেখলাম পাবলিক হিয়ারিংয়ের নামে হলো প্রহশন। যা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। এলাকার সাধারণ মানুষের বক্তব্য রাখার সুযোগ দিল না। আমাদের প্রশ্ন কেন জনশুনানি প্রকাশ্যে হলো না? এত গোপনীয়তা কেন? পরিবেশগত ছাড়পত্রে কী কোনো আইন লঙ্ঘন করা হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা।
নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে প্রাপ্তবয়স্ক গাছ। গাছ কাটতে বনদপ্তরের অনুমতি বাধ্যতামূলক। বনভূমি দখল করতে গেলে গ্রামের মানুষের সম্মতি নিতে হয় আইন অনুযায়ী। পুকুর, জোড়নদী বুজিয়ে দিতে বা গ্রামের পাশে কোনো কারখানা হলে গ্রামবাসীদের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। ফলে আমাদের প্রশ্ন এই বেআইনি কাজ চলছে কিভাবে? আইন কি শুধু সাধারণ মানুষের মেনে চলার জন্য?
একথা ঠিক কর্মসংস্থানের জন্য শিল্প প্রয়োজন আমরাও তা মনে করি কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করে কি? যথার্থ কর্মসংস্থান হচ্ছে কি? শুধু মালিকের মুনাফা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আর এলাকার মানুষ কী পাচ্ছে? পরিসংখ্যান বলছে সারা বিশ্বে শুধুমাত্র দূষণের প্রভাবে প্রতি বছর প্রায় ৯০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। দূষণের কারণে আমাদের দেশেও প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছেন প্রতি বছর। পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশুই দূষণে আক্রান্ত। অথচ এই দূষণ নিয়ন্ত্রণ বা দূষণ মোকাবিলায় সরকারগুলির ভূমিকা আমরা সকলেই দেখতে পাচ্ছি! কিছু আইন রয়েছে ঠিকই কিন্তু সেই আইনও পদে পদে লঙ্ঘিত হচ্ছে। প্রশাসন এই আইন লঙ্ঘন দেখেও দেখতে পায় না।
এছাড়াও এই পুরুলিয়া জেলার প্রাকৃতিক সম্পদের উপর চলছে লুটতরাজ। চলছে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা, জঙ্গল কাটা, বালি তোলা, জলাশয়ের উপর সোলার প্রজেক্ট, ওপেন মাইনিং করার পরিকল্পনা। এমনকি পুরুলিয়ার ফুসফুস অযোধ্যা পাহাড়ে তথাকথিত উন্নয়নের নামে চলছে জঙ্গল নিধনযজ্ঞ। যা আমাদের সুস্থ পরিবেশকে আরও বিষিয়ে তুলবে। এমতাবস্থায় এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন পরিবেশ সচেতনতা প্রয়োজন, অন্যদিকে প্রয়োজন পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন।
তাই আমরা এই দূষণ দ্বারা ধ্বংসলীলা চলতে দিতে পারি না। আমরা পারি না আমাদের শিশুদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে। তাই আসুন আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ, আমাদের পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনকে জোরদার করে তুলি।
আমাদের দাবি-
১) জনমত উপেক্ষা করে জনবসতির এত কাছে মারাত্মক দূষণ সৃষ্টিকারী (Red/Orange Category) কারখানা করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হবে।
২) ইতিমধ্যে যে সমস্ত স্পঞ্জ আয়রন, রামিং মাস কারখানা রয়েছে বেশিরভাগ কারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণে নেই। এমনকি দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে। সেই সমস্ত কারখানার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩) যথার্থ কর্মসংস্থানের জন্য দূষণমুক্ত ‘গ্রিন ক্যাটাগরি’ পরিবেশবান্ধব শিল্প চাই। বিশেষ করে মহিলাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়-ড্যাম ভিত্তিক পর্যটন কেন্দ্রগুলো এবং জঙ্গলমহলের সংস্কৃতিকে এই বিষাক্ত ধোঁয়া থেকে রক্ষা করতে হবে।
৪) Cumulative Impact Assessment ছাড়া রঘুনাথপুর এলাকায় কোনো কারখানা করা যাবে না। বিশেষজ্ঞ দিয়ে এলাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ Cumulative Impact Assessment এবং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের ওপর সমীক্ষা করতে হবে।
৫) খরাপীড়িত জেলায় পানীয় জলে ফ্লুরাইড দূষণ ও জলসংকট রুখতে স্পঞ্জ আয়রন কারখানায় গ্রাউন্ড ওয়াটার ব্যবহার করা যাবে না। সারফেস ওয়াটার সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
৬) পরিবেশের স্বার্থে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা, জঙ্গল কাটা, বালি তোলা, জলাশয়ের উপর সোলার প্রজেক্ট, ওপেন মাইনিং করা বন্ধ করতে হবে।
৭) পুরুলিয়ার ফুসফুস অযোধ্যা পাহাড়ে তথাকথিত উন্নয়নের নামে ঠুড়গা-বান্দো-কাঁঠালজল পাম্প স্টোরেজ প্রজেক্ট বাতিল করে জঙ্গল নিধনযজ্ঞ বন্ধ করতে হবে।
রঘুনাথপুর মহকুমা দূষণ বিরোধী ও প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা মঞ্চের প্রচার পত্র থেকে নেওয়া।











