কৈলাসে দুদিন ধরে প্রবল চীৎকার শোনা যাচ্ছে নারীকন্ঠের, সঙ্গে ছেলেমেয়েদের কান্নাকাটির আওয়াজ। এমনিতেই মাঝেমধ্যে শিবুবাবুর গাঁজার পরিমাণ বাড়াবাড়ি করলে শিবুর বউ রাগারাগি করে, কোন কোন সময় একটু গলা চড়িয়ে কথা বলে। নেহাত ছেলে মেয়েদের সামনে গালমন্দ করতে পারে না তাই একসময় থেমে যায়। শিবুবাবু তখন গঞ্জিকা সেবন অন্তে ব্যোম হয়ে অন্য মার্গে বিচরণ হেতু এই তীক্ষ্ম বাক্যবাণসমূহ অতি সহজে কর্ণকুহরে প্রবেশ করা নিবৃত্ত করতে পারে। তবে শিবু মানুষটা বড়ই ভালো। ছেলে মেয়েদের প্রত্যেকে শিক্ষিত, নিজের নিজের পেশায় রীতিমতো পারদর্শী। তাদের প্রত্যেকের কদর রয়েছে। ছেলে মেয়েদের প্রতি শিবুবাবুর দায়িত্ব বোধ ও সংসারে তার অবদান নিয়ে বলার সময় উমা তার পরিচিত জনের কাছে প্রগলভ হয়ে ওঠে। সেই নিয়ে অনেকে আড়ালে হাসিঠাট্টা করে, আবার শিবু-উমার সংসার নিয়ে মনেমনে যথেষ্ট ঈর্ষা করে।
ঐ ছেলেমেয়েরা পরিণত বয়সেও সবাই মামাবাড়ি যেতে বড্ডো ভালোবাসে। ওরা বছরে একবার মায়ের সঙ্গে সেই ছোট্ট বেলা থেকে মামার বাড়ি যাবেই। ওখানে দিদিমা মেনকার আদর তো আছেই তার সঙ্গে হাতের রান্না — আহা আহা। কতরকম পদ, কত বিচিত্র তার স্বাদ, সুবাস। মহালয়ার ভোর হবার আগেই সবাই স্নান করে নতুন কাপড় জামা পরে রেডিওতে মহিষাসুরমর্দিনী সঙ্গীতালেখ্য শুনতে বসে যায়। উদাত্ত কণ্ঠের স্তোত্র পাঠ আর মন কেমন করা গান শুনে মনটা আরও আঁকুপাঁকু করে ওঠে। ততক্ষণে ওদের মা উমাও তৈরি। এই সময়ে শিবুবাবুর নেশা উধাও। পত্নী প্রেমে আর অপত্য স্নেহে শিবুবাবুর মন আকুল হয়ে ওঠে। বহু বছর ধরে চলে আসছে। বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য উমার মনটা এমনি অস্থির হয়ে যেত শিবুর সঙ্গে বিয়ে হওয়ার প্রথম বছর থেকেই। তখন তো উমার বাবা নিজে এসে নিয়ে যেত।
তারপর কত বছর কাটলো। একে একে ওরা চারজন কোলে এল। উমার মনে পড়ে মায়ের কত যত্ন করে সপ্তমীর দিন কতরকম মাছ, অষ্টমীতে লুচি ডাল মিষ্টি, নবমীতে মাংস খাওয়ানোর কথা। সন্ধ্যায় শিবু এসে হাজির হত। না, শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সামনে শিবু কোনদিন নেশা করত না। রাত্রে ওর জন্য এক ডেকচি মাংস রাখা থাকতো। শিবু খুশি মনে এক থালা ভাতের সঙ্গে সাবড়ে দিত। তারপর নাক ডাকিয়ে ঘুমাতো।উমা আর মেনকার ঘুম আসতো না। দুজনেরই মন খারাপ। কাল শিবুর সঙ্গে কৈলাসে ফিরতে হবে। আবার সেই একটা বছরের অপেক্ষা।
সেই উমার এবার হলটা কি? পূজোর কেনাকাটা তো প্রায় শেষ। শিবুর জন্য বাঘছাল লোয়ার-এর বদলে খুব ভালো বাটিক প্রিন্টের কাপড় এনেছে উমা তার মেয়েদের সঙ্গে বাজার ঘুরে। উমাকে এবার এক মেয়ে হাল্কা গেরুয়া রঙের বেনারসি শাড়ি এনে দিয়েছে। তার জন্য অন্য মেয়ে, যে আবার পড়াশোনা আর গানবাজনার জন্য বিখ্যাত সে একটু মুখ বাঁকিয়ে হেসেছে। তার বোনের গা জ্বলে উঠেছিল। ঝগড়া বাঁধার আগেই উমা ওদের থামিয়ে দেয়। এরকম ঝগড়া খুনসুটি লেগেই থাকে ওদের। সত্যি বলতে কি উমার খারাপ লাগেনি এবারের শাড়িটা। এর আগে কতবছর একঘেয়ে নীল বেনারসি পড়তে হয়েছে বলে খুব রাগ হত। আর ঐ রঙ না হলে এ রাজ্যে ঢোকাই যেত না। তারও আগে ছিল লাল রঙের বেনারসি। প্রথম প্রথম কেমন জানি লজ্জা লজ্জা লাগত উমার নিজের বয়সের কথা ভেবে। তারপর তো কত ক্যাটক্যাটে লাল হতে পারে তার আয়োজন চলছিল। উমা একবার তাই রেগে মেয়েকে একটু বকে দিলো। আর তাই দেখে অন্য মেয়ে তখনও ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসেছিল। সব মোটামুটি ঠিকঠাক এগোচ্ছিল, এবছর নাকি একদিন বেশি থাকা যাবে। পাঁজিতে লিখেছে। সবাই ফুর্তিতে ছিল।
তাহলে! উমার মেজাজটা যেন সপ্তমে চড়ে আছে। এত জোরে তো উমা চেঁচায় না, আর ছেলেমেয়েরাই বা এই বয়সে এত কান্নাকাটি করছে কেন? শিবুর ধ্যানভঙ্গ হল,নেশা ছুটে গেল। ভয়ে ভয়ে জানলা দিয়ে উঁকি দিয়ে দ্যাখে উমা টি ভি র সামনে বসেই চীৎকার করছে, মুখের আগল খুলে গেছে —এই ড্যাকরা ছোঁড়া কোথা থেকে এসেছে, বাপ মা কি কিচ্ছু শেখায়নি গা। তেলোক পোঁটা কেটে ধম্মগুরু বনেছে।
বাংলায় নাকি এবার নিরামিষ খেতে হবে পূজোর সময়। না মানলে তাদের পাষন্ডী বলা হবে, হিন্দু সমাজ থেকে বের করে দেওয়া হবে। নবমীতে মাংস খাওয়া যাবে না? ওরে গোমুখ্যু তুই এই দেশটার কি বুঝিস রে, কোন পাঠশালায় লেখাপড়া করেছিস? এই দেশে কটা প্রদেশ বলতে পারবি? ওরে তোকে কে দীক্ষে দেছিল রে, কেমন করে বাবা বনে গেলি, গলায় হলুদ কাপড় জড়ালেই তোকে গুরু মানতে হবে? জানিস না নবরাত্রি আর নবমী এক নয়। নবমীতে কত জায়গায় পাঁঠা, শোল মাছ, কুমড়ো, লাউ বলি হয় এই বাংলায় পূজোর নবমীতে।সপ্তমী, দশমীতে মাছ খাওয়া হয়। কতরকম মাছ এই বাংলার পুকুরে, নদীতে।আমার উনি-কে তো কত জায়গায় নিরামিষ খাওয়ায়। আর বাংলায় আমাকে যখন অন্য রূপে আসতে হয়, শ্মশানে ঘুরতে হয়, উনি তো সঙ্গেই থাকেন তখন তো মাংস খাননা। ওরে মুখখু তান্ত্রিক সাধনা কি জিনিষ তোর গুরু কোন দিন তোকে শিখিয়েছে, বলেছে? বাপের জন্মে কমলাকান্ত, বামা খ্যাপার নাম শুনছিস? ওরা সত্যি সত্যিই একদিন এখানে ছিল, ওরা আমাদের ঘরের ছেলে। তারাপীঠের নাম শুনেছিস? জানিস আমাদের তারামাকে কি দিয়ে ভোগ দেয়? এই দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে কে সাধনা করত জানিস? নাম শুনেছিস কালিঘাট মন্দিরের? নাকি ওখানে ঢুকতে তোর বাপ মানা করেছে? রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, কমলাকান্ত, বামাখ্যাপা হিন্দু ছিলোনি? নাকি ওদের তুই হিন্দু সম্প্রদায় থেকে বের করে দিতে বলছিস?
শিবু প্রথমটায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিল, উমাকে এত রাগতে, এত মুখখারাপ করতে আজ অবধি কোনদিন দেখে নি। ছোট ছেলেটাকে ইশারা করে ডাকল। সে এসে ফোঁপাতে ফোঁপাতে কোনমতে টিভিতে কি দেখে মা এত রেগেছে বলল। সঙ্গে এও বলল মা নাকি বলেছে এর একটা বিহিত না হলে এবার কিছুতেই বাপের বাড়ি যাবে না। মায়ের কথা শুনে ওরা কাঁদছে। এতবছর ধরে ওরা মামার বাড়ি যায়। কত ঝড়, বন্যা, মহামারী হয়েছে, আয়োজন ধুমধাম কম হয়েছে কিন্তু যাওয়া তো আটকে যায় নি। মা অনেক কষ্ট করে খুঁজে, ঘোটকে, নৌকায় যেমন করে হোক মেনকা দিদার কাছে নিয়ে গেছে। শিবু সব শুনে থম মেরে কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপর ধ্যানে বসে রোমান দেবতা বুধ (mercuris) আর গ্ৰীক দেবতা হার্মিস (Hermes)-এর সঙ্গে কথাবার্তা বলল। ওরা বাণিজ্যের দেবতা। ধ্যানভঙ্গের প্রাক্কালে তার মুখে মৃদু হাসি দেখা গেল। চোখ মেলে দেখল লক্ষী আর গণেশ সামনে বসে রয়েছে। কি আশ্চর্য্য এই দুজনের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ তো ঐ বিদেশি বাণিজ্য দেবতারা বলছিল। ওরা বলল তুমি মাকে একটু সামলাও, আমরা দেখেছি কি করা যায়। ওরা দুজনে ইয়ারফোন লাগিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়ল। মর্ত্যের কাকে কাকে বকাঝকা করল। দেশ বিদেশের ব্যবসা বাণিজ্য, বৈদেশিক সম্পর্ক নিয়ে একটু উত্তপ্ত আলোচনা হল। শেষ পর্যন্ত ওদের পরামর্শ মর্ত্যের ঐ কয়েকজন মেনে নিল, খানিক কান্নাকাটি করল।
শিবুবাবু শুনলেন খাওয়াদাওয়া নিয়ে ঐ নিদান কেউ মানবে না বলে কথা দিয়েছে, অন্য কাউকে মানতেও বলবে না। শিবু এই কথাগুলো উমাকে গিয়ে বলল। উমা তখনও ফুঁসছে। শিবুর কথা শুনে খেঁকিয়ে উঠলো ওসব কথা আমিও শুনেছি ঐ নেতাগুলোর মুখে। ওসবে আমি পাত্তা দিচ্ছি না, আগে ওদের সবাইকে ক্ষমা চাইতে হবে। একজায়গায় বসে বসে তো ঐ ছুঁচোর কথা সবাই শুনল। কেউ তো ওকে থামালো না। উচিত তো ছিল ঘাড় ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেওয়া। তা নাকি করা যাবে না। কি সব নাকি রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। ধাষ্টামো হচ্ছে?
শিবু আর কথা বাড়ালো না।
লক্ষী গণেশ হাঁ করে চেয়ে আছে। সরস্বতী ফুট কাটল পড়াশোনা তো কবেই উঠে গ্যাছে। সবকিছুতেই পেটে একটু বিদ্যে থাকতে হয়। কার্তিক চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। এখন আর মাথায় কিছু ঢুকছে না। সবাই ভাবছে কি হবে। এমন সময় উমার গলা শোনা গেল মা বাবার সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারি কিন্তু ঐ ক’দিন আমি নিরম্বু উপোস করে থাকব। অর্থাৎ উমা প্রতিবাদে অনশনে বসবে ওর বাপের বাড়িতে।











