অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে উত্তরবঙ্গ সহ রাজ্যের বিভিন্ন ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। এরফলে সেখানকার ভূপ্রকৃতি, নিসর্গ, জনজীবন দেখার সুযোগ ঘটে। আবার এক পশ্চাদপদ জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থিত স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার, তারপর ব্লক মেডিকেল অফিসার। তারপর অন্য জেলাগুলিতে মহকুমার দায়িত্বে সহ মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক, জেলার উপ মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক, মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক প্রমুখ বিভিন্ন রকম পদে। চারটে ব্যস্ত হাসপাতালের অধীক্ষক বা সুপারিনটেনডেন্ট ছিলাম ১০ বছরের বেশি।
সাধারণত মানুষ রাজ্য সরকারের চাকরি থেকে কেন্দ্র সরকারের বেশি – বেতনের, সুযোগ সুবিধা ও নিরাপত্তার চাকরিতে যোগ দেন। আমার ক্ষেত্রে হয়েছে বিপরীত। তারপর ৩০ বছরের বেশি সেখানে বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে কাটিয়ে দিলাম। প্রায় প্রতিটি জায়গার কাজ ছিল খুব চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু শুরুতেই তদানীন্তন হিংসা কবলিত মুর্শিদাবাদ জেলার লেলিহান ক্ষেত খামারে সাড়ে তিন বছরের যে কমান্ডো ট্রেনিং পেয়েছিলাম তারজন্য বোধহয় অন্যত্র ততটা অসুবিধা হয়নি। এখন ভেবে দেখলে মনে হয় অনেক কিছুই করা যায়নি। সামান্য কিছু কাজ হয়তো করা গেছে। যেটুকু করা গেছে তার জন্য কৃতিত্ব কিছু নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীর এবং স্থানীয় মানুষের এক সংবেদনশীল অংশের। এরমধ্যে সব জায়গায় কিছু বিশেষ ব্যক্তির বিশেষ অবদান ছিল। এখানে সবার নাম উল্লেখ করার সুযোগ নেই। এই নীরব আসল নায়ক নায়িকাদের প্রতি সশ্রদ্ধ সম্মান ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা নিবেদন করছি।
অনেকেই প্রশ্ন করেন ধুঁকতে থাকা, চরম বিশৃঙ্খলাপূর্ণ নদীয়ার রানাঘাট মহকুমা হাসপাতাল (আনুলিয়া হাসপাতাল), বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর মহকুমা হাসপাতাল, পুরুলিয়ার ‘ইনস্টিটিউট ফর মেন্টাল কেয়ার’ এর পুনরসঞ্জীবন কি করে হল? কৃতিত্ব উপরোক্ত আসল নায়ক নায়িকাদের। আমার ভূমিকা তাঁদের দক্ষতা দেখানোর সুযোগ করে দেওয়া মাত্র। সবচাইতে বেশি প্রশ্ন আসে কলকাতায় অবস্থিত একদা মৃতপ্রায় এবং উঠে যাওয়ার মত অবস্থায় পৌঁছনো বাঘা যতীন স্টেট জেনারেল হাসপাতালের পুনর্জন্ম নিয়ে। এখানেও একদল নিবেদিত প্রাণ চিকিৎসক, নার্সিং স্টাফ, স্বাস্থ্য কর্মী, অফিস স্টোর ও ওয়ার্ড মাস্টার অফিস কর্মচারী এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা প্রবল ও প্রধান। যাদবপুর কেন্দ্রে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর ঐতিহাসিক পরাজয়ে কেউ কেউ এই হাসপাতাল নিয়ে অচলাবস্থাকে জড়িয়ে থাকেন। ২০১১ তে প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রী হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সর্ব প্রথমে এই হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন। পূর্ববঙ্গ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে চলে আসা স্থানীয় মানুষের আবেগপূর্ণ এই হাসপাতাল রক্ষা নিয়েই একসময় গড়ে উঠেছিল এক সফল গণ আন্দোলন। এই হাসপাতাল প্রসঙ্গেই চলে আসবে চণ্ডীদার প্রসঙ্গ। চণ্ডী চরণ বোস।
২০১৫ তে যখন ওখানে আমায় পাঠানো হয় লক্ষ্য করলাম এক অত্যন্ত ভদ্র, শান্ত, মিতবাক, দক্ষ অবসরপ্রাপ্ত গ্রুপ ডি কর্মী সারাদিন ওয়ার্ড মাস্টার অফিসে থেকে হাসপাতালের যাবতীয় কাজ করে দেন। কিছুদিনের মধ্যে বুঝতে পারলাম বহু ঝুটো মুক্তোর মধ্যে ইনি আসল হীরে। এমার্জেন্সি, ও টি, ওয়ার্ড সহ কোন গুরুত্বপুর্ণ জায়গায় কোন গ্রুপ ডি বা সাফাই কর্মী আসেননি। নাইট শিফটে এমার্জেন্সি তে অথবা সকালে আউটডোরের টিকিট করার জায়গায় কেউ আসেননি। ওষুধ দেওয়ার লোক কম পড়েছে। হাসপাতালের আলো জল চলে গেছে, ফোন জেনারেটর কাজ করছে না। ড্রেন আটকে জল জমে গেছে। এমার্জেন্সিতে কোন বড় অ্যাক্সিডেন্ট কেস এসেছে অথবা ব্রট ডেথ কেস এসেছে। রাতে ম্যাজিস্ট্রেট সুরহতাল করতে এসেছেন অথবা মাঝরাতে পুলিশ কোন মৃতদেহ এনেছে মর্গে রাখার জন্য। থানা, পি ডব্লিউ ডি, কর্পোরেশন ইত্যাদির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। হাসপাতালের টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়া। গ্রুপ ডি ও ‘কর্মবন্ধু’ দের ডিউটি রোস্টার তৈরি। তালিকা আর বাড়ালাম না। কে এত সব ঝঞ্ঝাট সামলাবে? কেন চণ্ডীদা তো আছেন!
হাসপাতালের মধ্যে ও বাইরে যেমন বহু ভালো মানুষ আছেন, কিছু গোলমেলে লোকও আছেন যাদের হাসপাতাল নিয়ে নানারকম স্বার্থ থাকে। তারা অন্যান্য গণ্ডগোলের সঙ্গে এই বিষয়েও গণ্ডগোল করছিলেন, চণ্ডীদা কয়েকবার আক্রান্তও হন। একটা আইনি বিধিব্যবস্থা করা দরকার। হাসপাতালের ‘রোগী কল্যাণ সমিতি’র বৈঠকে আলোচনা করে চণ্ডীদার একটা ব্যবস্থা করা হল। তার সঙ্গে সাম্মানিক ও হাসপাতালের কোয়ার্টারে থাকার ব্যবস্থা। চণ্ডীদা আরও দায়িত্ব নিয়ে এবং তাঁর স্বভাবসুলভ নীরবতায় সকাল থেকে রাত, কোন কোন দিন সারা রাত, কাজ করে চললেন। কোনদিন ছুটি নিতে দেখিনি, কোনদিন কোন দাবি বা অভিযোগ করেননি। রাতে ডিউটি করলেও পরেরদিন সকালে ঠিক এসে কাজে যোগ দিয়েছেন। কোভিড অতিমারীর সময় রাতারাতি ‘এম আর বাঙ্গুর হাসপাতাল’ কোভিড হাসপাতাল হয়ে গেল। ঐ পরিকাঠামোর মধ্যেই বাঘা যতীন হাসপাতাল কে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলা হাসপাতালের দায়িত্ব দেওয়া হল। চণ্ডীদার দায়িত্ব ও তৎপরতা অনেক বেড়ে গেল। আমাদের মর্গ ছিল ছোট এবং কোন ‘ডোম’ পদ ছিল না। আশ্চর্য হয়ে দেখতাম সবাই যখন সংক্রমণের ভয়ে তটস্থ তখন চণ্ডীদা অনায়াস ভঙ্গিতে কোভিড রোগগ্রস্ত বা কোভিড সন্দেহজনক মৃতদেহগুলি মর্গে ঢুকিয়ে রাখছেন অথবা মর্গ থেকে পুলিশের মৃতদেহ বহনকারী গাড়িতে তুলে দিচ্ছেন। বারবার বলা সত্ত্বেও PPE পরতেন না।
চণ্ডীদা নিজের বিষয়ে কিছু বলতে চাইতেন না। আদতে বাঁকুড়া জেলার মানুষ। যতদূর শুনেছি সত্যজিৎ রায়ের ‘ফটিকচাঁদ’ গল্পের মত তাঁর রোমাঞ্চে ভরা জীবন। বাবা বড় পুলিশ অফিসার ছিলেন। চণ্ডীদা অল্প বয়সে গৃহত্যাগ করেন। তারপর ইন্দ্রজাল শিখে বিভিন্ন মেলায় সেগুলো দেখিয়ে বেড়াতেন। তারপর সার্কাসের দলে যোগ দিয়ে নানারকম খেলা দেখাতেন। তারপর অনেককিছু করে শেষে স্বাস্থ্য দপ্তরের কাজে যোগ দেন। পাতলা দোহারা ফিট চেহারা। বয়স বোঝা যেত না। টিভিতে মাইকেল জ্যাকসনের নাচ দেখে শিখে দারুন ব্রেক ড্যান্স করতে পারতেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ডাক আসত। এই ধরনের প্রতিভাবান মানুষেরা অন্যরকমের হয়। চন্ডীদার পুত্রের একটা দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়। মেয়ের ছেলেকে নিজের কাছে খুব যত্ন করে রেখেছিলেন।
সামান্য অভিজ্ঞতায় দেখেছি যাঁরা প্রকৃত কাজের মানুষ তাঁরা বেশি কথা বলেন না, সাজিয়ে গুছিয়ে উপস্থাপনা করেন না। কারুর পদলেহন করেন না, নেতাদের পেছন পেছন ঘুরে বেড়ান না। স্বীকৃতি, পুরস্কার, পদোন্নতি, বেতন বৃদ্ধি এসবের তোয়াক্কা করেন না। ভালবেসে, মনের আনন্দে কাজ করে যান। এরাই আমাদের দেশ ও সমাজের সম্পদ। শত সমস্যা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার মধ্যে সংস্থাগুলো এদের জন্যই টিকে আছে এবং সাধারণ মানুষ কিছু পরিষেবা পাচ্ছেন। চণ্ডীদা ছিলেন এই ধরনের কাজের মানুষ।
সম্প্রতি চণ্ডীদা চিরকালের জন্য চলে গেলেন। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কঠিন সময় গুলোতে একসঙ্গে কাজ করার অনেক ঘটনার স্মৃতি মনের কোঠায় ভেসে এল। সমগ্র দক্ষিণ কলকাতা জুড়ে আন্ত্রিক মহামারী, ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসার ভালো ফলের জন্য কলকাতা কর্পোরেশনের নোডাল সেন্টার হওয়ার চাপ, আম্পনের তাণ্ডব …. আরও কত কি!
চণ্ডীদার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও প্রণাম রইল। 🙏











এরকম মানুষের জন্যই আমরা বেঁচে থাকি, ভালো থাকি।
শ্রদ্ধা জানাই।
আর লেখককে ধন্যবাদ।